সববাংলায়

কোচবিহার রাজবাড়ি ভ্রমণ

পাহাড়, নদী, অরণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থানে ভ্রমণ করতেও পছন্দ করেন মানুষ। ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলির সম্মুখীন হয়ে, সংরক্ষণ করা পুরোনো দিনের নানা জিনিস স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে যে রোমাঞ্চ অনুভব করা যায়, তার স্বাদই আলাদা। ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে, ঘুরে দেখতে যারা পছন্দ করেন তাঁদের জন্য কোচবিহার রাজবাড়ি (Cooch Behar Palace) অবশ্যই একটি উপযুক্ত স্থান হবে।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে নির্মিত এই রাজবাড়িতে ড্রেসিং রুম, বিলিয়ার্ড রুম, কিচেন, শয়নকক্ষ-সহ ৫০-এর বেশি কক্ষ রয়েছে। এছাড়াও একাধিক সুন্দর তোরণযুক্ত বারান্দা, ইতালীয় রেনেসাঁর ঘরানার স্থাপত্য, এখানকার মিউজিয়ামে সংরক্ষিত পুরাতন ঐতিহাসিক নানা জিনিস, পরিচ্ছন্ন সবুজ বাগান – এইসব মিলিয়ে কোচবিহার রাজবাড়ি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এক কথায় অসাধারণ। ইত্যাদি দেখবার মতো এবং উপভোগ করবার মতো অনেক কিছুই রয়েছে এই রাজবাড়িতে। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এই রাজবাড়ি একটি উপযুক্ত ভ্রমণস্থল হতে পারে।

কোচবিহার রাজবাড়ি কোথায়

জলপাইগুড়ি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত পশ্চিমবঙ্গের উত্তর-পূর্বদিকের জেলা কোচবিহারের কেশব রোডে সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাসের কাছে কোচবিহার রাজবাড়ি অবস্থিত। কোচবিহার জেলাটি দক্ষিণ ও পশ্চিমে জলপাইগুড়ি, আসাম এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দ্বারা বেষ্টিত। জলপাইগুড়ি থেকে কোচবিহারের দূরত্ব প্রায় ১৩৬ কিলোমিটার এবং কলকাতা থেকে কোচবিহারের দূরত্ব প্রায় ৭০৮ কিলোমিটার।

কোচবিহার রাজবাড়ির ইতিহাস

কোচবিহার রাজবাড়িটি কোচ রাজবংশের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণের শাসনামলে ১৮৮৭ সালে তৈরি হয়েছিল। এই প্রাসাদটি ভিক্টর জুবিলি প্যালেস নামেও পরিচিত। এই রাজবাড়িতে ইতালীয় রেনেসাঁর স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণ লক্ষ করা যায়। এমনকি লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে এই রাজবাড়ির সাদৃশ্যও লক্ষিত হয়। এছাড়াও মাগার প্রাসাদের প্রবেশদ্বারটি রোমের সেন্ট পিটার চার্চের অনুরূপ। কোচবিহার রাজবাড়িটি দ্বিতলবিশিষ্ট একটি প্রাসাদ, তবে ১৮৯৭ সালে আসাম ভূমিকম্পের কারণে তৃতীয়তলটি আর অবশিষ্ট নেই।

রাজবাড়ির ভিতরে ঢুকলে চোখ আর মন একসঙ্গে ধাঁধিয়ে যায়। সুদৃশ্য স্থাপত্য ও ভাস্কর্যখচিত হলঘর ছাড়াও শয়নকক্ষ, স্নানঘর, নাচঘর, বৈঠকখানা, অতিথিশালা, ভোজনকক্ষ, গ্রন্থাগার সব মিলিয়ে সে এক এলাহি ব্যাপার। এই রাজবাড়িটি ৫১,৩০৯ বর্গফুট এলাকার জুড়ে নির্মিত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় গুরুত্বের স্মৃতিস্তম্ভের তালিকা অনুসারে কোচবিহার প্রাসাদ একটি এএসআই (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া) তালিকাভুক্ত স্মৃতিস্তম্ভ। রাজবাড়ির শেষ মহারাজার মৃত্যুর পর এটি এএসআই-এর অধীনস্থ হয়।

কোচবিহার রাজবাড়ি
কোচবিহার রাজবাড়ি। ছবি ইন্টারনেট

ঐতিহাসিক নিদর্শনকে চোখের সামনে দেখলে প্রাচীন ইতিহাসের যে-স্পর্শ, যে অনুভূতি লাভ করা যায় তা রোমাঞ্চকর তো বটেই এবং মুখে বলে বা লিখে বোঝানো তা সম্ভব নয়। কোচবিহার রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িত ইতিহাসকে অনুভব করবার পাশাপাশি  রাজবংশের জীবনযাপনের নিদর্শন সচক্ষে প্রত্যক্ষ করবার সুযোগ পাওয়া যাবে এখানে। ভিতরে ঢুকে যখন একে একে দরবার কক্ষ, রাজাদের শয়নকক্ষ, স্নানঘর, নাচঘর, বিলিয়ার্ড খেলবার ঘর, ভোজনকক্ষ, অতিথিশালা, গ্রন্থাগার ইত্যাদি দেখবেন পর্যটকরা, তাঁরা মুগ্ধ তো হবেনই, সেই সঙ্গে প্রাচীন বাংলার এই রাজবংশের জাঁকজমক ও সমৃদ্ধির ছবিটিও তাঁদের চোখে স্পষ্টভাবে ধরা দেবে।

এছাড়াও কোচবিহার রাজবাড়ি চত্বরের মিউজিয়ামটিও অবশ্য দ্রষ্টব্য এক স্থান। কোচ রাজবংশের রাজাদের ব্যবহৃত প্রাচীন ও দুর্মূল্য জিনিসপত্রের সম্ভারে মিউজিয়ামটি সমৃদ্ধ। রাজবাড়ির চত্বরটিও ঘুরে বেড়ানোর জন্য খুবই উপযুক্ত এবং মনোরম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাগান যেমন গড়ে তোলা হয়েছে, তেমনি সবুজ ঘাসের গালিচা দিয়ে হেঁটে চত্বরটি ঘুরে বেড়াতেও মন্দ লাগবে না। এছাড়াও সন্ধেবেলায় যে স্পেশাল লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-এর ব্যবস্থা করা হয় সেটিও ছোটদের তো বটেই, বড়োদের জন্যেও খুবই উপভোগ্য। সব মিলিয়ে কোচবিহার রাজবাড়ি ছুটির অবসর কাটানোর জন্য একটি উপযুক্ত ভ্রমণস্থল হতে পারে।

কোচবিহার রাজবাড়ি কীভাবে যাবেন

ট্রেনে করে কোচবিহার রাজবাড়ি যেতে হলে হাওড়া কিংবা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে এমনকি কলকাতা ও সাঁতরাগাছি স্টেশন থেকেও নিউ কোচবিহার স্টেশন পর্যন্ত যাওয়ার ট্রেন পাওয়া যাবে। এছাড়াও নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকেও কোচবিহারের অনেক ট্রেন পাওয়া যাবে। সড়কপথে বাসে করে যেতে হলে কলকাতার ধর্মতলা বাস টার্মিনাস থেকে সরাসরি কোচবিহারে যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে, এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যটন বাস পরিষেবাও রয়েছে। প্রাইভেট গাড়িতে যেতে হলে ন্যাশানাল হাইওয়ে ১২ এবং ২৭ ধরে যেতে হবে। বিমানে করে যেতে হলে কোচবিহার এয়ারপোর্টে নেমে সেখান থেকে রাজবাড়ি যেতে হবে। এছাড়াও বাগডোগরা বিমানবন্দরে নেমে সেখান থেকেও গাড়ি করে যাওয়া যায় কোচবিহার।

কোচবিহার রাজবাড়িতে কোথায় থাকবেন

কোচবিহার যেহেতু পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয় সেই কারণে এখানে থাকবার জন্য মনমতো এবং বাজেট অনুযায়ী হোটেল পেতে খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কোচবিহার রাজবাড়ির আশেপাশে থাকতে চাইলেও প্রচুর হোটেল পাওয়া যাবে। সেখানে যেমন ৫০০টাকার কমেও হোটেল পাওয়া সম্ভব তেমনি ২০০০ টাকার বেশি দামেরও হোটেল সহজেই পেয়ে যাবেন পর্যটকেরা। রাজবাড়ির নিকটবর্তী অঞ্চলে হোটেল নিলে ঘুরতেও সুবিধা হতে পারে।

কোচবিহার রাজবাড়িতে কী দেখবেন

কোচবিহার রাজবাড়ির মূল আকর্ষণ এর ভিতরে ও বাইরে সর্বত্রই ছড়ানো রয়েছে। প্রথমত বলে রাখা দরকার যে, এই প্রাসাদে ঢুকতে গেলে ভারতীয়দের জন্য প্রবেশমূল্য ২৫ টাকা। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সাইটের থেকে অনলাইনে টিকিট কাটলে মূল্য ২০ টাকা। টিকিট কাটার সময় ভিজিট টাইম ভালো করে দেখবেন। আপনি যে সময়ে যেতে চাইছেন সেই সময়ের টিকিট নিচ্ছেন কিনা দেখে নেবেন। প্রাসাদটি প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে।

রাজপ্রাসাদ

কোচবিহার রাজবাড়িটিকে ভাল করে দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায় এবং মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। প্রথমত এই রাজবাড়িটিতে পাশ্চাত্য ঘরানার বিশেষত ইতালীয় রেনেসাঁর স্থাপত্যশৈলীর যে অসাধারণ নিদর্শন রয়েছে তা দেখবার মতো। প্রাসাদের প্রধান প্রবেশদ্বারটি রোমের সেন্ট পিটার চার্চেরই প্রায় অনুরূপ। এছাড়াও প্রাসাদের দেওয়ালে, কক্ষে, ছাদে সর্বত্রই বহু সুন্দর চিত্রকর্ম পরিলক্ষিত হয়। একটি বারান্দা দিয়ে যখন দরবার হলে গিয়ে উপস্থিত হওয়া যাবে তখন আরও বেশি মুগ্ধ হওয়ার পালা। এই দরবার হলের উপরে প্রায় ১২৪ ফুট উঁচুতে একটি সুন্দর ধাতব গম্বুজ রয়েছে। এটিই ইতালীয় রেনেসাঁর স্থাপত্যের কথা বিশেষভাবে মনে করায়। সেই গম্বুজকে ঘিরে বেশ কয়েকটি ছোট ও সুন্দর বারান্দাও দেখা যায়।

এছাড়াও একাধিক সুন্দর তোরণযুক্ত বারান্দাও প্রত্যক্ষ করা যাবে। এছাড়াও প্রায় ৫০টি কক্ষ আছে রাজবাড়িতে, যার মধ্যে রয়েছে, ড্রেসিং রুম, ডাইনিং হল, শয়নকক্ষ, নাচের ঘর, রান্নাঘর, বিলিয়ার্ড রুম, তোষা খানা বা ট্রেজার রুম, মহিলাদের গ্যালারি এবং লাইব্রেরি। বাইরে থেকে প্রাসাদের ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে কিন্তু মূল ভবনের ভিতরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ, এই ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, ধরা পড়লে জরিমানা হতে পারে।

রাজবাড়ির মিউজিয়াম

রাজপ্রাসাদটি ভাল করে ঘুরে নেওয়ার পরে অবশ্যই রাজবাড়ির মিউজিয়ামটিতেও যেতে হবে। সেই মিউজিয়ামে কোচ রাজবংশের রাজাদের ব্যবহৃত উপকরণ ছাড়াও রয়েছে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্রও। সেই অস্ত্রের সংগ্রহটি দেখবার মতো এক জিনিস। এছাড়াও মিউজিয়ামে প্রাচীন জিনিসপত্র, তৈলচিত্র, তীর ছাড়াও বেলেপাথর, কোদাল এমনকি পোড়ামাটির মূর্তি পর্যন্ত রয়েছে। বলে রাখা দরকার যে, মিউজিয়ামটি কেবল শুক্রবার বন্ধ থাকে।

প্রাসাদ চত্বর

কোচবিহার রাজপ্রাসাদ বিশাল এক চত্বরের মাঝে অবস্থিত। প্রাসাদের বাইরের এই বিপুলায়তনের জায়গা খুবই পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে। সবুজ মোলায়েম ঘাসের গালিচা বিছানো রয়েছে সর্বত্র। এছাড়াও একটি বাগানও রয়েছে যেটিকে খুব যত্নসহকারে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করা হয়। তার নিকটে একটি পুস্করিণীও দেখা যায়।

লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো

যদি কেউ শুক্রবার কিংবা শনিবার প্রাসাদ চত্বরে বেড়াতে যান তাহলে সন্ধে ছটা থেকে আটটা পর্যন্ত চলা লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-টি একটি উপরিপাওনা হতে পারে।

কোচবিহার রাজবাড়ি ছাড়াও এর আশেপাশে আরও উল্লেখযোগ্য যেসব দর্শনীয় স্থান রয়েছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: মদনমোহন মন্দির, বানেশ্বর শিবমন্দির, রসিক বিল, মহারাজা এনএন পার্ক, মধুপুর সাতরা ইত্যাদি।

কোচবিহার রাজবাড়িতে কখন যাবেন

সারা বছরই প্রায় কোচবিহার রাজবাড়িতে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। তবে গ্রীষ্মে প্রচন্ড গরমে এবং বর্ষায় ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ভ্রমণ আরামদায়ক নাও হতে পারে, তাই রাজবাড়ি ভ্রমণের সর্বোত্তম সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে কারণ এই সময় আবহাওয়া মনোরম থাকে।

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • প্রাসাদ চত্বরে কোনোরকম খাদ্যসামগ্রী নিয়ে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ, অন্যথায় জরিমানা হতে পারে।
  • বাইরে থেকে প্রাসাদের ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে কিন্তু মূল ভবনের ভিতরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ, এই ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, ধরা পড়লে জরিমানা হতে পারে।
  • আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সাইটের থেকে অনলাইনে টিকিট কাটার সময় ভিজিট টাইম ভাল করে দেখবেন। আপনি যে সময়ে যেতে চাইছেন সেই সময়ের টিকিট নিচ্ছেন কিনা দেখে নেবেন।
  • প্রবেশের পর থেকে মাত্র তিন ঘণ্টা টিকিটের বৈধতা।
  • একটি সরকারী পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখবেন।
  • প্রাসাদটি সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading