রূপকথার মতো এক দুর্গ—একদিকে রাজকীয় সৌন্দর্য, অন্যদিকে রহস্যে মোড়া এক ভয়াবহ অতীত। এমনই এক অদ্ভুত মিশ্রণের নাম শনিবারওয়াড়া। পুনের মধ্যবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদ আজ ধ্বংসস্তূপ হলেও, তা একসময় মারাঠা সাম্রাজ্যের গর্ব ছিল। পাথরের প্রাচীরের ফাঁক দিয়ে আজও যেন কানে আসে রাজসভা, ষড়যন্ত্র আর কূটনীতির গুঞ্জন। দিনে ইতিহাস আর স্থাপত্যের ভক্তদের ভিড়, আর রাতে চলে ভয়ের কাহিনি—তাই তো শনিবারওয়াড়াকে অনেকেই বলেন “ভারতের সবচেয়ে ভয়ংকর দুর্গ”।
শনিবারওয়াড়া কোথায়
শনিবারওয়াড়া অবস্থিত মহারাষ্ট্রের পুনে শহরে, যা পুনে জেলার অন্তর্গত। এই দুর্গটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে শনি পেট এলাকায় অবস্থিত। চারদিক ঘিরে আধুনিক নগরায়ন, আর তার মাঝে সময়কে হার মানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক রাজকীয় নিদর্শন এই দুর্গ। পুনে শহরের একেবারে মধ্যস্থলে অবস্থানের জন্য এখান থেকে শহরের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে যাওয়া যায় খুব সহজেই। কলকাতা থেকে পুনে শহরের দূরত্ব প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার, শিলিগুড়ি থেকে প্রায় দু’হাজার তিনশো কিলোমিটার এবং বর্ধমান থেকে প্রায় এক হাজার নয়শো কিলোমিটার। কাছাকাছি বিখ্যাত স্থানের মধ্যে রয়েছে আগা খান প্যালেস, দগডুশেঠ গণেশ মন্দির, পার্বতী পাহাড়—যেখান থেকে শনিবারওয়াড়া পৌঁছতে সময় লাগে মাত্র কুড়ি মিনিট।
আরও পড়ুন: কুতুব মিনার ভ্রমণ
শনিবারওয়াড়ার ইতিহাস
আঠারো শতকে মারাঠা সাম্রাজ্য যখন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, তখনই পেশও বাজীরাও প্রথম ঠিক করেন, তিনি পুনেতে মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্র তৈরি করবেন। সেই পরিকল্পনা থেকেই জন্ম হয় শনিবারওয়াড়ার। ১৭৩০ সালে তিনি এই প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, এবং ১৭৩২ সালে এর নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়। এই দুর্গ প্রায় ৯০ বছর ধরে ছিল মারাঠা সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ভবন। এখান থেকেই পেশও শাসকরা সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন। শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, এখানে বসত রাজসভার আসর, সঙ্গীতসভা, এবং উৎসব। একসময় এখানে ছিল ফুলের বাগান, জলাশয়, বালুকাকণা মাখা আঙ্গিনা আর রাজপ্রসাদের দালান-কোঠা।
তবে এই রাজপ্রাসাদ শুধু গৌরবের কাহিনি নয়, আছে রক্তাক্ত ইতিহাসও। পেশও নারায়ণরাও, যিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে ক্ষমতায় আসেন, তাঁকে ১৭৭৩ সালে দুর্গের অন্দরমহলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জনশ্রুতি বলে, তাঁর কাকা রঘুনাথরাও ও কাকিমা আনন্দীবাঈ ষড়যন্ত্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। বলা হয়, মৃত্যুর আগমুহূর্তে নারায়ণরাও চিৎকার করে বলেছিলেন, “কাকাসা, মালা বাঁচवा!” — অর্থাৎ, “কাকাসা, আমাকে বাঁচাও!”। আজও সেই চিৎকার নাকি পূর্ণিমার রাতে শোনা যায় এই দুর্গচত্বরে। এই কারণেই শনিবারওয়াড়াকে ভারতের অন্যতম ভৌতিক স্থানও মনে করা হয়।
শনিবারওয়াড়া কীভাবে যাবেন
শনিবারওয়াড়ায় যেতে হলে প্রথমেই পৌঁছাতে হবে পুনে শহরে। পূর্বভারতের শহরগুলি থেকে পুনে যাওয়ার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায় হল ট্রেন। হাওড়া, শিয়ালদহ, আসানসোল বা বর্ধমান থেকে একাধিক ট্রেন রয়েছে পুনে স্টেশনের উদ্দেশ্যে। আজাদ হিন্দ এক্সপ্রেস, দুরন্ত এক্সপ্রেস অন্যতম। পুনে স্টেশন থেকে শনিবারওয়াড়া মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে, অটো বা ওলা/উবেরেই সহজে পৌঁছনো যায়।
বাসে গেলে কলকাতা থেকে পুনে পর্যন্ত সরাসরি বাস খুব একটা নেই। তবে মুম্বই পর্যন্ত বাসে পৌঁছে সেখান থেকে পুনে আসা যায়। মুম্বই থেকে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বাস রয়েছে পুনের দিকে, যেগুলি MSRTC বা বেসরকারি সংস্থার হয়ে চলে।
গাড়িতে যেতে হলে কলকাতা থেকে ধরতে হবে NH 53 ও NH 65 রুট। পুরো পথে পড়বে নাগপুর ও হায়দরাবাদ। সময় লাগতে পারে প্রায় ৩২ থেকে ৩৫ ঘণ্টা। তবে রাস্তা ভালো থাকলে এই দীর্ঘ যাত্রাও দারুণ অভিজ্ঞতা হতে পারে।
আরও পড়ুন: পুরী ভ্রমণ
শনিবারওয়াড়ায় কোথায় থাকবেন
পুনে শহর যেহেতু একটি বড় শহর, তাই এখানে থাকার ব্যবস্থা খুবই উন্নত। রাজকীয় হোটেল থেকে শুরু করে হোস্টেল, হোমস্টে—সবই পাওয়া যায়। যাঁরা বিলাসবহুল পরিবেশে থাকতে চান, তাঁদের জন্য পাঁচতারা হোটেল যেমন রয়েছে, তেমনই মধ্যবিত্ত পর্যটকদের জন্য রয়েছে বাজেট হোটেল ও তিনতারা হোটেল। এছাড়া শনিবারওয়াড়ার আশপাশে কিছু লজ ও অতিথিনিবাসও আছে যারা ঘন্টা বা দিনে রুম ভাড়া দিয়ে থাকে।
শনিবারওয়াড়ায় কী দেখবেন
একসময় যে প্রাসাদে পেশও রাজাদের রাজত্ব চলত, আজ সেটির বেশিরভাগটাই ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপই যেন নিঃশব্দে বলছে এক প্রাচীন ইতিহাসের কথা। দুর্গের মূল প্রবেশপথ ‘দিল্লি দরওয়াজা’ এখনও সুদৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে—কাঠ আর লোহার সমন্বয়ে তৈরি বিশাল দরজাটিতে এখনও দেখা যায় হাতির আক্রমণ ঠেকানোর কাঁটা। ভেতরে পা রাখলেই চোখে পড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত অন্দরমহল, বাগানের ভিত্তি, রাজদরবারের চিহ্ন।
প্রাসাদে ছিল সাতটি দরজা—তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নারায়ণ দরওয়াজা, মাস্তানি দরওয়াজা ও খিজরি দরওয়াজা। নারায়ণ দরওয়াজাই সেই স্থান, যেখান দিয়ে নারায়ণরাওকে টেনে আনা হয়েছিল হত্যার উদ্দেশ্যে। মাস্তানি দরওয়াজা পেশও বাজীরাওয়ের প্রিয় মাস্তানির নামে নামাঙ্কিত, তাঁদের প্রেমকাহিনির স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আজও রয়েছে।
এছাড়া সন্ধ্যার পর এখানে আয়োজন করা হয় আলো ও শব্দের প্রদর্শনী (Light & Sound Show)। এই শো-তে উঠে আসে পেশও শাসকদের ইতিহাস, মারাঠা বীরগাথা ও দুর্গের নির্মাণকাহিনি। মারাঠি ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই শো হয়।
শনিবারওয়াড়ার বাইরে একটু বেরোলেই পাওয়া যাবে দগডুশেঠ গণেশ মন্দির, আগা খান প্যালেস, পার্বতী পাহাড়, শনি ওয়ার পেট বাজার এবং যাদববাগের মতো জায়গা। এগুলোও ঘোরার উপযুক্ত স্থান।
শনিবারওয়াড়ায় কখন যাবেন
সারা বছরই খোলা থাকে শনিবারওয়াড়া। তবে অক্টোবর থেকে মার্চ—এই সময় আবহাওয়া ঠান্ডা ও আরামদায়ক থাকে, তাই ভ্রমণের পক্ষে সবচেয়ে ভালো সময় এই সময়টাই। গরমকালে পুনের আবহাওয়া কিছুটা তাপপ্রবণ হয়, তাই তখন না যাওয়াই ভালো।
প্রতি দিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধে ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই দুর্গ। সন্ধ্যায় ‘Light & Sound Show’ শুরু হয় ঠিক ৭টায়। টিকিটের দাম প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২৫ টাকা, বাচ্চাদের জন্য ১০ টাকা। তবে বৃহস্পতিবার ও সরকারি ছুটির দিনে শো বন্ধ থাকে।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- প্রাসাদের কোনও স্থানে নিজের নাম, ফোন নাম্বার ইত্যাদি লিখে জায়গাটি কলুষিত করবেন না।
- ভেতরে গিয়ে টিকিট হারিয়ে গেলে বেরনোর সময় ১০০ টাকা জরিমানা। তাই টিকিট সাবধানে রাখবেন।
- আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সাইটের থেকে অনলাইনে টিকিট কাটার সময় ভিজিট টাইম ভালো করে দেখবেন। আপনি যে সময়ে যেতে চাইছেন সেই সময়ের টিকিট নিচ্ছেন কিনা দেখে নেবেন।
- প্রবেশের পর থেকে মাত্র তিন ঘণ্টা টিকিটের বৈধতা।
- একটি সরকারী পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখবেন।
- খাবার নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবেন না।
ট্রিপ টিপস
- এই জায়গায় যেদিন ঘোরার প্ল্যান করছেন, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সাইটের থেকে আগেভাগেই সেইদিনের টিকিট কেটে রাখুন। এর ফলে আপনাকে এখানে পৌঁছে ভিড়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে না এবং আপনার টিকিট হারানোর ভয়ও থাকবে না।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
আরও পড়ুন: সোমনাথ ভ্রমণ
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব প্রতিনিধি
- https://en.wikipedia.org/
- https://pune.gov.in
- https://pune.gov.in/
- https://www.aajkaal.in/


আপনার মতামত জানান