সববাংলায়

তালসারি ভ্রমণ 

ভ্রমণপিপাসুরা বিভিন্ন ধরণের হন৷ কেউ পাহাড় ভালবাসেন, কেউ জঙ্গল তো কেউ আবার সমুদ্রের অপার বিশালতার সামনে দা়ঁড়িয়ে জীবনের ক্লেদ, গ্লানি মুহূর্তের জন্য ভাসিয়ে দিতে চান। সাগরের নীল জল ও একের পর এক ঢেউ পাড়ে আছড়ে পড়ে ছড়িয়ে যাওয়া সাদা ফেনা, সেই সমুদ্রের ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে মন ভরে স্নান, বিস্তীর্ণ নির্জন বালিয়াড়ি – এসব যাঁদের পছন্দের তালিকায় প্রথমদিকে আসে তাঁদের জন্য তালসারি সমুদ্র সৈকত অবশ্যই উপযুক্ত একটি ভ্রমণস্থল হতে পারে। বিশেষত এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপারটি হল, সমুদ্রের সঙ্গে নদীর মিলন এখানে প্রত্যক্ষ করা যায়। সমুদ্র তীরবর্তী তালগাছ, ঝাউবনের সারি, সুবর্ণরেখা নদীর মোহনা, লাল কাঁকড়া, সমুদ্রের বুকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য এই সব মিলিয়েই তালসারি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে পর্যটকদের স্মৃতিতে।

তালসারি হল ওড়িশার বালেশ্বর জেলার একটি সমুদ্র সৈকত। এটি ভারতের উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। দীঘা থেকে তালসারি প্রায় সাত কিলোমিটার, জলেশ্বর থেকে ৩৮ কিলোমিটার। দীঘা থেকেই অনেকে তালসারি ঘুরতে যান। যদি দীঘা অঞ্চলের মানচিত্র বোঝাই, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওড়িশার দিকে উপকূল বরাবর পূর্ব মেদিনীপুরের সৈকতগুলো হল যথাক্রমে বাঁকিপুট, জুনপুট, বগুরান জলপাই, মন্দারমনি, তাজপুর, চাঁদপুর, শঙ্করপুর, ওল্ড দীঘা, নিউ দীঘা। দীঘায় ঘুরতে গেলে নিউ দীঘা সৈকতের পরেই ওড়িশার দুটো সমুদ্রসৈকত উদয়পুর এবং তালসারিতে পর্যটকেরা সাইটসিইং করতে যায়।

ওড়িশার সবচেয়ে পরিস্কার ঝকঝকে সমুদ্র সৈকতগুলির মধ্যে একটি হল এই তালসারির সমুদ্র সৈকত। এখানকার সৈকতের আরেকটি বড় বিশেষত্ব হল এই তালসারিতে পর্যটকদের ভিড় খুব একটা হয় না, তাই এখানকার সৈকত মোটের ওপর নির্জন। অতএব জনকোলাহল থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ এখানে পাওয়া যাবে, নিস্তব্ধ প্রকৃতির মাঝে সমুদ্রের গর্জন রোমাঞ্চ জাগিয়ে তুলবে মনে। এমন নির্জন এবং পরিস্কার পরিপাটি সমুদ্র সৈকতের ধার ধরে বালিয়াড়িতে পা ডুবিয়ে সঙ্গীদের সঙ্গে কিংবা একলা অনেক দূরে হেঁটে যাওয়া এক মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা উপহার দেবে পর্যটকদের। একপাশে থাকবে অপার নীল সমুদ্র এবং অন্য পাশে ইতস্তত তাল, নারকেল, খেজুর গাছ কিংবা ঝাউবনের সারি। এখানে উল্লেখ্য যে, তালসারি নামটির মধ্যে তালগাছের সারির কথাই আসলে বলা রয়েছে। তালসারির আরেকটি আকর্ষণ যা এই স্থানটিকে অন্য সমুদ্র সৈকতগুলির তুলনায় একটু পৃথক করেছে, তা হল, এখানে সুর্বণরেখা নদীর একটি ধারা এসে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। ফলে এই সঙ্গমস্থলে অপূর্ব এক প্রাকৃতিক ঘটনার সাক্ষীও থাকবেন পর্যটকেরা। দূর থেকে সুবর্ণরেখা নদীর মোহনার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। তালসারির বিস্তীর্ণ সাদা বালির সৈকতে মাঝেমধ্যেই দেখা পাওয়া যাবে লাল কাঁকড়ার। তারা মূলত বালির নীচে গর্ত করে থাকে এবং মাঝে মাঝে বাইরে বেরিয়ে আসে তবে মানুষের পায়ের আওয়াজ পেলে আবার গর্তের ভিতরে ঢুকে যায় তারা। যেহেতু এখানে কোলাহল কম সেকারণেই এখানকার সমুদ্র সৈকতে লাল কাঁকড়ার দেখা পাওয়া যেতে পারে সহজেই। এছাড়াও জেলেদের সঙ্গে চাইলে সমুদ্রে নৌকো ভ্রমণের আনন্দও উপভোগ করতে পারবেন পর্যটকেরা। এমনকি জেলেদের থেকে সামুদ্রিক মাছও ক্রয় করা যায়। সব মিলিয়ে সমুদ্র দর্শনের পাশাপাশি আরও নানান আনন্দ উপভোগের সুযোগ রয়েছে তালসারিতে।

যেহেতু দীঘা থেকে তালসারি পৌঁছতে ১৫ মিনিট থেকে আধঘণ্টা সময় লাগে, তাই অনেকেই দীঘা হয়ে তালসারি যান। হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরতে হবে। হাওড়া স্টেশন থেকে নিম্নলিখিত ট্রেনগুলো দীঘার জন্য ভাল।

ট্রেন নাম্বারট্রেনের নামকোথা থেকে ছাড়বেকখন ছাড়বেকাঁথি কখন পৌঁছবেদীঘা কখন পৌঁছবে
১২৮৫৭তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসহাওড়াপ্রতিদিন সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটপ্রতিদিন সকাল ৯টা ১৮ মিনিটপ্রতিদিন সকাল ১০টা ৫ মিনিট
১৫৭২২পাহারিয়া এক্সপ্রেসনিউ জলপাইগুড়ি/হাওড়াশুক্রবার রাত ৮টা ১৫ মিনিট/শনিবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটশনিবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটশনিবার সকাল ১১টা ৫৫ মিনিট
০২৮৪৭সাতঁরাগাছি দীঘা স্পেশালসাতঁরাগাছিশনিবার সকাল‌ ৯ টা ১০ মিনিটশনিবার সকাল‌ ১১ টা ৪৪ মিনিটশনিবার দুপুর ১২ টা ৪৫ মিনিট
০২৮৯৭সাতঁরাগাছি দীঘা স্পেশালসাতঁরাগাছিরবিবার সকাল‌ ৮ টা ১০ মিনিটরবিবার সকাল‌ ১০ টা ৪৪ মিনিটরবিবার সকাল ১১টা ৫৫ মিনিট
০৩১৬১কলকাতা দীঘা স্পেশালকলকাতাশনি ও রবি দুপুর ২টোশনি ও রবি সন্ধ্যে ৫টা ৫০
মিনিট
শনি ও রবি সন্ধ্যে ৬টা ৫০
মিনিট
২২৮৯৭কাণ্ডারি এক্সপ্রেসহাওড়াপ্রতিদিন দুপুর ২টো ২৫ মিনিটপ্রতিদিন বিকেল ৫টাপ্রতিদিন বিকেল ৫টা ৫০
মিনিট

বাসে যেতে চাইলে, দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে সরাসরি দীঘার জন্য বাস ছাড়ে। যেমন হাওড়া স্টেশন, বারুইপুর, বাগুইআটি, মধ্যমগ্রাম এবং আরও অন্যান্য জায়গা থেকে সরাসরি দীঘার বাস ছাড়ে। বাসে বা ট্রেনে দীঘা গিয়ে সেখান থেকে অনেক টোটো বা ভ্যান পাওয়া যায়। আর গাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে কলকাতা থেকে কোলাঘাট গিয়ে এন এইচ্ ১১৬ (পুরোনা এন এইচ ৪১) রাস্তা ধরে নন্দকুমার পর্যন্ত যেতে হবে, সেখান থেকে ‌স্টেট হাইওয়ে ধরে তালসারির পথ পাওয়া যাবে।

তালসারিতে থাকার জন্য সমুদ্র তীরবর্তী এমন অনেক হোটেল রয়েছে যেখান থেকে সমুদ্রের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যায়। কিছু হোটেলের ছাদে সুইমিং পুলেরও ব্যবস্থা রয়েছে। যেহেতু দীঘা থেকেও সাইট সিইং করতে তালসারি যাওয়া যায়, তাই দীঘার সমুদ্র সৈকতের নিকটবর্তী হোটেলগুলিতেও থাকা যেতে পারে। নিউ দীঘার হোটেলগুলোতে থেকে তালসারি ঘুরতে যাওয়া বেশি সুবিধাজনক।

তালসারির দ্রষ্টব্য বলতে তালসারির সুন্দর সৈকতকেই বোঝায়। সমুদ্রে পৌঁছাতে হলে খাল পেরিয়ে যেতে হয়। সমুদ্রের জলে এই খাল পুষ্ট হয়। জোয়ারের সময় বা বর্ষাকালে এই খাল পায়ে হেঁটে পেরনো অসম্ভব। ভাটার সময় এখানে জল কম থাকলে পায়ে হেঁটে সমুদ্র অবধি যাওয়া যায়। তবে পর্যটকদের জোয়ার ভাটার সময় জানা না থাকাটা স্বাভাবিক এবং যে কারণে নৌকা করে যাওয়াই বেশি সুবিধাজনক। আগে এখানে কোন জেটিঘাট ছিল না এবং রাস্তা থেকে সরাসরি সৈকতের ওপর যাওয়া যেত। দিন দিন মানুষের ভিড় বাড়ার ফলে এখানে নিত্যনতুন হোটেল যেমন তৈরি হয়েছে তেমনই বর্তমানে এখানে তৈরি হয়েছে একটি জেটিঘাট। এখানে গাড়ি, টোটো পার্ক করে রাখতে হয় এবং নৌকা ফেরবার পথে এখানেই নামায়। নৌকার ভাড়া মাথাপিছু ১০০ টাকা। তবে এখানে সমুদ্রের জলে স্নান করবেন না। সৈকত জুড়ে লাল কাঁকড়া দেখা গেলেও তাদের ধরবার চেষ্টা করবেন না। এখানে সৈকতে বাইক ভাড়া পাওয়া যায় কিন্তু বাইক নিয়ে সৈকতের ওপর চালানো উচিত নয়।

পর্যটকেরা যদি সেখান থেকে আশেপাশের আরও কিছু দ্রষ্টব্য স্থানে যেতে চান, তেমন বেশ কয়েকটি জায়গা রয়েছে। তালসারির খুব কাছেই দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে নির্জন উদয়পুর সৈকত। তালসারি থেকে তিন কিলোমিটার দুরত্বে রয়েছে চন্দনেশ্বর শিব মন্দির। এখানে মন্দিরে পূজা দিতে পারেন। এছাড়া ৮ কিলোমিটার দূরত্বে যে লঙ্কেশ্বরী মন্দির রয়েছে, সেখান থেকেও ঘুরে আসা যায়। তালসারি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে যে বিচিত্রপুর অভয়ারণ্য রয়েছে সেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে ঘুরে আসা যায় একবার। ম্যানগ্রোভ বনভূমি দেখার সুযোগ তো সেখানে মিলবেই, তাছাড়া দ্বীপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও খুব সুন্দর। এছাড়া তালসারিতে থাকলে একদিনের জন্য দীঘার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারেন।

সারা বছর ধরেই পর্যটকেরা এখানে ভিড় জমায়। তবে তালসারিতে ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে জুন মাসের মধ্যে। গ্রীষ্ম এবং শীত এখানে খুবই উপভোগ্য। বর্ষাতে জল বেশি থাকার জন্য না আসাই ভাল।

জেটিঘাটের ওপরে কেনাকাটার জন্য বেশ কিছু দোকান পাওয়া যাবে। সেখানে সামুদ্রিক উপকরণ দিয়ে তৈরি নানারকম শৌখিন জিনিস কিনতে পারবেন পর্যটকেরা। একই জিনিস দীঘার দোকানগুলো থেকে এখানের দোকানে দাম কম। তাই দীঘাতে থেকেও যারা একদিনের জন্য তালসারি ঘুরতে আসবেন, তাঁরা কেনাকাটি করতে চাইলে অবশ্যই তালসারি থেকে জিনিসপত্র কিনতে পারেন। তবে দীঘার মত বিশাল মার্কেট এখানে নেই। কয়েকটি মাত্র দোকানই রয়েছে।


ট্রিপ টিপস

  • কীভাবে যাবেন – দীঘা থেকে যেহেতু তালসারির দূরত্ব সাত কিলোমিটার,  তাই দীঘা হয়েই তালসারি যাওয়া সহজ। বাসে বা ট্রেনে দীঘা গিয়ে সেখান থেকে টোটো বা অটো বুক করে তালসারি যেতে পারেন।
  • কোথায় থাকবেন – তালসারির সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। আবার দীঘা থেকে যেহেতু এখানে যাওয়া যায়, তাই দীঘার সমুদ্র সৈকতের নিকটবর্তী হোটেলগুলিতেও থাকা যায়।
  • কী দেখবেন – তালসারির সমুদ্র সৈকতে লাল কাঁকড়া, সুবর্ণরেখা নদীর মোহনা, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত ছাড়াও আশেপাশে আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থান আছে, যেমন চন্দনেশ্বর মন্দির, উদয়পুর সৈকত, বিচিত্রপুর অভয়ারণ্য, অমরাবতী পার্ক, কাজল দীঘি ইত্যাদি৷
  • কখন যাবেন – বর্ষাকাল অবশ্যই বাদ দিন। তালসারি ভ্রমণের উপযুক্ত সময় হল, অক্টোবর থেকে জুন মাসের মধ্যবর্তী সময়টা। শীত ও গ্রীষ্ম এখানে খুবই উপভোগ্য।
  • সতর্কতা –
    • এখানে সমুদ্রের জলে স্নান করবেন না।
    • সন্ধের পর একা একা বেরবেন না।
    • সৈকত জুড়ে লাল কাঁকড়া দেখা গেলেও তাদের ধরবার চেষ্টা করবেন না।
    • এখানে সৈকতে বাইক ভাড়া পাওয়া যায় কিন্তু বাইক নিয়ে সৈকতের ওপর চালানো উচিত নয়।
  • বিশেষ পরামর্শ
    • একই জিনিস দীঘার দোকানগুলো থেকে তালসারির দোকানে দাম কম। তাই দীঘাতে থেকেও যাঁরা একদিনের জন্য তালসারি ঘুরতে যাবেন, তাঁরা কেনাকাটি করতে চাইলে অবশ্যই তালসারি থেকে জিনিসপত্র কিনতে পারেন।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৩


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. https://en.m.wikipedia.org/
  3. https://odishatour.in/
  4. https://www.tourmyindia.com/
  5. https://www.prokerala.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading