বিচ্ছেদ
রুবাই শুভজিৎ ঘোষ
আলিদের কোম্পানীর সাথে অন্য একটি কোম্পানীর আজ গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিং। এই মিটিং দুই কোম্পানীর ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেবে। এইরকম মিটিং গুলোয় আলিদের কোম্পানী থেকে আলিই উপস্থিত থাকে। আর অন্য কোম্পানীর হয়ে আসছে মিসেস রায়। একেবারে কাঁটায় কাঁটায় টাইম মেনে আলি এসে ঢুকল কনফারেন্স রুমে। অন্য কোম্পানীর মিসেস রায় তখনও এসে পৌঁছয়নি। আলি এসে বসল একটি চেয়ারে। “গুড আফটারনুন স্যার।” আলির পাশে বসা সহকর্মীটি তাকে বলল। একে একে অন্য সকলেই তাকে বলল। প্রত্যুত্তরে আলিও সকলকে, “গুড আফটারনুন জেন্টেলমেন!” জানাল। তারপর মন দিল একটি বিশেষ ফাইলে। মিসেস রায় যখন এখনও আসেননি, তখন কয়েকটা পয়েন্ট আরও একবার দেখে নিল সে। কিছুক্ষণ পরই মিসেস রায় আর তার টিম এসে ঢুকল মিটিং-এ। ফাইল থেকে মাথা তুলে দরজার দিকে তাকাল। কনফারেন্স রুমের দরজা ঠেলে মিসেস রায়দের টিমের প্রথম যে ব্যক্তিটি এসে ঢুকল, তাকে দেখে আলির ব্যক্তিত্ব, আলির আত্মবিশ্বাস কেমন যেন ঘেঁটে গেল। হঠাৎ আলির মধ্যে কেমন একটা চাপা উত্তেজনা দেখা দিল, কেমন একটা আনচান ভাব তার মধ্যে। আলির সহকর্মী ব্যাপারটা বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করল, ” কি হয়েছে স্যার?””কিছু না।” আলি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও সে জানে সে স্বাভাবিক নেই। আগন্তুক সেই মহিলাটি যখন সকলকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সরি জেন্টেলমেন!”, আলি আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না। “এক্সকিউস মি।” বলে বেরিয়ে এল কনফারেন্স রুম থেকে।
ওয়াশরুমে এসে বেসিনের কলটা চালিয়ে দিল। একটা কান্না দলা পাকিয়ে এসেছে তার গলার কাছে, তার চোখের কোণে।মুখে কয়েক আঁজলা ঝাপটা দিল জলের। কয়েক আঁজলা সেই জলে তার চোখের কয়েক ফোঁটা জল ঢাকা পড়ল। নাহলে তাকে যদি কেউ দেখে ফেলত এভাবে? আলিকে যদি এভাবে কেউ দেখে ফেলত, কি ভাবত তাহলে!আর আলি কেন, পুরুষ মানুষকে কি আর এভাবে কাঁদতে আছে? মনে যতই ঝড় বয়ে যাক তার, একজন পুরুষকে কাঁদার অধিকার তো সমাজ দেয় না, বরং কাঁদলে তাকে কাপুরুষ আখ্যা দেয়। আর সমাজের সবকিছুই তো আলি মাথা পেতে নিয়েছে চিরকাল। নিতেই হতো, নাহলে সমাজে বাঁচতই বা কি করে। আরও কয়েকটা ঝাপটা মারল সে মুখে। বারে বারে আয়নায় জলের ঝাপটা পড়ে আবছা হয়ে গেল সেটা। নিজেকে দেখতে আলি সেই আয়নার দিকে তাকাল এবার। কিন্তু ঝাপসা আয়নায় দেখতে পেল না নিজেকে। বরং দেখতে পেল তার অতীত, যেটা থেকে সে পালিয়ে এসেছিল, কিন্তু ভুলতে পারেনি কখনও।
এই তো কয়েক বছর আগেও আলি ঠিক এরকম ছিল না। চাকরি সে তখনও করত। কিন্তু এত চুপচাপ, এত গম্ভীর ছিল না, ছিল একেবারে শিশুর মত। ধীরে ধীরে সবটাই বদলে গেল। যেমন খুব দ্রুত তখন বদলে যাচ্ছিল শহরটা, এগিয়ে যাচ্ছিল একটা ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে। আলি কখনও ভাবেওনি তখন তার জীবনেও নেমে আসতে পারে এমন কিছু। কারণ তার শহরটা যে বাকি সকলের থেকে আলাদা ছিল। আর আলাদা ছিল বলেই তো সে পদবী দেখে ভালোবাসেনি। পদবী দেখে ভালোবাসা যায়ও না। তার জীবনে রাই এসেছিল একটা রঙ্গীন স্বপ্নের মত। তারা অনেক বছর স্বপ্নটাকে বাড়িয়ে তুলেছিল, পালন করেছিল একসাথে। কিন্তু কিছু মানুষ যেমন ভালোবাসতে জানে, তেমনই কিছু মানুষ জানে শুধুই ঘৃণা করতে। আর দ্বিতীয় গোষ্ঠীর মানুষেরা প্রথম গোষ্ঠীর চেয়ে সংখ্যায় বেশি। তবে সবচেয়ে বেশি আর ভয়ানক তো সেইসব মানুষেরা যারা নিজেরা হয়তো অন্যকে ঘৃণা করে না, কিন্তু এই দ্বিতীয় গোষ্ঠীর প্ররোচনায় তারা এক মুহূর্তেই দানব হয়ে উঠে। সবকিছু শেষ করে দেয়, শেষকরে একটা শহর, শেষ করে দেয় একটা সভ্যতা। সেইরকমই এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল এই দুজনকে। যে পরিস্থিতির কথা, যে ঘটনার কথা তারা শুধুই পড়েছে বইয়ে বা খবরের কাগজে, শুধুই দেখেছে সিনেমায়, শুধুই শুনেছে আগের প্রজন্মের মানুষের থেকে। হঠাৎ করেই তাদের পড়তে হয়েছিল এরমই একটা উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে, যার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল এতটাই দ্রুত যে তারা বুঝে ওঠার সময় পায়নি। তারা আলাদা হয়ে গেছিল, রাই আর আলি আলাদা হয়ে গেছিল চিরকালের মত। সেদিন হাউমাউ করে কেঁদেছিল আলি। বেশ কয়েকদিন সে কেঁদেছিল। আস্তে আস্তে বদলে গেছিল সে, কেমন একটা যন্ত্রের মত হয়ে গেছিল। আজ ওই মেয়েটাকে দেখে তার বুকের জমে থাকা কান্নারা শীতঘুম ভেঙে বেরিয়ে এল। আলি বেরিয়ে এল ওয়াশরুম থেকে।
যখন কনফারেন্স রুমে এসে ঢুকল আলি,যতটা সম্ভব সে চেষ্টা করল স্বাভাবিক থাকার। কিন্তু বুকের মধ্যে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার। তার কয়েক বছর আগের রাই ফিরে এসেছে, ফিরে এসেছে এই শহরে, ফিরে এসেছে “মিসেস রায়!” হয়ে। মিসেস রায়! শব্দটা কয়েকবার উচ্চারণ করল আলি। মিসেস! যাকে আলি একটিবার দেখবার জন্য সারাটাজীবন অপেক্ষা করে গেছে, সেই রাই এখন মিসেস রায়। মিটিং শেষ হওয়া অবধি কোনোরকমে অপেক্ষা করল আলি। এখানে দমবন্ধ হয়ে আসছে তার। গলা থেকে টাইয়ের গিটটা আলগা করল সে। মিটিং শেষ হতেই বেরিয়ে গেল তাড়াতাড়ি। হনহন করে নেমে এল পার্কিং এরিয়ায়। আবার শুরু হল তার পালানো জীবন, কয়েক বছর আগের মত। এবার পালানো নিজের থেকে। গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়েই আ্যক্সিলেটরে পা দিল সে।
আলির গাড়ি স্পিড তুলে বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে গেল মিসেস রায়ের গাড়ির সামনে দিয়ে। মিসেস রায় দাঁড়িয়ে দেখল তার চলে যাওয়া, তাকে ডাকতে ইচ্ছে হল তার।খুব জোরে চেঁচিয়ে ডাকতে ইচ্ছে হল, কিন্তু পারল না। নিজের গাড়ির ভেতর উঠে এল সে। গাড়ির রঙিন কাঁচটা তুলে দিল সে, যাতে বাইরে থেকে তার ভেতরের রংহীন জীবনটা না প্রকাশ পায়। এবার আর পারল না। এত বছর ধরে চেপে রাখা দুঃখটা এক মুহূর্তে দলা পাকানো কান্না হয়ে বেরিয়ে এল। কান্নাটাকে সে আর ধরে রাখতে পারল না।
তখনও রাই, মিসেস রায় হয়ে ওঠেনি। শহরের পরিস্থিতি দুপক্ষকে নিয়ে হয়ে ওঠেনি এমন অগ্নিগর্ভ। একই এলাকায় দুপক্ষেরই বাস ছিল পাশাপাশি। দুপক্ষের কিছু মানুষ,যারা পদবী দেখে মানুষ ভালবাসে না, তাদের মধ্যে ছিল বন্ধুত্ব । সেই মানুষদেরই আগের প্রজন্ম বন্ধুত্বটাকে নিয়ে গেল আরও একধাপ আগে। রাই আর আলি প্রেমে পড়ল পরস্পরের। রাইয়ের তখন কিশোরী বয়স।মনে তার প্রজাপতির মতো রঙ্গীন পাখা। দুজন দুজনকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু তারপর একদিন তাদের সাজানো স্বপ্ন তাসের ঘরের মত ভেঙে গেল। ভেঙে দিল সমাজের কিছু মানুষেরা। আলাদা হয়ে গেল দুজন। কবে আবার তাদের দেখা হবে কেউ জানত না। রাই কতদিন অবধি রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদত আর অপেক্ষা করত আলির। অপেক্ষা করত যদি আলি ফিরে আসে। কিন্তু আলি আসেনি। আলি এসে তাকে বলেনি, “রাই! চলো। আমাদের জন্য সবকিছু ঠিক করে রেখেছি।”
আলি না এলেও রাই সারাজীবন অপেক্ষা করতে রাজি ছিল। ঠিক যেমন রাজি ছিল আলিও। দুজন দুজনের জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু আলির মত বিয়েকে প্রত্যাখ্যান করা রাইয়ের কাছে অত সোজা ছিল না। একটা মেয়ের কাছে বিয়ে করব না বলা অতটা সোজা না। রাইও অনেকদিন অবধি ঠেকিয়ে রাখল ওর বিয়ে। কুমারী মেয়ে বাড়িতে থাকলে নাকি সমাজ বাজে কথা বলবে। কিন্তু রাই কিছুতেই রাজি হল না। অতএব অন্যান্য বাবা মার মত রাইয়ের বাবা মাও সেই পুরোনো পন্থা ধরল। তার বাবা একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ল। রাই বিয়ে না করলে নাকি বাবা বাঁচবে না। রাই হার মানল সমাজের কাছে। বিয়ে হল তার। আজ যখন আলিকে দেখল, তাকে সব কথা বলতে ইচ্ছে হল তার। কিন্তু আলি ভুল বুঝল। তবে ঠিক বুঝেই বা কি হত? তাদের বিচ্ছেদ তো হয়েই গেছে। ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নিয়ে কি তারা আবার এক হতে পারত? হলেই বা সমাজ মেনে নেবে। তার থেকে ভুল বোঝাবুঝিই থাক না। হয়ত দুজনে কিছুটা হলেও ভালো থাকবে।
রাই গাড়ি স্টার্ট দিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান