সববাংলায়

মাকড়শা নিজের জালে আটকায় না কেন

বিভাগঃ ,

ঘরের সিলিঙের কোনায়, জানালার গ্রিলে বা ঘরের আনাচে কানাচেতে মাকড়শার জাল দেখলে ভ্রু কুঞ্চিত হয় না এমন মানুষ বোধ করি পৃথিবীতে নেই। কেউ কেউ তো আবার মাকড়শা দেখলেই ভয় পেয়ে যায় যাকে আরাক্নোফোবিয়া (Arachnophobia) বলে। আসলে মাকড়শা আর্থোপোডা পর্বের আরাকনিডা শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। আরাকনিডা শ্রেণির নাম অনুসারেই রোগটির নাম আরাক্নোফোবিয়া হয়েছে।এই শ্রেণির প্রাণীদের আটটি পা থাকে।কিন্তু অন্যান্য পতঙ্গ শ্রেণির প্রাণীদের মত মাথার দুপাশে কোনো এন্টেনা থাকে না।মাকড়শাকে সুনিপুন ভাবে জাল বুনতে আমরা অনেকেই দেখেছি। আবার এও দেখেছি  মাছি, মথ বা ছোট ছোট কীট পতঙ্গ যখন এই জালের কাছে অনিচ্ছাকৃতভাবে হঠাৎ করে চলে আসে তখন কেমন করে যেন জড়িয়ে যায় জালের ফাঁদে। চালাক মাকড়শা ঠিক তখনি  জালের মধ্যে দিয়ে সাবলীল ভাবে চলে দিব্যি ধরে ফলে তার শিকারটিকে আর মহানন্দে ভোজন পর্বটি সমাপ্ত করে। তারা কিন্তু নিজের জালে তো আটকায় না। মাকড়শা নিজের জালে আটকায় না কেন এই প্রশ্নটির উত্তর পেতে গেলে আমাদের মাকড়শার শারীরিক গঠন সম্বন্ধে একটু জানতে হবে।

মাকড়শা সিল্কগ্ল্যান্ড
চিত্র – ১

মাকড়শার উদর দেশে এক বা একাধিক পরিবর্তিত রেচনত্যাগী গ্রন্থি (Modified Excretory gland) থাকে। এগুলিকে রেশম গ্রন্থি বা সিল্ক গ্ল্যান্ড বলে। এই সিল্ক গ্ল্যান্ডগুলি আবার উদরদেশের নিচের দিকে অবস্থিত স্পিনারেট (Spinneret) নামের এক বিশেষ অংশের সাথে যুক্ত থাকে। প্রত্যেকটি সিল্ক গ্ল্যান্ড ভিন্ন ভিন্ন ধরণের সিল্ক উৎপন্ন করে (চিত্র – ১ দ্রষ্টব্য)। কিছু সিল্ক গ্ল্যান্ড তরল সিল্ক উৎপন্ন করে যা বাতাসের সংস্পর্শে এসে শুষ্ক হয়ে যায় – আবার কিছু সিল্কগ্ল্যান্ড আঠালো সিল্ক উৎপন্ন করে যা নিঃসরণের পরেও আঠালো ও চটচটে থাকে। মাকড়শা প্রত্যেকটি স্পিনারেটকে প্রসারিত করতে পারে,   পিছনের দিকে নিয়ে যেতে পারে, এমনকি সংকুচিত করে চাপ সৃষ্টিও করতে পারে। স্পিনারেটের মাধ্যমে মাকড়শা সিল্ক গ্ল্যান্ড থেকে নির্গত সিল্কগুলিকে সংযুক্ত করে প্রয়োজন অনুসারে সরু সিল্কের সুতো বা মোটা ও  চওড়া সিল্কের ব্যান্ড তৈরী করতে পারে। মাকড়শার সিল্কের স্থিতিস্থাপকতা(Elasticity) বা সম্প্রসারণশীলতা(Tensile Strength) সমওজনের স্টিলের রডের থেকে কয়েকগুন বেশি।

মাকড়শার জালের চটচটে ভাবটি জালের সিল্ক সুতোর ওপর  অবস্থিত আঠার বলগুলির উপস্থিতির জন্য হয়। এই বলগুলি নানা ধরণের কাজ করে। উচ্চ গতিতে কখনো  রাবারের বলের ন্যায় স্থিতিস্থাপক বস্তুর মত, আবার নিম্ন গতিতে সাধারণ চটচটে আঠালো বস্তুর মত এগুলি কাজ করে। জালের মধ্যেকার এই আঠার বলগুলিই মাছি, কীটপতঙ্গকে জালের সাথে আটকে দেয়। তারা আর জাল থেকে বেরোতে পারে না। আঠার বলগুলির মধ্যে নিউরোটক্সিন(Neurotoxin) নামের এক রাসায়নিক পদার্থ থাকে। সম্ভবত এগুলিও জালে আটকে পড়া শিকার গুলিকে নিস্তেজ ও চলচ্ছক্তিহীন করে দেয়। বলগুলির অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল(Antimicrobial) ধর্ম আবার মাকড়শাকে পিঁপড়ে ইত্যাদির আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।  

এবার আমরা জেনে নেব সিল্কের সুতোর মাধ্যমে মাকড়শা জাল বানায় কী করে। জাল বানানোর সময় সে তার প্রয়োজনের দিকগুলি আগে ঠিক করে। অর্থাৎ জালের কোন অংশে আঠা থাকবে আর কোন অংশে আঠা থাকবে না। মাকড়শার জালে সমস্ত অংশটি কিন্তু আঠালো নয়। জালের একদম কেন্দ্রস্থলে যেখানে সাধারণত মাকড়শাটি বিশ্রাম নেয় সেখানে কোনো আঠালো  বস্তু থাকে না।

   

মাকড়শা নিজের জালে আটকায় না কেন » সববাংলায়
চিত্র – ২

 একটু লক্ষ্য করলে  দেখা যায় জালের  প্রথম স্ট্র্যান্ডটি মোটা আঠালো স্তর দিয়ে তৈরি হয়েছে। এই মোটা আঠালো স্তরটির মুক্ত প্রান্তটি বায়ুবাহিত হয়ে একটু দূরবর্তী স্থানে গিয়ে আটকে যায়। অর্থাৎ জাল বোনার একটা ফ্রেম তৈরী তৈরী হয়। এর পর শুরু হয় জালের পরবর্তী স্তরগুলো বোনা।  এই স্তরগুলি কেন্দ্রের স্তরের মতো অতটা আঠালো হয় না।  এগুলি শুষ্ক সিল্ক দিয়ে তৈরী।  পরবর্তী ধাপে শুরু হয় জালের একদম বাইরের অংশ বোনার কাজ।  এর জন্য সে আগের বোনা কয়েকটি স্তর খেয়ে ফেলে এবং তার জায়গায় নতুন আঠালো স্তর বোনে। যে সব মাকড়শা জাল বোনে তাদের পায়ের নিচের দিকে কাঁটার মতো অংশ থাকে।  এই কাঁটাগুলি ফ্রিকশনাল এরিয়া (Frictional Area) ন্যূনতম করে সিল্কের সুতোর ওপর অনায়াসে হেঁটে যেতে তাদের সাহায্য করে। 

কিন্তু জালে জড়িয়ে পড়া শিকারগুলির শরীরের পুরো অংশটাই জালের আঠায় আটকে যায় উদ্ধার পাবার কোনো  উপায়ই থাকে না।

অনেকে মনে করেন মাকড়শার শরীর থেকে নিঃসৃত একপ্রকার অতৈলাক্ত পদার্থ এদের জালের মধ্যে দিয়ে চলতে সাহায্য করে। যদিও বা কোনো ভাবে এরা  জালে জড়িয়ে যায়, তাহলে ওই অংশটি খেয়ে ফেলে তারা নিজেদের মুক্ত করে নেয়।

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা গেল মাকড়শা নিজের জালে আটকায় না কেন। আর্থোপোডা পর্বের  এই নিম্নশ্রেণীর প্রাণীটির  কী অসীম দক্ষতায় জাল বোনে যা বৈজ্ঞানিক পন্থা, অসামান্য কারিগরি কুশলতা ছাড়া সম্ভব নয়। এই জাল যেমন সুকৌশলে শিকার ধরতে সাহায্য তাকে সাহায্য করছে তেমনই আবার  তার আত্মরক্ষার পুরো ব্যবস্থা করছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।