এবার লিখুন “বাঙালির নস্টালজিয়া” নিয়ে— এ স্মৃতিচারণ হতে পারে বাঙালির চিরকালীন, অথবা ব্যক্তিগত… সেই হারিয়ে যাওয়া পাড়া, ছোট বেলার খেলা, পুজোর দুপুর, পুরনো গানের সুর, প্রথম সিনেমা দেখা, প্রেমে খাওয়া ছ্যাঁকা, হারিয়ে যাওয়া ট্রাম, সহজ সরল গ্রাম…
এক কথায়, আপনার মনে লুকিয়ে থাকা যে কোনও গল্প বা অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন। চলুন একে অন্যের নস্টালজিয়াকে ছুঁয়ে দেখি…
বাঙালির নস্টালজিয়া
সেই হারিয়ে যাওয়া দিন।সেই ছোটবেলা। বাঙালিএকান্নবর্তী পরিবারের সেই রান্নাঘর … তার জন্য মন টা আজ বড়ো উদাস হয়ে যায়।
সামনে বাগান, পেছনে উঠোন দোতালাবাড়ীটা।একতলায় ছিল
সেই বাড়ির রান্নাঘর। পাশে তার এক বিরাট পুকুর। রান্নাঘরে ছিল মাটির তৈরি পর পর তিনটে নিরামিষ পদ রান্নার উনুন। তার পাশে ছোট্ট একটু ইটের পার্টিশান দেয়া আমিষ রান্নার উনুন। সেবাড়িতে আমিষ নিরামিষ নিয়ে কঠোর নিয়মকানুন মানা হতো কারণ বাড়িটা ছিল গোঁড়া বৈদিক ব্রাহ্মণের বাড়ি। রান্নার দায়িত্বে আমার পিসিমা আর মা। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত সেই উনুনে রান্না বান্না র কাজ চলত। খেতাম সকলে আমরা মাটিতে বসে পিঁড়ি পেতে। তখনকার দিনে সবজির একটা দারুন সুগন্ধ ছিল। শীতের দিনে ফুল কপি, বাঁধা কপি, মুলো, শিম, পালং শাক যা ই রান্না হতো তার গন্ধে খাবা র ইচ্ছেটাও বেড়ে যেতো দ্বিগুণ হয়ে। আর খেতে বসে সবাই মিলে সেই গল্প, আড্ডা, এর ওর পেছনে লাগা সব যেন কোথায়
আজ হারিয়ে গেছে।
অনেকগুলো আছে।
প্রথমেই মনে পড়ে পাড়া কালচার, যা আস্তে আস্তে ফ্ল্যাট কালচারে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। এখনও সমস্ত জায়গায় এই পরিবর্তন না এলেও ধীরে ধীরে অনেকটাই বদলে গেছে। পাড়ার রকে, চায়ের দোকানে বসে সাহিত্য, ক্রিকেট থেকে শুরু করে রাজনীতির আলোচনা খুব মিস করি। আমাদের বন্ধুদের একটা গ্রুপ ছিল। ছাত্রজীবনে বা চাকরিজীবনের শুরুর দিকে রোজ রাতে ৯টার পর নিয়ম করে আমরা সকলে এসে উপস্থিত হতাম। সেই আড্ডা থেকে জন্ম নিয়েছিল আমাদের প্রথম কবিতার সংগঠন, যদিও সেটাও হারিয়ে গেছে কালের অতলে। তারপর আস্তে আস্তে সব কেমন হারিয়ে গেল। এখনও পাড়ার পুরনো কাকুরা যারা আছেন, মাঝে মাঝে বলে যে আমাদের সেই আড্ডা তাদেরও খুব মনে পড়ে। শুধু আড্ডা নয়, পাড়া কালচারের সবথেকে বেশি যেটা মিস করি সেটা হল পাড়ার পরিচিত কুকুর বেড়াল গুলো, যারা বিভিন্ন বাড়িতে নিজেদের একটা ভালবাসার জায়গা করে নিয়েছিল। যদিও বেড়াল কখনও রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে খাবারে মুখ দিচ্ছে এই অভিযোগ প্রায়শই শোনা যেত, তবুও মিলেমিশে থাকার এই ব্যাপারটা দারুণ ছিল। এখন ফ্ল্যাটে থাকার ক্ষেত্রে যেন একটা গণ্ডি টেনে দেওয়া রয়েছে। সেটা ভাল না খারাপ তা নিয়ে কোন মন্তব্য করব না, শুধু পাড়া কালচারটা আমার কাছে যে একটা বড় নস্টালজিয়া, সেটুকুই বলব।
দ্বিতীয় যেটা মনে পড়ে বিয়েবাড়ি বা কোন অনুষ্ঠানবাড়ির যে দৃশ্য। আগে বিয়ের অনুষ্ঠান নিজেদের বাড়িতেই হত। যারা দূর থেকে আসতেন, তাদের জন্য আমাদের আত্মীয় বা পাড়া পড়শিদের ঘরকেই কয়েকদিনের জন্য হোটেলঘর বানিয়ে ফেলা হত। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আত্মীয়দের মধ্যে কাজ ভাগ হয়ে যেত। আমরা ছোটরা কেউ খাবার পরিবেশনের দায়িত্ব, তো কেউ মণ্ডপ সাজানোর দায়িত্ব পেতাম। সেই সময়ের লোহার চেয়ার, সরু টেবিল থাকত। আবার কখনও কখনও কলাপাতাতে খাবার পরিবেশন করা হত। বিয়ের সানাই বাজত। আবার শ্রাদ্ধবাড়ির যে কার্ড ছাপা হত, তাতে গঙ্গা লেখা থাকত, সেই সব এখন দেখা যায় না। গত কয়েক বছরে সেই ব্যাপারটা অনেক বদলে গেছে।
এরপর বলব শীতকালের পিকনিকের যে নস্টালজিয়া। কখনও বন্ধুদের সাথে কারও বাড়ির ছাদে, কখনও বা দলবল নিয়ে কোনও পিকনিকের জায়গায়। এখনও অনেক জায়গায় এই পিকনিকের ধারা বজায় থাকলেও কলকাতা বা আশেপাশের অঞ্চলে পিকনিকের সংজ্ঞা অনেক বদলে গেছে। এখন দলবল বেঁধে বিভিন্ন প্রাইভেট স্পটে মানুষ পিকনিক করতে যায়। যার ফলে দেখবেন রোজ নতুন নতুন প্রাইভেট স্পটের সন্ধান পাচ্ছেন। যাই হোক সেই সময়টা আলাদা ছিল। প্রতি গ্রুপে একজন বা কয়েকজন রাঁধুনি থাকত, কেউ থাকত জোগাড়ে, আবার কেউ শুধুই বসে বসে গল্প শোনাত। খুনসুটির মধ্যে দিয়ে শীতের দুপুর আর রাত পেরিয়ে যেত।
আরও এক নস্টালজিয়া হল নববর্ষের সময় বা নিউ ইয়ারের সময় সপরিবারে বসে অনুষ্ঠান দেখার মজাটা আলাদা ছিল। এখন OTT তে সব কিছু সব সময়ে পাওয়া যায়। অনুপম রায়ের গানের লাইন মনে পড়ে যায় – “সব পেলে নষ্ট জীবন”
কথায় কথায় কলকলায় কথা… রুবাই এর কথার সূত্র (কবিতা সংগঠন) ধরে মনে পড়ে গেল আমাদের সেই “অবাস্তবিক” দলের কথা… সেই দলের সদস্যরা ছিল বিভিন্ন বয়সের, সবার নামের (ডাক বা ভাল নাম) আদ্যাক্ষর নিয়ে দলের নাম – অমৃতা, বাপ্পা (আমি), সন্দীপ, তমোঘ্ন, বিউটি (রনিতা), কৌশিক… প্রতি রবিবার বসত আমাদের সেই আড্ডা, আমার মাসির বাড়ির ছাদে (অমৃতা/রিনিতার বাড়ি)… আমাদের সদ্য লেখা কবিতা পাঠ, সেই নিয়ে আলোচনা… প্রতিটি অবাস্তবিক দলের যা পরিণতি হয় তাই হয়েছিল… ম্যাগাজিন বের করার ইচ্ছে পূরণ হয়নি তখন… তারপর, বেশ কয়েক বছর পর, আমাদের সেই দলের সব থেকে আগ্রহী ও কনিষ্ঠ সদস্য কৌশিকের আত্মহত্যা আমাদের একটা বিশাল ধাক্কা দিয়ে গেল… তৈরি হল কৌশিকতা সোসাইটি। তখন চাকরি জীবন… কয়েকটা উদ্যোগী ছেলেকে নিয়ে শুরু হল আরও ব্যাপকভাবে সাংস্কৃতিক কাজ… সেই সময় কৌশিকের অপূর্ণ স্বপ্ন “মানকর্ষ” লিটল ম্যাগাজিনের হত ধরে পূর্ণ হলো… বছর পাঁচ-ছয় পর সেই সোনার দিনগুলোও শেষ হলো – নিয়ম মেনেই… সেইসব সোনালি দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি… নস্টালজিয়া…
রুবাই ও সম্বিত এর লেখা পড়ে আমার ও কিছু লেখার তাগিদ এলো মনে। আমার ছেলেবেলায় এখনকার মতো বিনোদনের বৈচিত্র্য ছিল না। তখনকার দিনে বেশিরভাগ বাড়িতে ই থাকতো রেডিও। আমাদের বাড়িতে ও ছিল। সেই রেডিও শোনার সময় ও ছিল বাড়ির সব সদস্যদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন। আমাদের রিটায়ার্ড ভাইস প্রিন্সিপাল অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ দাদু ঠিক সকাল এগারোটার মধ্যে মধ্যাহ্ন ভোজন সারতেন। সাড়ে বাড়োটার সময় রেডিওতে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুরু হতো। তাই তিনি শুনতেন । তখন থেকেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, পঙ্কজ মল্লিক, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, কনিকা, সুমিত্রা সেন আরও কতো নাম, তাঁদের গান শুনতে শুনতে কথা ও সুর গুলো মাথায় গেঁথে গেছিল।তার পর বেলা একটায় শুরু হতো খবর। দেড়টায় শুরু হতো সুগম সঙ্গীত। বুধবার দুপুরে বেলা দের মহিলা মহল। এটা মা, ঠাকুমার শোনার সময়। সন্ধেবেলা হতো পল্লী মঙ্গল, তার পর খবর। তখন বাবা, কাকা বাড়ির সবাই মিলে শোনা হতো। শুক্রবার রাতে নাটক হতো। ভালো ভালো নাটক। রবিবার সকালে শ্রদ্ধেয় পঙ্কজ মল্লিক এর সঙ্গীত শিক্ষার আসর। তার পর হতো শিশু মহল। খুব ভালো লাগতো। রবিবার রাতে হতো ছায়াছবির গান। এটার শ্রোতা মূলত মা, কাকা ও কাকিমা। যেহেতু আমি ছোট ছিলাম, আর আমার ভাই বোনেরা আমার থেকে অনেক ছোট তাই বাড়ির সবার সাথে ই মানে ডালে ঝোলে অম্বলএ সব ধরনের রেডিও অনুষ্ঠান শুনতে শুনতে বড়ো হয়েছি। ও আর একটা কথা মনে পড়ল। তখন বাড়িতে আসতো বেতার জগৎ মানে আকাশবাণীর অনুষ্ঠান সূচী সম্বলিত পত্রিকা। এখনকার ছেলে মেয়েরা রেডিও শোনে কতটা জানিনা।
আলো কাকিমা রেডিওর সেইসব দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিলেন। আমাদের ছোটবেলায় বাড়িতে টিভি ছিল না। সকাল থেকে শুরু হয়ে যেত রেডিও – একদম “বন্দে মাতরম” থেকে…শেষ হত রাত্রে… সকাল 6:20 তে খবর, ছোট থেকে খেলার খবরে আগ্রহ ছিল, সেটা সবার শেষে বলত… সাতটায় হতো প্রাত্যহিকি – বিভিন্ন চিঠি পাঠ করা হয়, খুব সুন্দর সুন্দর সেসব চিঠি শুনতে ভাল লাগত…
ছোট থেকেই অভ্যেস রেডিও শুনতে শুনতে অঙ্ক করা বা লেখার কাজ.. কাকিমা যেমন বললেন, শিশু মহল, শুক্রবারে নাটক এগুলো ছিল বিশেষ আকর্ষণ। বিকেলে গল্প দাদুর আসর অবশ্য কম শোনা হত, ওই সময় খেলতে চলে যেতাম মাঠে…
সেসময় রেডিও ছিল আমাদের ঘড়ি, কখন কী হচ্ছে সেই শুনে বুঝে যেতাম কটা বাজছে।
11/12 এ পড়ার সময়, আকাশবাণীর (ক , খ) অনুষ্ঠান শেষের পরেও অঙ্ক করার জন্য শুনতাম বাংলাদেশের রেডিও.. তখনই বাংলা দেশের ব্যান্ড মিউজিক এর সঙ্গে পরিচয়… তারপর তো গান শোনার অভ্যেস শুরু হলো ক্যাসেটে… সেও তো এখন নস্টালজিয়া, পুরোনো টেপ রেকর্ডারটা সারানোর ইচ্ছে হয় কিন্তু আর হয়ে ওঠে না, কিছু ক্যাসেট আছে যার গান অনলাইনে পাই না…
কাকিমা একটা প্রশ্ন রেখেছেন, এখন আর লোকে রেডিও শোনে কিনা.. সত্যি, মাঝে রেডিও একদম উঠে যেতে বসেছিল.. তবে এফএম মনে হয় আবার শ্রোতাকে ফিরিয়ে এনেছে কিছুটা… তবে অনলাইন গান শোনা অনেকাংশে রেডিওর গান শোনা কমিয়ে দিয়েছে কিন্তু রেডিওতে ‘হঠাৎ করে ভেসে আসা পুরোনো গান’ একটা অন্য জগতে নিয়ে যায় যার পরিপূরক ‘বেছে নেওয়া প্লে লিস্ট’ কখনোই নয়…
সম্বিতের র লেখা পড়ে ভীষণ ভালো লাগলো।
কারণ —
বাঙালির নস্টালজিয়া য় রেডিও এমন একটা বিষয় যা আমায় বড়ই আবেগ তাড়িত করে। বেশ কিছু দিন আগে কোনও একটা ওয়েব জিনে ” “ডায়রির পাতা থেকে ‘” এই নাম দিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। জানি না কজন সে লেখা পড়েছেন। তবে আজ সকালে সম্বিতের রেডিও আমায় ফের সেই আমার রেডিও শোনার দিন গুলোতে আর আকাশবাণী কলকাতা র সেই বাড়িটাতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছিল যেটা ছিল আমার স্বপ্নের বাড়ি।আর সেই বাড়ি থেকে বাতাসে ভেসে যাদের কণ্ঠস্বর আমার কানে পৌঁছাত তাদের সাক্ষাতের স্মৃতি আমায় আবার স্মৃতিমেদুর করে তুললো। সম্বিত কে অনেক ধন্যবাদ আমার সেই দিনগুলোকে কে নতুন করে আবার মনে করিয়ে দেবার জন্য।
বিষয়ে রেডিও সম্বন্ধে
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
