সববাংলায়

ডেভিড লিভিংস্টোন

ডেভিড লিভিংস্টোন (David Livingstone) একজন স্কটিশ চিকিৎসক, লন্ডন মিশনারি সোসাইটির অন্যতম ধর্মপ্রচারক যিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর আফ্রিকা অভিযানের জন্য। ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত, জাম্বেসি নদী, নাসায়া হ্রদ প্রভৃতির খোঁজ তাঁর হাত ধরেই সারা বিশ্ব জানতে পারে। 

১৮১৩ সালের ১৯ মার্চ স্কটল্যান্ডের ছোট্ট শহর ব্লানটায়ারে ডেভিড লিভিংস্টোনের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নীল লিভিংস্টোন এবং মায়ের নাম অ্যাগনেস হান্টার। নীল লিভিংস্টোন খ্রিস্টীয় ‘সান্ডে স্কুল’- এ শিক্ষকতা করতেন এবং পাশাপাশি মিশনারির কাজও করতেন। এছাড়াও তাঁর ছিল খুচরো চায়ের ব্যবসা। সাত ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন ডেভিড লিভিংস্টোন। তাঁর স্ত্রীর নাম মেরী মোফাত। তাঁদের ছয় সন্তান ছিল।

গ্রামের স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করলেও মাত্র দশ বছর বয়স থেকেই সাংসারিক প্রয়োজনে স্থানীয় কাপড় মিলে কর্মজীবন শুরু করেন লিভিংস্টোন। বারো ঘন্টা কঠোর পরিশ্রম শেষে রাতে স্কুলের পড়া পড়তেন তিনি।

তাঁর যখন একুশ বছর বয়স তাঁর বাবার আনা একটি প্রচারপত্র দেখে লিভিংস্টোন জানতে পারেন বিখ্যাত খ্রিস্টীয় ধর্মপ্রচারক কার্ল গুস্তাভ মিশনারী কাজের জন্য চীন যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে গুস্তাভ প্রস্তাব দেন যে সকল মিশনারী তাঁর সাথে কাজ করতে রাজি হবেন তাঁদের চিকিৎসক হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বাবার চাপে এক প্রকার বাধ্য হয়েই লিভিংস্টোন ১৮৩৬ সালে মেডিসিন ও রসায়ন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য অ্যান্ডারসন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

১৮৩৭ সালে মিশনারী কাজের সবথেকে বড় প্রতিষ্ঠান লন্ডন মিশনারী সোসাইটিতে কাজ করতে চেয়ে আবেদন করেন লিভিংস্টোন। বেশ কয়েকবার প্রত্যাখ্যানের পর ১৮৩৯ সালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার অনুমতি পান। মিশনারী কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল জ্ঞান লাভের জন্য তিনি চারিং ক্রস হাসপাতাল মেডিক্যাল স্কুলে উদ্ভিদবিদ্যা (Botany) এবং ধাত্রীবিদ্যা (midwifery) নিয়ে ভর্তি হন। ১৮৪০ সালে তিনি এখান থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র পাস করেন। 

লন্ডন মিশনারী সোসাইটি থেকে তাঁকে চীনে পাঠানোর কথা হলেও ব্রিটেন এবং চীনের মধ্যে প্রথম আফিম যুদ্ধ শুরু হওয়ায় লিভিংস্টোনের চীন ভ্রমণ বাতিল হয়। শেষ পর্যন্ত রবার্ট মোফাত নামের এক স্কটিশ মিশনারী তাঁকে আফ্রিকাতে কাজ করার প্রস্তাব দিলে লিভিংস্টোন সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। অবশেষে ১৮৪০ সালের শেষের দিকে আফ্রিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে ১৯৪১ সালের মার্চ মাসে তিনি কেপটাউন বন্দরে পৌঁছান। এখানে কিছু দিন কাটিয়ে তিনি পৌঁছান বেচুয়ানাল্যান্ডের কুরুমান নামক স্থানে। ধর্মপ্রচারের সাথে সাথে চিকিৎসা পরিষেবাও দিতে থাকেন তিনি এখানে। ক্রমে লিভিংস্টোনের মনে আফ্রিকার আরও প্রত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলগুলিতে যাওয়ার ইচ্ছে জাগে। রবার্ট মোফাতের থেকে লিভিংস্টোন জানতে পারেন  দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর পশ্চিমে মাবৎসা ( Mabotsa) গ্রামে মোফাতের একটি আশ্রম আছে।  এই গ্রামটি সিংহের আক্রমণে জর্জরিত।  তিনি ঠিক করেন এই গ্রামেই অভিযানে যাবেন।  গ্রামে পৌঁছে লিভিংস্টোন সিংহ শিকারের উদ্দেশ্যে গ্রামবাসীদের উদ্বুদ্ধ ও একত্রিত করার চেষ্টা করেন। অবশেষে সিংহ শিকারের উদ্দেশ্যে তাঁরা জঙ্গলে প্রবেশ করেন এবং কিছুদূর যাওয়ার পর দেখেন একটি টিলার ওপর সিংহের একটি দল শুয়ে আছে।  এই দলের মধ্যে সবথেকে বড় সিংহটিকে লক্ষ করে লিভিংস্টোন তাঁর দোনলা বন্দুক থেকে দুটি গুলি করেন।  গুলি সরাসরি সিংহকে আঘাত করলে গ্রামবাসীরা আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। লিভিংস্টোন দ্বিতীয়বার বন্দুকে গুলি ভরবার জন্য প্রস্তুতি শুরু করলে হঠাৎ লক্ষ করেন আহত সিংহটি অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে এবং লিভিংস্টোন সিংহের দিকে বন্দুক তাক করবার আগেই সিংহটি তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে কামড়ে টানতে টানতে নিজের দলের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। লিভিংস্টোনকে বাঁচাতে মেবালওয়ে নামের এক বয়স্ক গ্রামবাসী বন্দুক হাতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক গ্রামবাসীর হাত থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে সিংহটিকে লক্ষ করে গুলি করেন। কিন্তু তাঁর গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে সিংহটি লিভিংস্টোনকে ছেড়ে মেবালওয়েকে আক্রমণ করে এবং তাঁর পা কামড়ে ধরে। সিংহের কামড়ে লিভিংস্টোনের কাঁধের হাড় ভেঙে যায়। নিজেই নিজের ভাঙা কাঁধের চিকিৎসা করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে উঠলেও আজীবন তিনি এই আঘাতের প্রভাব শরীরে বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন।  এই আক্রমণের পর থেকে কাঁধের ওপর আর কোনদিন হাত তুলতে পারেননি তিনি।  

সুস্থ হয়েই ইংরেজ অভিযাত্রী উইলিয়াম অসওয়েলকে সঙ্গে করে লিভিংস্টোন নগামি হ্রদের খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। দুর্গম কালাহারি মরুভূমি পার করে অবশেষে তাঁরা পৌঁছান নগামি হ্রদে।

ইতিমধ্যে লিভিংস্টোন জাম্বেসি নদীর কথা জানতে পারেন। পরিবারকে ব্রিটেনে পাঠিয়ে দিয়ে ১৮৫২ সালে জাম্বেসি নদীর উত্তর দিকের গ্রাম লিনিয়াতিতে এসে পৌঁছান তিনি।  সেখানকার ম্যাকোলোলো উপজাতিদের রাজা সেকেলেটুর সঙ্গে দেখা করে বলেন যে তিনি আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত একটি পথ খুঁজে বের করতে চান।  রাজা  এই পথ আবিষ্কারে পশ্চিম তীরের দেশগুলির সাথে বাণিজ্যের সম্ভাবনার কথা ভেবে লিভিংস্টোনকে এই অভিযানের অনুমতি দেন।

১৮৫৪ সালের ৩১ মে লিভিংস্টোন এসে পৌঁছান পর্তুগিজ শহর লুয়ান্ডায়। অসম্ভব রকম বিপদসংকুল এই অভিযানে তাঁদের সময় লাগে প্রায় ছয় মাস। কখনও ডিঙি নৌকায় চেপে, কখনও গরুর গাড়িতে আবার কখনও বা পায়ে হেঁটে দেড় হাজার মাইল বিস্তৃত গভীর জঙ্গল পেরিয়ে হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে কোনরকমে বেঁচে ফিরে অবশেষে তাঁরা খুঁজে বের করলেন সমুদ্র উপকূলে পৌঁছাবার পথ। তবে লিভিংস্টোন বুঝতে পারলেন এরকম বিপজ্জনক দুর্গম পথে আগামী দিনে বাণিজ্য করা একপ্রকার অসম্ভব।  তিনি ঠিক করলেন জাম্বেসি নদীর পূর্বদিক বরাবর এগোবেন। 

১৮৫৫ সালের ৩ নভেম্বর রাজা সেকেলেটুর সহযোগিতায় একশো কুড়ি জন ম্যাকোলোলো যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যাত্রা করলেন জাম্বেসি নদীর উৎসমুখ আবিষ্কারে। যেতে যেতে এই উপজাতিদের কাছেই তিনি শুনলেন এখানকার  গভীর জঙ্গলে এমন এক ভয়ংকর স্থান আছে যেখানে আকাশের মত উঁচু থেকে ভীষণ গর্জন সহ প্রচুর পরিমান জল নিচে এসে পড়ে এবং সাদা ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। লিভিংস্টোন সেই জায়গাটিতে গিয়ে দেখলেন জাম্বেসি নদী একটি পাহাড়ের ওপর থেকে জলপ্রপাত হয়ে নেমে এসেছে।  প্রবল শব্দে সেই জল সাদা ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে পড়ছে। লিভিংস্টোনের আগে কোন ইউরোপীয়ান শ্বেতাঙ্গ এই অঞ্চলে এসে পৌঁছাতে পারেননি। স্থানীয় মানুষ এই জলপ্রপাতকে ‘মসি-ওয়া-তুন্যা’ নামে ডাকে যার বাংলা অর্থ হল – ‘যে ধোঁয়া গর্জন করে‘।  মহারানি ভিক্টোরিয়ার নামানুসারে লিভিংস্টোন এই জলপ্রপাতের নাম রাখলেন – ‘ভিক্টোরিয়া ফল্স’।

১৮৫৬ সালে লিভিংস্টোন ব্রিটেন ফিরে যান। প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে আফ্রিকা মহাদেশ অতিক্রম করায় বিখ্যাত হয়ে ওঠেন তিনি। ১৮৫৭ সালে তাঁর আফ্রিকা অভিযানের ওপর একটি তথ্যমূলক বই রচনা করেন তিনি যার নাম দেন ‘মিশনারি ট্র্যাভেলস অ্যান্ড রিসার্চেস ইন সাউথ আফ্রিকা’ (Missionary Travels and Researches in South Africa)। বইটি প্রকাশের সাথে সাথে সমগ্র ইংল্যান্ড জুড়ে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। 

১৮৫৮ সালে লন্ডন মিশনারি সোসাইটির কাজে ইস্তফা দিয়ে মিশনের কাজে জাম্বেসি অভিযানে নতুন করে যাত্রা শুরু করেন তিনি । কিন্তু বিভিন্ন কারণে তাঁর দলের ছয়জন ইউরোপীয় সদস্যই ইস্তফা দিয়ে চলে যায়। একপ্রকার নিজের উদ্যোগেই তিনি নায়াসা হ্রদের (Lake Nyassa) কিছু অংশ জরিপ করেন। রাত্রি বেলা তারা ভর্তি আকাশের ছবি নায়াসা হ্রদের জলে প্রতিফলিত হতে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে এই হ্রদের নতুন নাম দেন ‘লেক অব স্টারস’ (Lake of Stars) । 

অজানা মহাদেশ আফ্রিকাকে পৃথিবীর সামনে তার অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসহ আবিষ্কারের জন্য ডেভিড লিভিংস্টোন রয়াল জিওগ্রাফিক সোসাইটির ভিক্টোরিয়া পদক দ্বারা সম্মানিত হন। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও পেয়েছেন সাম্মানিক ডিগ্রি। 

১৮৭৩ সালের ১ মে জাম্বিয়ার কঙ্গো নদী অববাহিকার তীরে অবস্থিত বাংওয়েলু হ্রদের দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত চিপুন্ডু গ্রামে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে লিভিংস্টোনের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর দুজন বিশ্বস্ত সেবক চুমা এবং সুসি তাঁর শরীর থেকে হৃদপিন্ডটি বের করে নিয়ে ম্পূন্ডু(mpundu) গাছের নিচে পুঁতে দেয়। তাঁর বাকি শরীর এরপর লন্ডনে ফেরত নিয়ে আসা হয় এবং ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে সমাধিস্থ করা হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading