ইতিহাস

রঘু রাই

রঘু রাই

ভারতীয় ফোটোগ্রাফি এবং চিত্র-সাংবাদিকতার জগতে রঘু রাই (Raghu Rai) এক অনন্য স্মরণীয় নাম। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হয়েও ছবি তোলার নেশায় একেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। বিখ্যাত ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় চিত্র-সাংবাদিক হিসেবে তিনি বহুদিন নিযুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে ‘ইণ্ডিয়া টুডে’-র ডিরেক্টর অফ ফোটোগ্রাফি পদেও বহাল ছিলেন। ‘রঘু রাই’স ইণ্ডিয়া : রিফ্লেকশনস ইন কালার অ্যাণ্ড রিফ্লেকশন্স ইন ব্ল্যাক-অ্যাণ্ড-হোয়াইট’ বইটির জন্য তিনি ভারতীয় চিত্রগ্রাহক থেকে শুরু করে সাধারণ পাঠক সকলের কাছেই পরিচিত হয়েছেন। বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় চিত্রসাংবাদিকতার কাজের জন্য ১৯৭২ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন রঘু রাই। তাছাড়াও ইউনেস্কোর ‘ইন্টারন্যাশনাল ফোটো কনটেস্ট’ এবং ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফোটো কনটেস্ট’-এর বিচারক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি অনেকবার। শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও তাঁর তোলা ছবির অসামান্য সব প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর পরাধীন ভারতে পাঞ্জাবের ঝং গ্রামে রঘু রাইয়ের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম রঘুনাথ রাই চৌধুরী। তাঁর বাবা-মায়ের চার সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন তিনি।

ছোটোবেলা থেকেই ছবি তোলার প্রতি আগ্রহী রঘু রাই তাঁর দাদা শরম্‌পাল চৌধুরীর কাছ থেকে ১৯৬৫ সাল থেকে ছবি তোলার প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। তাঁর দাদা নিজেও একজন খুব ভালো চিত্রগ্রাহক ছিলেন। তেইশ বছর বয়সে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তেই ছবি তোলার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন রঘু রাই।

১৯৬৬ সালে ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় মুখ্য চিত্রগ্রাহক হিসেবে যুক্ত হয়ে কর্মজীবন শুরু করেন রঘু রাই। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত মোট দশ বছর তিনি এই সংস্থায় কাজ করেছেন। তারপর ১৯৭৭ সালে তিনি যোগ দেন ‘সানডে’ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় যেখানে দীর্ঘ তিন বছর চিত্র সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন রঘু রাই। ১৯৭১ সালে প্যারিসে রঘু রাইয়ের একটি চিত্র-প্রদর্শনী দেখে বিশ্বখ্যাত চিত্রগ্রাহক হেনরি-কার্টিয়ার-ব্রেসন তাঁকে ১৯৭৭ সালে চিত্রগ্রাহকদের জন্য অত্যন্ত সম্মানীয় ‘ম্যাগনাম ফোটোস’ পত্রিকার জন্য নির্বাচন করেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে সদ্য গড়ে ওঠা ‘ইণ্ডিয়া টুডে’ পত্রিকার মুখ্য চিত্রগ্রাহক-চিত্র সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন রঘু রাই এবং ঐ সময়কালের মধ্যেই বহু বিশেষ সংখ্যার বিন্যাস তৈরির পাশাপাশি সাম্প্রতিক ইতিহাসের সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত বিষয়ে ছবি এবং লেখা প্রকাশ করেছেন তিনি। মূলত ভারতের অলি-গলি সর্বত্র তিনি ক্যামেরার চোখ দিয়ে আবিষ্কার করে গিয়েছেন। তাঁর সমস্ত চিত্র-প্রবন্ধগুলি বিশ্বের বিখ্যাত সব পত্রিকা টাইমস, জিইও, লাইফ, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, সানডে টাইমস্‌, নিউজউইক, দ্য ইণ্ডিপেণ্ডেন্ট ইত্যাদিতে প্রকাশ পেতো। আঠারোটিরও বেশি বই লিখেছেন রঘু রাই যার মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত বইগুলি হল – ‘রঘু রাই’স দিল্লি’, ‘দ্য শিখস’, ‘ক্যালকাটা’, ‘খাজুরাহো’, ‘তাজমহল’, ‘টিবেট ইন এক্সাইল’, ‘ইণ্ডিয়া’ এবং ‘মাদার টেরেসা’। ১৯৮৪ সালে ভোপালে যে বিধ্বংসী গ্যাস দূর্ঘটনা ঘটে সেখানে ‘ইণ্ডিয়া টুডে’ পত্রিকার পক্ষ থেকে চিত্র-সাংবাদিকতা করেছিলেন রঘু রাই, দূর্ঘটনাগ্রস্ত মানুষদের উপর এর কুপ্রভাব বিষয়টিও উঠে এসেছিল তাঁর প্রতিবেদনে। এই ঘটনার ফলে ২০০৪ সালের পরে তিনি একটি বই লেখেন যার নাম ‘এক্সপোজার : এ কর্পোরেট ক্রাইম’ এবং ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা জায়গায় তাঁর ছবির প্রদর্শনী করেন। ভোপালের দূষিত পরিবেশে কীভাবে সেখানকার বাসিন্দারা আছেন বা বিপর্যস্তদের পরিবার যারা তখনও কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি সেই সংক্রান্ত ঘটনা সম্পর্কে একপ্রকার জনসচেতনতা জাগাতেই তাঁর এই প্রদর্শনী। ২০০৩ সালে বম্বের জিইও পত্রিকার একটি প্রকল্পে কাজের সময় তিনি প্রথম ডিজিটাল নিকন ডি-১০০ মডেলের ক্যামেরা ব্যবহার করা শুরু করেন। ফিল্ম ব্যবহারে ইতি পড়ে যায়।

অ্যামস্টারডামে আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো’র প্রতিযোগিতায় একবার এবং ইউনেস্কো আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফোটো কনটেস্ট’-এ দুবার বিচারক নির্বাচিত হয়েছিলেন রঘু রাই। ২০১৭ সালে কাশ্মীর ভ্রমণকালে তাঁর কন্যা অবনী রাই তাঁকে কেন্দ্র করে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন যার নাম ‘রঘু রাই : অ্যান আনফ্রেমড্‌ পোর্ট্রেট’। এই তথ্যচিত্রে রঘু রাই অনেক জায়গাতেই কিছু কিছু বিখ্যাত ছবি তোলার পিছনের অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়েছেন।

অজস্র বই লিখেছেন রঘু রাই সংখ্যায় যা প্রায় কুড়িটিরও বেশি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘রঘু রাই’স ইণ্ডিয়া : এ রেট্রোস্পেক্টিভ’ (২০০১), ‘ইন্দিরা গান্ধী : এ লিভিং লিগ্যাসি’ (২০০৪), ‘বাংলাদেশ : দ্য প্রাইড অফ ফ্রিডম’ (২০১৩), ‘দ্য টেল অফ টু : অ্যান আউটগোয়িং অ্যাণ্ড অ্যান ইনগোয়িং প্রাইম মিনিস্টার’ (২০১৪) ইত্যাদি। এছাড়া লুপ্ত বিজয়নগর সাম্রাজ্যের উপরেও তিনি লিখেছিলেন ‘বিজয়নগর এম্পায়ার : রুইন্স টু রেসার‍্যাকশন’ নামের বইটি। শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও বহু জায়গায় প্রদর্শনী করেছেন রঘু রাই। ১৯৯৭ সালে নিউ দিল্লির ন্যাশনাল গ্যালারি অফ মডার্ণ আর্ট-এ প্রথম প্রদর্শনী করেন রঘু রাই। তারপর ২০০২ সালে লণ্ডন এবং সুইজারল্যাণ্ডে প্রদর্শনী করেন তিনি। ভোপাল গ্যাস দূর্ঘটনার প্রেক্ষিতে তোলা তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয় ২০০৩, ২০০৪ এবং ২০০৫ সালে যথাক্রমে ফিনল্যাণ্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, ভেনিস, প্রাগ এবং চেক প্রজাতন্ত্রে। ২০১৪ সালে হংকং আন্তর্জাতিক চিত্র উৎসবে রঘু রাইয়ের ‘ইন লাইট অফ ইণ্ডিয়া’ নামে বেশ কিছু ছবির প্রদর্শনী হয়।

চিত্রগ্রহণে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য আজীবন বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন রঘু রাই। বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় চিত্রসাংবাদিকতা এবং তাদের প্রভূত সাহায্যের জন্য ১৯৭২ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ১৯৯২ সালে ফোটোগ্রাফার অফ দ্য ইয়ার নির্বাচিত হন রঘু রাই। সর্বোপরি ২০১৭ সালে ভারত সরকারের তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের পক্ষ থেকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অর্জন করেন তিনি।

বর্তমানে নিউ দিল্লিতে ৫৭তম বইয়ের কাজ করছেন চিত্রগ্রাহক রঘু রাই।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়