অচেনা রাস্তায় বেরিয়ে কোন নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে আজকাল আমরা প্রায়শই মোবাইলের ম্যাপ ব্যবহার করি। এই ম্যাপে আপনার অবস্থান কোথায় তা দেখায় আর আপনি কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছাবেন সেটাও দেখায়। এর জন্য আপনাকে আপনার মোবাইলের লোকেশন সার্ভিস চালু করতে হয়। এই লোকেশন সার্ভিস চালু করার অর্থ হল GPS সার্ভিস চালু করা। আর এই GPS আপনার সঠিক অবস্থান বুঝে আপনার গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। এখন প্রশ্ন হল, GPS কাজ করে কীভাবে?
GPS বা গ্লোবাল পজিসনিং সিস্টেম (Global Positioning System) হল একটি কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক পথনির্দেশক ব্যবস্থা, যা পৃথিবীর যেকোনও জায়গায় সঠিক অবস্থান (location), সময় (time) এবং গতি (velocity) নির্ণয় করতে সাহায্য করে।
GPS কাজ করে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে বেড়ানো স্যাটেলাইট থেকে সংকেত গ্রহণ করে, এবং সেই সংকেতের ভিত্তিতে আপনার অবস্থান নির্ধারণ করে। আপনার ফোন এক্ষেত্রে একটি GPS রিসিভার হিসেবে কাজ করে। একটি GPS রিসিভার অন্তত চারটি স্যাটেলাইট থেকে দূরত্ব হিসাব করে আপনার সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে। স্যাটেলাইট, জিপিএস রিসিভার ছাড়াও গ্রাউন্ড স্টেশন এই সিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রাউন্ড স্টেশনের র্যাডারের সাহায্যে বোঝা যায় ভ্রাম্যমান স্যাটেলাইটগুলোর অবস্থান। এখানে GPS এর সাহায্যে কীভাবে আপনার অবস্থান নির্ণয় করা যায় ব্যাখা করা হল।
পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ৩০টির বেশি GPS স্যাটেলাইট ঘুরছে। প্রতিটি উপগ্রহ তাদের নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরার সময় সময় ও অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য পাঠাতে থাকে।
আপনার ফোন বা GPS ডিভাইস এই সংকেতগুলো গ্রহণ করে, এবং প্রতিটি স্যাটেলাইট থেকে তার দূরত্ব হিসাব করে। অন্তত চারটি স্যাটেলাইট থেকে সংকেত পেলে, GPS রিসিভার ট্রাইল্যাটারেশন (Trilateration) পদ্ধতিতে আপনার সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে।
এই ট্রাইল্যাটারেশন পদ্ধতিটি সহজে বুঝে নেওয়া যাক। প্রতিটি স্যাটেলাইট থেকে সংকেত আসতে নির্দিষ্ট সময় লাগে। GPS রিসিভার সেই সময়ের ভিত্তিতে দূরত্ব হিসাব করে। তিনটি উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত সিগ্ন্যালের ভিত্তিতে, রিসিভার তিন-মাত্রিক স্থানাঙ্ক (অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ, উচ্চতা) নির্ধারণ করে। চতুর্থ উপগ্রহটি ব্যবহার করা হয় সময়জনিত ভুল সংশোধনের জন্য। এখানে ট্রাইল্যাটারেশন পদ্ধতিটি সহজে বোঝার জন্য একটি ছবি দেওয়া হল।

GPS এর কাজ করার জন্য ইন্টারনেট বা মোবাইল নেটওয়ার্ক এর প্রয়োজন হয় না। তবে তবে নেটওয়ার্ক থাকলে লোকেশন আপডেট দ্রুত হয় এবং অতিরিক্ত ফিচার (যেমন ম্যাপ) পাওয়া যায়। এই কারণে প্রত্যন্ত জায়গায় যাওয়ার আগে অনেকে ম্যাপ ডাউনলোড করে রেখে দেন যাতে মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ না করলেও জিপিএস এর মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
GPS সংকেত সব আবহাওয়ায় কাজ করে, তবে গুহা বা উঁচু বাড়ির নিচের তলায়, বেসমেন্টে সবসময় কাজ নাও করতে পারে।
বর্তমানে অনেক জায়গাতেই GPS ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। ম্যাপ দেখে কোন নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা তো আগেই বলা হয়েছে। বিমান, জাহাজ, গাড়ী ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন যেমন ফুড ডেলিভারি, কার রাইড ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়। সামরিক বাহিনীতে GPS এর ব্যাপক প্রয়োগ হয়।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন GPS (Global Postioning System) আমেরিকার সামরিক বিভাগ প্রথম তৈরি করে। সেই হিসেবেই এর নাম জিপিএস হিসেবে বহুল প্রচলিত। আসলে এটি হল বিশ্ব পথনির্দেশ উপগ্রহ ব্যবস্থা (Global navigation satellite system, GNSS)। আমেরিকার GPS ছাড়াও রাশিয়ার গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (Global Navigation Satellite System, GLONASS), চিনের (BeiDou Navigation Satellite System, BDS), ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও (Galileo). এই চারটি বিশ্ব নির্দেশনা ব্যবস্থা ছাড়াও জাপান ও ভারতের আঞ্চলিক নেভিগেশন সিস্টেম আছে। ভারতের এই ব্যবস্থার নাম ইন্ডিয়ান রিজিওনাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (Indian Regional Navigation Satellite System, IRNSS) বা নেভিগেশন উইথ ইন্ডিয়ান কন্সটেলেশন (Navigation with Indian Constellation, NavIC)।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান