সম্মান লাভার্থে প্রজারা সৎপথে চলবে, এই উদ্দেশ্যে কৌলিন্য প্রথা সৃষ্টির একটা কারণ হলেও সময়ের সাথে সাথে কৌলীন্য প্রথার কুফল সমাজের বুকে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে বাঙালি হিন্দু সমাজ প্রায় স্থবিরতার দিকে পৌঁছে যায়। একটা শ্রেণী এই প্রথার সুবিধা ভোগ করতে থাকে আর বেশির ভাগ মানুষ ক্রমেই অবহেলিত হতে থাকেন। এখানে কৌলীন্য প্রথার কুফল তুলে ধরা হল।
বিনয় ঘোষের লেখা “ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর” পুস্তকের ১১০ পৃষ্ঠায় লেখা আছে,”ব্রাহ্মণেরা কৌলীন্য প্রথার দোহাই দিয়ে সামাজিক সুবিধা আদায় করতে লাগলেন। ক্রমে এই কৌলীন্য প্রথা থেকে সৃষটি হল কন্যাকে উচ্চবর্নে বিবাহ দেবার রীতি, যার অবশ্যম্ভাবী ফল হল বহুবিবাহ। এক একজন কুলীন ব্রাহ্মণ বহু কন্যার পাণিগ্রহন করতে লাগলেন।
ঋতুমতি হবার আগে বিবাহ দেবার বাধ্যবাধকতা ও বিবাহ দিতে না পারলে পিতামাতার যে সামাজিক অসম্মান হত তা থেকে মুক্তি দেবার জন্য কুলীন ব্রাহ্মণেরা এই সব কন্যাদের বিবাহ করতেন। অতএব বিবাহ বেশ লাভজনক ব্যাবসা হয়ে উঠল। কুলীন ব্রাহ্মণ কন্যাদের অসহায় পিতা মাতার দু তিন ডজন স্ত্রী থাকা সত্বেও, ৭০/৮০ বছরের বৃদ্ধ কুলীন ব্রাহ্মণদের উপযুক্ত পাত্র বিবেচনা করতেন। মৃতপ্রায় ৮০ বছরের ও অধিক বয়স্ক বৃদ্ধের সাথে নিতান্ত বালিকা কন্যাদের বিবাহ হত মৃত্যুর আগে সে বৃদ্ধের লাভ হত সামান্য কয়েকটি টাকা।“
কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে অনেকে এ প্রথার বিরোধিতা করেছিলেন তাদের মাঝে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশে) রাসবিহারী মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিশেষ উল্লেখযোগ্য।তিনি তার জীবন চরিতে যা লিখেছেন তা থেকে সামান্য কিছু তূলে ধরা হল।
তিনি লিখেছেন, ”পিতাঠাকুর মহাশয় আমাকে অতি শৈশবাবস্থায় রাখিয়া স্বর্গারোহন করেন। তখন পিতৃব্য শ্রীযুক্ত তারক চন্দ্র মুখোপাধ্যায় মহাশয় আমার অভিভাবক ছিলেন। দারিদ্রতাবশত আমাকে অল্পকালের মাঝেই তিনি ৮টি বিবাহ করান। বহুবিবাহে সম্মতি থাকিলে বোধহয় আমাকে শতাধিক রমণির পাণী গ্রহন করতে হত।নিরুপায় হয়ে আরো ৬টি বিবাহ করিতে হইল, তাহাতে আমার ঋন পরিশোধ ও ভরণপোষনের সংস্থা হইলে আমি হোসেন শাহির জমিদারিতে আশ্রয় গ্রহনপূর্বক তহশিলদারি কর্মে নিযুক্ত হই।”
(রাসবিহারি মুখোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত- ভারতীয় জাতীয় গ্রন্থাগারে পাওয়া যাবে)
এছাড়া আরো অনেক দৃষ্টান্ত আছে যে যার দ্বারা প্রমান করা যেতে পারে যে কৌলিন্য প্রথা সমাজে ভীষন আকার ধারন করেছিল।
যেমন –
(ক) একটি ব্রাহ্মণের যদি ত্রিশটি স্ত্রী থাকে তবে প্রতি মাসে কয়েকদিনের জন্য শ্বশুরালয়ে গিয়ে থাকলে আর খেয়ে ও ঊপহার পেয়ে থাকলে, জীবিকা অর্জনের কোন চেষ্টা না করে তার সারা বৎসর কেটে যেতে পারে। বহুবিবাহ প্রথার ফলে
কুলীন ব্রাহ্মণেরা এক নিষ্কর্মা, পরভুকশ্রেণী হয়ে উঠেছে, এবং বিবাহের মত একটি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান কে নীতি হীনতার উৎস করে তুলেছিল।
(খ) অতএব অনেক কুলীন ব্রাহ্মণের জীবনধারণের একমাত্র উপায় ছিল বহুবিবাহ করা।
(গ) কুলীনরা বৃদ্ধ বয়সে ও বিবাহ করত। অনেক সময় স্ত্রীদের সঙ্গে তাদের দেখা সাক্ষাৎই হত না অথবা বড়জোর ৩/৪ বছর পরে একবারের জন্য দেখা হত।
(ঘ) এমন কথা শোনা যায় যে একজন কুলীন ব্রাহ্মণ ১ দিনেই ৩/৪ টি বিয়ে করেছেন।
(ঙ) কোন কোন সময়ে একজনের সব কয়টি কন্যার ও অবিবাহিত ভগিনীদের একই সঙ্গে বিবাহ দেয়া হত।
(চ) কুলীনের ঘরের বিবাহিত বা কুমারী কন্যাদের খুব দুঃখের মাঝে দিন কাটাতে হত। কুলীনদের এ ধরনের বহু বিবাহের ফলে ব্যাভিচার, গর্ভপাত, শিশুহত্যা ও বেশ্যাবৃত্তির মত জঘণ্য সব অপরাধ সংঘটিত হত।
উপরের (ক) থেকে (চ) পর্জন্ত উদ্ধৃতিগুলো শ্রী বিনয় ঘোষের লেখা “ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর” নামক পুস্তক থেকে নেয়া হয়েছে।
মোট কথা কৌলিন্য প্রথা এক শ্রেণীকে একশত খণ্ডে বিভক্ত করে বিভেদের প্রাচীর রচনার ফলে মানুষের মানবিকতাকে দারুনভাবে অপমানিত করা হয়েছিল এবং মানুষের স্বাধীন অধিকারের মূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- অতুল সুর, বাংলার সামাজিক ইতিহাস, কলকাতা, ১৯৭৬।
- নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ভারতীয় জাতি বর্ণ প্রথা, কলকাতা, ১৯৮৭।
- রমেশচন্দ্র মজুমদার, বঙ্গীয় কুলশাস্ত্র, কলকাতা, ১৯৮৯।
- নগেন্দ্রনাথ বসু, বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস, ২ খন্ড, কলকাতা।
- বিনয় ঘোষ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
- বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস, দুর্গাচন্দ্র সান্যাল, মডেল পাবলিসিং হাউস


আপনার মতামত জানান