সববাংলায়
স্মৃতিচারণ: রথযাত্র…
 
Notifications
Clear all

স্মৃতিচারণ: রথযাত্রা

3 Posts
2 Users
1 Reactions
359 Views
সববাংলায় বৈঠক » সববাংলায়
Trusted Member Admin Registered
Joined: 9 বছর ago
Posts: 47
Topic starter  

রথযাত্রা নিয়ে আপনার স্মৃতিকথা লিখুন এখানে। আগে কীভাবে রথের মেলা বা রথের দিনগুলো কাটাতেন আর এখন কীভাবে কাটান তারও তুলনামূলক আলোচনা করতে পারেন… আসুন স্মৃতিচারণ করি সেইসব নিয়ে… 



   
Quote
সববাংলায় বৈঠক » সববাংলায়
New Member
Joined: 2 বছর ago
Posts: 1
 

লেখার দৈর্ঘ্য দীর্ঘ হওয়ার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।

 

রথের রশি

 

সেই ছোটবেলা থেকেই রথযাত্রাটাকে কেন জানিনা ঠিক ধর্মীয় উত্‍সব বলে মনে হয় না। রথের গল্প শুনতাম ঠাকুমার কাছে। জগন্নাথদেব দুই ভাইবোন বলরাম আর সুভদ্রাকে নিয়ে রথে চড়ে মাসির বাড়ি যান। আবার সাত দিন পরে ফিরে আসেন নিজের বাড়িতে। সেটা উল্টোরথ। এই আসা যাওয়ার ব্যাপারটায় বেশ মজা লাগত। জগন্নাথের মন্দির পুরীতে। রথে সেখানে নাকি মহা ধূমধাম হয়। লাখ লাখ মানুষ রথের দড়ি ধরে টান দেয়। চৈতন্যদেবও রথযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন। চৈতন্যদেব আর পুরীর কথা এলেই মনে পড়ে ঠাকুমা বলত, নীল সমুদ্রের মধ্যে কৃষ্ণরূপ দেখে তাকে আলিঙ্গন করতে গিয়ে ঊষাকালে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যান চৈতন্যদেব। ছোট থেকেই এই গল্প বিশ্বাস করার কোন কারণ খুঁজে পাই নি। ঠাকুমাকে বলেও দিতাম, এইসব গাঁজাখুরি গল্প তুমি কোথা থেকে পাও? গলাটা একটু নামিয়ে, যেন কোন গোপন কথা বলছে এমনভাবে বলত , বিশ্বাস আমিও করি না ভাই। সমুদ্র যা নেয় তা আবার ফিরিয়ে দেয়। কৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে মহপ্রভু যদি সমুদ্রের মধ্যেই চলে যেত তবে ডুবে মরত। আর তার নশ্বর দেহ ঢেউয়ের টানে ভাসতে ভাসতে এসে পড়ত সৈকতে। একটা জলজ্যান্ত মানুষ উধাও হয়ে গেল! তারপর গলা আরও নামিয়ে কেউ যাতে শুনতে না পায় এমনভাবে স্বগতোক্তির স্বরে বলত, নিমাই খুনই হয়েছে। পরে বাবাকেও জোর গলায় বলতে শুনেছি পুরীর ধর্ম ব্যবযায়ীরা মন্দিরের মধ্যে খুন করে চৈতন্যদেবের দেহ লোপাট করে দেয়। এই বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় যে বাবা পুরীতে গেলেও জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করে না। 

 

হচ্ছিল রথের কথা। কোথা থেকে কোথায় চলে গেলাম। আসলে প্রথমেই বললাম না রথযাত্রাকে ধর্মীয় উত্‍সব বলে মানতে পারি না। সত্যি মিথ্যে যাই হোক উপরের শোনা ঘটনাগুলো এমন প্রভাব ফেলেছিল যে রথ টানার সময় পুরী, জগন্নাথ এগুলোর কোন আলাদা গুরুত্ব অনুভব করতাম না। ছোটবেলায় রথযাত্রা ছিল এক নির্মল অনাবিল আনন্দের উত্‍সব। একদম কচি বয়েস মানে ক্লাস থ্রি-ফোর পর্যন্ত রথ সাজিয়ে দিত মা। তারপর বছর দুই মায়ের তত্বাবধানে রথ সাজানো শেখা। বছর ছয়েকের ভাইটাকে সাগরেদ করে যখন নিজেই রথ সাজান শুরু করলাম আমি তখন দুপুরের স্কুলে। আগের দিন থেকেই শুরু হয়ে যেত প্রস্তুতি। বিকেলে খেলার মাঠ থেকে ফিরেই রথ সাজানোর পালা। বাড়ি ফেরার আগেই মা বাথরুমের তাক থেকে কাপড় জড়ানো রথ নামিয়ে ময়লা ঝেড়ে , রথের গায়ে লাগানো পুরোনো কাগজ ছিঁড়ে ঘরের কোণায় দাঁড় করিয়ে রাখত। স্কুল থেকে আসার পথেই নিয়ে আসতাম মার্বেল কাগজ। আর মাঠ থেকে ফেরার পথে পাড়ার কাকু-জ্যেঠুদের বাড়ি থেকে পাতাবাহার আর ঝাউ গাছের পাতা।

 

তিনতলা রথের মাঝখানের খোঁপ থেকে বেরোতেন জগন্নাথ – বলরাম – সুভদ্রা। কখনো ঘাড় নড়ে গেছে তো কখনও বা কোমর ভাঙা। আগের বছরের রথযাত্রার ধকল। বাবা নিপুণ হাতে জুড়ে দিত। একবার মূর্তির উপর সার্জারি শেষ করে বাবা বললেন – এবার ভাঙলে আর কিছু করা যাবে না। জোড়া লাগানোরও একটা সীমা আছে। রথ সাজানো হয়ে গেলে বলিস। মূর্তি আমি বসিয়ে দেব। মার্বেল কাগজ, পাতা ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হত রথ। তারপর মায়ের পুরোনো সিল্কের কাপড় কেটে তিনকোণা রক্তবর্ণ পতাকা রথের মাথায় লাগিয়ে দিয়ে বাবার জন্য অপেক্ষা। বাবা তিন মহল্লা ছোট রথটার মাঝখানের তলায় তিন ভাইবোনকে আঠা দিয়ে আটকে দিত। তারপর সরু তার দিয়ে বেঁধে দিত রথের দেয়ালের সাথে। সরু এক ফালি কাপড় এমনভাবে মূর্তিগুলোর কোমরে পেচিয়ে দিত যে তারগুলো দেখা তো যেতই না, কাপড়টাকে মনে হত কোমড়বন্ধ। এখন ভাবি আর অবাক হই। যে ভদ্রলোক জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করেন না ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ীদের উপর বিতৃষ্ণায় তিনিই কি পরম যত্নে মূর্তিগুলোকে সাজিয়ে দিতেন, যাতে ছেলেদের আনন্দ উপকরণে কোন খামতি না থাকে। 

 

যখন সন্ধ্যে হব হব, স্ট্রীট লাইটগুলো জ্বলতে শুরু করত এক এক করে, রথ তৈরী হত পথে নামার জন্য। রথের নিচের তলাটায় রাখা থাকত এক ঠোঙা নকুল দানা, ছোট মোমবাতি আর দেশলাই। একটা ছোট থালায় কয়েকটা নকুলদানা আর ছোট একটা গ্লাসে জল রাখা হত। মোমবাতি দিয়ে সাজান হত রথের প্রতিটা তলার ধারগুলো। বাড়ির বাইরে রথ বেরোনোর আগে একটা ফুলের মালা ঠাকুমা ঝুলিয়ে দিত রথের চূড়ো থেকে। তারপর প্রণাম করে থানের গিট খুলে একটা দশ পয়সা রেখে দিত জগন্নাথের পায়ে। প্রণামী। বাড়ি থেকে গলির মোড় পর্যন্ত ছিল সীমানা। এর মধ্যেই রথ টানা হত। রথ পথে নামার পর শুরু হত আসল যুদ্ধ। গর্তে ভরা অসমান রাস্তা দিয়ে রথ টেনে নিয়ে যাওয়াটা সহজ কাজ নয়। তার উপর আবার লড়াই। রথের রশি কার হাতে থাকবে তা নিয়ে। সে লড়াই স্থায়ী হয়নি কোনওদিন। ভাগাভাগি করেই রথ টেনে নিয়ে গেছি দুই ভাইয়ে। মাঝে মাঝে মোমবাতি নিভে গেলে আলো জ্বালিয়ে নেওয়া। নিজেদের রথ যে শুধু নিজেরাই টেনে নিয়ে যেতাম তা নয়। যাদের রথ ছিল না তারাও হাত লাগাত রথের দড়িতে। সবাই মিলে বন্ধুর পথে রথ টেনে নিয়ে যাওয়ার যে আনন্দ সেখানে ধর্মের কোন স্থান ছিল না। পথ চলতি পাড়ার বড়রাও মাঝে মাঝে একটু রথ টেনে দিত। কি রে প্রসাদ দিবি না? হাতে দুটো নকুল দানা দিলেই পাঁচ বা দশ পয়সার প্রণামী পড়ত জগন্নাথদেবের পায়ে। 

 

ঘন্টা খানেক রথ টানার পর বাড়ি ফিরে রথের স্থান হত ঠাকুরের আসনের পাশে। থাকত  উল্টোরথ পর্যন্ত। এক নির্ভেজাল আনন্দের জন্য আবার এক বছরের অপেক্ষা। 

 

একটু বড় হয়ে বুঝেছি জগন্নাথ আসলে শবরদের দেবতা। দেশীয় জনজাতির অন্য অনেক সামাজিক, ধর্মীয় প্রথার মত জগন্নাথকেও আত্মস্থ করেছে প্রাতিষ্ঠানিক হিন্দু ধর্ম। ফলে রথযাত্রায় ধর্মের ব্যাপারটা মনের মধ্যে কিছুতেই স্থান পায় না। এটা নিছকই এক নির্মল আনন্দ। যা শুধু শিশুদেরই মানায়। তাদের এক সাথে পথ চলা শেখায়। প্রতি বছর কচি হাতগুলোর রথ টানা দেখি আর ফিরে যাই রথের রশি হাতে ছোটবেলার আনন্দ সন্ধ্যায়। পাশের পাড়ায় একটা বড় কাঠের রথ ছিল। রথের দিন সন্ধ্যেবেলা সেই রথ নিয়ে বের হত বড় দাদারা। কাসর, ঘন্টা বাজাতে বাজাতে যেত গলির মধ্যে দিয়ে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আমরা যারা দেখতাম, সবার হাতে গুঁজে দিত বাতাসা। সেই সব সন্ধ্যার স্মৃতি নিয়ে পথে হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম রথ নিয়ে শোভাযাত্রা বেরিয়েছে। গত কয়েক বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে চারপাশে যা গত চার দশকের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে নেই। গণপতির আরাধনা সার্বজনীন রূপ নিয়েছে, রামনবমীর উন্মাদনার আঁচ পেয়েছে শহর নগর। হুজুগের পালে হাওয়া লাগিয়ে মোক্ষলাভ করতে চেয়েছে ক্ষমতার কারবারীরা। তার রেশ রথযাত্রাতেও। রশির দখল নিয়ে লড়াইয়ের পরিণতি চোখের সামনে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম আপাদমস্তক এল ই ডি লাইট দিয়ে মোড়া, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে ফুল, পতাকায় শোভিত রথের পিছনে বেশ কিছু মানুষ ‘জয় জগন্নাথ’ বলতে বলতে ছুটছে। 

 

ধীরে ধীরে মিছিল শেষ হল। একদম পিছনে একটা বছর পাঁচেকের বাচ্চা। মায়ের হাত ধরে চলেছে। ভদ্রমহিলার অন্য হাতে ধরা প্রাতিষ্ঠানিক উন্মাদনার সামনে হারিয়ে যাওয়া নির্মল আনন্দের প্রতীক বাচ্চাটার ছোট্ট রথটা।

 



   
ReplyQuote
সববাংলায় বৈঠক » সববাংলায়
Trusted Member Admin Registered
Joined: 9 বছর ago
Posts: 47
Topic starter  

@রাজীবদা, অসাধারণ লিখেছো। ছোটবেলার রথ সাজানোর স্মৃতির সঙ্গে চৈতন্যদেব মৃত্যুরহস্য, বর্তমান সময়ের হিন্দিবলয়ের অতি হিন্দুত্ব, আর তারপরেও আশার আলো… 👍 



   
ReplyQuote

সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।