কিংবদন্তি সুরকার ও গীতিকার অমর সিং চমকিলা পাঞ্জাবি গানকে যেমন সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন তেমনই তাকে বিশ্বের দরবারে হাজির করেছিলেন। তাঁর গানের ভাষা ছিল প্রাণবন্ত এবং তাতে সমাজের অন্ধকার দিকগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসত। টুম্বি নামক পাঞ্জাবি লোক ঘরানার বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে তাঁর সেইসব উচ্চকন্ঠের গান আজও মানুষের হৃদয়ে রয়ে গেছে। তাঁকে ‘পাঞ্জাবের এলভিস’ বলা হয়ে থাকে। এমনই একজন জনপ্রিয় শিল্পীকে হত্যা করা হয়েছিল মাত্র ২৬ বছর বয়সে। কে বা কারা এই হত্যা করেছিল, কীই বা ছিল এই হত্যার উদ্দেশ্য তা এখনও অজানা, অমর সিং চমকিলা মৃত্যুরহস্য (Amar Sing Chamkila Death Mystery) আজও অমীমাংসিত হয়েই রয়ে গেছে। অনেকে মনে করেন এ-কাজ খালিস্তানি জঙ্গীদের কেউ আবার অন্যরকম তত্ত্বও উপস্থাপিত করে থাকেন। পরবর্তীকালে চমকিলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাঁর সেক্রেটারি অনেকেই এই হত্যা নিয়ে নানারকম কথা বলেছেন। কেরিয়ারের একেবারে মধ্যগগনে থাকা উজ্জ্বল এই জ্যোতিষ্কের এমনই আচমকা নিভে যাওয়া পাঞ্জাবি সঙ্গীতের এক অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছিল।
১৯৮৮ সালের ৮ মার্চ পাঞ্জাবের জলন্ধর জেলার একটি গ্রাম মেহসামপুরে এক আখড়ায় গানের একটা অনুষ্ঠান করতে এসে মাত্র ২৬ বছর বয়সে আততায়ীদের হাতে নিহত হয়েছিলেন অমর সিং চমকিলা। আনুমানিক দুপুর ২টো নাগাদ এই হত্যাকান্ড ঘটেছিল। অমর সিং-এর সঙ্গে ছিলেন একাধারে তাঁরই সহশিল্পী এবং স্ত্রী অমরজোত এবং দুইজন ব্যান্ডের শিল্পী। অনুষ্ঠানস্থলে এসে গাড়ি থেকে নামবার সময় এই ঘটনা ঘটেছিল। তিনজন মুখোশধারী আততায়ী এসে তাঁদের উপর মারাত্মকভাবে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায় এবং মোটরবাইকে করে পালিয়ে যায়। সেই গুলিতেই বিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় অমর সিং চমকিলা ও অমরজোত-সহ মোট চারজনের। অন্য কয়েকজন গুরুতরভাবে আহত হন। এই আততায়ী আসলে কারা ছিল তা আজও এক রহস্যের ব্যাপার হয়ে রয়েছে।
অমর সিং-এর প্রাক্তন সেক্রেটারি মানকু যিনি হত্যাকান্ডের দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, তিনি পরবর্তীকালে সেই দিনের ঘটনা আরও বিশদে শুনিয়েছিলেন। চমকিলাকে তাঁর সেই অনুষ্ঠানটির জন্য ৮০০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠান শুরুর আগে অমর সিং এবং তাঁর স্ত্রী অমরজোত মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নিতে চেয়েছিলেন। মানকু তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করে নিকটেই অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে মঞ্চে সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখতে চলে যান। মাইক্রোফোন ঠিক রয়েছে কিনা দেখে নিয়ে এবং দর্শকদের অভিবাদন এবং স্বাগত জানিয়ে তিনি অমর সিংদের গিয়ে জানিয়েছিলেন সব প্রস্তুত। মানকু বলেন আততায়ীরা ভিড়ের মধ্যেই নাকি অপেক্ষা করে ছিল। অমর সিং-এর গাড়ি যখন এসে দাঁড়িয়েছিল অনুষ্ঠানস্থলে, মানকু মাইকে তখন অমর সিং-দের স্বাগত জানাচ্ছেন এবং ঠিক সেই সময়তেই বন্দুক গর্জন করে ওঠে। মানকু কিছুপরেই লক্ষ করেছিল গাড়ির সামনে কেউ একজন পড়ে আছে। মঞ্চ থেকে নামবার পর মানকুকে কোন একজন মহিলা বলেছিল, তিনি দেখেছেন তিনজন লোক ভাংড়া নাচছিল এবং নাচতে নাচতে চমকিলার বুকের ওপরে একটি চিঠি রেখে দিয়েছিল। আততায়ীরা পরে মোটরবাইকে করে পলায়ন করে। অমর সিং-এর ঢোলক বাদক লাল চাঁদও সেই হত্যাকান্ডের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন যিনি নিজেও গুলিতে আহত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত কোন খুনিকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি।
অধিকাংশ মানুষই বলে থাকেন সেই আততায়ীরা খালিস্তানি জঙ্গী ছাড়া কেউ নয়। এই খালিস্তানি বা শিখ জঙ্গীরা স্থানীয় ভাষায় ‘খরকু’ নামে পরিচিত ছিল। তাদের দীর্ঘসময়ব্যাপী সংগ্রাম ও আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে একটি সার্বভৌম শিখ রাষ্ট্র (খালসা) প্রতিষ্ঠা করা। তাঁরা সাধারণ শিখ জনতার সমর্থন পেয়েছিল এবং এই খরকু আন্দোলন পাঞ্জাবের গ্রামীণ এলাকায় বিশেষভাবে শক্তিশালী ছিল। খালিস্তান নামক শিখদের জন্য একটি পৃথক সার্বভৌম আবাসভূমির জন্য এই যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন তা ছিল চরমপন্থারই নিদর্শন। এই খালিস্তানিদের সেই কারণে জঙ্গী হিসেবেই চিহ্নিত করেছিল প্রশাসন। এই জঙ্গীদের হাতেই অমর সিং চমকিলা নিহত হয়েছিলেন বলে অনেকের মত। চমকিলার গানে অশ্লীল সব প্রসঙ্গ রয়েছে এই কারণেই তিনি খালিস্তানিদের টার্গেট হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। অথচ তাঁর গানের তথাকথিত অশ্লীল সব প্রসঙ্গগুলি আদতে পাঞ্জাবের সেই সময়কার সামাজিক জীবনকেই তুলে ধরেছিল। চমকিলার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্বর্ণ্ সিভিয়া প্রকাশ করেছিলেন যে, অমর সিং-এর বিতর্কিত গানের ফলেই তিনটি খালিস্তানি জঙ্গী সংগঠন তাঁকে টার্গেট করেছিল। এমনকি এই সিভিয়া মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চমকিলা এবং পাঁচজন প্রতিনিধিস্থানীয় খালিস্তানি নেতার মধ্যে অমৃতসরের দরবার সাহেবে একটি মিটিং-এরও সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেখানে চমকিলা তাদের সামনে ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং নিজের গানের থিম পরিবর্তন করবেন বলে নাকি প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। যদিও এই হত্যাকান্ডের পিছনে খালিস্তানিরাই রয়েছে বলে সন্দেহ করেন সিভিয়া এবং বলেছেন তিনি সারা জীবন ধরে তদন্ত চালিয়ে গেছেন যে কে রয়েছে এই হত্যাকান্ডের নেপথ্যে।
অমর সিং চমকিলার সঙ্গে তাঁর প্রথম এবং বেশিরভাগ অ্যালবামেই কাজ করা সঙ্গীত সুরকার চরণজিৎ আহুজা জানিয়েছিলেন যে, নিয়মিত হুমকি পেতেন অমর সিং। এমনকি ক্রমাগত হুমকি পাওয়ার ফলে ১৯৮৬ সালে দুই মাস তিনি দিল্লিতে চরণজিৎ-এর সঙ্গে ছিলেন। যদিও সাহসেরও কমতি ছিল না তাঁর। আহুজা জানিয়েছেন, জীবনের জন্য ভয় পেলেও পালিয়ে যেতে কমই দেখা গেছে তাঁকে।
খালিস্তানি জঙ্গীদের দ্বারা হত্যার তত্ত্বটি ছাড়াও আরও যে একটি তত্ত্ব অনেকে উপস্থাপন করে থাকেন তা হল, অমর সিং চমকিলার সঙ্গীত জগতের প্রতিদ্বন্দ্বীরাও হয়তো এই হত্যাকান্ডের নেপথ্যের মূল ষড়যন্ত্রী হতে পারেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে এমন তুমুল জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে যাওয়া অমর সিং-এর যে সঙ্গীত জগতেই অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হবে এবং যথেষ্ট হিংসার পাত্র যে তিনি হয়ে উঠবেন তা খুবই স্বাভাবিক ছিল। অনেকে সেই প্রসঙ্গটিকেই এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চেয়েছেন। যদিও খালিস্তানি শিখ জঙ্গীদের দ্বারা হত্যার তত্ত্বটিকেই অধিক মান্যতা দেওয়া হয়ে থাকে।
পরিচালক কবীর সিং চৌধুরী এবং লেখক অক্ষয় সিং অমর সিং চমকিলা মৃত্যুরহস্য নিয়ে প্রায় বছরখানেক গবেষণা করেছিলেন। শেষপর্যন্ত ২০১৮ সালে ‘মেহসামপুর’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়াও ‘২২ চমকিলা ফরএভার’, ‘চমক’, ‘চমকিলা’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে অমর সিং চমকিলার জীবনকে কেন্দ্র করে, কিন্তু তাঁর মৃত্যুরহস্য আজও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান