সববাংলায়

হুমায়ুনের সমাধিসৌধ ভ্রমণ

তাজমহলের কথা আমরা প্রায় সবাই জানি। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মুমতাজ মহলের স্মৃতিতে এই সমাধিসৌধ নির্মাণ করেছিলেন, যা ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু তাজমহল নির্মাণের অনেক আগেই মুঘল যুগে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধিসৌধ তৈরি হয়েছিল, যার পেছনেও ছিল স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসার গল্প। সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী হামিদা বানু বেগম, দিল্লিতে হুমায়ুনের সমাধিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকে এই সমাধিসৌধ মুঘল সমাধি স্থাপত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হলেও, সাধারণ আলোচনায় এটি তাজমহলের ছায়ায় চাপা পড়ে যায়।

হুমায়ুনের সমাধিসৌধ কোথায়

হুমায়ুনের সমাধিসৌধ অবস্থিত ভারতের রাজধানী দিল্লি শহরে পূর্ব নিজামুদ্দিন এলাকায়। এটি দিল্লির দক্ষিণ-পূর্ব অংশে, যমুনা নদীর কাছাকাছি একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলে অবস্থিত। কলকাতা থেকে হুমায়ুনের সমাধিসৌধের দূরত্ব প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার এবং শিলিগুড়ি থেকে আনুমানিক ১৭০০ কিলোমিটার। দিল্লির প্রধান রেলস্টেশন হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে এই সমাধিসৌধের দূরত্ব মাত্র ২ কিলোমিটার, ফলে পৌঁছনো বেশ সহজ। ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার। কাছাকাছি এলাকায় সুন্দর নার্সারি, নিজামুদ্দিন দরগা ও পুরানা কিলা থাকায় দিল্লির পর্যটন মানচিত্রে হুমায়ুনের সমাধিসৌধ একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।

হুমায়ুনের সমাধিসৌধের ইতিহাস

১৫৫৬ সালে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যু হয় দিল্লির পুরানা কিলায় একটি গ্রন্থাগারের সিঁড়ি থেকে নামার সময় পা হড়কে পড়ে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা যায়। তাঁর মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র আকবর। হুমায়ুনের মৃত্যুর প্রায় নয় বছর পরে, ১৫৬৫ সালে তাঁর বিধবা স্ত্রী হামিদা বানু বেগম, স্বামীর স্মৃতিতে একটি সমাধিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় মুঘল দরবারে পারস্যের সাং সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের প্রভাব প্রবল ছিল। এই কারণে পারস্যের খ্যাতনামা স্থপতি মিরাক মির্জা গিয়াস এবং তাঁর পুত্র সাইয়িদ মুহাম্মদকে এই সমাধিসৌধ নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় সাত বছর ধরে সমাধিসৌধ নির্মাণের কাজ চলে এবং ১৫৭২ সালে হুমায়ুনের সমাধিসৌধ সম্পূর্ণ হয়।

এই সমাধিসৌধ মুঘল স্থাপত্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে ভারতে সমাধি নির্মাণ হলেও, পরিকল্পিত চারবাগ বাগানের মধ্যে কেন্দ্রীয় গম্বুজযুক্ত সমাধি—এই ধারণা এখানে প্রথম পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। পরবর্তী সময়ে তাজমহলসহ বহু মুঘল সমাধি এই নকশা ও ভাবনার অনুসরণে নির্মিত হয়। এই ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্বের কারণেই ১৯৯৩ সালে হুমায়ুনের সমাধিসৌধ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

হুমায়ুনের সমাধিসৌধ কীভাবে যাবেন

ট্রেনে গেলে হাওড়া বা শিয়ালদহ বা বর্ধমান স্টেশন থেকে নয়াদিল্লি বা হজরত নিজামুদ্দিনগামী একাধিক সুপারফাস্ট ও রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেন পাওয়া যায়। হুমায়ুনের সমাধিসৌধের সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন হল হজরত নিজামুদ্দিন রেলস্টেশন। স্টেশন থেকে অটো বা ট্যাক্সি ধরে সমাধিসৌধে পৌঁছাতে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে। বিমানে গেলে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানে চেপে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতে হবে। দিল্লি বিমানবন্দর থেকে হুমায়ুনের সমাধিসৌধের দূরত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার।

হুমায়ুনের সমাধিসৌধে কোথায় থাকবেন

হুমায়ুনের সমাধিসৌধের আশেপাশে থাকার জন্য বিভিন্ন বাজেটের হোটেল রয়েছে। ডিফেন্স কলোনি, সাউথ এক্সটেনশন বা কানট প্লেস এলাকায় বেশ কিছু ভাল মানের হোটেল রয়েছে। পূর্ব নিজামুদ্দিন ও দক্ষিণ দিল্লি এলাকায় কিছু মাঝারি মানের হোটেল রয়েছে, যা পরিবার নিয়ে থাকার জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। এই এলাকাগুলো থেকে অটো বা ক্যাবে খুব সহজেই সমাধিসৌধে পৌঁছানো যায়। এছাড়া পাহাড়গঞ্জ ও লাজপত নগর এলাকায় বেশ কিছু সস্তা হোটেলও রয়েছে।

হুমায়ুনের সমাধিসৌধে কী দেখবেন

মূল সমাধিসৌধ

হুমায়ুনের সমাধিসৌধের প্রধান আকর্ষণ হল মূল সমাধি ভবনটি। এটি একটি উঁচু চত্বরের উপর নির্মিত এবং চারদিক থেকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে হয়। লাল বেলেপাথর ও সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি এই সমাধিসৌধের মাঝখানে রয়েছে বড় গম্বুজ, আর চারদিকে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ।
ভিতরের মূল কক্ষে সম্রাট হুমায়ুনের প্রতীকী কবর রাখা আছে। আসল সমাধি রয়েছে এর ঠিক নিচের কক্ষে। একই ভবনের ভেতর ও আশপাশে হুমায়ুনের পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের সমাধিও দেখা যায়।

চারবাগ বাগান এলাকা

সমাধিসৌধটি একটি বিশাল চারবাগ বাগানের মাঝখানে অবস্থিত। বাগানটি চারটি সমান অংশে ভাগ করা, যার মাঝে মাঝখান দিয়ে জলপ্রবাহের নালা চলে গেছে। এই পরিকল্পনাই পরে তাজমহলসহ অন্যান্য মুঘল স্থাপনায় অনুসরণ করা হয়।
বাগান এলাকাটি আলাদা করে ঘোরার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বসার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা আছে এবং দর্শনার্থীরা ঘাসে না বসে নির্ধারিত পথ ও বেঞ্চ ব্যবহার করতে পারেন। বাগানের মধ্যে ফোয়ারা ও জলাধার রয়েছে, যদিও সেগুলো সব সময় সচল নাও থাকতে পারে।

প্রবেশদ্বার ও আশপাশের কাঠামো

সমাধিসৌধ চত্বরে ঢোকার জন্য একাধিক প্রবেশপথ রয়েছে, যার মধ্যে পশ্চিম দিকের প্রধান গেটটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত। প্রবেশপথের কাছাকাছি আরও কিছু ছোট ঐতিহাসিক কাঠামো ও সমাধি রয়েছে, যেগুলো অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়।

হুমায়ুনের সমাধিসৌধে কখন যাবেন

হুমায়ুনের সমাধিসৌধ সারা বছরই দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। তবে অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সময় ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, কারণ এই সময়ে দিল্লির আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে শীতল ও আরামদায়ক থাকে। গ্রীষ্মকালে (এপ্রিল–জুন) দিল্লিতে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে, ফলে খোলা বাগান ও চত্বরে ঘোরাঘুরি কষ্টকর হতে পারে।

সকালবেলা বা বিকেলের দিকে গেলে ভিড় তুলনামূলক কম থাকে এবং আলোও ছবি তোলার জন্য ভালো হয়। দুপুরের পর পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। বর্ষাকালে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) বাগান এলাকায় সবুজভাব বেশি থাকলেও হালকা বৃষ্টি হলে চলাচলে অসুবিধা হতে পারে।

সমাধিসৌধে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানজনিত বন্ধ থাকে না, তবে সপ্তাহান্তে ও সরকারি ছুটির দিনে ভিড় বেশি হয়। শান্তভাবে ঘোরার জন্য সপ্তাহের সাধারণ দিন ও সকালের সময়টাই সবচেয়ে ভালো।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • সমাধির কোনও স্থানে নিজের নাম, ফোন নাম্বার ইত্যাদি লিখে জায়গাটি কলুষিত করবেন না।
  • হুমায়ুনের সমাধিকক্ষে যেতে সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময় তাড়াহুড়ো করবেন না। সিঁড়িগুলো খুব উঁচু এবং সরু। তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে পড়ে যেতে পারেন।মসজিদের ভেতরে যাওয়ার আগে জুতো খুলে যাবেন।
  • বাগানের মধ্যে ঘাসের ওপর চলাফেরা করবেন না, বসবেন না বা শোবেন না। বসবার জন্য বাগানের ধারে গাছের ছায়ায় সুন্দর বেঞ্চি বানানো আছে। সপরিবারে সেখানে বসতে পারেন।
  • ভেতরে গিয়ে টিকিট হারিয়ে গেলে বেরনোর সময় ১০০ টাকা জরিমানা। তাই টিকিট সাবধানে রাখবেন।
  • আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সাইটের থেকে অনলাইনে টিকিট কাটার সময় ভিজিট টাইম ভালো করে দেখবেন। আপনি যে সময়ে যেতে চাইছেন সেই সময়ের টিকিট নিচ্ছেন কিনা দেখে নেবেন।
  • প্রবেশের পর থেকে মাত্র তিন ঘণ্টা টিকিটের বৈধতা।
  • একটি সরকারী পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখবেন।
  • খাবার নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবেন না।
  • দিল্লী থেকে গাড়ি ভাড়া করে গেলে বেশ কিছু ট্যুর কোম্পানি একদিনের প্যাকেজ দেয়। তাদের প্যাকেজে তারা কোন কোন জায়গা নিয়ে যাবে, প্যাকেজে কত কিমি এবং কত ঘণ্টার ট্যুর রয়েছে, জায়গার পার্কিংএর দাম ধরা আছে কিনা সেগুলো জেনে নেবেন।

ট্রিপ টিপস

  • এই জায়গায় যেদিন ঘোরার প্ল্যান করছেন, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সাইটের থেকে আগেভাগেই সেইদিনের টিকিট কেটে রাখুন। এর ফলে আপনাকে এখানে পৌঁছে ভিড়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে না এবং আপনার টিকিট হারানোর ভয়ও থাকবে না। লিঙ্ক আমাদের তথ্যসূত্রে পেয়ে যাবেন।
  • দিল্লী থেকে একদিনের ট্যুরে এখানে আসতে চাইলে গাড়ি ভাড়া করতে দিল্লী ট্যুরিজম সাইটের পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক ট্যুরিজম কোম্পানি আছে যারা আপনাকে অপেক্ষাকৃত কম দামে ঘোরাবে। কিন্তু আগে টাকা চাইলে তাদের ভালভাবে যাচাই করে নিন। তবে সবচেয়ে সস্তা হবে মেট্রোতে এসে ই-রিক্সা বা অটো করে এখানে আসা।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. https://whc.unesco.org/en/list/232/
  3. https://asi.payumoney.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading