সব

দীঘা ভ্রমণ

পশ্চিমবঙ্গের একটি অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত হল দীঘা। কথাতেই আছে, বাঙালির ঘোরার তিনটে জায়গা হল দীপুদা, অর্থাৎ দীঘা, পুরী আর দার্জিলিং। দীঘা এমন একটি সমুদ্রসৈকত, যা বাঙালির কাছে কখনও পুরনো হয়না। খুব সহজে এবং নিজের বাজেটের মধ্যে সমুদ্র দেখতে বাঙালি এখানে আসবেই। আর তাই তো দীঘা সবসময় ভিড়ে ঠাসা থাকে।

দীঘা হল পূর্বমেদিনীপুর কোন্টাই মহকুমায় অবস্থিত একটি সমুদ্রসৈকত। দীঘা বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তরের শেষ সীমানায়, পূর্বমেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত। এই সমুদ্রসৈকতকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় । দীঘার থেকে পূর্ব দিকে গেলে দেখা যাবে ওল্ড দীঘা সমুদ্রসৈকত আর দীঘার পশ্চিম দিকে আছে নিউ দীঘা সমুদ্রসৈকত। ওল্ড দীঘার

বিকেলবেলায় দীঘা। ছবিঃ সববাংলায়

দীঘার আদি নাম বীরকুল। ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁর একটি চিঠিতে এই জায়গাকে “প্রাচ্যের ব্রাইটন” বলে উল্লেখ করেছেন । ১৯২৩ সালে একজন‌ ব্রিটিশ‌ ব্যবসায়ী ও ভ্রমনকারী ফ্রাঙ্ক স্মিথ দীঘাতে থাকতে আসেন । দীঘার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে এত মুগ্ধ করে যে তিনি দীঘা নিয়ে লেখালিখি শুরু করেন । ভারতের স্বাধীনতার পর তিনি দীঘায় পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধি করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায়কে বলেন।

বাঙালির অন্যতম প্রধান ঘোরার জায়গা হল দীঘা। দীঘার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে ভারতবর্ষের ও ভারতবর্ষের বাইরে থেকেও বছরের বিভিন্ন সময় দীঘা ঘুরতে আসেন পর্যটকরা । দীঘার অগভীর বালুকাভূমিতে উঁচু উঁচু ঢেউ আঁছড়ে পড়তে দেখা যায়। বিশেষ করে ওল্ড দীঘাতে ঢেউয়ের উচ্চতা বেশি। তুলনায় নিউ দীঘায় ঢেউ কম। তাছাড়াও নিউ দীঘা ওল্ড দীঘার তুলনায় বেশি পরিষ্কার। যদিও দিন দিন পর্যটকেরা নিউ দীঘাকেও সমানভাবে নোংরা করে চলেছে। তবুও ঝাউ গাছ দিয়ে ঘেরা এই সমুদ্রসৈকত এখনও বাঙালির প্রিয় একটা জায়গা। বোল্ডার দিয়ে ঢাকা দীঘার পাড়ে যখন ঢেউ আছড়ে পড়ে, তখন খুব সুন্দর লাগে দেখতে। একইভাবে বোল্ডারে বসে অসাধারন সূর্যাস্ত দেখতেও অন্যরকম লাগে।

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে দীঘাতে প্রতিদিন‌ ট্রেনে যাতায়াতের ব্যবস্থা আছে । ট্রেনে যেতে গেলে হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরতে হবে । হাওড়া স্টেশন থেকে নিম্নলিখিত ট্রেনগুলো দীঘার জন্য ভালো।

ট্রেন নাম্বারট্রেনের নামকখন ছাড়বেদীঘা কখন পৌঁছবে
১২৮৫৭তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসসকাল ৬টা ৩৫ মিনিটসকাল ৯টা ৫৫ মিনিট
১২৮৪৭দীঘা সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসসকাল‌ ১১ টা ১০ মিনিটসকাল ২টো ২০ মিনিট
২২৮৯৭কাণ্ডারি এক্সপ্রেসদুপুর ২টো ১৫ মিনিটবিকেল ৫টা ৩৭
মিনিট

বাসে যেতে গেলে ধর্মতলা থেকে বাস পাওয়া যাবে। এছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন জায়গা থেকেও প্রচুর বাস ছাড়ে। দীঘা যাওয়ার জন্য বাস খুবই সহজলভ্য। আর গাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে কলকাতা থেকে বিদ্যাসাগর সেতু হয়ে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে তে এসে এন এইচ্ ১৬ (পুরোনো নাম এন এইচ্ ৬) রাস্তা ধরে কোলাঘাটে এসে এন এইচ্ ১১৬ (পুরোনা এন এইচ ৪১) রাস্তা হয়ে নন্দকুমার পর্যন্ত আসতে হবে, সেখান থেকে ‌স্টেট হাইওয়ে ধরে দীঘার পথ পাওয়া যাবে।

দীঘার ঝাউবন। ছবিঃ সববাংলায়

দীঘাতে সমস্ত মূল্যের হোটেল ভাড়া পাওয়া যায়। সকলেই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী থাকতে পারে। দীঘাতে সাধারনত কোনো ভালো হোটেলে থাকতে ভারতীয় মুদ্রায় ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা লাগবে । এছাড়াও অনেক কম মূল্যে কিম্বা বেশি মুল্যেরও হোটেল ভাড়া পাওয়া যায় দীঘাতে। দীঘাতে পৌঁছে হোটেল বুক করতে‌ গেলে অনেক্ষেত্রেই ভালো হোটেল পাওয়া যাবে না তাই হোটেল আগে থেকে বুক করে রাখাই ভালো হবে । ওল্ড দীঘার তুলনায় নিউ দীঘাতে ভালো আরামদায়ক হোটেল বেশি পাওয়া যায়।

দীঘার সমুদ্রসৈকত‌ ছাড়াও আরও অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। নিউ দীঘার ‘সায়েন্স সেন্টার’ দর্শকদের খুব দৃষ্টি‌ আকর্ষন‌ করে । নিউ দীঘা থেকে কিছু দুরে অবস্থিত অমরাবতী পার্ক খুব মনোরম ও মজাদার একটি জায়গা। এছাড়াও দীঘায় ঘুরতে যাওয়া মানুষদের কাছে ‘ম্যারীন স্টেশন’ খুব আকর্ষণের । দীঘার কাজল দীঘি বা ‘ওন্ডার ল্যান্ড’ ও পর্যটক দের খুব প্রিয় একটি‌ জায়গা। এছাড়াও দীঘা থেকে কাছাকাছি যে সমুদ্রসৈকত আর জায়গাগুলো যাওয়া যায় তা হল জুনপুট, মন্দারমনি, তাজপুর, চাঁদপুর, উদয়পুর, শঙ্করপুর, তালসারি, চন্দনেশ্বর শিব মন্দির।

দীঘাতে বছরের সবসময়েই যাওয়া যায় তবে সাধারনত অক্টোবর থেকে‌ ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দীঘা ভ্রমনের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই সময়ে এখানে ভিড়ও থাকে খুব বেশি। বর্ষাকালে যদিও প্রচুর মানুষ এখানে আসে, কিন্ত বর্ষাকালে এখানে ভ্রমণের জন্য না আসাই ভালো।

দীঘা মোহনা। ছবিঃ সববাংলায়

দীঘার হিং এর কচুড়ি, মিষ্টি, চিংড়ি মাছ, কাঁকড়া, কাজুবাদাম, নারকেলের জল আর বাঙালি স্বাদের রান্নাবান্না পর্যটক রা খুব ভালো উপভোগ করেন । দীঘা গেলে দীঘার কাজুবাদাম কিনতে কিম্বা কাঁকড়া খেতে অবশ্যই ভুলবেন না ।

দীঘার কাজুবাদাম, হাতে সেলাই করা মাদুর, হায়দ্রাবাদী মুক্তোর গহনা, ঝিনুকের মালা ও গহনা, শুঁটকি মাছ, শঙ্খ, কাপড়ের ব্যাগ, কাঠের পেন, ঝিনুকের পেন স্ট্যান্ড পর্যটক রা খুব কিনে আনেন ।

দীঘায় গেলে কোস্ট‌গার্ড দের পরামর্শ শুনে চলাটা খুব দরকারি তাছাড়াও সাঁতার কাটা যাবেনা‌ এমন অঞ্চলে সাঁতার কাটার চেষ্টা‌ করা‌ একেবারেই উচিৎ নয়। হোটেল সংক্রান্ত ব্যাপারে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দীঘা স্টেশনে এসে হোটেল‌ এজেন্ট‌দের সবসময় উপেক্ষা ‌করা উচিৎ। সাধারনত তাদের হোটেল গুলি সমুদ্রসৈকত থেকে অনেক দুরে অবস্থিত হয়। আবার অনেক্ষেত্রে ভালোও হয়না।

দীঘাতে রওনা হওয়ার ক্ষেত্রে একটি বৈদ্যুতিক টর্চ কিম্বা এমার্জেন্সি ল্যাম্প সাথে নেওয়া খুব দরকারি । মশা তাড়ানোর কয়েল, ধুপ কিম্বা‌ লোশন ও নিতে হবে সাথে । সাঁতার কাটা যাবেনা এমন অঞ্চলে সাঁতার কাটলে চলবে না । কোস্ট গার্ডের পরামর্শ সবসময় মেনে চলতে হবে ।


ট্রিপ টিপস

  • কিভাবে যাবেনঃ হাওড়া থেকে দীঘা প্রতিদিন‌ ট্রেনে যাতায়াতের ব্যবস্থা আছে । হাওড়া স্টেশন থেকে তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস (সকাল ৬ টা ৪০) দুরন্ত এক্সপ্রেস (সকাল‌১১ টা ১৫) ও কান্ডারী এক্সপ্রেস (দুপুর ২ টো ৪০) প্রতিদিন দীঘা যায়। এছাড়াও ধর্মতলা থেকে বাস যায়।
  • কোথায় থাকবেনঃ  দীঘার জন্য আগে থেকে ভালো হোটেল বুক করতে হবে । দীঘার আশেপাশে বিভিন্ন দামের অনেক হোটেল ভাড়া পাওয়া যায় । তবে ওল্ড দীঘার তুলনায় নিউ দীঘাতে হোটেল ব্যবস্থা অনেক ভালো ।
  • কি দেখবেনঃ  নিউ এবং ওল্ড দীঘা সমুদ্রসৈকত, নিউ দীঘা সয়েন্স ‌সেন্টার, অ্যাকোয়ারিয়াম অব্‌ জিওলজিক্যাল সার্ভে অব্ ইন্ডিয়া, অমরাবতী পার্ক, কাজল দীঘি। এছাড়াও দীঘা থেকে অল্পদূরে জুনপুট, মন্দারমনি, তাজপুর, উদয়পুর, চন্দনেশ্বর শিবমন্দির, উদয়পুর বা শঙ্করপুরের মতো জায়গায় যাওয়া যায়।
  • কখন যাবেনঃ বর্ষাকাল অবশ্যই বাদ দিন। শীতকাল এখানে ভ্রমণের জন্য বিশেষ উপযোগী।
  • সতর্কতাঃ  দীঘায় জলে স্নান করতে গেলে কোস্ট‌গার্ড দের পরামর্শ শুনে চলাটা খুব দরকারি
  • সাঁতার কাটা যাবেনা এমন অঞ্চলে সাঁতার কাটার চেষ্টা‌ করা‌ একেবারেই উচিৎ নয় ।
  • হোটেল সংক্রান্ত ব্যাপারে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দীঘা স্টেশনে এসে হোটেল‌ এজেন্ট‌দের সবসময় উপেক্ষা ‌করা উচিৎ।
  • বিশেষ পরামর্শঃ কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে গেলে টোটো বা গাড়িকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করে নেবেন কতক্ষণের জন্য তারা ওই ভাড়া বলছে। শুরুতে এই কথা বলে না নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘুরতে একটু বেশি সময় নিলেই তারা প্রচুর ভাড়া চেয়ে বসে।

১ Comment

1 Comment

  1. D. Nandy

    মে ১৭, ২০২০ at ০১:০৩

    সুন্দর তথ্য বহুল লেখা

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।