সববাংলায়

রামোজি ফিল্ম সিটি ভ্রমণ

বিভাগঃ ,

রামোজি ফিল্ম সিটি শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র নির্মাণ কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত। হায়দ্রাবাদের কাছে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা এই ফিল্ম সিটিতে একসঙ্গে শুটিং, পোস্ট-প্রোডাকশন এবং সেট নির্মাণের সমস্ত ব্যবস্থা রয়েছে। একই জায়গায় তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্থায়ী ও অস্থায়ী সেট—শহরের রাস্তা, রাজপ্রাসাদ, বিমানবন্দর, গ্রাম, বাজার, বাগান ইত্যাদি। ফলে এটি যেমন চলচ্চিত্র জগতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সাধারণ ট্যুরিস্টদের কাছেও একটি জনপ্রিয় দেখার জায়গা। এখানে ঘুরতে গেলে বোঝা যায়, পর্দার পেছনের বিশাল আয়োজন ঠিক কতটা বড় পরিসরে গড়ে ওঠে।

রামোজি ফিল্ম সিটি কোথায়

ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী হায়দ্রাবাদ শহরের উপকণ্ঠে রামোজি ফিল্ম সিটি অবস্থিত। এটি হায়দ্রাবাদ–বিজয়ওয়াড়া জাতীয় সড়কের ধারে বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে এবং শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রশাসনিকভাবে এটি রাঙ্গা রেড্ডি জেলায় পড়ে। হায়দ্রাবাদের প্রধান রেলস্টেশন সেকেন্দরাবাদ জংশন থেকে রামোজি ফিল্ম সিটির দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার এবং হায়দ্রাবাদ ডেকান (নামপল্লি) স্টেশন থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার। রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এর দূরত্ব আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার। হায়দ্রাবাদের ব্যস্ত শহরাঞ্চল থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে পৌঁছালে একেবারে আলাদা পরিবেশের অনুভূতি পাওয়া যায়। শহর ভ্রমণের পাশাপাশি রামোজি ফিল্ম সিটি সহজেই একদিন বা পুরো দিনের পরিকল্পনায় রাখা যায়।

রামোজি ফিল্ম সিটির ইতিহাস

রামোজি ফিল্ম সিটি প্রতিষ্ঠা করেন বিশিষ্ট মিডিয়া উদ্যোক্তা চেরুকুরি রামোজি রাও। তাঁর উদ্যোগেই হায়দ্রাবাদের উপকণ্ঠে বিস্তীর্ণ জমির উপর একটি সমন্বিত চলচ্চিত্র নগরী গড়ে তোলা হয়। ফিল্ম সিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯৬ সালে চালু হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শুটিং কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। রামোজি রাও-এর লক্ষ্য ছিল এমন একটি পরিকাঠামো তৈরি করা, যেখানে চলচ্চিত্র নির্মাণের যাবতীয় ব্যবস্থা এক জায়গাতেই পাওয়া যাবে। সেই ভাবনা থেকেই এখানে শুটিং ফ্লোর, আউটডোর সেট, পোস্ট-প্রোডাকশন সুবিধা, সাউন্ড স্টেজ, প্রপস সংরক্ষণ, এমনকি শিল্পীদের থাকার ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়। ফলে একটি ছবির পরিকল্পনা থেকে চিত্রগ্রহণ এবং পরবর্তী সম্পাদনার কাজ পর্যন্ত একই পরিসরে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

সময়ক্রমে রামোজি ফিল্ম সিটি শুধু তেলুগু চলচ্চিত্র জগতের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, হিন্দি, তামিল, কন্নড় ও অন্যান্য ভাষার সিনেমা এবং টেলিভিশন ধারাবাহিকের গুরুত্বপূর্ণ শুটিং লোকেশন হিসেবেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য চলচ্চিত্র ও অনুষ্ঠান এখানে চিত্রায়িত হয়েছে। এত বৃহৎ পরিসর ও অবকাঠামোর জন্য রামোজি ফিল্ম সিটি আন্তর্জাতিক স্তরেও পরিচিতি লাভ করে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র স্টুডিও কমপ্লেক্স হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে এটি শুধু শুটিং কেন্দ্র নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও গড়ে উঠেছে, যেখানে সিনেমার জগতের আড়ালের বাস্তবতা কাছ থেকে দেখা যায়।

রামোজি ফিল্ম সিটি কীভাবে যাবেন

হায়দ্রাবাদ ডেকান (নামপল্লি) বা সেকেন্দরাবাদ জংশনে নেমে সেখান থেকে ট্যাক্সি বা অ্যাপ-ক্যাব নিয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রামোজি ফিল্ম সিটিতে পৌঁছানো যায়। যানজটের ওপর নির্ভর করে সময় লাগে প্রায় ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা। বিমানে গেলে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি হায়দ্রাবাদের রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়মিত ফ্লাইট রয়েছে। বিমানবন্দর থেকে রামোজি ফিল্ম সিটির দূরত্ব প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার। সেখান থেকে প্রিপেইড ট্যাক্সি বা অ্যাপ-ক্যাব নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো যায়।

হায়দ্রাবাদ শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাস পরিষেবাও পাওয়া যায়। এছাড়া নিজস্ব গাড়ি নিয়ে গেলে হায়দ্রাবাদ–বিজয়ওয়াড়া জাতীয় সড়ক ধরে সহজেই রামোজি ফিল্ম সিটিতে পৌঁছানো যায়। শহরের বাইরে অবস্থিত হওয়ায় অনেকে হায়দ্রাবাদেই থাকেন এবং সেখান থেকে একদিনের জন্য রামোজি ফিল্ম সিটিতে ঘুরে আসেন।

রামোজি ফিল্ম সিটিতে কোথায় থাকবেন

রামোজি ফিল্ম সিটির ভেতরেই ট্যুরিস্টদের থাকার জন্য একাধিক হোটেল ও রিসর্টের ব্যবস্থা রয়েছে। যারা সম্পূর্ণ ফিল্ম সিটির অভিজ্ঞতা নিতে চান, তাঁদের জন্য ভেতরের আবাসনই সবচেয়ে সুবিধাজনক। এখানে বিভিন্ন বাজেটের হোটেল রয়েছে—কিছু অপেক্ষাকৃত বিলাসবহুল, আবার কিছু তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। ভেতরে থাকার সুবিধা হল, সকালে খুব তাড়াতাড়ি ঘুরতে শুরু করা যায় এবং সন্ধ্যার অনুষ্ঠান বা আলোর সাজও সহজে উপভোগ করা যায়।

তবে অনেক ট্যুরিস্ট হায়দ্রাবাদ শহরেই থাকতে পছন্দ করেন। শহরের বানজারা হিলস, হিমায়তনগর বা গাছিবৌলি অঞ্চলে নানা ধরনের হোটেল পাওয়া যায়—বাজেট হোটেল থেকে শুরু করে উন্নত মানের আবাসন পর্যন্ত। সেখান থেকে গাড়িতে প্রায় ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার মধ্যে রামোজি ফিল্ম সিটিতে পৌঁছানো যায়। শহরে থাকার সুবিধা হল, একসঙ্গে হায়দ্রাবাদের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানও ঘুরে দেখা যায়।

রামোজি ফিল্ম সিটিতে কী দেখবেন

রামোজি ফিল্ম সিটি মূলত একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ কমপ্লেক্স হলেও ট্যুরিস্টদের জন্য এখানে নানা ধরনের আকর্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা স্থায়ী ও অস্থায়ী সেট, বাগান, থিমভিত্তিক অঞ্চল এবং বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান মিলিয়ে পুরো জায়গাটিই যেন একটি আলাদা জগৎ।

এখানে বিভিন্ন ধরনের স্থায়ী সেট দেখা যায়, যেগুলো সিনেমা ও ধারাবাহিকের শুটিংয়ের জন্য তৈরি। কখনও রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল স্থাপনা, কখনও আধুনিক শহরের রাস্তা, কখনও গ্রামবাংলার আদল—সবই এখানে সাজানো আছে। অনেক সময় একই সেটকে সামান্য পরিবর্তন করে ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যের জন্য ব্যবহার করা হয়, যা কাছ থেকে দেখলে চলচ্চিত্র নির্মাণের কৌশল বোঝা যায়।

ফিল্ম সিটির ভেতরে একাধিক মনোরম বাগান রয়েছে, যেগুলো নিজস্ব নকশা ও থিম অনুযায়ী সাজানো। বিভিন্ন ফুলের বাগান, ল্যান্ডস্কেপড গার্ডেন এবং কৃত্রিম জলাধার জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ট্যুরিস্টদের জন্য নির্দিষ্ট বাসে করে ভেতরের বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে দেখানো হয়, ফলে পুরো এলাকা সহজে দেখা যায়।

এছাড়াও এখানে লাইভ শো, স্টান্ট প্রদর্শনী এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। শিশুদের জন্য আলাদা কিছু আকর্ষণও রয়েছে। যারা সিনেমার জগৎ সম্পর্কে আগ্রহী, তাঁদের কাছে শুটিং ফ্লোর এবং সেট তৈরির পদ্ধতি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।

সব মিলিয়ে রামোজি ফিল্ম সিটিতে ঘুরে দেখা মানে শুধু কিছু স্থাপনা দেখা নয়, বরং চলচ্চিত্রের আড়ালের এক বিশাল কর্মযজ্ঞকে কাছ থেকে অনুভব করা। পুরো এলাকা ঘুরে দেখতে সাধারণত একটি পূর্ণ দিন সময় রাখা ভালো।

রামোজি ফিল্ম সিটিতে কখন যাবেন

রামোজি ফিল্ম সিটি সারা বছরই ট্যুরিস্টদের জন্য খোলা থাকে। তবে ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক সময় হল অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস। এই সময় হায়দ্রাবাদের আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে শীতল ও মনোরম থাকে, ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা হেঁটে বা বাসে ঘুরে দেখাও সুবিধাজনক হয়।

মার্চ থেকে জুন মাসে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। দিনের বেলায় রোদ তীব্র থাকে, তাই এই সময় গেলে সকালে তাড়াতাড়ি পৌঁছনো ভালো। বর্ষাকালে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হলেও সবুজে ঘেরা পরিবেশে ফিল্ম সিটির সৌন্দর্য আলাদা মাত্রা পায়। সপ্তাহান্ত, ছুটির দিন এবং শীতের মরশুমে ট্যুরিস্টদের ভিড় বেশি থাকে। তাই শান্তভাবে ঘুরে দেখতে চাইলে সপ্তাহের সাধারণ দিনে যাওয়াই সুবিধাজনক। পুরো ফিল্ম সিটি ঘুরে দেখতে প্রায় একটি পূর্ণ দিন সময় রাখা ভালো।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • রামোজি ফিল্ম সিটি বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অবস্থিত, তাই অন্তত একটি পূর্ণ দিন সময় হাতে রাখুন।
  • প্রবেশের টিকিট আগে থেকে অনলাইনে বুক করলে ভিড়ের দিনে সুবিধা হয়।
  • ভেতরে নির্দিষ্ট বাস পরিষেবায় বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে দেখানো হয়, তাই নির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলা ভালো।
  • গরমের সময় গেলে টুপি, সানস্ক্রিন ও পানীয় জল সঙ্গে রাখুন।
  • আরামদায়ক পোশাক ও হাঁটার উপযোগী জুতো পরা উচিত, কারণ অনেকটা পথ হাঁটতে হয়।
  • কিছু শুটিং চলাকালীন নির্দিষ্ট অংশে প্রবেশ সীমিত থাকতে পারে, তাই কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে চলুন।
  • বর্জ্য নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলুন এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন।
  • শিশুদের সঙ্গে গেলে ভিড়ের মধ্যে তাদের দিকে বিশেষ নজর রাখুন।
  • ক্যামেরা বা মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলুন।
  • নিরাপত্তারক্ষীদের নির্দেশ মেনে চলা এবং নির্ধারিত সীমার বাইরে না যাওয়াই শ্রেয়।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. https://www.ramojifilmcity.com/
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Ramoji_Film_City

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading