সববাংলায়

ভূমিকম্প এলে পশুপাখিরা বুঝতে পারে কিভাবে

বিজ্ঞান ও উন্নত প্রযুক্তির আশীর্বাদে বিজ্ঞানীরা হাজারো অজানাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসলেও মানুষ এখনও আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়নি কিভাবে জানা যেতে পারে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস। কিন্তু ভূমিকম্প এলে পশুপাখিরা বুঝতে পারে কিভাবে?

১৯৭৫ সাল, ৭.৩ মাত্রার ভূমিকম্পে  চীনের হাইচেং প্রদেশে কেঁপে উঠল। কিন্তু অবাক হওয়ার মতই ঘটনা! একজনেরও মৃত্যু হয়নি সেদিন। কিন্তু কি এমন ঘটেছিল সেদিন যাতে এত প্রবল কম্পনেও প্রাণহানি হলনা! চীনের বিশেষজ্ঞরা এই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন বেশ কিছুদিন যাবৎ ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকা মৃদু ভূ-কম্পন এবং জলের স্তরের তারতম্য দেখে। তাছাড়া সে সময় তারা পশুপাখির মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেছিলেন। হাইচেং শহরের রাস্তায় হঠাৎ অসংখ্য সাপ ও ইঁদুর দেখে বিষয়টিকে তারা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছিলেন।

প্রশ্নটা হল পশুপাখিরা কি সত্যিই বুঝতে পারে ভূমিকম্পের আগাম খবর? প্রাণীরা যে সত্যিই সেটা ভীষণভাবে বুঝতে পারে সে তো জানিই। প্রাচীন জাপানী জেলেরা মনে করতো সমুদ্রের মাঝখানে একসাথে উড়ুক্কু মাছ চোখে পড়লে কয়েকদিনের মধ্যেই কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে। তারা ভূমিকম্পের ভয়ে তখন তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে আসতো। গত কুড়ি বছরের মধ্যে এভাবে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া গিয়েছে।

১৮৫৫ সালে টোকিও শহরের কয়েকটি জায়গায় দেখা গেলো হঠাৎ করেই হাঁস-মুরগী ডিম দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তারা খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসার পর আর খাঁচায় ঢুকতে চাইতো না। তাদের হাবে-ভাবে এমন ছটফটানির চিহ্ন ফুটে উঠতো যে, বোঝা যেতো প্রাণীগুলো সেখান থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে। এর সাতদিনের পর শহরের ঠিক সে জায়গাতেই আঘাত হেনেছিল অনেক বড় মাপের ভূমিকম্প।

ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা উড়ে বেরাচ্ছে। এই দৃশ্য ইতালির জেনোয়া শহরের অতি পরিচিত দৃশ্য। ১৮৫৭ সালে ভূমিকম্পের ঠিক কয়েকদিন আগে হঠাৎ করেই পায়রাশূন্য হয়ে গেলো শহরে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, আগামী বিপদের ইঙ্গিত পেয়েই তারা দল বেঁধে দূরের নিরাপদ এলাকায় চলে গিয়েছিল। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস অনুভব করার ক্ষমতা সরীসৃপদেরও আছে। তাই কোনো এলাকায় ভূমিকম্পের ঠিক আগে সাপেদেরও দল বেঁধে গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে আসতে দেখা গিয়েছে।

১৮৯৬ সালে চীনের তিয়েনসিনে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়। তার মাত্র চারদিন আগে সেখানকার চিড়িয়াখানায় খাঁচার ভিতর থাকা বড় প্রাণীগুলো প্রচন্ড চিৎকার আর দাপাদাপি করতে থাকে। পাখিরাও অস্থির হয়ে ওঠে। গোল্ডেন উইং ওয়ার্ব্লার নামের পাখিদের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করেছিলেন বিজ্ঞানীরা যে তারাও ভূমিকম্পের আভাস টের পেয়ে তাদের আবাসস্থল পরিবর্তন করে নিরাপদ অবস্থানে চলে যায়।

১৯৫৫ সালে সাবেক যুগোশ্লাভাকিয়ায় এবং ১৯৭৬ সালে ইতালির মধ্য অঞ্চলে ভূমিকম্পের আগে বেশ কিছু প্রাণীর অস্বাভাবিক আচরণ দেখা গিয়েছিল। এরপর নব্বইয়ের দশকে চীনের বেইজিংয়ে আবারও ইঁদুর, বিড়াল সব ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। কুকুর চিৎকার করে ডাকাডাকি করতে থাকে।

২০১১ সালের আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রেইস্ট কোস্ট অঞ্চলে ৫.৮ মাত্রার যে ভূমিকম্প হয় তা ফ্ল্যামিঙ্গো পাখি বুঝতে পেরেছিল। কারণ ভূমিকম্পের আভাস পেয়ে নদীতে সাঁতার কাটতে থাকা ৬৪টি ফ্ল্যামিঙ্গো পাখি একসাথে উড়ে গাছে আশ্রয় নেয়।

২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় সুনামি ঘটার আগে সমুদ্রের গভীর থেকে প্রচুর মাছ উপকূলে এসে জেলেদের জালে ধরা পড়ে। কুনোব্যাঙ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস পায়- এ রকম ইঙ্গিত পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যের ওপেন ইউনিভার্সিটির প্রাণিবিদ ড. রাচেল গ্রান্ট কুনোব্যাঙের এই অদ্ভুত আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন। ইতালির সান রাফিনো লেককে গবেষণার স্থান হিসেবে তিনি নির্বাচন করেন, যেখানে প্রায়ই ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। তার এই গবেষণাকালীন সময়টিতে ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল সেখানে ৬.৩ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ড. গ্রান্ট জানান, ভূমিকম্প আঘাত হানার পাঁচ দিন আগেই সেখানকার প্রায় ৯৬ শতাংশ ব্যাঙ তাদের প্রজননক্ষেত্র ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদ স্থানে চলে যায়। ভূমিকম্পের পর ব্যাঙগুলো পুনরায় তাদের আবাসস্থলে ফিরে আসে।

কিন্তু প্রশ্নটা হল প্রাণীরা এটা বুঝতে পারে কিভাবে? বিশিষ্ট ভূবিজ্ঞানী নারায়ণ দেশাই, পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় চার দশক ধরে ভূকম্পন  নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে জানাচ্ছেন, কম্পন অনুভবের এক বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে পায়রাদের।বিখ্যাত ভূবিজ্ঞানী জিম বার্কল্যান্ড তাঁর ‘When it happens’ বই তে যা জানাচ্ছেন- ভূকম্পন-এর আগে মাটির গভীরে ইলেকট্রিক পালস্ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ার ফলে তৈরী হয় একপ্রকার তরঙ্গ,পরিভাষায় যার নাম – ‘টেলুরিক কারেন্ট’।মাটির ওপরে স্পষ্ট ভাবে কম্পন অনুভূত হওয়ার বহু আগেই সেই তরঙ্গের ছোঁয়ায় তৈরী একধরণের অনুরণন।পায়রা সেই অনুরণন টের পায়।কিন্তু এত গেল পায়রার ব্যাপার।কিন্তু বাকি প্রাণীরা?বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন ক্যাটফিশরা জলের তলায় তৈরী ইলেকট্রিক কারেন্টের মধ্যে ভূমিকম্প আসার আগেই যে সূক্ষ্মতম পরিবর্তন হয় সেটা ঠিক বুঝতে পারে। আর বুঝতে পেরেই জলের তলায় অতি দ্রুত ছুটোছুটি করতে থাকে।আবার কিছু প্রাণী যেমন জার্মান শেফার্ড কুকুর ও জলহস্তীরা ইনফ্রাসনিক সাউন্ড (মানুষের শোনার ক্ষমতার ব্যপ্তি হল (কুড়ি হার্জ থেকে কুড়িহাজার হার্জ। কুড়িহাজার হার্জ-এর বেশী কম্পাঙ্ক-এর শব্দ কে আলট্রাসনিক সাউন্ড বলে যা আমরা শুনতে পাইনা।আবার কুড়ি হার্জ এর কম শব্দ কে ইনফ্রাসনিক সাউন্ড বলে যেটাও আবার আমরা শুনতে পাইনা।)বুঝতে পারে।বলা হয় এরা ভূগর্ভের তলায় মহাদেশীয় পাতে পাতে সংঘর্ষে যে আওয়াজ হয় সেটা পর্যন্ত এরা শুনতে পায়।ভেবে দেখুন খালি একবার মহাদেশীয় পাতে পাতে এই লড়াই টা হয় প্রায় সমুদ্রতল থেকে ১০ কিমি নিচে।

২০০৪ সালের সুনামি আসার প্রায় ৩ ঘণ্টা আগে থাকতেই শ্রীলঙ্কার ‘ইয়ালা ন্যাশনাল পার্ক’-এর হাতি গুলো তারস্বরে চিৎকার করতে করতে পাহাড়ের দিকে ছুটছিল।বাঘ আর হায়নাগুলোকে মাংসের লোভ দেখিয়েও কিছুতেই খাঁচার বাইরে আনা যাচ্ছিল না।ব্রিটেন এর আ্যংলিয়া রাস্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার ডক্টর র‍্যাচেল গ্রান্টের মতে ভূমিকম্প হলেই মাটির তলায় প্রচণ্ড চাপ তৈরী হওয়ার ফলে প্রচুর পরিমাণে পজিটিভ আয়ন তৈরী হয় যা পশুদের মধ্যে ভীষণ অস্বস্তি তৈরী করে যা পশুপাখিদের মধ্যে ভূমিকম্প-এর আগাম সতর্ক বার্তা হিসেবে কাজ করে।শুধু পশু পাখি-ই বা কেন, মানুষের মধ্যেও কিন্তু এই পজিটিভ আয়নজনিত অস্বস্তি অনুভব হয়। ভাবছেন কিভাবে? মনে করে দেখুন তো  ভূমিকম্পের সময় কি আপনার মাথাটা কেমন যেন মনে হয় ঘুরে গেল একবার! ভূমিকম্পের সময় আমার আপনার এই মাথা ঘোরাকে ডক্টর র‍্যাচেল গ্রান্ট বলছেন ‘সেরোটোনিন সিন্ড্রোম’।সেরোটোনিন হরমোন প্রাণীদের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। ভূমিকম্প হলেই মাটির তলায় প্রচণ্ড চাপ তৈরী হওয়ার ফলে প্রচুর পরিমাণে পজিটিভ আয়ন তৈরী হয় যা এই সেরোটোনিন হরমোনের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় কিছু সময়ের জন্য।পশু পাখিদের সাথে আমাদের পার্থক্য হল আমাদের চেয়ে অনেক আগেই ওরা এই পজিটিভ আয়নজনিত অস্বস্তি অনুভব করতে শুরু করে ভূমিকম্প হওয়ার অনেক আগেই।শোনা যায় ভূমিকম্পের অনেক আগেই কান নেমে যায় গাধার।পিঁপড়েরা ২.০ তীব্রতারও ভূমিকম্প বুঝতে পারে। বিজ্ঞানীরা পশু পাখিদের এই আগে থাকতেই ভূমিকম্প বুঝতে পারার ক্ষমতার রহস্যের কিছুটা পর্দা ফাঁস করতে পেরেছেন।কিন্তু এখনও অনেকটাই জানা বাকি।গবেষণা চলছেই।তবে বিজ্ঞানীদের এই চেষ্টা অন্তত আমাদের একটা ভ্রান্ত ধারণা নিশ্চয়ই ভাঙতে পেরেছে যে কোন অলৌকিক ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের কারসাজি নয়, আমাদের চেয়ে ক্ষমতায়,বুদ্ধিতে অনেক পিছিয়ে থেকেও প্রকৃতি তার এই সন্তানদের কিছু কিছু অঙ্গের ক্ষমতা এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে যেখানে তার অহঙ্কারী গর্ভজাত সন্তানটিও স্রেফ ম্লান হয়ে গেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading