এ এক অভিশপ্ত ছবি। সময়টা ১৯৯৩ সালের মার্চ মাস। দক্ষিণ সুদানের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ পীড়িত অঞ্চল মরুপ্রায়। সেইসঙ্গে চলছে অ্যানথ্রাক্স মহামারী। কঙ্কালসার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ আর তাদের কঙ্কালসার শিশুদের ছবি তুলতে ছুটলেন দক্ষিণ আফ্রিকার চিত্র-সাংবাদিক কেভিন কার্টার। ২৬ মার্চ নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার পাতায় ছাপা হল সেই অভিশপ্ত ছবি – ‘দ্য ভালচার অ্যাণ্ড দ্য লিট্ল গার্ল’ (The vulture and the little girl) একটি শিশু ও একটি শকুন । পুলিৎজার পুরস্কারে সম্মানিত হয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে নাম খোদিত হয়ে গেল কেভিন কার্টারের। কিন্তু গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো অমোঘ নিয়তি এসে কেভিনকে ঠেলে দিল আত্মধ্বংসের পথে। একটি বিখ্যাত ছবি – উপচে পড়া সমালোচনা আর অসীম অনুশোচনার ভারে আত্মহত্যা করে বসলেন চিত্রগ্রাহক কেভিন কার্টার। কিন্তু কি ছিল সেই ছবিতে? কী তার প্রেক্ষাপট? চলুন জেনে নিই।
১৯৯০ সাল থেকে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার সুদানে। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ চলায় পুরো দেশ জুড়েই মন্দা, ঋণের বোঝা চাপে দেশের সরকারের উপর। এদিকে সুদানের শিল্প-পরিকাঠামোও অতটা উন্নত নয়। আর এর মধ্যেই মহামারী আর দূর্ভিক্ষ গ্রাস করলো গোটা দেশকে। অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকলো সুদানের। অ্যানথ্রাক্স রোগের প্রকোপ বাড়ছিল ক্রমশ। সম্মিলিত জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সুদানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অধিকাংশ অপুষ্টিতে আক্রান্ত। বহু প্রাপ্তবয়স্কের মৃত্যুর সংবাদও পাওয়া যাচ্ছিল, আয়োদ শহরে দশ থেকে তেরো জন প্রাপ্তবয়স্ক শুধুমাত্র না খেতে পেয়ে মারা গিয়েছিল বলে জানা যায়। শিশুরাও মারা যাচ্ছিল ক্রমশ। ইউনেস্কোর তরফে প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার ইত্যাদি ঐ অঞ্চলে পাঠানো হতে থাকে এবং এই ঘটনা সম্পর্কে সকলকে সচেতন করার জন্য চালু হয় ‘অপারেশন লাইফলাইন সুদান’। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই চিত্র-সাংবাদিক কেভিন কার্টারকে ডেকে আনা হয়। গৃহযুদ্ধের কারণে সুদানে আসার জন্য কোনো ভিসার অনুমতি এতদিন দেওয়া হচ্ছিল না, কিন্তু এই বিপদের মুহূর্তে সাংবাদিকদের ভিসার অনুমতি দেওয়া হয়। কেভিন কার্টার চলে আসেন সুদানের দূর্ভিক্ষপীড়িত মরুপ্রায় অঞ্চলে। তখনও তিনি ভাবতেও পারেননি এখানেই জন্ম হবে শতাব্দীর সেরা একটি দূর্ভিক্ষের ছবি আর তার কারণেই পরবর্তীকালে তাঁর জীবনটা বিষিয়ে উঠবে।
সুদানে সেসময় যেখানে তাকানো যায় শুধুই উষর প্রান্তর, ফসল হয় না। খরা হয়ে গেছে এরই মধ্যে। এদিকে মাথার উপর তীব্র রোদের ঝলকানি। জঙ্গলের ঘাসগুলিও হলুদ হয়ে গেছে শুকিয়ে। ঠিক এই নেপথ্য পরিবেশের ফ্রেমে হঠাত ঢুকে পড়ে একটি বছর তিনেকের শিশু – রুগ্ন, কঙ্কালসার চেহারা। দূর্বল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে একসময় মাটিতে বসে পড়ে। একটা ভালো ছবি হতে চলেছে বুঝতে পেরে ক্যামেরা ধরে উন্মুখ হয়ে থাকেন কেভিন কার্টার। শিশুটি তখন তাঁর মাছের চোখ। চিত্র-সাংবাদিকতার জীবনে বহু ‘এক্সক্লুসিভ’ ছবি তোলার কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর। নিরপেক্ষ, নিরাবেগ মন নিয়ে শীর্ণ কৃষ্ণাঙ্গ ঐ শিশুটির ছবি তুলতে থাকলেন কেভিন কার্টার। ঠিক সেইসময় মৃত্যুদূতের মতো নিঃশব্দে পিছনে এসে দাঁড়ায় একটা শকুন।

মৃত্যুর গন্ধ বড়োই লোভনীয়। ধীরে ধীরে শকুনটা শিশুটির দিকে এগোতে থাকে। একটা সময় শকুনটি আর শিশুটিকে এক ফ্রেমে রেখে কেভিন ক্যামেরাবন্দী করে ফেললেন সেই অভিশপ্ত ছবি। পরে বিপদ বুঝতে পেরে কেভিন ক্যামেরাটা শূন্যে ঘুরিয়ে সতর্ক করে দেন শিশুটিকে। শকুনটিও সতর্ক হয়ে যায়। মাটি থেকে উঠে হাঁটতে থাকে শিশুটি, পিছনে তখনও অপেক্ষমান মৃত্যুদূত। সেদিন ঠিক কতদূর হেঁটেছিল শিশুটি কেভিন জানেন না, এমনকি শকুনটির হাত থেকে সে বেঁচেছিল কিনা তাও তাঁর অজানা। ১৯৯৩ সালে ২৬ মার্চ নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হল সেই ছবি, শিরোনাম – ‘দ্য ভালচার অ্যাণ্ড দ্য লিটল গার্ল’। চারিদিকে সমালোচনা আর নিন্দার ঝড় শুরু হয়ে গেল। কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করলেন যে শিশুটির অমন বিপদে নিছক সাংবাদিকতার দায়ে কেভিন কীভাবে পারলেন শুধু ছবি তুলে যেতে? কেউ প্রতিবাদ জানালেন এভাবে দূর্ভিক্ষপীড়িত শিশুটিকে ‘অবজেক্ট’ বানাতে পারেন না কেভিন কার্টার। অনেকে আবার শিশুটির পরিণতির কথা জানতে চান। কেভিনের থেকে একটা বয়ান নিয়ে পুনরায় পত্রিকায় ছাপা হলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরো বেড়ে যায়। সকলের চোখে কেভিন কার্টার আর ঐ শকুন এক হয়ে যায়।
অথচ ঠিক এক বছর পরেই এই ছবিটিই তাঁকে এনে দেয় পুলিৎজার পুরস্কারের সম্মান। ফিচার ফোটোগ্রাফি বিভাগে বিজয়ী কেভিন কার্টারের মনে পুরস্কারের আনন্দ দাগ কাটতে পারেনি। ক্ষুধার্ত শকুন আর কঙ্কালসার শিশুটির চিন্তা তাঁকে অস্থির করে রাখে। কোনো কাজেই আর মন বসে না কেভিনের। ঐ মাসেই আবার ছবি তোলার সময় দূর্ভাগ্যবশত গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান কেভিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু কেন উস্টারব্রোক যিনি কেভিনের ‘ব্যাং ব্যাং ক্লাব’-এর সদস্যও ছিলেন একসময়। সব মিলিয়ে এত বিপুল মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে অবসাদে চলে যান কেভিন। যেখানেই যান ঐ ছবিটি নিয়ে মানুষ তাঁকে নানা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে চলে। প্রশ্ন থামে না। তাঁর নিজেরও একসময় পর থেকে আত্ম-অনুশোচনা জাগে। প্রতি মুহূর্তে মনে হয় ঐ শিশুটিকে তাঁর উদ্ধার করা উচিত ছিল। হয়তো প্রতিটি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এই আত্মধ্বংসের আখ্যান। যে পেশাদারি মানসিক দূরত্ব থেকে সেদিন শিশুটির প্রতি সহৃদয়তা বা কোনো অনুভূতি জাগেনি কেভিনের, সেই পেশাদারিত্ব ভুলে যেতে চাইলেন তিনি ক্রমশ। একটা নিখুঁত শট নেবার জন্য নীতিবোধ-মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে তাঁর যে দীর্ঘ অপেক্ষা, সেটাই যে তাঁকে এত অবসাদগ্রস্ত করে দেবে তিনি হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি। পরবর্তীকালে সমালোচক ম্যাকলাউড কেভিন কার্টার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছেন যে তাঁর তোলা ঐ ছবির শকুনের মতো অবসাদ যেন তাঁর জীবনে মৃত্যুর ছুরি নিয়ে অপেক্ষমান আর ঐ রুগ্ন শিশুটি যেন কার্টার নিজেই।
১৯৯৪ সালে জোহানেসবার্গে নিজের গাড়ির মধ্যেই বিষাক্ত গ্যাসে আত্মহত্যা করেন কেভিন কার্টার। তাঁর কাছে পাওয়া সুইসাইড নোটে লেখা ছিল অবসাদগ্রস্ত হওয়ার কথা। ওই সেই অভিশপ্ত ছবি যা তাঁকে মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভুলতে দেয়নি শিশুটির কথা, ভুলতে দেয়নি তীব্র অনুশোচনার জ্বালা। একটি শিশু ও একটি শকুন ছবিটি তাই ইতিহাসের পাতায় কেভিন কার্টারের এই মর্মন্তুদ পরিণতির কথাই স্মরণ করায়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান