ভ্রমণ

জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর ভ্রমণ

জয়রামবাটি কামারপুকুর ভ্রমণ

বাংলার অধ্যাত্ম-সংস্কৃতির জগতে রামকৃষ্ণ পরমহংস এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব আর তাঁরই সঙ্গে উচ্চারিত হয় পরম সেবাময়ী স্নেহময়ী সকলের মা সারদা দেবীর নাম। বাঙালির মনীষীদের তালিকায় রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ এবং সারদা দেবীর নাম উচ্চারিত হয় একত্রে। আর তাই তাঁদের জন্মস্থান হিসেব পশ্চিমবঙ্গের কামারপুকুর এবং জয়রামবাটি খুবই বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। রামকৃষ্ণদেব কিংবা সারদা দেবীর বাল্য-শৈশবের সমগ্র সময় এবং পরবর্তী জীবনের কিছু মুহূর্ত জড়িয়ে আছে জয়রামবাটি-কামারপুকুরের সঙ্গে। ভক্ত-অনুরাগীদের কাছে রামকৃষ্ণের জন্মস্থান কামারপুকুর এবং সারদা দেবীর জন্মস্থান জয়রামবাটি তাই অত্যন্ত পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। তাই এই দুই মনীষীকে স্মরণ করতে সপ্তাহান্তের ছুটিতে ঘুরে আসাই যায় জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর । মঠ ও মিশনের শান্ত–সুন্দর পল্লী পরিবেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার এক অনাম্নী গ্রামের ইতিহাসের উপাদানগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া যায় সহজেই।

হুগলি জেলার আরামবাগ সাবডিভিশনের অন্তর্গত গোঘাট-২ সম্প্রদায় উন্নয়ন ব্লকের মধ্যে পড়ে কামারপুকুর গ্রাম। এর তিন মাইল পশ্চিমদিকেই রয়েছে বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত জয়রামবাটি গ্রামটি যা বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর মহকুমার অন্তর্গত। কামারপুকুরের উত্তর দিকে রয়েছে ভুরসুবো গ্রাম যেখানে এককালে মানিক রাজার বাস ছিল, পশ্চিম সীমানায় রয়েছে ভুতির খাল যা পরে গিয়ে মিশেছে আমোদর নদীতে আর কামারপুকুর গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে গড় মান্দারনের জঙ্গল। তারকেশ্বরের শিবমন্দির কামারপুকুর থেকে মাত্র ৪৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে প্রথমে পড়বে কামারপুকুর গ্রাম আর তারপর আরও ৬ কিলোমিটার দূরে রয়েছে জয়রামবাটি। জয়রামবাটি থেকে ৪৪ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে বিখ্যাত বিষ্ণুপুর।

জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর এর ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণদেব এবং সারদা দেবীর জীবনকে ঘিরে। ১৮৩৬ সালে এই কামারপুকুর গ্রামেই এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জন্ম হয়। তবে শ্রীরামকৃষ্ণের পৈতৃক ভিটে ছিল কামারপুকুর থেকেই অনতিদূরে দেড়ে গ্রামে। জমিদারদের অত্যাচারে বাড়ি-ঘর, সম্পত্তি সব হারিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ ওরফে গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের বাবা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় বন্ধু সুখলাল গোস্বামীর আমন্ত্রণে কামারপুকুরে এসে ওঠেন। সুখলাল গোস্বামী তাঁকে যে জমি দিয়েছিলেন সেই জমিই লক্ষ্মীজলা নামে পরিচিত হয়। শোনা যায় এই জমিতে এত ধান হত যে অতিথিদের পেট পুরে খাইয়েও ক্ষুদিরামের পরিবারে অভাব ছিল না। কামারপুকুর গ্রামের আদি নাম ছিল সুখলালগঞ্জ। গ্রামের আদি জমিদার সুখলাল গোস্বামীর নামেই এই নাম এবং সুখলালগঞ্জ, মুকুন্দপুর, শ্রীপুর, মধুবাটী ও কামারপুকুর — এই পাঁচটি ছোটো গ্রাম ছিল কাছাকাছি। অনেকের মতে, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের ভিক্ষামাতা ধনী কামারিনীর পিতৃকুলের কোনো এক ব্যক্তিকে দিয়ে স্থানীয় শাসনকর্তা মানিকরাজা যে পুকুরটি খনন করিয়েছিলেন, তাকে কামারদের পুষ্করিনী নামে অভিহিত করা হত। কামারদের পুকুর থেকেই কামারপুকুর নামটির উদ্ভব ঘটে বলে মনে করা হয়। এই গ্রামেই শ্রীরামকৃষ্ণের বাল্যকাল কেটেছে। গ্রামের লাহাদের দুর্গামন্দিরের সামনের বিশাল নাটমন্দিরে বসত পাঠশালা আর এখানেই মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ভর্তি হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ ওরফে গদাধর। কামারপুকুরে লাহাবাবুরা ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশীয়। লাহাদের দুর্গামন্দিরের কাছেই তাঁদের স্থাপিত বিষ্ণু মন্দির ছিল, যেখানে মাঝেমধ্যেই বালক গদাধর এসে বসে থাকতেন। বাংলায় বর্গী আক্রমণের সময়েই জগন্নাথ লাহা এই মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন বলে ইতিহাসে জানা যায়। ঐ শতকেই লাহাদের দুর্গামন্দিরটি স্থাপন করেন ধর্মদাস লাহা। কামারপুকুরে গদাধরদের বাড়ির কিছু দূরেই বেনেপাড়ায় ছিল সীতানাথ পাইনের বাড়ি। সেই সময় তাঁর বাড়িতে বহিরাগত কোনো পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। জানা যায়, গদাধর বাল্যকালে বিধবা নারীর ছদ্মবেশে সীতানাথ পাইনের বাড়ির অন্দরে প্রবেশ করেছিলেন। গ্রামের পূর্বপাড়ে বুধুই মোড়লের শ্মশান, ভুতির খালের কাছে এসে গদাধর কৈশোরের বহু সময় কাটিয়েছেন। কামারপুকুরের উত্তরে যে ভুরসুবো গ্রাম ছিল, তাঁর রাজা মানিকচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের নিকট বন্ধু। তাঁর বাড়িতে মাঝেমধ্যেই চলে যেতেন বালক গদাধর। এই সবই আজ ইতিহাস, কিন্তু তাঁর স্মৃতি আজও অক্ষত আছে এই গ্রামে।

অন্যদিকে জয়রামবাটি গ্রামে ১৮৫৩ সালের ২২ ডিসেম্বর সারদা দেবীর জন্ম হয়। তাঁর বাড়ির সামনেই ছিল পুণ্যপুকুর এবং একটি পাড় বাঁধানো সুন্দর দিঘি। এই দিঘি আজ মায়ের ঘাট বা মায়ের দিঘি নামেই পরিচিত। জয়রামবাটির পাশ দিয়ে বয়ে চলা আমোদর নদকে সারদা মা বলতেন আমার গঙ্গা। সারদা দেবী এখানে স্নান করতেও আসতেন বলে শোনা যায়। সারদা মায়ের গৃহদেবতা ছিলেন সুন্দর নারায়ণ ধর্মঠাকুর যার একটি মন্দির রয়েছে পুণ্যপুকুরের পশ্চিম পাড়ে। অনতিদূরেই শান্তিনাথ মন্দিরের নাটমণ্ডপেই মা সারদা শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে পতিরূপে বরণ করেছিলেন। বিষ্ণুপুরে আসার সময় প্রতিবারই সারদা মা কোয়ালপাড়ায় জগদম্বা আশ্রমে এসে বিশ্রাম নিতেন, তারপর কলকাতায় রওনা হতেন। কোয়ালপাড়া তাই মায়ের বৈঠকখানা নামেই পরিচিত। ফলে কামারপুকুর এবং জয়রামবাটির সুদীর্ঘ ও ব্যাপ্ত ইতিহাস আজও স্মরণীয়।

জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর যেতে হলে বাসে বা গাড়ি করে যাওয়াই সুবিধেজনক। তবে ট্রেনে করেও আসা যায়। সেক্ষেত্রে হাওড়া বা শিয়ালদা থেকে ট্রেনে করে তারকেশ্বর স্টেশনে নেমে সেখান থেকে বাসে ৫০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে খুব সহজে পৌঁছানো যায় জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর । কামারপুকুরের নিকটবর্তী স্টেশন গোঘাট কিংবা আরামবাগেও নামা যায়, তবে হাওড়া বা শিয়ালদা থেকে এই স্টেশনের ট্রেন খুবই কম। ফলে একটু দূর হলেও তারকেশ্বর নামা যায় নিশ্চিন্তে। তারকেশ্বর স্টেশনে নেমে পাশেই তারকেশ্বর বাসস্ট্যাণ্ড থেকে কামারপুকুরগামী বাসে উঠে পড়া যাবে। তাছাড়া কলকাতার ধর্মতলা থেকে বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুর বা সরাসরি কামারপুকুরগামী বাসে করেও এখানে আসা যায়। সরাসরি বাসে করে আসতে গেলে কামারপুকুরে পৌঁছাতে ঘন্টা চারেক সময় লাগে এবং সেখান থেকে আরো মিনিট কুড়ির পথ জয়রামবাটি। আসানসোল, বর্ধমান, পানাগড়, দুর্গাপুর, মেদিনীপুর, বিষ্ণুপুর সহ বিভিন্ন জায়গা থেকেই সড়কপথে নিজের গাড়ি করে এখানে চলে আসা যায়। কলকাতা থেকে গাড়ি করে আসার ক্ষেত্রে ১০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কামারপুকুরে পৌঁছাতে তিন ঘন্টা মত সময় লাগে । সেখান থেকে জয়রামবাটি আরো ৬ কিলোমিটারের পথ, গাড়িতে মোটামুটি ১৫-২০ মিনিট সময় লাগে।  

জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর -এ থাকতে চাইলে সবথেকে ভালো হয় কামারপুকুর মঠ ও মিশনের অভ্যন্তরে আবাসিক আশ্রমে থাকা। বাইরে অনেক হোটেল থাকলেও কামারপুকুরে বা জয়রামবাটির মঠের প্রাঙ্গণের মধ্যে থাকাই নিরাপদ এবং খরচও অনেক কম হয়। জয়রামবাটিতে মাতৃমন্দিরে থাকতে কোনো ভাড়া দিতে হয় না, তবে তা মঠ ও মিশনের সম্পাদক মহারাজের অনুমতি নিতে হয় আগে থেকে। সবসময়ই মানুষের ভিড় থাকার কারণে তিন রাতের বেশি এখানে থাকার অনুমতি পাওয়া যায় না। তাই ঘুরতে বেরোবার দু মাস আগে থেকে আশ্রমে যোগাযোগ করে নিতে হবে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় পুজোর সময় ভিড় অত্যন্ত বেশি থাকে বলে থাকার জায়গা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে পুজোর সময় ঘোরার হলে অবশ্যই আগে থেকে আশ্রমে কথা বলে রাখাই শ্রেয়। 

জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর -এ অসংখ্য দ্রষ্টব্য স্থান রয়েছে । শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের ভিতরেই অধিকাংশ দ্রষ্টব্য স্থান রয়েছে। প্রথমে দেখে নেওয়া যাক কামারপুকুরের দ্রষ্টব্য স্থানগুলি-  

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের বাসঘর । ছবি – ইন্টারনেট

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জন্মভিটে ও মন্দির : রামকৃষ্ণদেব যেখানে জন্মেছিলেন সেখানেই তৈরি হয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির আর তার পাশেই সেই পুরনো দিনের মতো খড়ের চালার মাটির বাড়িটি দেখা যায়। এটাই রামকৃষ্ণের জন্মভিটে। যদিও একে সংরক্ষণের জন্য অনেক সংস্কার করা হয়েছে।বাড়ির দাওয়ায় আগে যে ঢেঁকি আর উনুন ছিল বলে জানা যায়, ঠিক একইরকম প্রতিরূপ গড়ে তোলা হয়েছে এখানে। মূর্তি তৈরি করে রামকৃষ্ণের জন্মের সময়কার ঘটনা দেখানো হয়েছে।

রঘুবীরের মন্দির ও যুগীদের শিব মন্দির : জন্মভিটের পশ্চিম দিকে গেলেই রঘুবীরের মন্দির দেখা যায়। ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের তাঁর কুলদেবতা রঘুবীরের মন্দির তৈরি করেছিলেন এখানে। শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির তৈরির সময় এই রঘুবীরের মন্দিরটিও ভেঙে নতুন করে পাকা করা হয়। এখানে বর্তমানে রঘুবীরের শিলা, রামেশ্বর শিবলিঙ্গ, শীতলা দেবীর মাটির ঘট ইত্যাদি রয়েছে। জন্মভিটের কাছেই যুগীদের শিবমন্দির। কথিত আছে এর সামনেই গদাধরের মা চন্দ্রামণি দেবী দেখেছিলেন অলৌকিক উজ্জ্বল এক আলো যা শিবলিঙ্গের পিছন থেকে সোজা এসে পড়েছিল তাঁর গর্ভে। তারপরই গদাধরের জন্ম হয়েছিল বলে জানা যায়।

হালদার পুকুর। ছবি – ইন্টারনেট

হালদার পুকুর : যুগীদের শিবমন্দিরের উলটোদিকে হালদার পুকুরে ছোটোবেলায় বাল্যবন্ধুদের নিয়ে সাঁতার কাটতে ভালোবাসতেন বালক গদাধর।

লাহাদের রাসমন্দির, দুর্গাবাটি ও পাঠশালা : বর্গী আক্রমণের সময় নির্মিত এই লাহাদের দূর্গামন্দিরের পাশেই রয়েছে রাসমন্দির যাকে আগে বিষ্ণুমন্দির বলা হত। লাহাদের পাঠশালাটি দেখতে পাওয়া যাবে জন্মভিটের পূর্ব দিকে। আটচালার একটি নাটমন্দিরের দাওয়ায় যে পাঠশালা চলত সেখানে বালক গদাধর পড়তেন।

বিশালাক্ষী মায়ের মন্দির : শোনা যায় দেবী বিশালাক্ষী নাকি এই অঞ্চলে অত্যন্ত জাগ্রত ছিলেন। তাই সেই সময় বহু মানুষ মনস্কামনা পূরণের জন্য এখানে আসতেন।

এছাড়াও কামারপুকুরে দেখে নিতে পারেন ধনী কামারনীর মন্দির। কামারপুকুর দেখে এসে জয়রামবাটিতে আসবেন, সেটাই সুবিধেজনক। জয়রামবাটির অবশ্য দ্রষ্টব্য স্থানগুলি হল –

মায়ের নতুন বাড়ি। ছবি – ইন্টারনেট

মাতৃমন্দির মঠ : জয়রামবাটির যে বাড়িতে সারদা দেবীর জন্ম হয়েছিল সেখানেই তৈরি হয়েছে এই মাতৃমন্দির। ভিতরে রয়েছে সুদৃশ্য সারদা দেবীর মর্মর মূর্তি। স্বামী সারদানন্দের প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল এই মাতৃমন্দির মঠ এবং মূল মন্দিরটি।

সিংহবাহিনীর মন্দির : জয়রামবাটির গ্রাম্য দেবী সিংহবাহিনীর মন্দিরটি খুবই জাগ্রত। জানা যায় এই মন্দিরেই সারদা দেবীর মা শ্যামাসুন্দরী দেবী দেখেছিলেন এক লাল চেরি পরা কিশোরী কন্যাকে।

মায়ের ঘাট ও আমোদর নদ : পুণ্যপুকুর নামে আগে পরিচিত ছিল এই মায়ের ঘাট। বাল্যকালে এই পুকুরের পাড়ে বসে গরুদের ঘাস খাওয়াতেন সারদা দেবী। আর এই আমোদর নদ ছিল সারদা মায়ের গঙ্গা, প্রায়ই এখানে স্নান করতে আসতেন সারদা মা।

এই সবই জয়রামবাটি মঠ বা মাতৃমন্দির প্রাঙ্গণের আশেপাশেই দেখা যাবে। তাছাড়া মায়ের পুরনো বাড়ি এবং নতুন বাড়ি, সারদা দেবীর গৃহদেবতা সুন্দরনারায়ণ ধর্মঠাকুরের মন্দির, লক্ষ্মীজলা, বুধুই মোড়লের শ্মশানও ঘুরে দেখতে পারেন।

এছাড়া কামারপুকুরের আশেপাশেই গড় মান্দারন, মানিকরাজার ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ, দেরেপুর, ভানুপিসির বাড়ি, চিনু শাঁখারীর বাস্তুভিটে ইত্যাদি সাইটসিইং হিসেবে দেখে আসা যায়। অন্যদিকে হুগলির আরামবাগ ছাড়িয়ে গেলে পাওয়া যায় তেলোভেলোর মাঠ। এই মাঠেই ডাকাতবাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেছিল সারদা মায়ের, চাইলে জয়রামবাটি ঘোরার পরে এই স্থানটিও দেখে আসা যায় সাইটসিইং হিসেবে। তাছাড়া অন্যান্য সাইটসিইং-এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জয়রামবাটি থেকে ২ কিমি দূরত্বে শিহড়ে হৃদয়রাম মুখার্জীর বাড়ি এবং ‘মায়ের বৈঠকখানা’ হিসেবে পরিচিত কোয়ালপাড়ার জগদম্বা আশ্রম। দেড়- দুদিনের মধ্যেই খুব ভালো করে ঘুরে আসা যায় কামারপুকুর-জয়রামবাটি। তবে দুর্গাপুজোর সময় ঘুরতে এলে জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর দুই জায়গার পুজো দেখারই অভিজ্ঞতা হবে। মঠ-প্রাঙ্গণের মধ্যে কোনো আমিষ খাবার নিয়ে না ঢোকাই ভালো। অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ কোনোভাবেই যাতে নোংরা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। খাবারের প্যাকেট বা খালি জলের বোতল নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলে আসাই শ্রেয়। এছাড়া অযথা হৈ-হল্লা বা চিৎকার-চেঁচামেচি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।  

বছরের যে কোনো সময়েই কামারপুকুর-জয়রামবাটি যাওয়া যেতে পারে। তবে জয়রামবাটিতে মাতৃমন্দিরের বিশেষ কিছু সময়সূচি রয়েছে। এপ্রিল মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই মাতৃমন্দির ভোর ৪টে থেকে দুপুর ১১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এবং বিকেল ৪টে থেকে রাত ৯টা ০৫ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে আর অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ভোর সাড়ে ৪টে থেকে দুপুর ১১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এবং বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে রাত ৮টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এই মন্দির খোলা থাকে। কামারপুকুরের রামকৃষ্ণ মঠেও ঠিক একই সময়সূচি অনুসরণ করা হয়। এখানে উল্লেখ্য মন্দিরে প্রবেশের সময় ক্যামেরা, মোবাইল নিয়ে যাওয়া যায় না। মোবাইল সঙ্গে থাকলে তা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রাখতে হয়, মন্দিরের ভিতরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ।

কামারপুকুরে বা জয়রামবাটিতে ঘুরতে এলে মাতৃমন্দিরের অন্নভোগ বা কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠের সকালের প্রসাদ খাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া না করাই ভালো। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট সময়ে যাওয়া দরকার। কামারপুকুর এবং জয়রামবাটি দুই জায়গাতেই প্রতি দিন সকাল ৯টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত দুপুরের প্রসাদের কুপন দেওয়া হয়ে থাকে। রাতে যদি এই প্রসাদই খেতে চান, সেক্ষেত্রে একসঙ্গে রাতের কুপনটিও কেটে নিতে পারেন। এখানকার সব প্রসাদই নিরামিষ।

জয়রামবাটি এবং কামারপুকুর দুই জায়গাতেই রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধীনে পল্লী উন্নয়ন সমিতির নানা স্টল থাকে যেখানে গ্রামীণ মহিলাদের হাতে তৈরি শাড়ি, শৌখিন জিনিস, আচার, ইত্যাদি পাওয়া যায়। ইচ্ছা থাকলে স্টল ঘুরে এগুলি কেনাকাটা করতে পারেন।


ট্রিপ টিপস

  • কীভাবে যাবেন – ট্রেনে করে আসতে চাইলে হাওড়া বা শিয়ালদা থেকে প্রথমে তারকেশ্বর স্টেশনে নেমে সেখান থেকে বাসে বা গাড়ি করে কামারপুকুর বা জয়রামবাটি পৌঁছানো যায়। তাছাড়া কলকাতার ধর্মতলা, দুর্গাপুর, আসানসোল, বর্ধমান, মেদিনীপুর ইত্যাদি নানা জায়গা থেকেই নিয়মিত কামারপুকুর বা জয়রামবাটি যাওয়ার বাস ছাড়ে, সেই বাসে অথবা একই সড়কপথে নিজের গাড়ি নিয়ে এখানে আসা যায়।
  • কোথায় থাকবেন – কামারপুকুর কিংবা জয়রামবাটির মঠ ও মিশনের আশ্রমে থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে।
  • কী দেখবেন – শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জন্মভিটে, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মন্দির, রঘুবীরের মন্দির, যুগীদের শিব মন্দির, হালদার পুকুর, ধনী কামারনীর মন্দির, লাহাদের রাসমন্দির, লাহাদের দুর্গাবাটি, লাহাদের পাঠশালা, পুণ্যপুকুর, সিংহবাহিনীর মন্দির, লক্ষ্মীজলা, বুধুই মোড়লের শ্মশান, বিশালাক্ষী মায়ের মন্দির, মায়ের ঘাট, আমোদর নদ, মায়ের পুরনো বাড়ি এবং নতুন বাড়ি, মাতৃমন্দির মঠ, সারদা দেবীর গৃহদেবতা সুন্দরনারায়ণ ধর্মঠাকুরের মন্দির, গড় মান্দারন, মানিকরাজার ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ, দেরেপুর, ভানুপিসির বাড়ি, চিনু শাঁখারীর বাস্তুভিটে, তেলো-ভেলোর মাঠ, কোয়ালপাড়া জগদম্বা আশ্রম ইত্যাদি।
  • কখন যাবেন – বছরের যে কোনো সময়েই আসা যায় এখানে। তবে মন্দির দর্শনের নির্দিষ্ট সময়সূচি মনে রাখা দরকার।
  • সতর্কতা
    • আশ্রমের মধ্যে থাকার জন্য আগে থেকে আশ্রমের মহারাজদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তবে এখানে আসা উচিত।
    • আশ্রম ও মঠ প্রাঙ্গণ যাতে কোনোভাবে নোংরা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
    • মন্দিরের মধ্যে ছবি তোলা যায় না, ফলে মন্দিরে ঢোকার সময় ক্যামেরা ব্যবহার করা যাবে না এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন মোবাইল ফোন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে।
    • কামারপুকুর এবং জয়রামবাটি উভয় ক্ষেত্রেই এপ্রিল মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই মাতৃমন্দির ভোর ৪টে থেকে দুপুর ১১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এবং বিকেল ৪টে থেকে রাত ৯টা ০৫ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে আর অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ভোর সাড়ে ৪টে থেকে দুপুর ১১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এবং বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে রাত ৮টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত এই মন্দির খোলা থাকে।
  • বিশেষ পরামর্শ
    • সরাসরি বাসে আসাই ভালো এখানে, সময় ও যাত্রাপথের ক্লান্তি থেকে অনেকটা মুক্তি পাওয়া যায়।
    • এক দিনে ঘুরে নিতে চাইলে ভোরের বাস ধরে সকাল দশটার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া দরকার। তাহলে হাতে অনেকটা সময় পাওয়া যাবে। তবে দুদিন হাতে সময় নিয়ে বেরোলে প্রতিটি স্থান খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
    • কামারপুকুর এবং জয়রামবাটি দুই জায়গাতেই প্রতি দিন সকাল ৯টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত দুপুরের প্রসাদের কুপন দেওয়া হয়ে থাকে। কামারপুকুর এবং জয়রামবাটি দুই জায়গাতেই প্রতি দিন সকাল ৯টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত দুপুরের প্রসাদের কুপন দেওয়া হয়ে থাকে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

1 Comment

1 Comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়