শিক্ষক দিবস নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে পারেন, আলোচনা করতে পারেন সেকাল আর একালের কথা… প্রসঙ্গক্রমে শিক্ষা ও অন্যান্য বিষয় এসে যেতে পারে… আসুক ক্ষতি নেই, হোক আড্ডা…
শিক্ষক দিবসের কথা উঠলে প্রথমেই স্কুল লাইফের কথা মনে পড়ে। আমার স্কুল জীবন মানে ৯ এর দশক – সে যুগে শিক্ষকদিবস পালনের জাঁকজমক না থাকলেও আন্তরিকতা ছিল (অন্তত গ্রামের দিকে)। প্রাইমারি স্কুলে কোনদিন শিক্ষক দিবসের নাম শুনেছি বলে মনে পড়ে না – অথচ এখন প্রাক-প্রাথমিক বাচ্চাদের হাত দিয়ে শিক্ষকের জন্য উপহার কিনে পাঠাচ্ছে বাবা-মা; শিক্ষকরাও তাদেরকে খাওয়াচ্ছেন সাধ্যমত চকোলেট, মিষ্টি ইত্যাদি।
যখন বড় ইস্কুলে গেলাম, প্রথম বছর অর্থাৎ ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় স্কুলে আয়োজিত হল শিক্ষক দিবস। আমরা ছিলাম শুধুমাত্র দর্শক, সম্ভবত আয়োজনের দায়িত্বে থাকত একাদশ/দ্বাদশের ছাত্রছাত্রীরা। ক্লাস সিক্সে উঠে আমরা নিজেদের ক্লাসে নিজেদের মতো করে আয়োজন করেছিলাম শিক্ষক দিবস। না, কোন উপহারের ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না কোন মিষ্টিমুখের ব্যাপার। প্রথম পিরিয়ডের আগে ব্ল্যাক বোর্ড জুড়ে লিখেছিলাম “শিক্ষক দিবস”। ক্লাস টিচার আসতে ওনাকে প্রণাম – পা ছুঁয়ে। শিক্ষক মহাশয় সবার উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলেছেন, সেসব বিশেষ কিছু মনেও নেই আর। পরের পিরিয়ডগুলোতেও এই ভাবেই প্রণাম চলছিল। কিন্তু যাঁরা আমাদের ক্লাস নিতেন না তাঁদের বেলায় কী হবে! তখন অতটাও সাহস হয়নি যে স্টাফ রুমে গিয়ে প্রণাম করব। দুটো পিরিয়ডে ফাঁকে স্টাফরুমের সামনে ঘুরঘুর করতাম আর যে শিক্ষক/শিক্ষিকা বাইরে আসতেন তাঁকে ঘিরে ধরে প্রণাম। আর ফোর্থ পিরিয়ডের পর অনুষ্ঠান।
তবে প্রতি বছর অনুষ্ঠান হত এমনও নয়, তবে ক্লাস রুমে আমাদের নিজের মতো করে পালনটা চলত। আর একটু বড় হতে, স্টাফরুমে যাওয়ার সাহস সঞ্চয় করে সকলকে পরপর প্রণাম করে আসতাম।
ক্লাস এইটে পড়ার সময় ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা ‘শিক্ষক দিবস’ হয়ে গেল “Happy Teacher’s Day”. প্রথম ক্লাস ছিল ইংরাজির, সেজন্যেই ইংরাজিতে লেখা নাকি তখন সবেতে “হ্যাপি” বসানোর রেওয়াজ উঠেছে বলে কিনা জানি না। স্যার (গিরিজাপতি বাবু) এসে বললেন, ‘বাহ, খুব ভাল, এবার বলো তো এখানে কী ভুল আছে?’ আমরা সবাই কাঁচুমাচু, কেউ বলতেও পারি না কী ভুল আছে! স্যার তখন বললেন, আজ সকল শিক্ষকদের দিবস, একজনের নয় তাই এটা প্লুরাল। আর প্লুরালের বেলায় apostrophe symbol টা s এর পরে হবে। বলে ঠিক করে দিলেন “Happy Teachers’ Day”… আজও ওই একটা বাক্য ‘s এর ভুলটা হতে দেয় না। তবে এখনও অনেকের উৎসবে ছোটবেলার সেই ভুল বানানটা দেখি, হয়ত আজও কোন শিক্ষক ওদের ভুলটা ধরিয়ে দেন… নাকি দেন না আর?
টুয়েলভে যখন পড়ি, বেশ বড়ই লেজ তখন, প্রণাম ট্রণাম শেষে সবাই স্যারকে ধরলাম – ‘স্যার মিষ্টি খাওয়ান’। কয়েকবার আবদার করতেই ‘স্যার শ দুই টাকা দিয়ে বললেন সবাই মিলে খাবি কিন্তু, আর আমি দিচ্ছি বলে অন্য স্যারদেরকে বলবি না, তাহলে কিন্তু হবে না’। না অন্য স্যারদেকে তরুণবাবু খাওয়ার জন্য টাকা দিয়েছেন এ কথা আমরা বলিনি। সায়েন্সে তখন ২০ জন মতো ছিলাম, সবাই মিলে মিষ্টির দোকানে গিয়ে খেয়েছিলাম।
এছাড়া ছিল টিউশন (১১/১২ ক্লাসে)। সেখানে অবশ্য আমরা উপহার দেবো আর শিক্ষকেরা মিষ্টিমুখ করাবেন এরকম একটা অলিখিত নিয়ম তখন শুরু হতে চলেছে। এনাদের মধ্যে একজন শিক্ষক ইলেভেনে পড়ার সময় উপহার দেওয়ার পরেও খাওয়াননি, পরে টুয়েলভের সময় আমরাও ওনাকে উপহার দিইনি, শুধু প্রণামেই কাজ সেরে নিয়েছিলাম।
হ্যাঁ, প্রণাম করতাম সব শিক্ষকদেরকেই, মাথা নিচু করে,পা ছুঁয়ে। রাস্তায় স্যারদেরকে দেখলে সাইকেল থেকে নেমে হেঁটে যাওয়া – স্কুল ছাড়ার অনেক পরেও করেছি।
কলেজে কোনদিন শিক্ষকদিবস পালন করেছি বলে মনে পড়ে না, কলেজে সত্যি বলতে সেরকম সম্পর্ক কোন শিক্ষকের সঙ্গে গড়েও ওঠেনি। (তাপস স্যারের সঙ্গে সম্পর্ক কলেজ পাস করার অনেক পরে, তাই ওনাকে ধরছি না।) স্কুলের শিক্ষকদের প্রথম দিন থেকেই কেন জানি না বাড়ির অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন। গুরুগম্ভীর শিক্ষকরাও ভিতর থেকে আমাদেরকে ভালবাসতেন সেটা অনুভব করতে পারতাম, তাই ভয় পেলেও অন্যরকম সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আর কিছু কিছু শিক্ষক মহাশয় তো আমাদের খুবই কাছের হয়ে উঠেছিলেন। যেমন আনন্দবাবু, ফাইভে ক্লাস নিতেন, পরেও অনেকবার অনেক ক্লাসে পেয়েছি। ওনার সঙ্গে সকলের বন্ধুর মতো সম্পর্ক, এই ক’দিন আগে স্কুলে গেছিলাম, এখনও জড়িয়ে ধরে কথা বলেন, সব খোঁজ খবর নেন। না এটা শুধু আমার সঙ্গে নয়, স্যারের সঙ্গে সমস্ত ছাত্রদেরই এরকম সম্পর্ক। বিদ্যাসাগর মূর্তির তলায় শান্তিবাবুর (সংস্কৃত, ক্লাস ৭/৮) পাশে ঘিরে ধরে কত গল্প করতাম আমরা! ইলেভেন/টুয়েলভে শিবানী ম্যাডামের ইংরাজি ক্লাসে এত জ্বালাতন করেছি, কিন্তু তাই বলে কোনদিন অসম্মান করিনি। ওনার সঙ্গে আজও যোগাযোগ আছে, স্কুলে গেলেই দেখা করি, কথা হয়। সেভেনের শেষের দিকে ভৈরববাবু সম্ভবত প্রধান শিক্ষক হলে, উনি প্রথম দিকে নিয়মিত ক্লাসমনিটরদের সঙ্গে মিটিং করতেন। এবং সেসময় আমাদের সমস্যা শুনে সমাধান করতেন বা চেষ্টা করতেন। তপনবাবুর কথা শুনেই প্রথম কবিতা লেখার চেষ্টা, স্যার সি সব অপটু লেখা সংশোধ্ন করে দিতেন। এরকমই অনেক শিক্ষকের কথা মনে আসছে, সকলের নাম নেওয়া বা ঘটনা ধরে ধরে বলা সম্ভব নয়। লেখার আয়তনও বাড়বে। তবে স্কুললাইফ শেষ করে পরে যতবারই স্কুলে গেছি সব শিক্ষক শিক্ষিকারা আন্তরিকভাবে কথা বলেছেন, খোঁজখবর করেছেন – শুধু আমারই না,পরিবারের সকলের।
টিউশনিতে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি যাঁদের তাঁদের মধ্যে সুকুমার কাকুর নাম প্রথমেই করতে হয় কারণ উনি আমার প্রথম টিউশন শিক্ষক (ছবি আঁকার)। অবশ্য ওনার সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্কের থেকেও নিজের কাকুর মতো সম্পর্ক। আজকে ইংরাজি যেটুকু জানি গোপালবাবুর জন্য, নবম-দশমের অপছন্দের কেমিস্ট্রিকে একাদশ দ্বাদশে প্রিয় করে তুলেছিল ফন্টেদা। সঞ্জিতদা, কাশীদা তো শিক্ষক নয় যেন বন্ধু ছিল, যাবতীয় গল্প করা যেত।
কেন জানি না, মনে হয়, আজকাল ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক বড় বেশি ‘প্রফেশনাল’ হয়ে যাচ্ছে যেখানে জাঁকজমক আছে, আন্তরিকতা নেই। তবে, হয়ত, শিক্ষকদের সঙ্গে আজকের ছাত্রদেরও সেই সময়কার মতো সম্পর্কই আছে – আমরা হয়ত দূর থেকে দেখছি বলে মনে হচ্ছে সেই সম্পর্কগুলোতেও অবক্ষয় শুরু হয়েছে… এই ভাবনা ঠিক না ভুল সেটা আজকের ছাত্র-শিক্ষকেরাই বলতে পারবেন। অনুরোধ করব, সেই মতামত জানান।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
