পূর্বজন্মের জীব
রুবাই শুভজিৎ ঘোষ
।।১।।
এতক্ষণে তার খেয়াল হল সে পথ হারিয়েছে জঙ্গলে। কিসের একটা মোহে সে গভীরে, আরও গভীরে প্রবেশ করেছিল জঙ্গলের। ফিরতে পারবে কি পারবে না সে চিন্তাই করেনি। প্রথমত বিকেলবেলায় হরিণ দেখার লোভে তার আসাই উচিত হয়নি। আকাশটা কালো হয়ে আসছে এখন। কিছুটা সন্ধ্যে হবে বলে, বাকিটা মেঘের জন্য। দ্বিতীয়ত এসেই যখন সে পড়েছিল, তাহলেও জঙ্গলের এতটা ভিতরে তার ঢোকা উচিত হয়নি। জঙ্গলের ব্যাপারে সে একেবারে আনকোরা। বলতে গেলে এটা তার প্রথমবার জঙ্গলে আসা। তাও আবার একা। এখন সে ভাবছে পুরো সিদ্ধান্তটাই ভুল ছিল তার। কিন্তু কেন সে এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিল, আর তার পরিণতিই বা কি, সেটা সে বুঝেছিল পরে।
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর স্টেশন থেকে পনেরো-ষোলো কিলোমিটার দূরে জয়পুরের জঙ্গল। বিষ্ণুপুর স্টেশনে জয়ের জন্য গাড়ী অপেক্ষা করছিল। স্টেশনে নেমে আধ ঘণ্টার ভিতরেই গাড়ী করে সে পৌঁছে গেল জঙ্গলের ধারের একটা রিসর্টে। এখানে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেছিল। এখন কড়া রোদ। রিসর্টে পৌঁছে একটু বিশ্রাম নেমে ঠিক করেছিল জয়। একদম সকালের ট্রেন ছিল তার, তাই স্নান করা হয়নি। বাথরুমে টাওয়েল, বডি ওয়াশ রাখাই ছিল। স্নান সেরে জয় টাওয়েলটা কোমরে জড়িয়ে বেরিয়ে এলো বাথরুম থেকে। এসি-টার টেম্পারেচার নিজের মত করে বাড়িয়ে কমিয়ে নিল। খিদে পেল তারপর। রুমে দরজার পাশেই দেওয়ালে আটকানো টেলিফোনটা থেকে তার রুমের সার্ভিসে থাকা মায়াকে ফোন করল। রিসর্টে পৌঁছে মায়াই তাকে তার রুম দেখিয়ে দিয়ে গেছে। মায়ার নাম্বারটা ডায়াল করল জয়। রুমের সঙ্গে লাগোয়া ডাইনিং রুম। সেখানে রাখা খাবারের মেনুকার্ডটা থেকে নিজের পছন্দসই খাবারের অর্ডারটা দিল জয়। খাবার আসতে মোটামুটি আধঘণ্টা থেকে চল্লিশমিনিট। সে সময়টুকু জয় রুমের বাইরেটা বসবার জন্য বেরোল। রুম থেকে বেরোতেই সামনের রুমের ট্যুরিস্টটার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল জয়ের। জয়কে দেখে সৌজন্যসুলভ একটা হাসি দিল লোকটা। কিন্তু জয় কোনও সৌজন্য দেখাল না। লোকটার প্রতি অজানা ঘৃণায় তার মন ভরে গেল। অজানা ভয়, অজানা ক্রোধ। কেমন একটা অস্বস্তিতে জয় থাকতে না পেরে রুমের ভেতরে চলে এলো। খাবার আসতে তখনও কিছুটা দেরী আছে। সেই সময়টুকু বিছানায় শুয়ে সে টিভিটা চালিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর তার খাবার চলে এলে খাবার খেয়ে দরজাটা বন্ধ করে একটুখানি শুলো সে। এই নিস্তব্ধ আর আরামদায়ক পরিবেশে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল জয়।
দুটো হরিণ জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পরস্পরের প্রতি সোহাগ প্রকাশ করছে, খেলা করছে। সূর্য অস্ত যেতে আর কিছুক্ষণ। দল থেকে একটু দুরত্বেই আছে সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত এই দুজন। আচমকা একটা শব্দে দুজনেরই কান খাড়া হয়ে উঠল। প্রচণ্ড বেগে ছুট লাগাল দুজনে। কিন্তু হঠাৎই কিছু একটা ওদের গতির চেয়ে বহুগুণ বেয়ে ধেয়ে এসে বিদ্ধ করল ওদের একজনকে। সেই হরিণটা ছিটকে পড়ল মাটিতে। আর ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে উঠে বসল জয়।
ঘাড়ের কাছে যন্ত্রণাটা যেন টাটকা লাগছে এখনও। অনেকদিন পর স্বপ্নটা দেখল সে। আগে ছোটবেলায় এরকম স্বপ্ন দেখত। ঘুম ভেঙে যেত ভয়ে। কিসের ভয় সে বুঝতে পারেনি কোনওদিন, আজও পারল না। কিন্তু সেই ছোটবেলায় ভয়টা মনের গভীর থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য বেরিয়ে এল, এখন আবার মনের গভীরেই চলে গেল। কিন্তু কেমন একটা অস্বস্তি রয়েই গেল। এসির আরামদায়ক পরিবেশেও সে আরাম পাচ্ছে না। পায়ের ওপর থেকে চাদরখানা সরিয়ে ফেলল। নেমে এলো বিছানা থেকে। দরজা খুলে বাইরে যাবার জন্য পা বাড়াতেই আচমকা বুকটা ধড়াস করে উঠল তার।
দরজার সামনেই দাঁড়িয়েছিল মায়া। জয় দরজাটা খুলতেই জিজ্ঞেস করল, “কিছু লাগবে স্যার?”
“না! তুমি এখন?”
“কিছু লাগবে কিনা জানতে এসেছিলুম। ঘুমোচ্ছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“জঙ্গল দেখতে যাবেন না ?”
“হরিণ দেখার তো খুব ইচ্ছে। কিন্তু এত বিকেলে কি যাওয়া ঠিক হবে?”
“এখনও তো বিকেল হয়নি। ”
জয় আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল আলো আছে যথেষ্ট। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল পৌনে চারটে। দুপুরটা সবে পড়েছে।
“ঠিক আছে।” জয় বলল, “কিছু লাগলে আমি ফোন করে নেব।”
“ঠিক আছে স্যার।” মায়া যাবার জন্য পেছন ফিরল। যাবার আগে বলল, “তবে এখন জঙ্গলে গেলে হরিণ ঠিক দেখতে পাবেন স্যার।”
মায়াকে কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে জয়ের। সেই প্রথম দেখা থেকেই। চেনা লাগছে না ভালো লাগছে সেই পার্থক্যটা ধরতে পারল না সে। মায়ার চোখদুটো কেমন যেন মায়াবী, আর হাসিটাও। জয়ের মনে হল কোথাও যেন সে দেখেছে এগুলো। কিন্তু মনে করতে পারল না। তবে এ নিয়ে আর বেশি ভাবনাচিন্তা না করে রুমে তালা লাগিয়ে সে জঙ্গলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। রাস্তার দুধারেই জয়পুরের এই ঘন জঙ্গল। রিসর্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তা পাড় করে জঙ্গলে ঢুকতে হয়, অথবা রিসর্টের পেছন দিক দিয়েও জঙ্গলে প্রবেশ করা যায়। জয় রিসর্টের পেছন দিকটা ধরল।
মাটির রাস্তা ধরে হেঁটে চলল সে। এ রাস্তাটা তার কেমন চেনা লাগছে আজ, অথচ সে কোনোদিন এই দিকে আসেনি। অবশ্য রাস্তাটা চেনা লাগছে না ভালো লাগছে সেই পার্থক্যটা করতে পারল না সে। প্রথম প্রথম দু একজনকে দেখতে পেলেও কিছুক্ষণ পর রাস্তা পুরোই ফাঁকা পেল সে। আসলে সে অনেকটাই ভেতরে চলে এসেছে। চারিদিকে এখন চুপচাপ। চুপচাপ না বলে বলা উচিত রাস্তাঘাট, রিসর্ট, মানুষজনের শব্দগুলো এখানে উধাও হয়ে গিয়ে শুধুই জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ।
জয় মোহিতের মত এগিয়ে চলল জঙ্গলের আরও ভিতরে। দূরে গাছের আড়ালে হরিণের মত প্রাণীটাকে দেখে সেদিকে এগিয়ে গেল সে। চোখের নিমেষেই সেই প্রাণীটা পলাতক। তার পালানোর পায়ের আওয়াজ শুনে জয় তার পিছু নিল, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারল এই ক্ষিপ্রগতির প্রাণীটার সাথে সে পেরে উঠবে না। কিন্তু একটা জেদ, একটা আনন্দ তাকে পেয়ে বসল। এত দূর এসে সে হরিণ না দেখে যাবে না। আবার অদেখা সেই হরিণটার সাথে লুকোচুরি খেলতেও ভালই লাগছে তার। লুকোচ্ছে অবশ্য হরিণটাই। কিন্তু জয়ের কেমন যেন সেটা চেনা চেনা লাগছে। তবে চেনা লাগছে না ভালো লাগছে সেটা অন্যগুলোর মতই বুঝতে পারল না জয়।
আকাশে প্রচণ্ড মেঘের গর্জনে এবার মুখ তুলে চাইল সে। আকাশটা কালো হয়ে আসছে। কিছুটা মেঘের কারণে, বাকিটা সন্ধ্যে হবে বলে। পায়ের কাছে জ্বালা আর হাল্কা ব্যথা করছে। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল, রুমে যে চটিটা ছিল, বিছানা থকে নেমে সেটাই পায়ে গলিয়ে চলে এসেছে। জঙ্গলের বিভিন্ন গাছের কাঁটায় লেগে দুটো পা’ই ছড়ে গিয়ে হাল্কা রক্তারক্তি হয়ে গেছে। ঘুম ভাঙ্গা থেকে তার যেন হুঁশ ছিল না। আকাশে মেঘের গর্জনে তার হুঁশ এলো। কিন্তু হুঁশ ফেরার সাথে সাথেই সে বুঝল মোহিতের মত, অবশের মত রাস্তা না বুঝে, না চিনে সে চলে এসেছে জঙ্গলের অনেকটা ভিতরে। আর ফিরতে গিয়েই বুঝল সে পথ হারিয়েছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান