ভূগোল

বান্দরবান জেলা

বাংলাদেশ ৬৪টি জেলাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল বান্দরবান (Bandarban)।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি পার্বত্য জেলা বান্দরবান। বান্দরবান বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড়ে ঘেরা ছবির মত এক অপরূপ পটভূমি। দেশের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং এবং বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং এই জেলাতেই অবস্থিত। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী জেলা এই বান্দরবান।

১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ হওয়ার পর ১৯৫১ সালে পুর্ব পাকিস্তানের মহকুমার মর্যাদা পায় বান্দরবান জেলা। সেই সময় এই জেলা রাঙ্গামাটি জেলার প্রশাসনিক ইউনিট ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর সমগ্র বান্দরবান জেলা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। মার্মা ভাষায় বান্দরবানের প্রকৃত নাম “রদ ক্যওচি ম্রো”।

এই জেলার উত্তরে রাঙ্গামাটি জেলা, দক্ষিণে আরাকান (মায়ানমার), পূর্বে ভারত এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা অবস্থিত। এই জেলায় অবস্থিত পর্বত শ্রেণীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মিরিঞ্জা, ওয়ালটং,তামবাং এবং পলিতাই। সাঙ্গু, মাতামুহুরী এবং বাঁকখালী এই জেলার উল্লেখযোগ্য নদী। সাঙ্গু এখানকার প্রধান নদী। জেলার জীবন-জীবিকার সঙ্গে সাঙ্গু নদী অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

আয়তনের বিচারে বান্দরবান জেলাটি প্রায় ৪৪৭৯.০৩ বর্গ কিলোমিটার স্থানজুড়ে অবস্থিত। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার বিচারে বান্দারবান জেলা সমগ্র বাংলাদেশে চৌষট্টিতম জনবহুল জেলা। এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ৩,৮৮,৩৩৫ জন। এই জেলায় মারমা, চাকমা, মুরং, ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি, বোম, খেয়াং, চাক, পাংখো, ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি,ও তংচংগ্যা সহ মোট ১১টি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে যাদের মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠ সম্প্রদায় মারমা। এঁদের সংখ্যা প্রায় ৭৫,৮৮০জন। ১৫১৮ সালের বাংলাদেশ ভ্রমণকারী পর্তুগীজ বনিকের বর্ণনাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলা ভাষাভাষীদের বসবাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বর্তমানে এই জেলায় ৪৭% উপজাতি জনগোষ্ঠী এবং ৫৩% অ-উপজাতি জনগোষ্ঠীর বসবাস করছে।

বান্দরবান জেলার নামকরণ সম্পর্কে প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে এই অঞ্চলে একসময় বাঁদরদের আধিক্য ছিল যারা শহরের প্রবেশ মুখে ছড়ার পাড়ে পাহাড়ে নুন খেতে আসত। অবিরাম বৃষ্টির ফলে ছড়ার জল বৃদ্ধি পেলে বাঁদররা ছড়া পেরিয়ে পাহাড় যাওয়ার জন্য একে অপরকে ধরে ধরে সারিবদ্ধভাবে ছড়া পার হয়। বাঁদরদের ছড়া পারাপারের এই দৃশ্য স্থানীয় মানুষের নজরে এলে ছড়াটি’ ম্যাঅকছি ছড়া’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। মার্মা ভাষায় ‘ম্যাঅক’ মানে বাঁদর আর ‘ছি’ অর্থে ‘বাঁধ’ বোঝায়। পরবর্তী সময়ে বাংলা উচ্চারণে এই নাম পরিবর্তিত হয়ে বান্দরবান নাম হয়। বর্তমানে সরকারি দলিল পত্রে বান্দরবান হিসাবেই এই জেলার নাম লেখা আছে।

১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়; যথা – চাকমা সার্কেল, মং সার্কেল, এবং বোমাং সার্কেল। প্রত্যেক সার্কেলের জন্য একজন সার্কেল চীফ নিযুক্ত হন। বান্দরবান সেই সময়ে বোমাং সার্কেলের অর্ন্তভুক্ত ছিল। বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার কারণে এই জেলার আদি নাম ছিল বোমাং থং। এই জেলা ১৯৫১ সালে মহকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় যা সেই সময়ে রাঙ্গামাটি জেলার প্রশাসনিক ইউনিট ছিল। পরর্বতীকালে ১৯৮১ সালের ১৮ এপ্রিল তৎকালীন লামা মহকুমার ভৌগলিক ও প্রশাসনিক সীমানাসহ সাতটি উপজেলার সমন্বয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। বান্দরবান জেলায় মোট ৭টি উপজেলা রয়েছে যথা- আলীকদম, থানচি,নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি এবং লামা।

বান্দরবান জেলায় সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাভাষাই প্রচলিত। স্থানীয় বাঙালিরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। এছাড়াও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে এখানে মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, লুসাই, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, খেয়াং, খুমী, পাংখুয়া ইত্যাদি প্রচলিত।

এই জেলার ভ্রমণ উপযোগী স্থানের মধ্যে নীলাচল সর্বপ্রধান বলা যেতে পারে। নীলাচলকে ‘বাংলাদেশের দার্জিলিং’ বলা হয়। এছাড়া বালাঘাটায় অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দির যেখানে “বুদ্ধ ধাতু জাদি” নামে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৌদ্ধ মুর্তিটি অবস্থিত। বম ও ম্রো উপজাতীদের গ্রাম, জীবননগর কিয়াচলং বগা ও প্রান্তিক হ্রদ এখানকার মনোরম দর্শনীয় স্থানগুলির অন্যতম। এছাড়া জাদিপাড়ার রাজবিহার ও উজানীপাড়ার বিহার, মেঘলা সাফারী পার্ক যেখানে রয়েছে দুটি সম্পূর্ণ ঝুলন্ত সেতু, শৈল প্রপাত,বাকলাই, চিনরি ঝিরি প্রভৃতি পাহাড়ি ঝর্ণা এবং বাংলাদেশের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং এবং বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং এখানকার অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান।

বীর বিক্রম ইউ. কে. চিং এই জেলার বিখ্যাত ভূমিসন্তানদের মধ্যে অন্যতম। তিনি বাংলাদেশের একমাত্র উপজাতি খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। এছাড়া বাঙালি গনিতবিদ বিভূতিভূষণ সেন এই জেলারই সন্তান।

এই জেলার উপজাতিদের ঐতিহ্যবাহী খাবার মুন্ডি। নুডলসের মতো এই খাবার বান্দরবান শহরের বেশ কয়েকটি স্থানে পাওয়া যায়। হিল জুস ও তামাকের জন্যও এই জেলা বিখ্যাত। এখানকার স্থানীয় উৎসব বলতে মারমাদের বর্ষবরণ উৎসব ‘সাংগ্রাই’ বিখ্যাত। এছাড়া ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে বা প্রবারণা পূর্ণিমা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, দুর্গা পূজাও এখানকার অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। প্রাচীন রাজ প্রথা ও রাজ পূণ্যাহ্ অনুষ্ঠান এখনো এ জেলাতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন