ধ্বংসের শুরু
রুবাই শুভজিৎ ঘোষ
।।১।।
“কেমন লাগছে?” জিজ্ঞেস করল অ্যাবি।
“সেক্সি” উত্তর দিল মন।
“রবির ভালো লাগবে তো?”
“খুউব। থাকলে এখন আদরই করে দিত।” হেসে বলল মন।
“আচ্ছা?” অ্যাবিও দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, “এখন তো ও নেই। তুইই করে দে’না।”
মনের মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। অ্যাবির জন্য কয়েকটা শর্টস আর টি শার্ট কিনে এনেছিল সে, সেগুলোই অ্যাবি পরে দেখাচ্ছিল তাকে। তারপর বিছানায় উঠে এল অ্যাবি, মনের পাশে এসে বসল, অনেকটা গা ঘেঁষে।
“আমরা কি ঠিক করছি অ্যাবি?” দ্বিধাবিভক্ত মন জিজ্ঞেস করল।
“উফ। আবার! তোকে বলেছি না আবার। বারবার এক কথা বললে চলে যাব।” উঠতে গেল অ্যাবি, তাকে বাধা দিল মন, এক হাত ধরে টান দিয়ে বসিয়ে দিল তাকে। কপালে একটা চুমু খেয়ে তাকে পাশে বসিয়ে বলল, “সরি অ্যাবি।”
“আর তো কদিন পর চলেই যাচ্ছিস!” অ্যাবি উঠতে গেল আবার, টেনে নিল মন। তাকে টেনে নিল নিজের কোলে। তারপর তাকে নিয়ে ফেলল বিছানার ওপর। অ্যাবির বুকের আন্দোলন চাপা পড়ল মনের বুকে। আস্তে আস্তে দুজনের ঠোঁট এগিয়ে এল দুজনের দিকে।
অ্যাবিকে কিছুদিনের জন্য দক্ষিণ ভারত আসতে হয় কাজের সূত্রে। ওদিকে মন কলকাতা ছেড়ে পুনের অফিসের জন্য আবেদন করেছিল। কোম্পানি সে আবেদন মঞ্জুর করে। কিন্তু পুনের অফিস জয়েন করার আগে তাকে ট্রেনিং-এর জন্য আসতে হয় দক্ষিণ ভারত। মনে মনে সে নিজের ভাগ্যের ওপর খুশি হয়। প্রমাও বলেছিল সে এই তিনমাসের জন্য নিজের কোম্পানিতে আবেদন করবে কিনা। কিন্তু বাধ সেধেছিল মন। ইতিমধ্যেই পুনেতে ট্রান্সফারের জন্য প্রমা নিজের কোম্পানিতে বলেই দিয়েছে। সেখানে ট্রান্সফারের আগে আবার অন্য জায়গায় যাওয়া আদৌ সম্ভব কিনা সেটাও দেখা দরকার। আর তিনমাসেরই তো ব্যাপার। অতএব প্রমাকে বুঝিয়ে সে রাজি করিয়েছিল একা আসবার জন্য। আসলে এই তিনমাস সে অ্যাবির কাছে থাকতে চেয়েছে। অনেক কষ্টে সে এইরকম সুযোগ পেয়েছে। কিছুতেই হাতছাড়া করতে পারে না সেটা। তারা একসাথেই থাকার প্ল্যান করে। কিন্তু মন তার বউ প্রমাকে বা অ্যাবি তার বর রবিকে কিছু বলে না। মাত্র তিনটে তো মাস। এই তিনমাস তারা দুজনের সান্নিধ্যে কাটাতে চায়, অনেকটা কাছাকাছি। সেই যে একবার কাউকে না জানিয়ে তারা উড়িষ্যার তালসারি গেছিল, তখনই তাদের সম্পর্কটা বদলে গেছিল। সব গণ্ডি পেরিয়ে তারা মজেছিল ষড়রিপুর প্রধান রিপুতে। তারপর থেকেই তাদের মন সেই স্বাদ আবার নেওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজছিল। আর নিয়তি তাদের সেই সুযোগটা করে দিল এইভাবে। তারা কোম্পানির কোয়ার্টারে উঠল না কেউই। একটা প্রাইভেট বাংলো ভাড়া করল তিনমাসের জন্য। সবার থেকে আলাদা, সবার থেকে দূরে এই নিস্তব্ধ বাংলোটায় তারা মেতে উঠল নিষিদ্ধতায়।
বাংলোর ভেতরে একটা বড় সুইমিং পুল। রাত হলে তার নীল জলে আন্দোলন ওঠে। এক পা এক পা করে নেমে আসে দুটি আদিম প্রাণী, আদিম দুই জন্তু। মেতে ওঠে তারা আদিম রিপুর খেলায়। অ্যাবি তার সব দিয়ে মনকে বেঁধে রাখতে চায় নিজের কাছে। তার মনে হয় মনের ওপর শুধু তারই অধিকার। এ অধিকারবোধ তার ছোট থেকেই ছিল। কিন্তু দুজনের বিয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই তা কমে গেছিল। এখন আবার তা পূর্ণমাত্রায় জেগে উঠেছে। অ্যাবির ভেজা শরীর বেয়ে উঠতে থাকে মন। অ্যাবি তার চুল আঁকড়ে ধরে হাতের মুঠোয়। এভাবে রাতের অনেকটা কেটে যায়, শুরু হয় আরেকটা দিন। আর দিন-রাতের এই পরিবর্তনে এগিয়ে আসে তাদের বাড়ি ফেরার সময়।
দিন যত এগিয়ে আসে, তত তারা একে অপরের কাছছাড়া হতে চায়না। অনেক রাতেও যখন চাঁদটা ঘুম ঘুম চোখে আকাশের নীল চাদর জড়িয়ে শুতে যাচ্ছিল, তখন সব চাদর ফেলে দিয়ে অ্যাবির কোলে মাথা রেখে মন গল্প করছে। তাদের চোখে যেন ঘুমই আসত চাইছে না।
“রাতটা যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি!” মন বলল।
তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অ্যাবি বলল, “আর সময়ও এগিয়ে আসছে। পরশুর পর তো আর দেখা হবে না।”
মাথা তুলল মন, “এমনভাবে বলছিস যেন আমি মরে যাচ্ছি।”
“বাজে বকিস না”
“তুই বাজে বকিস না। ট্রান্সফারই তো নিচ্ছি। মাঝে মাঝে তো আসবই।”
“তুই নাও নিতে পারতিস। কলকাতায় কি অসুবিধা হচ্ছিল?”
“কলকাতায় স্কোপ নেই আগের মত। আমায় চেঞ্জ করতেই হত।”
।।২।।
এখন রাত দশটা। ট্রেনের মধ্যে সবার আনাগোনা কমে গেছে অনেকটাই। কিছু কিছু কূপে নিভে গেছে আলো। রাতের খাওয়া শেষ করে অ্যাবি আর মন নিচের দুটো বার্থে কেউ নেই বলে সেদুটোয় বসে আড্ডা দিচ্ছিল দুজনে। এখন চলে এল উপরের দুটো বার্থে। ট্রেনের গতি আস্তে আস্তে কমে এল। এসে থামল একটা স্টেশনে।
“এবার উঠব।” অ্যাবি বলল।
“বস না আর একটু।” মন বলল।
“চ’না ওপরে বসে আড্ডা দেব। ”
“আচ্ছা চ” মন আর বাধা দিল না।
প্রায় দুজনে যে যার বার্থে উঠে গেছে, তখন এসি কামরার দরজা ঠেলে ঢুকল একটা মেয়ে। যেটা যত্ন করে সে সিটে রাখল সেটা একটা প্যাকেট। প্যাকেটটা দেখে বোঝা গেল কেকের প্যাকেট। হঠাৎ মনের বেশ ভালো লাগল। আজ রাত ১২টা বাজলেই যে তার জন্মদিন। বাড়িতে থাকলে এতক্ষণে তার জন্যও কেকের আয়োজন হত। কাল সকালেই তো সে পৌঁছে যাচ্ছে বাড়িতে। তার জন্য এতক্ষণে আয়োজন হয়তো হয়েই গেছে। কেক খেতে খুব ভালোবাসে মন। বাড়ির কথা ভাবতেই মনটা অন্যরকম হয়ে গেল। কতদিন পর বাড়ি ফিরছে সে। আবার ফেলে আসা শহরটার জন্যও মনকেমন করছে তার। শহরটার থেকেও সময়টার জন্য যেন বেশি মন খারাপ তার। অ্যাবির সঙ্গে কাটানো সময়টা। দুটো মিলিয়ে অদ্ভুত অনুভূতি। মেয়েটা একবার উপরের বার্থে মনের দিকে তাকাল। কেমন যেন চেনা দৃষ্টি তার। কিন্তু যেটা অদ্ভুত সেটা হল মেয়েটার মুখ ওড়না দিয়ে বাঁধা। শুধু চোখদুটো ছাড়া মুখের আর কোনো অংশই স্পষ্ট নয়। দিনের বেলা হলে না হয় বোঝা যেত রোদের কারণে এরম ভাবে মুখ ঢেকেছে। কিন্তু এই রাতের বেলায় কি কারণে? মেয়েটা তারপর অন্যদিকে চলে গেল। মনে হয় নিজের সিট খুঁজতে গেল। মন পাশ ফিরে শুল।
চোখ দুটো জুড়ে এসেছে মনের। এতক্ষণে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল সে। চোখ একটু খুলতে দেখল কূপের মধ্যে এখন অন্ধকার। মাঝে মাঝে ট্রেনের বাইরে থেকে আসা রাস্তার আলোয় যা দেখা যাচ্ছে তাতে ঘুমজড়ানো চোখে মন দেখল অ্যাবি ওর বার্থে পর্দা টেনে নিয়েছে। মনে হয় ঘুমিয়েই পড়েছে। নিজের বার্থের আলো জ্বালাল সে। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত পৌনে বারোটা। একটু আশ্চর্য হল এই ভেবে যে প্রমার থেকে কোনও ফোন এলোনা এখনও। আর পনেরো মিনিট বাকি তার জন্মদিনের, কিন্তু প্রমা যেন ভুলে গেছে তাকে। একটু অভিমান হল তার, আবার ভয়ও হল। প্রমা কিছু জানতে পারেনি তো! আবার পাশ ফিরে শুল সে। বার্থের আলোটা নিভিয়ে দিল। চোখদুটো প্রায় বুজেই এসেছিল, হঠাৎ পায়ের কাছে একটা ধাক্কায় জেগে উঠল।
“হ্যাপি বার্থডে।” মিষ্টি করে গালভরা হেসে বলল অ্যাবি।
প্রমার ওপর সব অভিমান ভুলে গেল সে।
“থ্যাঙ্ক ইউ।” একটু থেমে বলল, “আমি ভাবলাম তুই ঘুমিয়ে পড়েছিস।”
“পড়েছিলাম।” মনের বার্থে উঠতে উঠতে বলল অ্যাবি, “কিন্তু ঠিক টাইমে এসে গেছি”
“টইমের পাঁচ মিনিত আগেই এসে গেছিস”, হাসল মন। তার বার্থে পুরোপুরি উঠে এল অ্যাবি।
“আজ তো সেলিব্রেট করব সারারাত।”
“এই হাফপ্যান্টটা পড়ে?” হেসে উঠল মন।
“গাধা তুইই তো কিনে দিলি। আর এটা হাফপ্যান্ট?”
একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল মন, “কিন্তু চেঞ্জ করলি কখন?”
উত্তরে অ্যাবিও একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, “কিন্তু কেক কৈ? সেলিব্রেট করতে হবে তো?”
কেমন একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরল মনকে।
“কিরে কি হল?” মনের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল অ্যাবি। নিচে তাকিয়ে মুখবাঁধা সেই মেয়েটাকে দেখল সে। কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাদের দেখছে মেয়েটা। বিরক্তি লাগল অ্যাবির। চোখ দুটো ছাড়া বাকি মুখ পুরোটাই ওড়নায় ঢাকা। বিরক্তির সাথে আপার বার্থের পর্দা টেনে দিল সে।
কিন্তু পর্দা টেনে নিলেও মেয়েটার চোখ দুটো কেমন অস্বস্তি দিচ্ছে মনকে। মেয়েটা কি ভাবছে এই ভাবনাটাই বোধয় তাকে অসস্তি দিতে থাকল।
“কি ভাবছিস বল তো?”
অন্যমনস্ক ভাবেই জবাব দিল মন, “কিছু না।”
কিন্তু কিছু একটা তাকে যেন সহজ হতে দিচ্ছিল না। মন থেকে এবার জোর করে সেই অস্বস্তি কাটিয়ে উঠল সে, “তো! এরপর তো দেখা হবে না তাহলে ।”
আর এই কথাতেই মুষড়ে পড়ল অ্যাবি।
পিঠটা দেওয়ালে এলিয়ে দিয়ে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল অ্যাবি, “সত্যি না, কি তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল এই দিনগুলো?”
“হুম। কি করব বল। আমরা তো জব করি।”
একটু থেমে চোখ দুটোকে প্রসারিত করে বলল মন “তুইও চ’ না বরং।”
“কোথায় যাব? পুনে?”
“হ্যাঁ।”
“আর তোর বউ।”
“তাই তো বলছি।” অ্যাবিকে কাছে টেনে নিল মন, “পরের কথা পরে, আজকে থাক না আমার সাথে। এই জন্যই তো ট্রেন জার্নি করলাম বল। ”
এবার অ্যাবির মুখে খুশির হাসি ফুটল।
“তুই তো মিষ্টি ছেলে।” বলে মনের দুই গাল টিপে দিল।
অ্যাবির স্পর্শ ভালো লাগল মনের, চিরকালই লাগে। এইরকম স্পর্শের পরই সাধারণত বাঁক নেয় ওদের গল্প। ট্রেনটাও বোধয় বাঁক নিল একটা। অ্যাবি এলিয়ে পড়ল মনের গায়ে। তার বুকের নরম স্পর্শে মনের তন্দ্রা একেবারেই কেটে গেল। অন্যরকম অনুভূতিরা নড়েচড়ে বসল তার মনে। কিন্তু অ্যাবি একটুও নড়ল না। মনের ওপর যেভাবে এলিয়ে পড়েছিল সেভাবেই বসে রইল।
“তোর ফিরে যেতে ভালো লাগছে মন?”
“ঠিক জানি না। মিক্সড ফিলিং।”
মনের দুই হাত আস্তে আস্তে অ্যাবির পেটের দুইপাশ থেকে যেন বেড়ি পরিয়ে দিল। অ্যাবি তার দুই হাতের মুঠোর ওপর নিজের হাত দিয়ে বলল,
“আমার তো স্যাড ফিলিং।” তারপর হঠাৎ মনের দিকে ঘুরে বলল “এই শোন না! আমার যদি কোম্পানির কাজে আবার বাইরে যেতে হয়, এরম আবার আসবি রে তুই?”
“উমমমম! ” শব্দটাকে একটু টেনে তারপর বলল মন, “এবারে খুব লাকি ছিলাম রে। আমার ট্রেনিং লোকেশন একই জায়গায় পড়ল। সবসময় কি হবে? আর তাছাড়া আমি নেক্সট আবার কবে লোকেশান চেঞ্জ করব বা ট্রেনিং এর দরকার পড়বে, কি করে বলি বলতো।”
“হুম। ” এবার অ্যাবি আর একটু কাছে এল মনের, “না। এই কয়েক ঘন্টা আর ঘ্যানঘ্যান করব না। ”
পা দুটোকে সামনে জড়ো করে বসল অ্যাবি। মনের হাত দুটোকে তার তলপেট থেকে আরও ওপরের দিকে তুলল সে। অ্যাবির উষ্ণতা অনুভব করে এই এসিতেও যেন হালকা গরম লাগল মনের। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস পড়ল অ্যাবির কাঁধে। হঠাৎ করে বার্থের আলো নিভিয়ে দিল অ্যাবি।
“কি হল?” জিজ্ঞেস করল মন। উত্তর না দিয়ে ঘুরে গিয়ে সজোরে তাকে আঁকড়ে ধরল অ্যাবি। আবার শুরু হল তাদের আদিম খেলা। অ্যাবির গলা থেকে শুরু করে পা অবধি নেমে এল মন। তারপর পা বেয়ে আবার উঠতে থাকল। অ্যাবি আস্তে আস্তে গিলে খেল তাকে। তার দুপায়ের মাঝে সে গিলে খেল তাকে। মন উঠে এল অ্যাবির ওপর, মিশে গেল দুজনে। তাদের দোদুল্যমান দুটো শরীর ট্রেনের গতির সাথে দুলতে থাকল।
।।৩।।
মাঝরাতে মন অনুভব করল কোনো একটা প্রচন্ড ঠান্ডা ঘরে তাকে রাখা হয়েছে। তার মুখ ঢাকা চাদরে। শরীরের ওপর ভারী কিছু রাখা। অনেকক্ষণ অবধি কিছু বুঝতে পারল না সে। তারপর হঠাৎ করেই যেন বুঝতে পারল সে আর বেঁচে নেই। হাত পা স্থির হয়ে গেছে তার। সে এখন একটা লাশ। তাকে জড়িয়ে আছে আর একটা লাশ, সেটা অ্যাবির। তাদের দুজনের নগ্ন লাশ দুটো সাদা চাদর ঢাকা দিয়ে রাখা হয়েছে হিমঘরের মধ্যে একটা ঠান্ডা বাক্সে। কেউ তাদের নিতে আসেনি, কেউ তাদের ছুঁতে আসেনি। বাক্সটার ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর প্রচন্ড ঠান্ডা। তার ভয় লাগছে প্রচন্ড। নিজের ওপর থেকে অ্যাবির ভারী লাশটাকে সরাতে পারছে না সে। কাল রাতেও অ্যাবির যেই বুকের স্পর্শে সে সব ভুলেছিল, এখন তা শুধুই যেন শরীরের ওপর একটা ভার, নিজের বুকের উপর একটা বোঝা। যেই পায়ের মাঝে সে স্বর্গ খুঁজেছিল, এখন যেন সাঁড়াশির মত আটকে রেখেছে তাকে। অ্যাবির থেকে কোনো মুক্তি নেই তার।
হঠাৎ একটা শব্দে বুঝল ঠান্ডা বাক্সটাকে কেউ টেনে বার করছে। আস্তে আস্তে অন্ধকার কাটছে তার। কেউ তাকে অবশেষে মুক্তি দিতে চলেছে। ঠান্ডা বাক্সটা টেনে যেই মুখটা তার মুখের ওপর এসে থামল সেটা তার চেনা। কালকের সেই মুখে ওড়না বাঁধা মেয়েটা। এখনো মুখে ওড়না জড়ানো কিন্তু একদৃষ্টিতে দেখছে তাকে। আর কি বীভৎস সেই দৃষ্টি। ধড়ফড় করে উঠে বসল মন। ঘুম ভেঙে হঠাৎ করে উঠে বসল সে। ট্রেনটা তখন সবে একটা স্টেশনে ঢুকছে।
অ্যাবিকে ঘুম থেকে টেনে তুলল মন। স্বপ্নটা এত বাস্তবের মত, মনটাই কেমন বিগড়ে গেল তার। কেমন একটা অস্বস্তি কাঁটার মত তার গলায় লেগে রইল। বাড়ি ফেরার জন্য মনটা তার আকুল হয়ে উঠেছে এখন। কলকাতা আসতে আরও কিছুক্ষণ।
“কিরে?” অ্যাবি জিজ্ঞেস করল, “বউয়ের জন্য মন কেমন করছে?”
মন এতক্ষণে হাসল। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
“কবে যাচ্ছিস পুনে তাহলে?”
“নেক্সট সানডে।”
“বেস্ট অফ লাক!” অ্যাবি জড়িয়ে ধরল তাকে। একটা শুকনো হাসি দিয়ে সেও পাল্টা আলিঙ্গন করল। কিন্তু মনের মধ্যে আর কোনও উত্তেজনা নেই। কেমন একটা অজানা ভয় তার সারা মন জুড়ে। সে এখন অপেক্ষা করছে শেষ স্টেশনের।
স্টেশন এল। তাড়াতাড়ি একটা গাড়ি ধরে বাড়ি এল মন। কিন্তু বাড়ি ঢুকে প্রমাকে দেখতে পেল না। উলটে মা তাকেই জিজ্ঞেস করল, “কিরে! বৌমা কই?”
“মানে?” আশ্চর্য মন জিজ্ঞেস করল এবার।
“ট্রেনে যে গেল তোকে সারপ্রাইজ দিতে!”
“আমায়!” মনের গলা কেমন একটা শুকিয়ে যায়।
“আমি তো কত বারণ করলাম” মা বলে চলল, “কিন্তু মেয়ে শুনল কই! কেক নিয়ে তোর জন্মদিন পালন করতে চলল।” এবার একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু কই সে?”
“নীল রঙের জামা ছিল কি?” মন জিজ্ঞেস করল।
এবার মনের মা বেশ উদ্বিগ্ন, “কি হয়েছে বলত? বৌমা কই?”
মনের মনে পড়ল সেই মেয়েটা। মুখে ওড়না বাঁধা সেই মেয়েটা যে কেকের প্যাকেট হাতে ট্রেনে উঠেছিল, সেইই নিশ্চয়ই প্রমা। তাকে আর অ্যাবিকে একসাথে দেখেছে সে। কিন্তু দেখার পর কি হয়েছে সেটা আন্দাজ করতে পারছে না মন, একটা অজানা আতঙ্কে তার মনটা ভরে উঠল। প্রমার নাম্বারে ফোন করল সে। কিন্তু কেউ ফোন ধরল না। অনেকবার ফোন করল, কিন্তু ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেল, কেউ ধরল না। এই এতটা পথে প্রমা কোথায় গেল, কি করল ভেবে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে যাচ্ছে তার। সব শেষ হয়ে গেল। নিজের হাতে নিজের ধ্বংস ডেকে আনল সে। দুহাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়ল সে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান