সববাংলায়

ডুয়ার্স ডায়রি ।। প্রথম পর্ব ।। যাত্রা শুরু

বিভাগঃ

অনেক…অনেক বার শুনেছি এই নামটা। প্রথম শুনেছিলাম ক্লাস নাইনের ভূগোল বইতে। তারপর বন্ধুদের মুখে যারা ঘুরে এসে বলেছিল কিংবা ঘুরতে যাওয়ার আগে।তারপর দেখেছি আরেকটু বড় হওয়ার পর টি.ভি তে, বেড়াতে যাওয়ার ম্যাগাজিন গুলোয়।আরো বড় হওয়ার পর বাড়ি থেকে,বন্ধুদের সাথে চেষ্টা করেছিলাম অন্তত চারবার।চারবার চেষ্টা করেছিলাম ডুয়ার্সকে ছোঁয়ার।প্রতিবারই ব্যর্থ।টিকিট কেটে, হোটেল বুক করেও শেষ অবধি কোন না কোন কারণে বাতিল করে দিতে হয়েছে।জীবনের ১৫টা বছর কেবল শুনেই এলাম,ছবি দেখেই এলাম অথচ ছুঁতে পারলাম না।এ অনেকটা সেই ছেলেটার মত যে কৈশোরে এসে হঠাৎ জানতে পারে যে মা’কে সে ছোট থেকে দেখে আসছে,তার বাইরে আরেকটা মা আছে তার।সেই মা’ই আসল।তার ছবি দেখল সেই প্রথমবার।তারপর থেকে বারবার গল্প শুনে এসছে মায়ের।কিন্তু মা কে সামনে থেকে দেখেনি কখনো।

এ বছর সেই কিশোর যখন মা’কে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পেল তখন সে যুবক।ডুয়ার্সকে ছুঁলাম অবশেষে।মানুষ যখন প্রথবার অধরা কে স্পর্শ করে, মানুষ যখন প্রথমবার প্রকৃতির কোলে এসে মাথা গোঁজে, সেই অনুভূতির কোন ভাষান্তর হয় না।ট্রান্সলেশন হয় না সেই বিস্ময়ের।ডুয়ার্স পশ্চিমবঙ্গের উত্তর পৃথিবীকে ভারতের হয়ে যে ভারতেও এমন এমন এক জায়গা আছে যা সুইজারল্যান্ডকে নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবার যোগ্যতা রাখে, ডুয়ার্স বাংলার উত্তর, বাংলার হয়ে ভারতকে এই বাংলায় এমন গহীন অরণ্যও আছে যেখানে বাইসনের দুই শিং এর মাঝে সূর্যাস্ত হয়, যেখানে পাহাড়ে পাহাড়ে নীরব প্রতিযোগিতা চলে বিশ্ব সুন্দরীর খেতাব নিয়ে।

জীবনের প্রথম জন্মদিন এইবার কাটালাম গণ্ডারের সাথে ময়ূরের পায়চারি দেখতে দেখতে।ডুয়ার্স এর পাহাড়ে পাহাড়ে নাম না জানা পাখির গানের রেওয়াজ শুনতে শুনতে।জীবনের প্রথম জন্মদিন কাটালাম আলো, কেক ছাড়াই, সভ্যতার থেকে অনেক দূরে সেই আদিম মায়ের কোলে, যেখানে হ্যাপি বার্থ ডে সং পৌঁছয় না, নেটওয়ার্ক পৌঁছয়না, সূর্যের উত্তাপ পৌঁছয় না।

ডুয়ার্সকে স্পর্শ করার, তার রূপ রস গন্ধ আস্বাদনের প্রতিটা মুহূর্ত, বিস্ময়ের প্রথম প্রকাশে মিশিয়ে দিচ্ছি আজ।মিশিয়ে দিচ্ছি বৃষ্টিভেজা পাহাড়ি নদীর বুকে পেনের কালির একটা একটা ফোঁটা।আমরা দুই বন্ধু শহর থেকে শহর,শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে উপত্যকা, উপত্যকা থেকে তরাই, তরাই থেকে গহন অরণ্য ভ্রমণে যেটুকু শিখলাম, জানলাম, দেখলাম, শুনলাম সবটুকু আজ ছড়িয়ে দিলাম এখানে।

২৯শে মে সকাল ৯.৩০টা

আধঘন্টা হল আমরা বাংলোয় এসে পৌঁছেছি।তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস যখন নিউ ময়নাগুড়ি স্টেশনে নামিয়ে দিল তখন সবে সূর্যের আলো ফুটছে। ছোট্ট স্টেশন। শহরতলির স্টেশন যেমন হয় আর কি।

ডুয়ার্স ডায়রি ।। প্রথম পর্ব ।। যাত্রা শুরু » সববাংলায়
চিত্রগ্রহণঃ লেখক

এখান থেকে আমরা যাব বক্সা টাইগার রিজার্ভ।ষ্টেশনে আমাদের জন্য গাড়ি রাখাই ছিল। যে বাংলোয় এখন আছি সেখান থেকেই পাঠিয়েছে।নিউ ময়নাগুড়ি স্টেশন থেকে  প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা মত লাগল আমাদের বক্সা পোঁছতে।আরো একটু কমই লাগত যদি না হাতির ভাঙা গাছের গুঁড়ি রাস্তা আটকে থাকত। ময়নাগুড়ি স্টেশন থেকে লাটাগুড়ি ফরেস্ট বাংলো পেরোতেই পরিবেশটা হঠাৎ করে কেমন যেন পাল্টে গেল।লাটাগুড়ি থেকে ময়না গুড়ি স্টেশন প্রায় ২৮ কিলোমিটার।এই আঠাশ কিলোমিটার পথের সাথে এ দেশের যেকোন শহরতলির কোন ফারাক নেই।কলকাতা শহরের চেনা চৌহদ্দিটা এখনো যেন পেরোনো গেল না, এই ভাবতে ভাবতে কখন যে আমাদের গাড়িটা লাটাগুড়ি এসে গেছে বুঝতেই পারিনি।আমাদের গাড়িটা একটা রেল ক্রসিংয়ে এসে দাঁড়ালো। ওপারে দেখতে পাচ্ছি ঘন জঙ্গল।আমরা যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছি সেটা NH-31।উত্তরপ্রদেশের উন্নাও তে শুরু হয়ে ময়নাগুড়ি পেরিয়ে টিলাবাড়ি মোড় থেকে সোজা গরুমারা ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে দিয়ে একেবারে মালদার কাছে সামসিতে এসে শেষ হয়েছে এই হাইওয়ে।যে রেল ক্রসিংএ দাঁড়িয়ে আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি Nh-31 কে আড়াআড়ি কেটে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে।দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ট্রেন আসছে।এরকম পরিবেশ আগে দেখিনি। সভ্য শহর আর আদিম বনের লম্বা হাইওয়ে আর অনন্ত সমান্তরাল রেললাইন মানুষের সেই অনন্ত চেষ্টাকে বোঝায় প্রকৃতির বুকে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে।ট্রেনের গতি যত শুনতে পাচ্ছি মনে হচ্ছে ভিতরের যাত্রীরা জানলার দুইপাশ থেকে কেবল সারিবদ্ধ ঘন গাছের সারি দেখবে চাষজমি, বস্তি, দোকান, প্ল্যাটফর্ম এসবের বাইরে গিয়ে। মনে পড়ছে কাগজে পড়েছি এরকম ট্রেনেই তো ধাক্কা লেগে রাতের অন্ধকারে হাতি মারা যায়।এই গভীর অরণ্যের বুক চিরে ছুটে চলা আমাদের কাছে জয়রাইড হতে পারে কিন্তু এ বনভূমি যাদের, তাদের তো এই রেললাইন, এই আওয়াজ, জোর করে জবরদখল মনে হবেই।ট্রেন চলে যেতেই সামনে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল সোজা।

ডুয়ার্স ডায়রি ।। প্রথম পর্ব ।। যাত্রা শুরু » সববাংলায়
চিত্রগ্রহণঃ লেখক

আমাদের আহ্বান জানালো গরুমারা ন্যাশনাল পার্ক তার আকাশ চুম্বি গাছের সারি আর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা দিয়ে।আমরা চলেছি এখন গরুমারার মধ্যে দিয়ে।

 

(চলবে…)


 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।