ভ্রমণ

তাজপুর ভ্রমণ

তাজপুর সমুদ্রসৈকত

 দিঘা এবং মন্দারমনির পরেই তাজপুর হল বাঙালির প্রিয় সমুদ্র সৈকত। আর নিরিবিলিতে সময় কাটানোর দিক থেকে প্রথম পছন্দ এটাই। হোটেল আর সমুদ্রের মাঝে যেখানে সবুজের সমাহার। সেই সবুজ পেরিয়ে হলুদ সৈকতের মধ্যে আসার পর লাল কাঁকড়ার খেলা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। ক্লান্ত সপ্তাহের শেষে এক বা দুইদিনের শান্তি নিতে বাঙালির অন্যতম পছন্দ তাজপুর।

পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি মহকুমায় দীঘার অনতিদূরেই তাজপুর সমুদ্রসৈকতের অবস্থান। কলকাতা  থেকে তাজপুরের দুরত্ব মোটামুটি  ১৮০ কিমি। দিঘার থেকে তাজপুর মাত্র ১৮ কিমি দূরে। পশ্চিমবাংলার বাঙালীর প্রিয় সব সমুদ্রের জায়গাগুলো এই অঞ্চলেই পরপর আছে। যদি আমরা দিঘা তাজপুর অঞ্চলের ম্যাপ বুঝতে চাই, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওড়িশার দিকে পরপর সমুদ্রের জায়গাগুলো হল যথাক্রমে বাঁকিপুট, জুনপুট, মন্দারমনি, তাজপুর মোহনা, তাজপুর, চাঁদপুর, শঙ্করপুর, দীঘা মোহনা, ওল্ড দীঘা, নিউ দীঘা , উদয়পুর, তালসারি (এটি ওড়িশার সমুদ্রসৈকত)। বকখালি এবং সেই সংলগ্ন সমুদ্রসৈকত আলাদাভাবে যেতে হয় বলে সেই তালিকায় এদের সাথে জোড়া হল না।

 তাজপুর জলধা সমুদ্রসৈকতের ওপর দোকান
তাজপুর জলধা সমুদ্রসৈকতের ওপর দোকান

তাজপুরের সমুদ্রে ভোরবেলা সূর্যোদয় বা সন্ধেবেলা সূর্যাস্ত খুবই উপভোগ্য। সমুদ্রের ধারে লাল কাঁকড়াদের চলাফেরা খুবই ভালো লাগবে। তবে যত দিন যাচ্ছে এই কাঁকড়াদের সংখ্যা ততই যেন কমছে। ২০১৪ সালের সময় কাঁকড়াদের আনাগোনায় এই সৈকত দূর থেকে লাল দেখাত। সমুদ্রের পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসুন তাজপুর মোহনা। পশ্চিমবঙ্গ সরকার থেকে তাজপুর মোহনাকে সুন্দরভাবে সাজানোর কাজ চলছে। আগে সবুজের পরিমাণ মোহনায় অনেক বেশি ছিল, তবে লোকে আসত কম। এখন এই সৌন্দর্যায়নের ফলে লোকের আনাগোনা বেড়েছে, কিন্তু যারা আগে এসেছেন তারা জানেন এখনের তুলনায় প্রাকৃতিক ভাবে আগে অনেক বেশি সুন্দর ছিল মোহনা। মোহনায় এসে তাজপুর শেষ হচ্ছে, এর অন্যপাড়ে মন্দারমনি। মন্দারমনি হেঁটে যাওয়া যায় না, গাড়ি নিয়ে যেতে হবে। মোহনার যে পাড়ে মন্দারমনি, অন্য দিকে সমুদ্রকে বামদিকে রেখে সোজা হাঁটতে থাকলে প্রথমে জলধা সমুদ্র সৈকত, তারপর চাঁদপুর, তারপর শংকরপুর। জলধা তাজপুরের মধ্যেই পরে। জলধায় বাঁশের ওপর তৈরি দোকানগুলোতে সকালে বসে জলখাবার খেতে খেতে সমুদ্র দেখার মজা আলাদা।

তাজপুর মোহনা (বামদিকে ২০১৬ সালের তোলা ছবি আর ডানদিকে  ২০১৯ সালের তোলা ছবি)
তাজপুর মোহনা (বামদিকে ২০১৬ সালের তোলা ছবি আর ডানদিকে ২০১৯ সালের তোলা ছবি)

বাস, গাড়ি বা ট্রেন তিনভাবেই যাওয়া যায়। ২০২০ সালের কোভিড পরিস্থিতির আগে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ট্রেনে করে আসতে চাইলে হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন। তবে তাজপুর যাওয়ার জন্য সরাসরি কোন ট্রেন নেই। তাজপুরের কাছের স্টেশন রামনগর। স্টেশনে নেমেই গাড়ি বা ভ্যান রিক্সা পাওয়া যায়। বাসে করে গেলে ধর্মতলার শহীদ মিনারের কাছ থেকে দীঘাগামী যেকোনও বাসে চেপে বালিসাই মোড়ে আসতে হবে। তারপর সেখান থেকে অটো বা ভ্যান রিক্সা ধরে সোজা তাজপুর। তবে তাজপুরের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে গাড়ি করে আসা। প্রচুর পর্যটক নিজেদের গাড়ি বা গাড়ি ভাড়া করে কলকাতা থেকে চলে আসে তাজপুর। কলকাতা থেকে গাড়ি করে তাজপুরের এই যাত্রাপথ খুব উপভোগ্য, বিশেষ করে যাদের নিজেদের গাড়ি আছে। মোটামুটি চার থেকে বড়জোর পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা। গাড়ি করে এলে সবচেয়ে বেশি সুবিধার কারণ ট্রেন হোক বা বাস আপনাকে সেই গাড়ি ভাড়া করতেই হবে বারবার, সঙ্গে যতবার কোন জায়গায় যাবেন, ততবার ভাড়া করে যেতে হবে। বিশেষ করে তাজপুরের হোটেল গুলো এতই ভেতরে যে সমুদ্রে যেতেও গাড়ি চাই। তার থেকে নিজের গাড়ি থাকলে সব দিক থেকেই সুবিধা।

 তাজপুর মোহনার প্রবেশের মুখে সৌন্দর্যায়নের কাজ চলছে (২০১৯)
তাজপুর মোহনার প্রবেশের মুখে সৌন্দর্যায়নের কাজ চলছে (২০১৯)

তাজপুর ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল সঠিক হোটেল নির্বাচন। যদি সমুদ্র দেখা যায় এরম হোটেলের সন্ধান করেন তাহলে কিন্তু মন্দারমনি আপনার জন্য বেশি উপযুক্ত। এখানে কিন্তু হোটেলগুলো সমুদ্র থেকে দূরে। পায়ে হেঁটে বা গাড়ি করে যেতে হবে। কিছু হোটেল আছে যেগুলো সমুদ্রের পাশে , কিন্তু সেগুলো যে খুব একটা ভালো তা নয়। তাই হোটেল নির্বাচন করার আগে ভালো করে খোঁজ নিন। ২০২০ সালের কোভিড পরিস্থিতির আগে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী হোটেল ভাড়া গড়ে প্রতিদিন ২০০০ টাকা থেকে ৪০০০ টাকা পর্যন্ত।

তাজপুরের সমুদ্রে স্নান করা যেতে পারে। তবে তাজপুর মোহনায় এসে স্নান না করাই ভালো। সমুদ্রের পাড়ে লাল কাঁকড়া দেখা উপভোগ করুন, তাদের বিরক্ত করবেন না। সকালবেলা তাজপুর জলধাতে এসে জলখাবার খেতে পারেন। জলধা থেকে হাঁটতে হাঁটতে চাঁদপুর বা শংকরপুরও যাওয়া যায়। তবে হাঁটার পথ অনেকটাই। তাজপুর থেকে মন্দারমনি, দীঘা, দীঘা মোহনা, উদয়পুর, তালসারি গাড়ি নিয়ে ঘুরতে যাওয়া যায়।

সারা বছর ধরেই মানুষ ভিড় জমায় এখানে। তবে গরম একটু কমলে সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে মনোরম পরিবেশ থাকে। আবার বর্ষাকালেও সমুদ্র বেশ ভালো লাগে কিন্তু সেই সময় না যাওয়াই ভালো।

 তাজপুর সৈকতে লাল কাঁকড়া
তাজপুর সৈকতে লাল কাঁকড়া

এখানে সমুদ্রের পাশে দোকানগুলোতে গামলার মধ্যে বড় বড় কাঁকড়া রাখা থাকে। হোটেলেও কাঁকড়ার বিভিন্ন রেসিপি বলে রাখলে পাওয়া যায়। এছাড়াও অন্যান্য সমুদ্রসৈকতের মতোই এখানেও বিশেষ খাবার বলতে পমফ্রেট, চিংড়ির মত সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া ইত্যাদির সুস্বাদু রেসিপি রসনা তৃপ্তি ঘটাবেই। এখানের দোকানগুলোতে দুপুরের খাবার খেতে খেতে সমুদ্র দেখার আলাদাই মজা উপভোগ করতে পারেন। এই দোকানগুলো তাজপুরের একটা আলাদাই বৈশিষ্ট্য।

তাজপুরে কেনাকাটা করার কোনো দোকানপাট নেই। কাছাকাছি দোকান মন্দারমনি। তবে সেখানেও খুব বেশি দোকান নেই। কেনাকাটা যদি করতে হয় তাহলে দীঘাই উপযুক্ত জায়গা হবে।

অনেক দোকানে খদ্দেরের চাহিদা মেটাতে বেআইনিভাবে মদ রাখে। জায়গাটা ফাঁকা হওয়ার ফলে দিনের বেলাতেই দোকানে মদ নিয়ে বসে পড়ে। কিন্তু এসব একদম করতে যাবেন না। সব দোকানদাররা কিন্তু অসৎ না এবং আপনার এইরকম রোমাঞ্চপ্রিয়তা বিপদ ডেকে আনতে পারে।  মদ খেয়ে ভুলেও জলে নামবেন না। নিজের গাড়ি নিয়ে গেলেও সৈকতের ওপর তা নিয়ে আসবার চেষ্টা করবেন না। এখানে ফাঁকা হওয়ার দরুণ সন্ধেবেলা একা হেঁটে সমুদ্রের কাছে না যাওয়াই ভালো। তবে একসাথে বেশ কয়েকজন থাকলে গাড়ি নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।


ট্রিপ টিপস

  • কিভাবে যাবেন- বাসে করে গেলে ধর্মতলার শহীদ মিনারের কাছ থেকে দীঘাগামী যেকোনও বাসে চেপে বালিসাই মোড়ে আসতে হবে। তারপর সেখান থেকে অটো বা ভ্যান রিক্সা ধরে সোজা তাজপুর। ট্রেনে যেতে হলে হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে রামনগর স্টেশনে নামতে হবে। স্টেশনে নেমেই গাড়ি বা ভ্যান রিক্সা পেয়ে যাবেন। তবে তাজপুরের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে গাড়ি করে আসা।  মোটামুটি চার থেকে বড়জোর পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা।
  • কোথায় থাকবেন- এখানে কিন্তু হোটেলগুলো সমুদ্র থেকে দূরে। পায়ে হেঁটে বা গাড়ি করে যেতে হবে। কিছু হোটেল আছে যেগুলো সমুদ্রের পাশে , কিন্তু সেগুলো যে খুব একটা ভালো তা নয়। তাই হোটেল নির্বাচন করার আগে ভালো করে খোঁজ নিন।
  • কি দেখবেন- সমুদ্রের পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসুন তাজপুর মোহনা। পশ্চিমবঙ্গ সরকার থেকে তাজপুর মোহনাকে সুন্দরভাবে সাজানোর কাজ চলছে।  মোহনার ওইপাড়ে মন্দারমনি, আর মোহনা থেকে সমুদ্রকে বামদিকে রেখে সোজা হাঁটতে থাকলে প্রথমে জলধা সমুদ্র সৈকত, তারপর চাঁদপুর, তারপর শংকরপুর।  জলধা তাজপুরের মধ্যেই পরে। এছাড়াও চাঁদপুর বা শংকরপুর জলধা থেকে হেঁটেও যাওয়া যায়। তাছাড়া গাড়ি করে দীঘা, উদয়পুর, দীঘা মোহনা, তালসারি ঘুরতে যাওয়া যায়।
  • কখন যাবেন- সারা বছর ধরেই মানুষ ভিড় জমায় এখানে। তবে গরম একটু কমলে সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে মনোরম পরিবেশ থাকে।
  • সতর্কতা- 
    • সূর্যাস্তের পর একা বেরোবেন না, দলবল থাকলে ঠিক আছে।
    • অনেক দোকানে খদ্দেরের চাহিদা মেটাতে বেআইনিভাবে মদ রাখে। কিন্তু এসব একদম করতে যাবেন না। মদ খেয়ে ভুলেও জলে নামবেন না।
    • নিজের গাড়ি নিয়ে গেলেও সৈকতের ওপর তা নিয়ে আসবার চেষ্টা করবেন না।

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন