বর্ষাকাল মানেই বর্ষাতি বা ছাতা, আর বাঙালি আজও ছাতা বললেই চোখ বুজে ভরসা করে কে. সি. পালের ছাতা (K. C. Paul Umbrella)। তবে কেবল বাংলাই নয়, ভারতের বিভিন্ন দিকে কে. সি. পালের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে গেছে এবং ক্রমশ ছড়াচ্ছে। ভারত বিশেষত বাংলার মানুষের কাছে ঐতিহ্যের একটি আলাদা মূল্য আছে। তাই কোন পণ্যের সঙ্গেও যদি মিশে থাকে অনেকদিনের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য, তার উপরে আপনা থেকেই ভরসা বেড়ে যায় মানুষের। কে. সি. পালের ছাতা-ও সেই গোত্রীয় পণ্যের মধ্যে অন্যতম। স্বাধীনতা পূর্ব যুগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়কালে এক বাঙালির হাতে গড়ে ওঠা এই ছাতার কারবার আজ এত বছর পরেও মানুষকে উচ্চমানের, বিচিত্র ডিজাইন, রঙ এবং স্টাইলের টেকসই ছাতার জোগান দিয়ে চলেছে। উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ব্যবসার ভাগাভাগি হলেও তাঁদের পরিবারে কিন্তু কোন ভাঙনই ধরেনি। স্বাধীন দেশে বাঙালির সফল ব্যবসার নিদর্শন হয়ে আছে এই কে. সি. পালের ছাতা।
চিরকালই বাঙালির বদনাম রয়েছে যে, বাঙালি ব্যবসা করতে পারে না। অবশ্য স্বাধীনতা প্রাপ্তির অনেক আগে থেকেই বেশ কিছু উদ্যোগী বাঙালি এই বদনাম ঘুচাতে সক্ষম হয়েছিলেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যালস গঠন বাঙালিকে ইংরেজের মুখাপেক্ষি না থেকে স্বতন্ত্রভাবে ব্যবসা করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তারপর একে একে বাঙালিদের হাতেই বোরোলিন, ডাবর, সুলেখা ইত্যাদি এমন অনেক যুগান্তকারী ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে মানুষ আজও যার কদর করতে দুবার ভাবে না। এরমধ্যে বহু পণ্যের সঙ্গে যেহেতু স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্বের ইতিহাসেরও খানিক সংযোগ রয়ে গেছে, সেই গৌরবময় ঐতিহ্য মানুষকে টানে এবং অবশ্যই ধারাবাহিকভাবে ভাল গুণমানের পণ্যের জোগান দেওয়ায় মানুষ তাদের ভরসা করতেও দ্বিধা করে না। সেইসব বহু পুরাতন ব্র্যান্ডগুলি তাই আজও কেবল বাংলা নয়, বাংলা ছাড়িয়ে ভারতের আরও নানাদিকে এমনকি বিদেশের মাটিতেও নিজেদের সাফল্যের নিশান ওড়াতে সক্ষম হয়েছে। বাঙালির তৈরি সফল সেই ব্যবসার তালিকায় “কে সি পালের ছাতা” আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। স্বাধীনতা প্রাপ্তির কিছু আগেই, অর্থাৎ ১৯৪০-এর দশকেই এই ব্র্যান্ডটির সূত্রপাত। সেই অস্থির সময়ে গড়ে ওঠা এই ব্যবসার নেপথ্যে তাকানো যাক এবার।
চল্লিশের দশক হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে খুব স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব পড়েছিল। ইংরেজ তখন জাপানিদের ভয়ে কাবু। এমনকি জাপানিদের আকস্মিক বোমা হামলার আতঙ্কে গোটা কলকাতা শহর তখন জড়সড় হয়ে রয়েছে। শ্যামবাজার খিদিরপুর ইত্যাদি এলাকায় পরপর অনেকগুলি বোমা ফেলেছিল জাপানিরা। সন্ধের পর শহরের আলো নিভিয়ে অন্ধকার করে রাখা হয়। এমনই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে প্রাণের তাগিদে অনেকেই কলকাতা শহর থেকে চলে গিয়ে গ্রামীণ এলাকায় বসবাস শুরু করেছিল। রাজনৈতিকভাবেও তখন চারদিক উত্তপ্ত। ভারত ছাড়ো আন্দোলনও পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন। এমন অস্থির পরিস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠিত ছাতা ব্যবসায়ী তুলসীদাস পালের পুত্র কার্তিকচন্দ্র পাল (Kartik Chandra Paul) কিন্তু পিতার যত্নসহকারে তিলে তিলে গড়া এই ব্যবসা ছেড়ে পালিয়ে গেলেন না কোথাও। বরং পিতার সেই ছাতার ব্যবসাটিকেই আরও বড় করে তোলবার প্রয়াস শুরু করলেন তিনি। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৪২ সালে বড়বাজার অঞ্চলের পুরুষোত্তম রায় স্ট্রীটে প্রথম দোকান তৈরি হল। কে সি পালের ছাতার সেই পথচলা শুরু হল। দেখতে দেখতে ব্যবসা বৃদ্ধি পেতে লাগল। ৫ বছরের মধ্যেই হ্যারিসন রোড, যেটি বর্তমানে মহাত্মা গান্ধী রোড নামে পরিচিত, সেখানে আরও একটি দোকান খোলা হল। ক্রমশ কে. সি. পালের এই ব্যবসা বিস্তার লাভ করতে শুরু করে৷ কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত তিনি নিজেই ব্যবসার রমরমা দেখে যেতে পারলেন না। ১৯৪৭ সালে, ভারতের স্বাধীনতার বছরেরই মাত্র ৫২ বছর বয়সে কার্তিকচন্দ্র পালের মৃত্যু হয়েছিল। ততদিনে কে. সি. পাল একটি জনপ্রিয় ও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছিল। চমৎকার গুণমানের কারণে মানুষের ভরসাও তারা অর্জন করতে পেরেছিল। স্বাধীন ভারতে শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্যের চাহিদা ও কদর যে বেড়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। কে. সি. পালের ছাতা ততদিনে ব্যবসাজগতে সফল হিসেবেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল।
১৯৪৭ সালে কার্তিকচন্দ্র পাল ওরফে কে. সি. পালের মৃত্যুর পরে তাঁর দুই ছেলে অনাথনাথ এবং বিশ্বনাথ ব্যবসার দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। কার্তিকচন্দ্রের বাকি দুই ছেলে অলোকনাথ এবং দেবনাথ তখন অনেকখানি ছোট। এই অনাথনাথ কিন্তু তাঁদের এই ব্যবসার ব্যাপারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই ছাতার ব্র্যান্ডটির আরও বিস্তারসাধনে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ২৪ বছর বয়স থেকে তিনি ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং প্রায় সমস্ত ছাতার ব্যবসায়ীই অনাথনাথের নাম জানতেন। এইভাবেই কে. সি. পালের পুত্রেরা ব্যবসায় যোগ দেওয়ায় কে. সি. পাল অ্যান্ড সন্স (K. C. Paul and Sons) হিসেবে ব্র্যান্ডটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। কোনরকম ট্রেডমার্ক না দেখেও, কেবল ‘সিন্স ১৯৪২’ লেখাটুকু দেখেই মানুষ বিশ্বাসে ও ভরসায় কে. সি. পালের ছাতা ক্রয় করে নিয়ে যেত। ব্যবসাটি উত্তরাধিকারী হওয়ার সুবাদে তুলসীদাসের চারজন নাতির মধ্যে ভাগ হয়ে গেলেও তাঁদের পরিবারটি কিন্তু কখনই ভেঙে যায়নি। তুলসীদাসের নামাঙ্কিত ‘তুলসী ভবনে’ই এক ছাদের তলায় তাঁরা সকলে মিলে বাস করেন।
কেবল উচ্চ গুণমানই নয়, নানারকম রঙ ও স্টাইলের ছাতাও কে. সি. পাল কোম্পানি তৈরি করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। কালো রঙ থেকে শুরু করে নানারকম উজ্জ্বল বর্ণের নান্দনিক ছাতা তৈরিতে তারা সিদ্ধহস্ত। অন্যদিকে সিঙ্গেল ফোল্ড ছাতা থেকে শুরু করে থ্রি-ফোল্ড ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের ছাতাও নির্মাণ করে থাকে কে. সি. পাল অ্যান্ড সন্স। প্রায় ১০০টিরও বেশি ডিজাইনের ছাতা রয়েছে তাদের। ছাতা তৈরির সরঞ্জামও যেহেতু ভারতে প্রস্তুত হয় না, সেই কারণেই ছাতার বিশেষ ধরনের কাপড়, রিবস ইত্যাদি সবই তাইওয়ান থেকে আমদানি করা হয়। তবে এই সমস্ত সরঞ্জাম বানাতে গেলে কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই কোম্পানির সেই পরিকল্পনাও রয়েছে। আপাতত সিমলা অঞ্চলে কে. সি. পালের একটি কারখানা রয়েছে।
শুধুমাত্র এই পশ্চিমবাংলার গন্ডির মধ্যেই কিন্তু কে. সি. পালের ছাতা সীমাবদ্ধ নেই। বাংলা বাইরেও বিহার, উড়িষ্যা পেরিয়ে এই ছাতার জনপ্রিয়তা কিন্তু পৌঁছে গেছে আসাম এবং ত্রিপুরার দিকেও। এই কোম্পানির পরবর্তী প্রজন্মের লক্ষ্য সারা ভারতবর্ষেই কে. সি. পাল অ্যান্ড সন্সের ছাতাকে ছড়িয়ে দেওয়া। দীর্ঘ প্রায় ৮২ বছর ধরে মানুষকে উন্নতমানের ছাতার জোগান দিয়ে আসা এই কে. সি. পালের ছাতার সঙ্গে যে ট্যাগলাইনটি জুড়ে আছে তা সত্যিই সার্থক—’শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, কে. সি. পালই ভরসা’।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান