২৯শে মে বেলা ১০.৩০টা
প্রায় ১,৩০০ বর্গকিলোমিটার জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই গরুমারা।যাবার পথে দেখতে পাচ্ছি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে বোর্ড লাগানো -গাড়ি আস্তে চালান।এটা হাতি পারাপারের রাস্তা।আসলে ন্যাশনাল হাইওয়ে গরুমারার যে অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে গেছে সেই অঞ্চলগুলো হাতির যাতায়াতের মধ্যে পড়ে।এগুলো কে করিডর বলে।আমরা দেখতে পেলাম জায়গায় জায়গায় এরকম বোর্ড অনেক লাগানো।

হাতির বোর্ড ছেড়ে এগিয়ে ডান হাতেই দেখতে পেলাম লেখা বাইসন করিডর।উত্তেজনায় আমার বুক কাঁপছে।জীবনে প্রথমবার এমন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি , যে রাস্তাটা আসলে আমাদের না।কোন মানুষেরই না।জোর করে নিজেদের সুবিধার জন্য দখল করেছি না মানুষদের এই রাস্তা।এ রাস্তায় তাদের অধিকারের ঘোষণা আবার আমরা মানুষই কিন্তু করেছি।দু পাশে শাল, সেগুন, শিরিষ, শিমুল ও আরো কত নাম না জানা গাছ এত গভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে কোথাও এই সকালেও সূর্যের আলো ঠিক মত প্রবেশ করতে পারছে না।হঠাৎ দেখি সামনে একটা ময়ূর আস্তে আস্তে রাস্তা পার হচ্ছে।এই পাখিটিকে চিরকাল খাঁচায় দেখে এসেছি।আজ প্রথমবার এত সামনে থেকে তার দেমাক ছড়ানো হাঁটা দেখার সুযোগ সামলাতে পারলাম না।গাড়িটা থামাতে বলে উত্তেজনায় ক্যামেরা নিয়ে নেমেই পড়লাম গাড়ি থেকে।

পেখমটা গোটানো।এত বড় যে শেষপ্রান্ত টা মাটিতে ঠেকে গেছে।আমি এক পা এক পা করে এগোতে লাগলাম ।আমাকে দেখে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল।ডান দিকে ঘাড়টা ঘুরিয়ে বেশ খানিক্ষন আমাকে দেখতে লাগল।আমি ততক্ষন ক্যামেরার ফোকাসটা ঠিক করছি।শাটার টেপবার আগেই তীর বেগে সামনের জঙ্গলে ঢুকে গেল।একটুর জন্য এমন একটা দুর্দান্ত শট মিস হয়ে গেল বলে নিজের ওপরই রাগ ধরে গেল খুব।লেন্স ক্যাপটা লাগিয়ে পেছন ফিরতেই দেখলাম গাড়ি থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছি।আমার আর গাড়ির মাঝে প্রায় ১০ মিটার মত ব্যাবধান।যার মানে দাঁড়ায় হয় আমাকে গাড়ির দিকে এগোতে হবে নয়তো গাড়িকে আমার দিকে আসতে হবে।মাঝের এই সময়টায় আমি একেবারে সরাসরি এই জঙ্গলের মাঝে সম্পূর্ণ একা।আমি বুঝতে পারছি কেমন যেন এক শিহরণ আমার পা থেকে ধীরে ধীরে পিঠের দিকে উঠছে।কি এক অমোঘ নির্দেশে কোথাও কোন আওয়াজ নেই। এই বিশাল বনের মাঝে, ওই আকাশ ছোঁয়া গাছগুলোর তলায় নিজেকে কি ভীষণ অসহায় আর তুচ্ছ মনে হচ্ছে বলে বোঝাতে পারব না।গাছে গাছে হঠাৎ গর্জন শুরু হল।এই আওয়াজ আমার চেনা।জয়পুরের জঙ্গলে যখন রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি তখন এই রকম গর্জন প্রথম শুনেছিলাম।যারা জঙ্গল ঘোরেন নিয়মিত তারা জানেন জঙ্গলের একটা নিজস্ব শব্দ আছে, গন্ধ আছে।গাছে গাছে যখন হাওয়ার ঝাপট লাগে,তখন যে শব্দ তৈরী হয়, সেটা এক গাছ থেকে আরেকগাছে ছড়িয়ে যেতে থাকে যেভাবে সমুদ্রে ঢেউ তৈরী হয়।সেই ঢেউ এর শব্দ যখন গাছে গাছে ধাক্কা খায় তখন যে প্রতিধ্বনি তৈরী করে শুনলে মনে হয় মেঘ ডাকছে। এখন সেই মেঘ গর্জন শুনতে পাচ্ছি।দূরে কোথায় যেন কি একটা পাখি অদ্ভূত তীক্ষ্ণ সুরে ডেকে উঠল।
প্রথমটায় মনে হল বুঝি পাখির ডাক।পরে মনে হল এটা হরিণের অ্যালার্ম কল নয়তো? জঙ্গলে বাঘ দেখতে পেলে হরিণ অ্যালার্ম কল দেয় যাতে অন্য সব পশুরা সতর্ক হয়ে যেতে পারে।আমি ঠিক করলাম গাড়িকে আমার কাছে আসার জন্য ইশারা না করে আমিই বরং গাড়ির দিকে এগোই।কেননা গাড়ির আস্তে যে সময়টা লাগবে ততক্ষণে যদি বাঘ কিংবা হাতি বেরিয়ে পড়ে তাহলে তো এমনিই গাড়ি এসে আর বিশেষ লাভ হবে না।আমি ছুট লাগালাম।১০মিটার দূরত্বকে ১০ কিলোমিটার মনে হচ্ছে তখন।গাড়িতে উঠতেই ড্রাইভার বলল -সাব জী! আ্যসে গাড়ি সে মাত উতারিয়ে।ইয়ে জাঙ্গল হ্যায়।কাঁহা কাঁহাসে হাতি সামনে চালে আয়েঙ্গে আপকো মালুমভি নেহি পরেঙ্গে। আমি লজ্জায়, অপরাধবোধে কিছু উত্তর দিলাম না।এরপর গাড়ি আবার ছুটতে শুরু করল।রাস্তায় জায়গায় জায়গায় হাতির টাটকা মল পড়ে থাকতে দেখলাম।ড্রাইভারদা বললেন এই একঘন্টা আগেই হাতি এই রাস্তা ধরে হেঁটে গেছে।আফসোস হল খুব হাতি না দেখে হাতির মল দেখে সন্তুষ্ট হতে হল বলে ।ড্রাইভারদার কাছ থেকে আসবার পথে জানলাম পৃথিবীর সবথেকে দামি কফি’র ১ কেজি’র প্যাকেটের দাম এক লক্ষ চৌত্রিশ হাজার টাকা ! এই কফি তৈরি করা হয় হাতির মল থেকে। ব্ল্যাক আইভরি কফি হচ্ছে বিশ্বের সবথেকে দামি কফি যা হাতিকে খাইয়ে তারপর হাতির মল থেকে এই কফি তৈরি করা হয়। ১কেজি কফি পেতে ৩৩ কেজি কফির বীজ খাওয়াতে হয় হাতিকে।থাইল্যান্ডে এই কফি তৈরী হয়।গল্প করতে করতে আমরা নিউ আলিপুরদুয়ার পেরিয়ে গেছি খেয়ালই নেই।প্রায় ২.৩০ঘন্টা হয়ে গেল আমরা গাড়িতে উঠেছি। হঠাৎ দূর থেকে ট্রেনের হুইসল শুনতে পেলাম।পেছনে তাকিয়ে দেখি আমরা যে রোড ধরে ছুটে চলেছি তার ডানদিকে হালকা কাঁটা ঝোপের জঙ্গল আর বাঁ দিকে রেললাইন।রেললাইনের ওপারে আবার জঙ্গল।ট্রেন ছুটে আসছে।আর আমরাও ছুটে চলেছি।ড্রাইভারদা কে বললাম রেস করবে?ট্রেন টাকে হারাতে হবে গতিতে।আমাদের গাড়ির গতি বাড়তে লাগল।ওদিকে ট্রেনের ইঞ্জিন আমাদের পেরিয়ে গেছে।বাকি কামরা গুলোও এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।আমি বললাম আরো জোর চালাও।গাড়ির গতি এখন ৮০কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা।প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছি আমরা ইঞ্জিনটাকে যখন ঠিক তখনই সামনে রেল গেট পড়ে গেল।এটাও মিস!রেল গেটের পাশে বড় বড় করে লেখা -রাজাভাতখাওয়া।
(চলবে…)
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান