সব

ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন কীভাবে

ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন কীভাবে

ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় নিয়মতান্ত্রিক শাসক হলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি (President of India)। ভারতীয় সংবিধানের ৫৩ (১) নং ধারা অনুসারে দেশের যাবতীয় শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার অধিকারী হলেন রাষ্ট্রপতি। নিয়োগের ক্ষমতাবলে তিনি যেমন প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীসভার অন্যান্য মন্ত্রী, সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিগণের নিয়োগ করতে পারেন, তেমনি বিভিন্ন রাজ্যের রাজ্যপাল এমনকি নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগও করতে পারেন রাষ্ট্রপতি। নিয়োগের পাশাপাশি তাঁদের পদচ্যুত করার অধিকারও রয়েছে তাঁর হাতে। এছাড়া ভারতের রাষ্ট্রপতি স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ করে থাকেন এবং তিনিই হলেন জাতীয় প্রতিরক্ষা কমিটির প্রধান। অর্থ, বিচার, জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত বিচার সম্পর্কেও মতামত বা নির্দেশ দিতে পারেন রাষ্ট্রপতি। তা ভারতের এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি কিন্তু সাধারণ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মত নয়। ভারতের সচেতন নাগরিক হিসেবে আজকে চলুন জেনে নেওয়া যাক ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন কীভাবে (How the President of India is elected)।

দেশের প্রথম নাগরিক এবং রাষ্ট্রের প্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। ভারতীয় সংবিধানের ৫৫ নং ধারায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি বা বিধান সম্পর্কে উল্লেখ করা আছে। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি আইনের দ্বারা এই বিধি নির্ধারিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য যে কোনও ভারতীয় নাগরিকের কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকা দরকার। যেমন –


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

প্রথমত, তাঁকে অবশ্যই ভারতীয় হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাঁর বয়স হতে হবে ন্যূনতম ৩৫ বছর।

তৃতীয়ত, প্রার্থীকে লোকসভার সদস্য হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে।

চতুর্থত, কেন্দ্র সরকার, রাজ্য সরকার অথবা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক সংস্থার অধীনে প্রার্থীকে কর্মরত থাকা যাবে না।

পঞ্চমত, কমপক্ষে ৫০ জন নির্বাচক প্রার্থী দ্বারা রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থীকে প্রস্তাবিত হতে হবে এবং ৫০ জন নির্বাচক দ্বারা ঐ নাম সমর্থিত হতে হবে। 

তবে ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন একটি বিশেষ নির্বাচকমণ্ডলী দ্বারা যাকে বলা হয় ইলেক্টোরাল কলেজ (Electoral College)। এই নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকেন সংসদের উভয়ক্ষক্ষের নির্বাচিত সদস্য অর্থাৎ মেম্বার অফ পার্লামেন্ট (MP) এবং অঙ্গরাজ্যগুলির বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যরা অর্থাৎ মেম্বার অফ লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি (MLA)। সংবিধানের ১৬৮ নং ধারা অনুসারে প্রতি রাজ্যের বিধানসভায় ন্যূনতম ৬০ জন এবং সর্বোচ্চ ৫০০ জন সদস্য থাকতে হবে। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ্য যে, অঙ্গরাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্বের হার সমান হতে হবে এবং বিধানসভার ভোটসংখ্যা এবং সংসদের ভোটসংখ্যা সমান হতে হবে। আইনি তথা সাংবিধানিক পরিভাষায় ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিকে বলা হয় ‘একক হস্তান্তরযোগ্য ভোট দ্বারা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক পদ্ধতি’ (Proportional Representation System by Single Transferable Vote)।

এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাধারণত পাঁচটি পর্যায় আছে। একে একে এই পর্যায়গুলি নিয়ে আলোচনা করা যাক।

  • প্রথম পর্যায় : ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেকটি অঙ্গরাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের ভোটসংখ্যা গণনা করা হয়, তবে এক্ষেত্রে প্রত্যেকে একটি করে ভোট দিলেও তাদের ভোটের মূল্য একেক রাজ্যের জন্য একেক রকম নির্ধারণ করা আছে। এই ভোটের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি হল, কোনও অঙ্গরাজ্যের মোট জনসংখ্যাকে ঐ রাজ্যের বিধানসভায় নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে সেই ভাগফলকে আবার ১০০০ দিয়ে ভাগ করতে হবে। তার ফলে নির্ণীত ভাগফলই হবে ঐ অঙ্গরাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের একেকটি ভোটের নির্দিষ্ট মূল্য। তবে এই দ্বিতীয় ভাগ গণনায় যদি কোনও সময় ৫০০ বা তার বেশি ভাগশেষ চলে আসে, তখন ভাগফলের সঙ্গে ১ যোগ করে পুনরায় ভোটের মূল্য গণনা করা হয়। বিধায়কদের ভোটের মূল্য রাজ্য বিশেষে পৃথক হলেও সর্বমোট বিধায়কদের ভোটসংখ্যার সঙ্গে সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যদের মোট ভোটসংখ্যা এক হওয়া দরকার।
  • দ্বিতীয় পর্যায় :   এই পর্যায়ে সংসদের উভয় কক্ষের নির্বাচিত সদস্যদের ভোটসংখ্যা গণনা করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে যেহেতু সকল অঙ্গরাজ্যের বিধায়কদের মিলিত ভোটসংখ্যার সঙ্গে এই সংসদের উভয় কক্ষের সকল সদস্যের মিলিত ভোটসংখ্যা এক হওয়া চাই, তাই প্রথম পর্যায়ে প্রাপ্ত অঙ্গরাজ্যের বিধায়কদের ভোটসংখ্যাকে সংসদের দুটি কক্ষের নির্বাচিত মোট সদস্যসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রাপ্ত ভাগফলকে এক নির্বাচিত সংসদ সদস্যের ভোটসংখ্যা বলা হয়। তবে এবারেও আগের নিয়মানুসারে ভাগশেষ যদি ভাজকের অর্ধেক বা তার বেশি থাকে, তখন পুনরায় ভাগফলের সঙ্গে ১ যোগ করে চূড়ান্ত ফল নির্ণয় করা হয়।
  • তৃতীয় পর্যায় :    ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ারএই পর্যায়ের আসল কাজ হল ভোটগ্রহণ।সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বজায় রেখে গোপন ব্যালট কাগজের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি সমাধা করা হয়। এক্ষেত্রে ভোটাররা সকল প্রার্থীকেই নিজের ভোট দিতে পারেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রার্থীদের মধ্যে প্রথম পছন্দের প্রার্থী কে তা অবশ্যই তাকে ব্যালট পেপারে উল্লেখ করতে হয়। অর্থাৎ ৫ জন প্রার্থী থাকলে পছন্দের গুরুত্ব অনুসারে ক্রমান্বয়ে এই প্রার্থীদের নামের পাশে ১, ২, ৩ এরকম সংখ্যা বসাতে হয়। এই পর্যায়ের কঠিন নিয়ম হল, কোনও ব্যালট পেপারে প্রথম পছন্দের উল্লেখ না থাকলে তা অবিলম্বে বাতিল হিসেবে ঘোষিত হয়।
  • চতুর্থ পর্যায় :    বৈধ ভোট গণনার সময় সবকটি বৈধ ভোটকে যোগ করে তাকে প্রথমে ২ দিয়ে ভাগ করে নেওয়া হয় এবং প্রাপ্ত ভাগফলের সঙ্গে ১ যোগ করে ‘কোটা’ (Quota) নির্ণয় করা হয়। বিজয়ী প্রার্থীকে অবশ্যই এই কোটা সংখ্যক ভোট পেতে হবে।
  • পঞ্চম পর্যায় :    ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার সর্বশেষ স্তরে কোটা সংখ্যক ভোট কোন কোন প্রার্থী পেয়েছেন তা বিচার করা হয়। প্রথমে ভোটারদের প্রথম পছন্দের বিচারে সবথেকে কম ভোট যিনি পেয়েছেন, সেই প্রার্থী বাতিল হয়ে যান নির্বাচন থেকে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হস্তান্তরের প্রক্রিয়া রয়েছে। অর্থাৎ প্রথম পছন্দ হিসেবে ভোটাররা যাকে ভোট দিয়েছেন, তিনি বাতিল হয়ে গেলে তার ভোটগুলি হস্তান্তরিত হয়ে যাবে দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে নির্বাচিত প্রার্থীর কাছে। কোটা সংখ্যক প্রথম পছন্দের তালিকায় আসা প্রার্থী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই ভোট হস্তান্তর চলতেই থাকে। এই পর্যায়ে আরেকটি সমস্যাও দেখা দিতে পারে, দুই বা তার বেশি প্রার্থী একই ভোট পেয়ে সর্বনিম্ন স্থানে অবস্থান করতে পারেন। সেক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে স্থির করা হয় চূড়ান্ত মনোনীত ব্যক্তিকে।  

স্পষ্টই বোঝা যায় যে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট প্রক্রিয়া এক প্রকার পরোক্ষ নির্বাচন যেখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। প্রত্যক্ষ নির্বাচন না করার পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন প্রত্যক্ষ নির্বাচন হলে রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থীকে নিজের হয়ে কোনও একটি রাজনৈতিক দলের অধীনে প্রচারে নামতে হত যার দরুণ রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বিরোধ বাধার সম্ভাবনা ছিল। তাছাড়া এই প্রক্রিয়া অনেকাংশেই জটিল হয়ে পড়ত। এত বিশাল জনসংখ্যার দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য প্রত্যক্ষ ভোট আয়োজন করতে হলে যে বিরাট পরিকাঠামো প্রয়োজন, যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা প্রয়োজন তার দরুণ দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। ২০২২ সালের ২৫ জুলাই ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের (Ram Nath Kovind) মেয়াদকাল শেষ হচ্ছে, ফলে নতুন রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের দিন স্থিরীকৃত হয়েছে ১৮ জুলাই। নিয়মানুসারে বিদায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষের আগেই শূন্যপদে নতুন রাষ্ট্রপতির অভিষেক ঘটানো হয়। এই বছরেও সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটবে না।    

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন