ভূগোল

ট্যাংরা

ট্যাংরা নামটা শুনলেই তেলে ঝালে মাখামাখি ট্যাংরা মাছের কথা বাঙলীর জিভে থুড়ি মনে এসে যায়। তবে পূর্ব কলকাতার প্রাচীন ঐতিহ্যপূর্ণ এই জায়গাটির নাম মোটেই ট্যাংরা মাছের নাম থেকে আসেনি৷ চিনাদের ট্যনারি বা চামড়া প্রক্রিয়াকরণ শিল্প থেকেই নামটির উৎপত্তি ধরা হয়ে থাকে। এখানে চামড়া শিল্প বিস্তার লাভ করেছে, চিনা বাসিন্দার পাশাপাশি এলাকার অনেকেই সেখানে কর্মসংস্থান করে থাকেন৷ নামকরণের ইতিবৃত্তে আমরা ফিরে আসি। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে তৈরি আর্মেনিয় হোলি ট্রিনিটি চার্চ পুরনো কলকাতার অন্যতম প্রধান চার্চ। ইতিহাসে উঁকি দিলে আমরা দেখব আর্মেনিয়ানদের সঙ্গে তুর্কিরাও এসেছিল কলকাতায়। ১৭৯৫-এ বেঙ্গলি থিয়েটার-এর প্রতিষ্ঠাতা গেরাসিম স্টেপানোভিচ লেবেডেভ জাতিতে ছিলেন রাশিয়ান। রাশিয়ার পাশেই অবস্থান করছে বুলগেরিয়া, তুর্কি ও বুলগেরিয়ানদের এক বিশিষ্ট দেবতার নাম ‘ট্যাংরা’। ইনি মহাকাশের দেবতা। চিনারাও এই দেবতার পুজো করত, হতে পারে ‘ট্যাংরা’ স্থাননামটি এসেছে সেখান থেকেই। ১৭১৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী মোগল সম্রাট ফারুকশিয়ারের কাছ থেকে যে ৩৮ টি গ্রামের ফরমান লাভ করেছিল তার মধ্যে একটি ছিল ট্যাংরা।

এই অঞ্চলের সব থেকে উল্লেখযোগ্য স্থান বলতে বোঝায় 'চায়না টাউন ', যেখানে প্রায় দেড়শ দুইশত বছর ধরে বসবাস করছে হাক্কা চায়নিজ সম্প্রদায়। স্বচ্ছন্দ ভাবে বংশ পরম্পরায় তারা বসবাস করছে এবং তারা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। এখানে চামড়াজাত শিল্পের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে চাইনিজ রেস্তোরাঁ, এখানে সাবেকী চাইনিজ খাবার পাওয়া যায়, যা কলকাতার মধ্যে সেরা, যেখানে কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ খাওয়ারের স্বাদ নিতে ভিড় করেন।

ইতিহাস বলে ট্যাংরা একসময় গ্রাম ছিল, বর্তমানে এটি কলকাতা মিউনিসিপালিটির এক্তিয়ারভুক্ত৷ ট্যাংরা এবং তিলজলা, তপসিয়া, ধাপা ইত্যাদি আশেপাশের এলাকাগুলিতে দরিদ্রসীমার নীচে অবস্থানকারী মানুষদের নিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অঞ্চলটির পত্তন হয়৷ বর্তমানে এর সমূহ উন্নতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে৷ ছোটো অঞ্চলের মধ্যেও ধীরে ধীরে জীবনের সতেজতা বিকাশ পায়। নীচু জমি, জলা জমি, খোলা ড্রেন এর মতন সমস্যাগুলি আজ লুপ্ত হয়েছে।

এই অঞ্চলের একটা উল্লেখযোগ্য দেখার জায়গা হল চৈনিক কালী মন্দির। আমরা জানি চা এবং চিনি শিল্প নিয়ে চীনাদের প্রবেশ হলেও কলকাতায় থাকতে থাকতে তারা এই সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ে, যার উদাহরণ বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের এই কালীবাড়ি৷ এখানে মায়ের ভোগ হিসেবে চাইনিজ খাওয়ার দেওয়া হয়, যদিও সেই নুডলস নিরামিষ।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!