সববাংলায়

শঙ্করপুর ভ্রমণ

সমুদ্রে ভালোবাসেন এমন মানুষ যদি পশ্চিমবঙ্গ-নিবাসী হন তবে প্রথমেই হয়ত সমুদ্র বলতে তাঁর দীঘা বা মন্দারমণির কথাই মনে পড়বে। তবে আরও কয়েকটি সমুদ্র সৈকত আছে যেগুলি স্বতন্ত্রভাবেও খুবই জনপ্রিয় হয়েছে। তেমনই একটি সমুদ্র সৈকত হল শঙ্করপুর। দীঘার নিকটেই অবস্থিত এই শঙ্করপুর সমুদ্র সৈকত তুলনামূলকভাবে অনেক নির্জন। তাই নিস্তব্ধতার মধ্যে প্রকৃতির শোভা, সামুদ্রিক বিশালতাকে উপভোগ করবার অবকাশ এখানে পাওয়া যেতে পারে। এখানে রয়েছে মাছ ধরবার বন্দরও। এমন নিরালা শান্ত সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে দূর দিগন্তে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখবার অমূল্য অভিজ্ঞতা লাভ করতে হলে, শহর থেকে দূরে নিরিবিলিতে সামুদ্রিক পরিবেশে দুদন্ড নিশ্চিন্ত অবসর যাপন করতে হলে ঘুরে আসতেই হবে শঙ্করপুর।

শঙ্করপুর কোথায়

শঙ্করপুর পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত একটি সমুদ্রসৈকত। এটি কলকাতা থেকে ১৭৫ কিলোমিটার, বর্ধমান থেকে ২৫৫ কিলোমিটার এবং শিলিগুড়ি থেকে ৭৪৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। দীঘা থেকে শঙ্করপুরের দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার। পূর্ব মেদিনীপুরেই পশ্চিমবঙ্গের সর্বাধিক সৈকত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওড়িশার দিকে উপকূল বরাবর পূর্ব মেদিনীপুরের সৈকতগুলো হল যথাক্রমে বাঁকিপুট, জুনপুট, বগুরান জলপাই, মন্দারমনি, তাজপুর, চাঁদপুর, শঙ্করপুর, ওল্ড দীঘা, নিউ দীঘা। নিউ দীঘা সৈকতের পরেই ওড়িশার দুটো সমুদ্রসৈকত উদয়পুর এবং তালসারিকে স্থানীয়রা দীঘার সাইটসিইং হিসাবে ধরে।

শঙ্করপুরের ইতিহাস

দীর্ঘদিন, প্রায় বিশ শতকের অনেকটা সময় পর্যন্ত শঙ্করপুর-সহ দীঘার সামুদ্রিক অঞ্চল বৃহৎ পরিসরের পর্যটনের দিক থেকে ছিল প্রায় অনাবিষ্কৃত। ১৯২০-এর দশকের শেষদিকে একজন ইংরেজ ব্যবসায়ী জন ফ্রাঙ্ক স্নাইথ দীঘার সমুদ্র সৈকতে যে পর্যটনকেন্দ্রের সম্ভাবনা রয়েছে তা অনুভব করেন। সেই সাহেবই স্বাধীনতার পরে ড: বিধানচন্দ্র রায়কে দীঘাকে পর্যটনস্থান হিসেবে গড়ে তুলতে এবং সৈকতে রিসর্ট তৈরি করতে অনুরোধ করেন। সেই থেকে প্রথমে দীঘা এবং তারপর তার আশেপাশে ছড়ানো মন্দারমণি, তালসারি, শঙ্করপুরের মতো সামুদ্রিক অঞ্চলগুলিও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হতে থাকে। দীঘায় পর্যটনের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শঙ্করপুরের পরিকাঠামোরও উন্নতি হতে থাকে। ছোট ছোট হোটেল, রিসর্ট তৈরি হতে থাকে, এমনকি ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনও (WBTDC) এখানে পর্যটনের উন্নতির জন্য বিনিয়োগ করে৷

শঙ্করপুর কীভাবে যাবেন

ট্রেনে করে যেতে হলে প্রথমে দীঘাগামী ট্রেনে উঠে দীঘা স্টেশনে নামতে হবে। দীঘা থেকে শঙ্করপুর পর্যন্ত বাস পাওয়া যাবে এমনকি প্রাইভেট ট্যাক্সিও ভাড়া করা যেতে পারে। যদি বাসে করে শঙ্করপুর যেতে হয় তবে ঘাগামী বাসে করে চলে যাওয়া যাবে শঙ্করপুর৷ দীঘায় নেমে সেখান থেকে ব্রেক জার্নি করে তো যাওয়া যায়ই, এমনকি কোনো কোনো বাস সরাসরি শঙ্করপুরও যায়। শঙ্করপুরে যাওয়ার জন্য কেবল কলকাতা থেকেই নয়, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, আসানসোল, বর্ধমান প্রভৃতি জায়গা থেকে বাস রয়েছে।
সড়কপথে মুম্বাই-কলকাতা হাইওয়ে ধরে এসে পরে কোলাঘাট-হলদিয়া রোড, কন্টাই-নন্দকুমার রোড, দীঘা রোড ধরে পোঁছে যাওয়া যাবে শঙ্করপুর। দীঘা পৌঁছনোর আগে বালিসাই থেকে বামদিকে গেলে শঙ্করপুর পাওয়া যাবে।
বিমানপথে শঙ্করপুর যেতে হলে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে, সেখান থেকে ট্যাক্সি, বাস বা ক্যাব ধরে হাওড়ায় এসে ট্রেন ধরে যেভাবে যাওয়ার কথা উপরে উল্লিখিত হয়েছে, সেভাবে যেতে হবে।

শঙ্করপুরে কোথায় থাকবেন

শঙ্করপুর এমনিতে নির্জন হলেও দীঘার পাশাপাশি এই আশপাশের সমুদ্র সৈকতগুলির প্রতিও মানুষের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে৷ সারাবছরই তাই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। তাদের থাকবার জন্য হোটেল বা রিসর্টের অভাব নেই শঙ্করপুরে। খুব কম খরচে থাকবার জায়গা যেমন সেখানে পাওয়া যাবে তেমনি বিলাসবহুল রিসর্ট পেতেও সেখানে অসুবিধা হবে না। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সবই সেইসব আবাসনে রয়েছে। সেইসঙ্গে সমুদ্রের একেবারে নিকটে থাকতে চাইলেও তেমন অনেক রিসর্ট বা হোটেল পাওয়া যাবে, যেগুলির ব্যালকনিতে বসে সরাসরি সমুদ্র উপভোগ করা যেতে পারে। সরকারী হস্তক্ষেপে দীঘার পাশাপাশি এই শঙ্করপুরের মতো জায়গাও যেহেতু পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, সেই কারণে শঙ্করপুরে সরকারী আবাসনও রয়েছে, যেখানে অত্যন্ত কম খরচে থাকা-খাওয়ার দারুণ বন্দোবস্ত রয়েছে।

শঙ্করপুরে কী দেখবেন

দীঘার নিকটেই অবস্থিত শঙ্করপুর নামের এই সামুদ্রিক অঞ্চলটি অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। সমুদ্রই এই স্থানটির প্রধান আকর্ষণ। দিগন্তবিস্তৃত বিপুল জলরাশি, নরম বালির বিস্তীর্ণ বেলাভূমি, অন্যদিকে সারি সারি বেলাতি ঝাউয়ের সবুজ ঘন বন—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন তাঁর অকৃপণ হস্ত এখানে উপুড় করে দিয়েছে। সুবিশাল সৈকতে সমুদ্রের ঢেউভাঙা ফেনা পায়ে মেখে বহুদূর হেঁটে যাওয়ার যে আনন্দ তা শঙ্করপুরের মতো এমন নিরিবিলি এক সমুদ্রতীরেই যেন ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। ভোরবেলা পুবদিকে সমুদ্রের বুক থেকে লাফিয়ে যখন ওঠে রক্তরাঙা সূর্য, আকাশ যখন সেই বিরাট সমুদ্রের ওপর রক্তিম এক চাঁদোয়ার রূপ ধারণ করে ভেসে থাকে এবং সমুদ্রের স্বচ্ছ জলে পড়ে তার রক্তাভ প্রতিবিম্ব, তখন মুগ্ধচোখে কেবল তা দেখতে হয়। সেই নির্জন সমুদ্রতীরে অমন আশ্চর্য সুন্দর সূর্যোদয়ের সাক্ষী যাঁরা হয়েছেন তাঁদের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ। যদি সৌভাগ্যক্রমে পূর্ণিমার মধ্যে যেতে পারেন শঙ্করপুরের সমুদ্র সৈকতে, তবে জ্যোৎস্নালোকে ভেসে যাওয়া সুদূর প্রসারিত বালুকারাশি আর সমুদ্রের উচ্ছ্বাস মিলে তৈরি হওয়া যে মায়াময় পরিবেশের সাক্ষী থাকার সুযোগ ঘটবে, তা আজীবনের মূল্যবান সম্পদ হয়ে থেকে যাবে৷ এছাড়াও শঙ্করপুর যেহেতু মৎসজীবীদের বন্দর, তাই দূরে দূরে মাছ ধরার নৌকা এবং বিছিয়ে রাখা সাদা জাল জ্যোৎস্নায় যে কি অপূর্ব দৃশ্যপট নির্মাণ করে তা বর্ণনার অতীত। সব মিলিয়ে প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে এক অসাধারণ অবসর যাপন করতে হলে ঘুরে আসতেই হবে শঙ্করপুর।

সমুদ্র সৈকত :- শঙ্করপুরের মূল আকর্ষণ এখানকার সমুদ্র সৈকত। দীঘার মতো এত লোকসমাগম এখানে হয় না বলেই, এই সৈকতে নির্জনতা বজায় রয়েছে এবং সেটিই যেন এই সমুদ্র সৈকতটিকে অনন্য করে তুলেছে। নরম সাদা বালি, স্বচ্ছ নীল সমুদ্রের জল, একদিকে বিলাতি ঝাউবনের সারি, ইতস্তত জেলেদের নৌকো ও পড়ে থাকা জাল–সব নিয়ে এক ছবির মতো সুন্দর এই শঙ্করপুরের সমুদ্র সৈকত। সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের সময়টির অপূর্ব দৃশ্য এই সমুদ্র উপকূল থেকে দারুণভাবে উপভোগ করা যায়। সৈকতে চালানোর জন্য বাইক ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। পর্যটকেরা সেই বাইক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া নিয়ে সমু্দ্রের ধারে চালিয়ে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে পারেন। এছাড়াও খুব সৌভাগ্য থাকলে শঙ্করপুরের এই সমুদ্র সৈকতে লাল কাঁকড়ার দেখাও পেয়ে যাওয়া যেতে পারে। এক সময়ে এই সমুদ্র সৈকতের অন্যতম আকর্ষণই ছিল লাল কাঁকড়া। ভাগ্যে থাকলে সেই কাঁকড়ার দল বেঁধে সৈকতে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য মুগ্ধ করবে পর্যটকদের।

বিলাতি ঝাউ বা ক্যাসুরিনার সারি :- শঙ্করপুর সৈকতের একদিকে আছে বিস্তীর্ণ সমুদ্র এবং এর ঠিক অন্যদিকেই রয়েছে ক্যাসুরিনা গাছের সারি যাকে আমরা বাংলায় বিলাতি ঝাউ বলতে পারি৷ সারিবদ্ধ সবুজ এই ঝাউবনের ভিতরে, শান্ত সুশীতল আলোছায়ার মধ্যে হেঁটে বেড়ালে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার স্বাদ পাওয়া যাবে।

শঙ্করপুর ফিসিং হারবার :- সমুদ্র সৈকতের নিকটেই রয়েছে শঙ্করপুর ফিসিং হারবার প্রকল্প। সেটি মূলত মৎসজীবীদের কর্মক্ষেত্র। সেখানে গেলে সারি সারি মাছ ধরবার ট্রলার যেমন দেখতে পাওয়া যাবে তেমনি জাল বিছানো এমনকি মাছ ধরাও চাক্ষুষ করা যেতে পারে। জেলেদের নৌকো, মাছ ধরার জাল, দলবদ্ধভাবে জাল টেনে তুলে মাছ ধরা, এসব কিছুরই দারুণ ছবি তোলবার সুযোগ পাওয়া যাবে এখানে।

মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম অ্যান্ড রিজিওনাল সেন্টার :- শঙ্করপুর থেকে আনুমানিক সাত-আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম ও রিজিওনাল সেন্টারটি মূলত জুওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার অধীনস্থ। দীঘার সমুদ্র সৈকতে প্রাপ্ত বিরাট তিমিমাছের কঙ্কাল এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়াও ভিতরের একাধিক অ্যাকোয়ারিয়ামে থাকা নানা প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণীও দেখার সুযোগ মিলবে। এটি এশিয়ার বৃহত্তম মেরিন অ্যাকোয়রিয়াম।

এছাড়াও শঙ্করপুর থেকে আশপাশের আরও কয়েকটি সমুদ্র সৈকত, যথা, দীঘা সমুদ্র সৈকত, তালসারি, মন্দারমণি, এমনকি চন্দনেশ্বর মন্দির, অমরাবতী লেক ইত্যাদি সুন্দর সব দ্রষ্টব্য স্থান থেকেও ঘুরে আসা যায়।

শঙ্করপুরে কখন যাবেন

সারাবছরই প্রায় শঙ্করপুরে মানুষের আনাগোনা লেগে থাকে। তবে বর্ষাকালটিকে অনেকেই এড়িয়ে যাওয়ার কথা বলেন, কারণ বৃষ্টিতে নিশ্চিন্তে ঘোরাঘুরি ব্যাহত হতে পারে, সমুদ্র সেসময় উত্তাল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে, ফলে সমুদ্রস্নানও অনেকবেশি বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। তাই বর্ষাকালটি বাদ দিয়ে যাওয়াই ভালো। এমনিতে গ্রীষ্মের শেষদিকে যখন আবহাওয়া একটু আরামদায়ক হয়, সেই সময়টিও বেশ উপযুক্ত হতে পারে। এছাড়াও ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস—এই সময়কালটিও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে ভ্রমণের পক্ষে মন্দ নয়।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • শঙ্করপুরে যেহেতু মানুষের ভীড় কম তাই এখানকার সমুদ্র সৈকতে আবর্জনা তেমন দেখা যায় না৷ এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সমুদ্র সৈকতটির যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে নোংরা করবেন না। পরিবেশটিকে স্বচ্ছ ও নির্মল রাখতে সহায়তা করবেন।
  • শঙ্করপুরে সমুদ্রের ঢেউ এতই প্রবল যে দক্ষ না হলে এবং জলে ভয় থাকলে এখানকার সমুদ্রে না নামাই শ্রেয়।
  • সমুদ্র সৈকতের ধারে, আশেপাশেই খাবারের অনেক জায়গা পাওয়া যাবে। তবে মনে রাখবেন খাবার খেয়ে বর্জ্যপদার্থ যথাস্থানে ফেলবেন।
  • দীঘা থেকে কাঁথি পর্যন্ত সমুদ্রের ধার দিয়ে যে মেরিনড্রাইভ তৈরি হয়েছে তার ওপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে সমুদ্রের অসাধারণ দৃশ্য উপভোগ করতে করতে শঙ্করপুরের পার্শ্ববর্তী সৈকতগুলিতেও ঘুরে আসা যায় সহজেই।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৪


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. https://en.m.wikipedia.org/

  3. https://www.getbengal.com/
  4. https://eisamay.com/


error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading