ধর্ম

তারকেশ্বর মন্দির

হিন্দু দেবতা শিবের অন্যতম বিখ্যাত মন্দির তারকেশ্বর মন্দির (Tarakeswar Temple) পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার তারকেশ্বরে অবস্থিত। ১৭২৯ সালে নির্মিত এই মন্দির হিন্দুদের কাছে অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান বলে পরিগণিত হয়। সমুদ্রমন্থনে যে বিষ উঠেছিল, সেই বিষ কণ্ঠে ধারণ করে নীলকন্ঠ শিব সারা পৃথিবীকে রক্ষা করেছিলেন। ভগবতী তারার স্বামী ভোলা মহেশ্বরকে এই তারকেশ্বরে অত্যন্ত জাগ্রত দেবতা রূপে আরাধনা করা হয়। ভক্তজন শিবের অনুগ্রহ লাভ করতে বাঁকে করে পবিত্র জল নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে পদব্রজে তারকেশ্বরে এসে মহাদেবের লিঙ্গে জল ঢেলে মঙ্গল প্রার্থনা করে শিবরাত্রির দিনে, গাজনের উৎসবে। এখানে তারকনাথ নামে পূজিত শিব কিংবদন্তী অনুসারে বহু মানুষের দুরারোগ্য ব্যধির নিরাময় ঘটান। তারকেশ্বরের দুধপুকুরে স্নান করলে নাকি সকল মনস্কামনা পূর্ণ হয় বলে মানুষের বিশ্বাস। এমনকি শোনা যায় যে নিকটস্থ কালী মন্দিরেও নাকি প্রয়োজনে তারকনাথ আরোগ্যের জন্য ভক্তদের যেতে বলতেন। কলকাতা থেকে আটন্ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তারকেশ্বর শহরের মাঝে তারকনাথের মন্দির হিন্দুদের এক প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে তারকেশ্বর মন্দিরের উৎপত্তি সম্পর্কে জানা যায় যে, ১৭২৯ সালে রাজা বিষ্ণুদাসের ভাই ভারমল্লা এই মন্দির স্থাপন করেছিলেন। অযোধ্যা প্রদেশের অন্তর্গত জেলা জৌনপুরের ডোভী পরগণার হরিহরপুর গ্রামের ক্ষত্রিয় ভূস্বামী ছিলেন রাজা বিষ্ণুদাস। তারকেশ্বরের কাছে রামনগর গ্রামে তিনি কয়েকজন ব্রাহ্মণের সঙ্গে এসে বসবাস করছিলেন। ইতিহাস অনুসারে বাংলার নবাব মূর্শিদকুলি খান তাঁকে রামনগরে প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি দান করেছিলেন থাকার জন্য। কথিত আছে, অষ্টাদশ শতকে শিব স্বয়ং ভক্ত বিষ্ণুদাসের স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন এবং নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তারকেশ্বরের কাছে জঙ্গলের গভীরে যে শিবলিঙ্গ রক্ষিত আছে, তাকে নিয়ে এসে মন্দির নির্মাণ করে তবে দেবতাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজার গো-রক্ষক মুকুন্দরাম ঘোষ একদিন লক্ষ করেন কয়েকটি গাভী ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গিয়ে একটা শিলার উপর বাঁট থেকে দুধ নিঃসৃত করে ফিরে আসছে। বিষ্ণুদাসের ভাই ভারমল্লাকে এই খবরটা জানালে তিনিও দেখেন যে জঙ্গলের মধ্যে এক নির্দিষ্ট জায়গায় তাঁদের গাভীগুলি প্রত্যেকদিন শিলাখণ্ডে দুধ দিয়ে আসছে। নল-খাগড়ায় পরিপূর্ণ সেই শিলাখণ্ডের মাথায় একসময় স্থানীয় মহিলারা ধান ঝাড়তো বলে শিলাখণ্ডের মাথায় গর্ত হয়েছিল যা আজও লক্ষ করা যায়। একথাও কথিত আছে যে ভারমল্লদেব সেই শিলাখণ্ড তুলে অন্যত্র স্থাপন করতে চাইলে ভগবান শিব স্বয়ং ভারমল্লকে স্বপ্নাদেশ দেন যে শিলাখণ্ড তোলা যাবে না কারণ তা গয়া-কাশী পর্যন্ত বিস্তৃত আছে। এর পরিবর্তে তিনি যেন সেখানেই একটি মন্দির নির্মাণ করেন। ফলে ভারমল্ল এবং বিষ্ণুদাস গড়ে তোলেন এই তারকেশ্বর মন্দির যা পরে বর্ধমানের মহারাজা সংস্কার করেছিলেন। ক্রমশ তারকেশ্বরের কথা মানুষ জানতে শুরু করলে বহু দূরান্ত থেকে বৈদ্যবাটি হয়ে তাদের মন্দিরে পৌঁছাতে হতো। সেইজন্য পরে বৈদ্যবাটিতে একটি বাংলো তৈরি হয় এবং আরো পরে নীলকমল মিত্রের দাক্ষিণ্যে ১৮৮৫ সালে শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত রেলপথ স্থাপিত হয়। একসময়ে দশনামী শৈব সম্প্রদায়ের মঠ হিসেবেই এই তারকেশ্বর মন্দির পরিগণিত হতো। শিব-সেবার জন্য ভারমল্ল এক হাজার তেইশ বিঘা জমি অর্পণ করেন এবং তাঁদের গো-রক্ষক মুকুন্দ ঘোষ ছিলেন তারকনাথের প্রথম সেবক। এখানকার পূজারীদের বলা হয় ‘মোহান্ত’। বিখ্যাত মোহান্ত ছিলেন তারকেশ্বরের মায়াগিরি। যদিও তারকেশ্বরের ইতিহাসে মোহান্তদেরকে কেন্দ্র করে একটি অন্ধকার অধ্যায় রচিত হয়েছে যা উনিশ শতকের বটতলা সাহিত্যে ‘মোহান্ত-এলোকেশী সংবাদ’ নামে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। সহোদর গোস্বামীর ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্যে, কবিচন্দ্র রামকৃষ্ণ দাসের ‘শিবায়ণ’ কাব্যে এই তারকেশ্বর মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়।

তারকেশ্বর মন্দিরের গঠনশৈলী বাংলার আটচালার অনুরূপ। মন্দিরের কাছেই রয়েছে লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির এবং এক অপূর্ব কালী মন্দির। মন্দিরের সম্মুখে একটি নাটমন্দির রয়েছে যেখানে ভক্তরা বসে তাদের মনের কথা দেবতাকে জানায়। শিব মন্দিরের উত্তরদিকে একটি পুষ্করিণী আছে, যাকে দুধপুকুর বলা হয়। হিন্দুদের বিশ্বাস যে ওই পুকুরে ডুব দিয়ে স্নান করলে ভক্তজনের সকল মনস্কামনা পূর্ণ হয়।

মন্দিরের শিবলিঙ্গকে স্বয়ম্ভু বলা হয় কারণ তারকেশ্বরের তারকনাথকে কেউ নির্মাণ করে স্থাপন করেননি। এছাড়া গঙ্গার পলিভূমিতে ওই ধরনের পাথর পাওয়া অসম্ভব। সে কারণে একথা অনেকেই বিশ্বাস করেন যে এখানে শিব স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছিলেন। মন্দিরে স্বয়ম্ভূ শিবলিঙ্গ যেমন রয়েছেন, তেমনই অধিষ্ঠান করছেন বাসুদেব। অনেকের মতে তিনি আসলে ব্রহ্মা। শিবের কিছুদূরে নন্দী-ভৃঙ্গীর অধিষ্ঠানও দেখা যায়। শিব-ভক্তদের মধ্যে তারকেশ্বরের মন্দিরের আকর্ষণ চিরন্তন, কারণ এই মন্দিরের দেবতা অত্যন্ত জাগ্রত এবং ভক্তদের মনোবাসনা অবশ্যই পূর্ণ করেন। এই তারকেশ্বরের তারকনাথকে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম বলেও মনে করা হয়।

মহা শিবরাত্রির দিন তারকেশ্বরে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম ঘটে। সারা দিন ও সারা রাত্রি মন্দিরের দ্বার খোলা থাকে। এই মন্দির সংলগ্ন রাজবাড়িতে এই সময়ে মেলা বসে। স্থানীয় প্রশাসন থেকে কঠোরভাবে মন্দিরের নিরাপত্তার দিকে লক্ষ্য রাখা হয়। প্রত‍্যেক ভক্তকে মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে পরীক্ষা করা হয়। শ্রাবণ মাসের প্রত্যেক সোমবার তারকেশ্বরে বহু ভক্তের ভিড় দেখা যায়। দেশের নানা স্থান থেকে বাঁক কাঁধে নিয়ে ভক্তরা শিবের মাথায় জল ঢেলে প্রার্থনা করার উদ্দেশ্যে তারকেশ্বরের মন্দিরে আসে। তাছাড়াও চৈত্র সংক্রান্তির দিন গাজন উৎসবে মন্দিরে ভক্তদের ভিড় হয়। সেখানেও বাঁক কাঁধে নিয়ে বহু ভক্ত পায়ে হেঁটে মন্দিরে আসে, দুধ পুকুরে স্নান করে, শিবের মাথায় জল ঢালে এবং আপন আপন মনোবাঞ্ছা জানায়। বাঁক কাঁধে নিয়ে ‘জয় বাবা তারকনাথ’ উচ্চারণে পথঘাট মুখর করে ভক্তেরা ছুটতে ছুটতে আসে তারকেশ্বরে। এখানে দণ্ডী কাটার প্রচলনও আছে।

মন্দিরের পূজার সময় সাধারণত সকাল ছ’টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত এবং বিকেলে চারটে থেকে সাতটা পর্যন্ত। কিন্তু বিশেষ বিশেষ দিনগুলিতে মন্দির প্রাঙ্গণ সর্বসাধারণের জন্য ও সারা দিন রাত্রি খোলা থাকে। মন্দিরের বাইরে ফুল-মালা- প্রসাদের মিষ্টি- মোমবাতি -প্রদীপ ইত্যাদি বিক্রি হয়। এছাড়াও সর্বদাই পুজো করানোর জন্য পুরোহিতেরা উপস্থিত থাকেন।

১৯৭৭ সালে তারকেশ্বরের ‘বাবা তারকনাথ’কে নিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাতা সুনীল বন্দোপাধ্যায়। গল্পের মাধ্যমে বাবা তারকনাথের মহিমা প্রচার করায় এই ছবি অত্যন্ত সাফল্য লাভ করেছিল। ছবিটির ঐতিহাসিক সাফল্য তারকেশ্বরের শিবকে আরো বেশি মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।