বিখ্যাত ইতালীয় প্রকৌশলী এবং উদ্ভাবক ছিলেন গুগলিয়েলমো মার্কনি (Guglielmo Marconi)। দূর-দূরান্তে বেতার টেলিগ্রাফ এবং রেডিও সংকেতের সফল প্রদর্শনের জন্য তিনি বিশ্বখ্যাত। এই কারণে বেতারের জনক হিসেবে ১৯০৯ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। তার অনেক আগেই ১৮৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মার্কনি গড়ে তুলেছিলেন দ্য ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফ অ্যান্ড সিগনাল কোম্পানি। প্রথমে তিনি তাঁর বাবার এস্টেটে বেতার তরঙ্গ নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন এবং এক মাইলেরও বেশি দূরত্বে বেতার তরঙ্গ পাঠাতে সমর্থ হন। পরে তিনি তাঁর যন্ত্রটি ইংল্যান্ডে নিয়ে গেলে খুবই সমাদৃত হন। এই বেতার তরঙ্গগুলি যে পৃথিবীর নিজস্ব চৌম্বক বক্ররেখা দ্বারা প্রভাবিত হয় না, তা তিনি প্রমাণ করার জন্য সমগ্র আটলান্টিক মহাসাগর জুড়ে বেতার তরঙ্গ পাঠিয়েছিলেন। তাঁর এই পরীক্ষার ফলেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইক্রোওয়েভের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯২৯ সালে ইতালির রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল মার্কনিকে একজন ‘মারকুইস’ হিসেবে সম্মানিত করেন। ১৯৩১ সালে পোপ পিয়াস একাদশের জন্য গুগলিয়েলমো মার্কনি ভ্যাটিকান রেডিও স্থাপন করেছিলেন।
১৮৭৪ সালের ২৫ এপ্রিল ইতালির বোলোগ্নার পালাসো মারেসক্যালচিতে গুগলিয়েলমো মার্কনির জন্ম হয়। তাঁর বাবা জিউসেপ মার্কনি জনৈক ইতালীয় জমিদার ছিলেন এবং তাঁর মা আইরিশ অ্যানি জেমসন ছিলেন বিখ্যাত হুইস্কি পাতনকারী কোম্পানি ‘জেমসন অ্যান্ড সন্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা জন জেমসনের নাতনি। মার্কনির পুরো নাম ছিল গুগলিয়েলমো জিওভানি মারিয়া মার্কনি। তাঁর এক ভাইয়ের নাম আলফান্সো এবং এক বৈমাত্রেয় ভাইয়ের নাম লুইজি। মাত্র দুই বছর থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যেই মার্কনি ও তাঁর বড় ভাই আলফান্সো বেডফোর্ডে থাকতেন। পরবর্তীকালে বিয়াত্রিচে ও বিয়েনের সঙ্গে বিবাহ হয় মার্কনির। তাঁদের এক পুত্র গুইলিও এবং দুই কন্যা ডেগনা ও জিওইয়া।
শৈশবে মার্কনি স্কুলেই যাননি এবং পরবর্তীকালেও কখনও প্রথাগত উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেননি। বাবা-মায়ের নিয়োগ করা গৃহশিক্ষকের কাছে বাড়িতেই রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিদ্যা শেখেন তিনি। তাস্কানি বা ফ্লোরেন্সের উষ্ণতার সন্ধানে যখনে শীতকালে তাঁর পরিবার বোলোগ্না ত্যাগ করে, সেই সময় মার্কনির জন্য অতিরিক্ত একজন গৃহশিক্ষক রাখা হয়েছিল। তাঁর জীবনে লিভার্নোর একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক অধ্যাপক ভিনসেঞ্জো রোসার অনেক বড় প্রভাব ছিল। তিনিই সতের বছর বয়সী মার্কনিকে বিদ্যুৎ সম্পর্কিত নতুন তত্ত্ব শিখিয়েছিলেন। ১৮ বছর বয়সে গ্রীষ্মকালে বোলোগ্নায় ফিরে মার্কনির সঙ্গে পরিচয় হয় বোলোগ্না বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ অগাস্টো রিঘির সঙ্গে। রিঘির অনুমতিক্রমেই গুগলিয়েলমো মার্কনি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার ও গ্রন্থাগার ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
যৌবন বয়স থেকেই মার্কনি বিদ্যুৎ ও বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। ১৮৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফি-র ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। তবে কোনও তারের সাহায্য ছাড়াই বার্তা প্রেরণের এই পরীক্ষা নতুন ছিল না। তার আগে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বৈদ্যুতিক পরিবাহী, তড়িৎ-চুম্বকীয় আবেশ ও আলোকীয় সংকেত ব্যবহারের মাধ্যমে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছিল। ১৮৮৮ সালে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের কাজের উপর ভিত্তি করে হাইনরিখ হার্জ তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ তৈরি ও শনাক্ত করতে পারেন। এই বিকিরণকে সাধারণভাবে বেতার তরঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৮৯৪ সালে হার্জের কাজ সম্পর্কে অগাস্টো রিঘির একটি নিবন্ধ মার্কনিকে এই কাজে গভীরভাবে উৎসাহী করে তোলে। মাত্র ২০ বছর বয়সে ইতালির পন্তেচিওতে ভিলা গ্রিফেনের বাড়ির ছাদের ঘরে সমস্ত সরঞ্জাম সহ বেতার তরঙ্গ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন তিনি। এজন্য বাটলার, মিগনানি নামে বেশ কিছু যন্ত্রপাতিও তিনি তৈরি করেছিলেন। হার্জের করা পরীক্ষাটি এবার নিজেই শুরু করেন মার্কনি এবং অধ্যাপক রিঘির পরামর্শে একটি ‘কোহেরার’ নামক যন্ত্রের ব্যবহার করেন। ১৮৯৪ সালের গ্রীষ্মকালে একটি কোহেরার, একটি ব্যাটারি এবং একটি বৈদ্যুতিক ঘন্টা সহযোগে মার্কনি একটি স্টর্ম অ্যালার্ম তৈরি করেন। বজ্রপাতের ফলে উদ্ভুত বেতার তরঙ্গকে আকৃষ্ট করা মাত্র সেই ঘন্টাটি বেজে উঠেছিল। ঐ বছরই ডিসেম্বর মাসের এক রাতে তাঁর মাকে গুগলিয়েলমো মার্কনি একটি বেতার সংবাহক এবং একটি বেতার গ্রাহক দেখান। এর মাধ্যমে পাশের ঘর থেকে একটি টেলিগ্রাফিক বোতামে চাপ দেওয়া মাত্রই অ্যালার্মটি বেজে উঠবে। তাঁর বাবার পরামর্শে বেতার তরঙ্গ নিয়ে কাজ করা অন্যান্য পদার্থবিদদের গবেষণার সম্পর্কেও পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। ক্রমে ক্রমে তিনি চলমান সংবাহক ও গ্রাহক যন্ত্র তৈরি করেন যা বহু দূর থেকে বেতার তরঙ্গের স্পন্দন গ্রহণ করতে সক্ষম। ১৮৯৫ সালের গ্রীষ্মকালে বোলোগ্নায় তাঁর বাবার এস্টেটে মার্কনি এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শুরু করেন, কিন্তু তখনও পর্যন্ত মাত্র দেড় মাইল দূরত্ব পর্যন্তই এই বেতার তরঙ্গকে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল মার্কনির পক্ষে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই দ্বিমেরু অ্যান্টেনার বদলে একমেরু অ্যান্টেনা ব্যবহার করে তরঙ্গের কম্পাঙ্ক হ্রাস করার মাধ্যমে সেই বেতার তরঙ্গকে প্রায় ২ মাইল দূরত্ব পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি এবং এভাবে পাহাড়ের উপরেও বেতার সংকেত প্রেরণে সক্ষম হন গুগলিয়েলমো মার্কনি। তাঁর তৈরি যন্ত্রপাতিগুলি প্রথম প্রকৌশলী দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ যন্ত্র ছিল এবং তাঁর বেতার সংকেত প্রেরণের পরীক্ষাটি বাণিজ্যিকভাবেও সফল হওয়ার যোগ্য ছিল। কিন্তু ইতালিতে তাঁর এই কাজের সেভাবে স্বীকৃতি না পেয়ে গুগলিয়েলমো মার্কনি ২১ বছর বয়সে ১৮৯৬ সালে লন্ডনে চলে আসেন এবং ঐ বছরই ২ জুন তারিখে এই গবেষণার পেটেন্ট করান তিনি। ব্রিটিশ ডাক-বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার-ইন-চিফ উইলিয়াম প্রিস তাঁর এই কাজের প্রভূত প্রশংসা করেছিলেনব।
১৮৯৭ সালে গুগলিয়েলমো মার্কনি শুরু করেন ‘ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফ অ্যান্ড সিগনাল কোম্পানি’ যা তিন বছর পরে পরিচিত হয় ‘মার্কনিস ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফ কোম্পানি’ নামে। ১৮৯৯ সালে তিনি ইংলিশ চ্যানেলের উপর দিয়ে বেতার তরঙ্গ প্রেরণ করেন এবং ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানের ব্যবস্থা সুদৃঢ় করে তোলেন। মার্কনির এই সাফল্যের পরেই দক্ষিণ ফোরল্যান্ডে একটি বেতার স্টেশন স্থাপিত হয় ফ্রান্সের উইমেরুক্সের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য। ঐ বছরই একই পদ্ধতি মেনে ব্রিটিশ যুদ্ধ জাহাজগুলি ৭৫ মাইল দূরত্বের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করে। ১৯০০ সালে মার্কনি ‘সিনটনিক ও টিউনড টেলিগ্রাফি’ বিষয়ে পেটেন্ট নিবন্ধীকৃত করেন। এর পরের বছরই কর্নওয়েল ও নিউফাউন্ডল্যান্ডের মধ্যে আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে বেতার সংকেত পাঠাতে সমর্থ হন তিনি। এই বেতার তরঙ্গগুলি যে পৃথিবীর নিজস্ব চৌম্বক বক্ররেখা দ্বারা প্রভাবিত হয় না, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন গুগলিয়েলমো মার্কনি। বেতার যোগাযোগের দূরত্ব বাড়ানোর জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান তিনি। ১৯০২ সালে কানাডা থেকে আয়ারল্যান্ড পর্যন্ত ট্রান্স-আটলান্টিক পরিষেবাগুলি চালু করেন মার্কনি। ১৯০৯ সালে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান মার্কনি। এক্ষেত্রে বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণার সঙ্গে মার্কনির একটি বিরোধ দেখা দেয়। জগদীশচন্দ্র তাঁর আগেই কলকাতায় সফলভাবে বেতার তরঙ্গের পরীক্ষা করলেও মার্কনি তাঁর আগে প্রথম সেই গবেষণার পেটেন্ট করান, তাই তাঁকেই বেতারের জনক বলা হয়। ১৯১২ সালে মার্কনি ‘টাইমড স্পার্ক’ নামক একটি নতুন সিস্টেমের পেটেন্ট করান। ১৯১৪ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত গুগলিয়েলমো মার্কনি নৌবাহিনীর কমান্ডার পদে উন্নীত হন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের পক্ষ থেকে বহু রাজনৈতিক ও শান্তি রক্ষা অভিযানে মার্কনিকে পাঠানো হয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে তিনি ক্ষুদ্র তরঙ্গের বেতার প্রযুক্তি বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা করতে শুরু করেন। ১৯২০-এর দশকে বীম সিস্টেমের সাহায্যে তিনি ঔপনিবেশিক যোগাযোগের পথ খুলে দেন।
রয়্যাল সোসাইটি অফ আর্টসের পক্ষ থেকে ‘অ্যালবার্ট পদক’ পান মার্কনি। তাছাড়া ‘কেলভিন পদক’, ‘জন ফ্রিৎজ পদক’-এও ভূষিত হন তিনি। ১৯০২ সালে ‘গ্র্যান্ড ক্রস অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য ইতালি’ সম্মান অর্জন করেন গুগলিয়েলমো মার্কনি। ১৯১৪ সালে তাঁকে ইংল্যান্ডের সম্মানীয় ‘নাইট গ্র্যান্ড ক্রস অফ দ্য রয়্যাল ভিক্টোরিয়ান অর্ডার’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
১৯৩৭ সালের ২০ জুলাই গুগলিয়েলমো মার্কনির মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান