বসন্ত এবং শরতে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুসে ভারী বর্ষণে মাটি কর্দমাক্ত হয় যা রাসপুতিতসা নামে পরিচিত। এই ‘রাসপুতিতসা’ শব্দটির জন্ম রাশিয়ান শব্দ ‘পুত’ থেকে যার অর্থ রাস্তা। ফিনল্যান্ডের ইস্টার্ন পরিভাষায় একে বলে ‘রসপুত্ত’ (Rospuutto)।। বৃষ্টি ও তুষারপাতের সমন্বয়ে এক অদ্ভুত পরিবেশের সৃষ্টি হয় এই ঋতুতে। যতদূর যাওয়া যায় শুধু চোখে পড়ে মাইলের পর মাইল কাদাময় রাস্তা। যে রাস্তা বারে বারে রুখে দিয়েছে রাশিয়া আক্রমণকারী শত্রুকে মাঝপথেই। রাসপুতিতসা তার জালে আবদ্ধ করেছে, গিলে খেয়েছে বিভিন্ন যানবাহন এমনকি প্রাণীকেও। এই রাস্তা পেরোতে গিয়ে ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় প্রাণ হারিয়েছে বহু মানুষ। বসন্তে যেখানে প্রকৃতি সেজে ওঠে সেখানে সমগ্র রাশিয়া এই রাসপুতিতসার শিকার হয়। এই পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে শরতের ভারী বর্ষণের প্রভাবে। রাশিয়ান ল্যান্ডস্কেপ চিত্রশিল্পী অ্যালেক্সি সারাসভ (Alexei Savrasov) ১৮৯৪ সালে ‘Sea of Mud’ চিত্রের মাধ্যমে রাসপুতিতসার চেহারাকে রঙে রেখায় রূপ দিয়েছেন। বিখ্যাত কবি রবার্ট ফ্রস্ট তাঁর লেখনীতেও রাসপুতিতসার প্রসঙ্গ এনেছেন বারবার।
এই রাসপুতিতসার স্থায়িত্বকাল দুই থেকে তিন মাস। প্রত্যেক বছর এই রাসপুতিতসা দক্ষিণে ক্রিমিয়া থেকে উদ্ভুত হয়ে উত্তরে প্রিপিয়াত মার্শ পেরিয়ে বেলারুস পর্যন্ত অগ্রসর হয়। রাশিয়ার কিছু জেলায় এই সময় রাস্তা বন্ধ থাকে। রাশিয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ গ্রাম্য এলাকায় পাকা রাস্তা না থাকার দরুণ সেখানে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মানুষজন তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় কর্মে বাধা পান। শিশুরা এই সময় রাস্তা খারাপ থাকার জন্য গৃহবন্দী থাকতে বাধ্য হয়।
রাসপুতিতসা তার গুণাবলীর কারণে বারবার দুনিয়ার সামনে হাজির হয়েছে খবর হিসেবে। এই রাসপুতিতসা রাশিয়াকে বারবার রক্ষা করেছে শত্রুর কবল থেকে। জার্মানির রাশিয়া আক্রমণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলা চলে। জার্মান বাহিনী যতই পরাক্রমী হতে থাকে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ ততই নিজের নিরাপত্তা বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এইসময় হিটলার রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে চাইলেও সেই চুক্তির কোনও ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়নি, বরং এই চুক্তি বাতিল হওয়ায় উভয় দেশের মধ্যে এক সন্দেহজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। চুক্তি বাতিল হওয়ায় ১৯৪১-এর ২২ জুন হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করে যা ‘অপারেশন বারবারোসা’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। আক্রমণের সঙ্গী ছিল প্যাঞ্জার ডিভিশন, ৩ হাজার ট্যাঙ্ক, ২৫০০ বিমান এবং ৬-৭ লক্ষ ঘোড়া। আবহাওয়ার অবনতি এবং রাস্তাঘাট খারাপ থাকায় যুদ্ধের ফলাফল জার্মানির বিপক্ষে যায়। সেই যাত্রায় মস্কো আক্রমণের আগেই রাশিয়ানরা রাসপুতিতসার কারণে জার্মানির কবল থেকে মুক্তি পায়। এই যুদ্ধে জার্মানির একমাত্র বাধা ছিল শীতকালীন পরিস্থিতি। কর্দমাক্ত রাস্তা তাদের জয়ের পথ আটকাবে একথা তারা স্বপ্নেও ভাবেনি। এই সম্পর্কে জার্মান আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করলেও হিটলার সেকথা কানে তোলেননি। যুদ্ধ যত এগোতে যেতে থাকে, রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। রাসপুতিতসার আবির্ভাবের কারণে সমস্ত ট্যাংক, ইঞ্জিন কাদায় প্রবেশ করে। ট্রাক্টরের চাকা় বসে যাওয়ায় সেনাবাহিনীর বিপদ বাড়তে থাকে। জ্বালানি কমতে থাকে এবং বড় ট্রাক ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হতে থাকে কাদায়। কিছুদিনের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ জার্মান ট্রাক ভেঙে যায়। জার্মানির কাছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় ধীরে ধীরে জার্মান বাহিনী পরাজয়ের পথে এগিয়ে যায়। একসময় দেখা যায় রাসপুতিতসা তাদের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সমস্ত আগাম সতর্কতা থাকা সত্বেও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করেছিলেন হিটলার।
হিটলারের আগে ঠিক একইভাবে ১৮১২ সালে নেপোলিয়নেরও পরাজয় ঘটেছিল এই রাসপুতিতসার কারণে। নেপোলিয়ানের পরাজয়ের বিভিন্ন কারণের মধ্যে অন্যতম একটি ছিল আবহাওয়া। নেপোলিয়নের যত সৈন্যবাহিনী এগোতে থাকল, অবস্থার ফায়দা তুলে রাশিয়ানরা তাদের জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে শুরু করল। খাদ্যের অভাব ও রাস্তার খারাপ অবস্থার কারণে প্রায় এক হাজার ঘোড়ার মৃত্যু হল। সৈন্যবাহিনী হাঁটতে থাকলেও খাদ্যের অভাবে কিছুদিনের মধ্যে তারাও মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে। শুধু তাই নয়, ইতিহাসে দেখা যায় ত্রয়োদশ শতকে মোঙ্গল আক্রমণের সময়েও রাসপুতিতসার কারণে বসন্তকালে রাশিয়ার নোভগোরোড (Novogorod) শহর জয় করা দুঃসাধ্য হয়েছিল। তাই অনেকেই এই রাসপুতিতসাকে ‘জেনারেল মাড’ বা ‘মার্শাল মাড’ নামেও ডেকে থাকেন।
বর্তমানে ইউক্রেনের সীমান্তের এই কর্দমাক্ত জমিই ইউক্রেনের এক অন্যতম সম্পদ হয়ে উঠেছে যা একাধারে রাশিয়ার অনুপ্রবেশ এবং ট্যাঙ্ক, মিসাইল ইত্যাদির পশ্চিমী সরবরাহের পথে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান