(কেউ যখন কিছু লিখছেন না, তখন আমিই শুরু করি, পুস্তক পর্যালোচনা কোনদিন করিনি, এটি একটি পুরনো লেখা, তাই তুলে দিলাম।)
মৌষলকাল (সমরেশ মজুমদার, প্রকাশ: ২০১৩) পড়লাম। বলা ভাল গিললাম দুদিনে। উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষের পরবর্তী খন্ড। অনিমেষ মাধবীলতা যেভাবে বাঙালির জীবন ছুঁয়ে আছে, বইটা হাতে পেতেই তাই আর তর সয়নি। আর অবশ্যই লেখকের সেই গুণটা আছে যে একবার ধরলে শেষ না করে থামা যায় না। অতএব…
কিন্তু বইটা পড়ে মন ভরল না। বারবার মনে হচ্ছিল, গাঁজা খেয়ে লিখেছেন কিনা! এত জঘন্য রকমের গন্ডগোল যে গোগ্রাসে গেলার সময়ও চোখ এড়িয়ে যায় না! কেন জানি না মনে হচ্ছিল সমরেশবাবু বইটা লেখার পর নিজে একবারও পড়ে দেখেননি। কোথাও অনিমেষ এর নাম হয়ে গেছে অর্জুন! কোথাও বলছেন বাহান্ন বছর পর জলপাইগুড়ি গেছে অনিমেষ, আবার কোথাও তিরিশ বছর! বাহান্ন বছরটা কোন ভাবেই হিসেবে মেলে না! একই লোক বার বার নিজের ফোন নাম্বার দিচ্ছে অনিমেষকে (যদিও কোথাও নাম্বার হারিয়ে ফেলার কথা নেই!)। চল্লিশ বছরের অর্ককে প্রথমে বলা হল সেপারেটেড, এবং বঊ ডিভোর্স দিচ্ছে না বলে অর্কও চাইছে না। অথচ শেষের দিকে অর্ক বার বার বলেছে সে অবিবাহিত, যদিও অর্ক চরিত্রটি মিথ্যা বলার প্রয়োজন না হলে মিথ্যা বলে না। অথবা এই মিথ্যা বলার কোন কারণ লেখক দেখিয়ে রাখলে পারতেন। এই সব ভুলগুলো দুয়েকবার রিভিশন দিলেই ধরা পড়ত…
গল্পের সময়কাল মোটামুটি ২০০৬/০৭ থেকে ২০১৩। সময়ের দিকে চোখ বোলালেই বোঝা যেবে তখন সিঙ্গুর কান্ড, নন্দীগ্রাম কান্ড ঘটছে, পালাবদল ঘটছে। বিষয়বস্তুও সেটাই। অথচ গোটা বইতে একবার মাত্র সিঙ্গুর শব্দটা এসেছে, তাও নন্দীগ্রামের সূত্র ধরে। এমন ভাবে উনি লিখেছেন যেন নন্দীগ্রাম প্রথম, এবং মমতা ব্যানার্জী ও তৃণমূলের উত্থান শুধুমাত্র নন্দীগ্রাম এর আন্দোলনের সময়েই হয়েছে!
নন্দীগ্রাম পরবর্তী সময়ের থেকে এমন ফাস্ট ফরওয়ার্ড মেরেছেন যে ২০০৯ এর লোকসভা ভোটে বামেদের হার বেমালুম ভুলে গেছেন! যেন নন্দীগ্রামের পরেই ২০১১ –র ভোট হয়েছে ও তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে। এবং পরবর্তী দুবছরের কার্যকলাপে নীচের তলার তিনু নেতাদের উপর ক্ষোভ দেখালেও মমতা ব্যানার্জীর উপর অগাধ আস্থা দেখিয়েছেন! অবশ্য এই ব্যাপারটিতে লেখককে দোষ দেওয়া যায় না – আমাদের মতোন দু’চারজন অর্বাচীন ছাড়া মমতা ব্যানার্জীর উপর আস্থা ২০১৩ অব্দি অনেকেই দেখিয়েছেন – এমনকি এখনও দেখিয়ে চলেছেন!
বাম ফ্রণ্টের ক্ষয়, সেই সময়ের সমস্ত নেতাদের দম্ভ, উপর তলা থেকে নীচের তলা অব্দি অনাচার, পুলিশের দলদাসত্ব এই সব উঠে এসেছে ঠিকঠাক। এ বিষয়ে কিছু বলার নেই। তবে যেভাবে মাও সংযোগ ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কথা লিখেছেন স্পষ্টতই বোঝা যায় যে এই আন্দোলন তিনি খুব দূর থেকে দেখেছেন। কালবেলা উপন্যাসে যে ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সেই সময়ের নক্সাল রাজনীতি তার ধারে কাছেও আসে না মৌষলকালের মাও বা তৃণমূল রাজনীতির ঘটনা। পালাবদলের সময়ের এই রাজনীতি আরেকটু গভীরে ছুঁতে পারলে ভাল হত! অন্তত অর্ককে যখন তৃণমূলে ভেড়ালেনই তখন আরেকটু ভিতরে ঢুকতেই পারতেন! আমরা যারা এই সময়ের মানুষ তারা সিঙ্গুর–নন্দীগ্রাম–পালাবদল মোটামুটি জানি, কিন্তু কালবেলা যেমন সত্তরের দশক আমাদের কাছে তুলে ধরেছিল মৌষলকাল সে ভাবে আগামী প্রজন্মের কাছে এই পালাবদলের ঘটনা তুলে ধরতে পারবে না! তাই কালবেলার মত কালোত্তীর্ণ বই এটি হয়ে উঠবে না।
শেষটা করতে চেয়েছেন সিক্যুয়েলের কথা ভেবে কিনা জানি না, কিন্তু যিনি বারবার বলছেন ২০১৩ তে এসে মানুষের মানসিকতার বদল হয়েছে বা হওয়া উচিত – ‘দুজন পুর্ণ বয়স্ক পুরুষ ও নারী বন্ধু হতেই পারে’ এবং অর্ক–কুন্তী নিজেরাই নিজেদের বন্ধু বলে এসেছে সেখানে শেষ করার সময় ‘কুন্তী মাধবীলতা হতে পারবে কি?’ বলার কি কোন যুক্তি থাকে!! লেখক জানেন তাঁর মাধবীলতা–অনিমেষ গাথা বাঙালিদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী যায়গা করে নিয়েছে তাই এই ছোঁয়াটা দিতে চাইলেন, অথচ অর্ক ও কুন্তীর মধ্যে সেরকম কিছু ব্যাপার এই বইয়ে অন্তত গড়েই ওঠেনি!
বইয়ের রিভিউ লেখার অভ্যেস কোনদিনই নেই, এটা কোনও ভাবে রিভিউ বলাও সঙ্গত হবে না। তবু, অনিমেষ–মাধবীলতা–অর্ক প্রেমীদের জন্যে লিখলাম… আর কোন কুন্তীর যদি এই লেখা ভাল লেগে যায় সেটা তো উপরি পাওনা…
পুনশ্চঃ বইটা কি তা হলে পড়বেন না? অবশ্যই পড়বেন – তবে পড়ে যদি মনে হয় সময় নষ্ট হল তাহলে আমাকে গালি দেবেন না!
খুব সুন্দর পর্যালোচনা। সোজাসাপটা কথা সোজাভাবে বলা। এভাবেই আরও বইয়ের রিভিউ দাও, পাঠকদের উপহার হবে বলেই আমার ধারণা।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
