সববাংলায়

লাকী আখান্দ

বাংলাদেশের অন্যতম বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী লাকী আখান্দ (Lucky Akhand)। তাঁর গানে লক্ষ করা যায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন। বাংলাদেশের গানকে আধুনিক করে তোলায় তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তবে শুধু গান নয় আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারও বাংলাদেশে জনপ্রিয় করেন লাকী আখান্দ। প্রেম, প্রকৃতি, দেশাত্মবোধ ভাবনা তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে বাংলা শিল্প জগতে বিশেষ কৃতিত্ব লাভ করেছেন।

১৯৫৬ সালের ৭ জুন আবার কোনও মতে ওই বছরের ১৮ জুন লাকী আখান্দের জন্ম হয় পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) পুরনো ঢাকায়। অবশ্য তাঁর মেয়ে মাম-মিনতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে ৭ জুনই লাকী আখান্দের জন্মদিন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ওই দিন পঁয়ত্রিশজন সদ্যজাতকের মধ্যে একমাত্র তিনিই ছিলেন পুত্রসন্তান, এর পাশাপাশি তাঁর জন্ম তারিখ মাথায় রেখে বাবা তাঁর নাম রাখেন লাকী। তবে লাকী এক সাক্ষাৎকারে নিজের প্রকৃত নাম বলেছেন আবু তাহের আমিন হাসান আখান্দ। লাকীর বাবার নাম আব্দুল আলি আখান্দ এবং মায়ের নাম নুরজাহান বেগম। তাঁর বাবা ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট। ছোটবেলা থেকে সঙ্গীতের পরিবেশের মধ্যেই লাকী বড় হন। তাঁর ভাই হ্যাপী আখান্দও ছিলেন বিশিষ্ট গায়ক ও সঙ্গীতের আয়োজক। হ্যাপী আখান্দের সুরেলা কণ্ঠে অভিভূত হয়ে তাঁকে ‘বাংলাদেশি সঙ্গীতের বরপুত্র’ বলে অভিভূত করা হত। হ্যাপী আখান্দ বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড “মাইলস্‌” এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। দুই ভায়ের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল বাংলা গানের উৎকর্ষ সাধন করা। লাকী আখান্দের বোনের নাম জেসমিন আখান্দ। লাকী নার্গিস আখতারকে বিয়ে করেন। তাঁদের কন্যা মাম-মিনতিও বাংলাদেশের পরিচিত গায়িকা।

এক নজরে লাকী আখান্দের জীবনী:

  • জন্ম: ৭ জুন, ১৯৫৬
  • মৃত্যু: ২১ এপ্রিল, ২০১৭
  • কেন বিখ্যাত: লাকী আখান্দ বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক। তিনি গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে বাংলা শিল্প জগতে বিশেষ কৃতিত্ব লাভ করেছেন। এইচএমভি পাকিস্তান, এইচএমভি ভারত-এর গায়ক হিসেবে অত্যন্ত অল্প বয়সে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশী বেতারে সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করেছেন পাকিস্তান সেনার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই।
  • পুরস্কার: ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানি আর্ট কাউন্সিল লাকী আখান্দকে ‘বাংলা আধুনিক গান’ বিভাগে পুরস্কৃত করে। তাঁর সঙ্গীত চর্চাকে সম্মান জানিয়ে ১৯৭৯ সালে যুগোশ্লোভিয়া সরকার তাঁকে পুরস্কার প্রদান করে।

সঙ্গীত অনুরাগী বাবা আব্দুল আলির কাছে লাকী আখান্দ সঙ্গীত চর্চা শুরু করেন মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকে। জনপ্রিয় লোকশিল্পী আব্বাসউদ্দিনের গান তাঁকে খুবই আকৃষ্ট করত। এছাড়া আর.ডি.বর্মণের গানেরও একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৬৩-১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি টেলিভিশন ও রেডিওতে শিশুশিল্পী হিসাবে সঙ্গীতের নানান অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে তিনি এইচ.এম.ভি পাকিস্তান ও ষোল বছর বয়সে এইচ.এম.ভি ভারতের অন্যতম গায়ক হিসাবে গান গাইতেন।

দেশভক্ত লাকী আখান্দ দেশের মানুষের দুর্দিন, অসহায়তায় ছিলেন তাদেরই সহযোদ্ধা। তবে তাঁর প্রতিবাদের মাধ্যম ছিল গান। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সরকারের রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশী জাতীয় রেডিও নেটওয়ার্কের ‘বাংলাদেশ বেতার’-এ অংশগ্রহণ করে সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করে তিনি রচনা করেন ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে’, ‘হঠাৎ করে বাংলাদেশ’ ইত্যাদি গান। মূলত এই সময় বাংলাদেশে অবস্থিত পরিবারের সুরক্ষার জন্য তিনি প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে লাকী আখান্দ নামটিই বেশি ব্যবহার করতেন।

ব্রিস্টল আন্তর্জাতিক সঙ্গীত উৎসবে (১৯৭৭ সাল) লাকী আখান্দ অংশগ্রহণ করে সকল শ্রোতার প্রশংসা পান। লাকী আখান্দ ছিলেন বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক। ১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকীর ‘ঘুড্ডি’ সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব নেন তিনি এবং নিজের অ্যালবামের ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ গানটি ব্যবহার করেন, যা দর্শকদের থেকে অকুণ্ঠিত ভালোবাসা পায়। আবার ‘নরসুন্দর’ সিনেমাতেও সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে কাজ করেন তিনি। নিজের সঙ্গীত জীবনে দ্রুত সাফল্য লাভ করে তিনি থেমে যাননি বরং নিজেকে নানা পরীক্ষার সম্মুখে দাঁড় করিয়ে আপন সঙ্গীত সাধনাকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে ফেলেছেন। আর এ কারণেই দৃঢ়চেতা, সাহসী লাকী প্রথমেই নিজের একক অ্যালবাম প্রকাশ করেন। তাঁর সেই প্রথম অ্যালবাম ‘লাকী আখান্দ’ (১৯৮৪ সাল) সারেগামার ব্যানারে প্রকাশিত হয়। এই অ্যালবামের জনপ্রিয় গানগুলি হল- ‘এই নীল মণিহার’, ‘হৃদয় আমার’, ‘মামুনিয়া’ ইত্যাদি। আবার সঙ্গীত পরিচালক হিসাবেও তিনি তাঁর দূরদৃষ্টিতা ও শৈল্পিক ভাবনার পরিচয় দেন।

শৈশব থেকে লাকীর সঙ্গীত চর্চার সঙ্গী ও প্রিয় ভাই হ্যাপী আখান্দের ১৯৮৭ সালে অকালমৃত্যুতে এই দ্রুত গতিময় সঙ্গীত জীবন হঠাৎ থমকে যায়। লাকীর জনপ্রিয় গান ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’-তে হ্যাপী আখান্দও সুর দিয়েছিলেন। শোকস্তব্ধ, মর্মাহত লাকী প্রায় একযুগ সঙ্গীত জগত থেকে দূরে থাকেন। তবে এই সঙ্গীতপ্রিয় মানুষ আজীবন সঙ্গীতের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে পারেননি। তাই তিনি আবার ফিরে আসেন আর বাঙালি শ্রোতাকে উপহার দেন ‘পরিচয় কবে হবে’ (১৯৯৮ সাল) অ্যালবামটি। এরপর আর তিনি থেমে যাননি। পরবর্তীকালে তিনি অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে প্রকাশ করেন ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ (১৯৯৮ সাল) অ্যালবামটি। যেখানে সামিনা চৌধুরী, হাসান, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, জেমস, আয়ুব বাচ্চু প্রমুখ শিল্পীও গানে কণ্ঠ দেন। এছাড়া ১৯৯৯ সালে সামিনা চৌধুরীকে নিয়ে লাকী আখান্দ দ্বৈত অ্যালবাম ‘আনন্দ চোখ’ প্রকাশ করেন। তাঁর অন্যান্য অ্যালবামগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল- ‘দেখা হবে বন্ধু’ (১৯৯৯ সাল), ‘আমায় ডেকো না’ (১৯৯৯ সাল), ‘তোমার অরণ্যের সুর’ (২০০০ সাল) ইত্যাদি। তাঁর মৃত্যুর পর ডি-সিরিজ থেকে লাকী আখান্দ, হ্যাপী আখান্দ ও শুক্লা দে-র কিছু মৌলিক ও কিছু রিমেক গান নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘দ্যা আখান্দ ব্রাদার্স’ (২০১৯ সাল)।

তাঁর যে গানগুলি রোমান্টিক বাঙালির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, সেগুলি হল: ‘নীল শাড়ি পরে’, ‘পাহাড়ি ঝর্ণা গানে’, ‘রীতিনীতি জানি না’, ‘আগে যদি জানতাম’ প্রভৃতি গান। এছাড়াও তিনি প্রায় ছশোটির বেশি গানে সুর দেন। শুধু আধুনিক গান নয় সফট মেলোডি, লোকগান, হার্ড রক, মেলো রক, স্পেনীয় গানের তাল তাঁর গানে কখনও এককভাবে আবার কখনও একত্রে উঠে এসেছে। স্পেনীয় সুর, তাল ও গানের প্রতি তাঁর কী রূপ আগ্রহ ছিল তা প্রমাণিত হয় তাঁর নিজের বক্তব্যেই – “শুরু থেকেই স্পেন ও গ্রিসের মিউজিক আমাকে স্পর্শ করে। এগুলোই আমার গানে বেশি ব্যবহার হয়েছে। কোনও শিক্ষক পাইনি। তবে নিজে নিজে শেখার চেষ্টা করেছি”। আধুনিক গানের পাশাপাশি দেশীয় ধ্রুপদি, ঠুমরি, গজল এবং ক্লাসিক্যাল সুরেও তিনি দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। গান নিয়ে নানা পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে তিনি আসলে বাংলা সঙ্গীত ভাণ্ডারকেই সমৃদ্ধশালী করেছেন।

লাকী আখান্দ জনপ্রিয় “হ্যাপী টাচ” (Happy Touch) ব্যান্ডদলের সদস্য ছিলেন। তবে তিনি আর্ক নামক ব্যান্ডদলের ‘হৃদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা’ –তেও সুর দেন। তিনি সঙ্গীতের পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্রেও নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন। একদিকে তিনি যেমন গিটার, কী-বোর্ড, পিয়ানো, অ্যাকর্ডিয়ন, হারমনিয়াম, স্প্যানিশ গিটার সম্পর্কে ছোট থেকেই অভ্যস্ত ছিলেন, অন্যদিকে আবার আধুনিক বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কেও ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। তবে শুধু নিজের জন্য নয় অন্যদেরও আধুনিক বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে আগ্রহী করতেন বা শেখাতেনও। লাকী নিজের সঙ্গীত জীবনে যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন তা হল বাংলা গানের প্রচার এবং বাংলা গানের উন্নতি করা। তাই তিনি নিঃস্বার্থভাবে অন্য শিল্পীদেরও ক্রমাগত সাহায্য করেছিলেন। বিনিময়ে প্রত্যাশা কিছুই রাখেননি। শেষ জীবনে অসুস্থ লাকী আখান্দ ও তাঁর পরিবার নানা কারণে আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হলেও শিল্পের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার জন্য তিনি তৎকালীন সময়ের খ্যাতনামা শিল্পীদের থেকে কোনও সাহায্য গ্রহণ করেননি। বরং বাংলা সঙ্গীত ভুবনকে নতুন দিশা দেখিয়ে তিনি সরে গেছেন নিভৃতে। লাকীর মানবিক স্নেহপরায়ণ মনের পরিচয় পাওয়া যায় বিটিভি এবং অন্যান্য জায়গায় শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীত অনুষ্ঠান উপস্থাপনের মধ্যে দিয়ে।

১৯৬৯ সালে পাকিস্তানি আর্ট কাউন্সিল লাকী আখান্দকে ‘বাংলা আধুনিক গান’ বিভাগে পুরস্কৃত করে। তাঁর সঙ্গীত চর্চাকে সম্মান জানিয়ে ১৯৭৯ সালে যুগোশ্লোভিয়া সরকার তাঁকে পুরস্কার প্রদান করেন। এছাড়া ২০১৯ সালে তাঁর তেষট্টিতম জন্মবার্ষিকীতে লাকী আখান্দের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গুগল তাদের বাংলাদেশের অনুসন্ধান অংশে গুগল ডুডল প্রকাশ করেন, যেখানে লাকী আখান্দকে তাঁর প্রিয় গিটার ও কালো টুপিতে দেখা যায়।

২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণে ঢাকার আরমানিটোলায় নিজের বাসভবনে লাকী আখান্দের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading