দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়া (Devendra Jhajharia) একজন বিখ্যাত প্যারালিম্পিক অ্যাথলিট যিনি ২০০৪ সালের এথেন্স প্যারালিম্পিকে এবং তারপর ২০১৬ সালের রিও-ডি-জেনিরোর প্যারালিম্পিক প্রতিযোগিতায় পুরুষদের এফ-৪৬ বিভাগে স্বর্ণপদক জেতেন প্রথম ভারতীয় অ্যাথলিট হিসেবে। ২০১৭ সালে ভারত সরকার তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ ক্রীড়া পুরস্কার রাজীব গান্ধী খেলরত্ন (অধুনা মেজর ধ্যান চাঁদ খেলরত্ন) পুরস্কারে ভূষিত করে। তিনিই প্রথম ভারতীয় প্যারালিম্পিয়ান যিনি ভারত সরকারের চতুর্থ শ্রেষ্ঠ নাগরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৯৮১ সালের ১০ জুন রাজস্থানের চুরু জেলায় একটি কৃষক পরিবারে দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়ার জন্ম হয়। নিতান্ত শখেই ছোটোবেলায় বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে খেলতে ভালোবাসতেন তিনি। তাঁর যখন মাত্র আট বছর বয়স একটি দুর্ঘটনায় তাঁর জীবনে আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। গ্রামেরই একটি গাছে চড়ার সময় দুর্ঘটনাবশত তিনি একটি উন্মুক্ত বিদ্যুতের তার ধরে ফেলেন এবং তার ফলে প্রায় এগারো হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের দ্বারা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চূড়ান্তভাবে আহত হন তিনি। এতটাই মারাত্মক আঘাত পেয়েছিলেন তিনি যে তাঁর বাঁ হাতটি তৎক্ষণাৎ শরীর থেকে বাদ দিতে হয়েছিল। শারীরিক ভাবে আংশিক প্রতিবন্ধী দেবেন্দ্রকে নিয়ে তাঁর বন্ধু-বান্ধবরাও ঠাট্টা-তামাশা করতে শুরু করে। অন্যান্য মায়েদের মতো দেবেন্দ্রর মা চাননি তাঁর সন্তান ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হোক, বরং চেয়েছিলেন সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে দেবেন্দ্র যেন একজন ভালো অ্যাথলিট হতে পারে। আর এই প্রতিবন্ধকতায় মা ছিলেন দেবেন্দ্রর অনুপ্রেরণা।
গ্রামের স্থানীয় স্কুলেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। সেই স্কুলে পড়াকালীন একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১৯৯৭ সালে দ্রোণাচার্য পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক আর. ডি. সিং লক্ষ্য করেন দেবেন্দ্রকে। তার আগেই যদিও দেবেন্দ্র বদ্ধপরিকর হন তাঁর এই অক্ষমতাকেই কাজে লাগিয়ে ক্রীড়াক্ষেত্রে সফল হতে। সেইজন্য তিনি প্রায় রোজদিন মাঠে বসে বিভিন্নরকম খেলা দেখতে দেখতে একটিমাত্র হাত কাজে লাগিয়ে কোনো খেলা হয় কিনা তা লক্ষ্য রাখতেন। হাল ছাড়েননি তিনি। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রতিদিন ক্রীড়াচর্চা করতেন দেবেন্দ্র এবং এইভাবেই মুক্ত শ্রেণিতে একটি প্রতিযোগিতায় জেলা-চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরেও একের পর এক খেলায় যোগ দিয়ে পদক জিততে শুরু করেন দেবেন্দ্র, আন্তঃকলেজ-জেলাস্তরের বা রাজ্যস্তরের খেলা সবেতেই দেবেন্দ্রর অংশগ্রহণ ছিল বাঁধা। এভাবে পরবর্তীকালে আর. ডি. সিং-এর প্রশিক্ষণে নিজেকে তৈরি করতে থাকেন দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়া। যদিও প্যারালিম্পিকে যোগদানের পর তাঁর প্রশিক্ষণ শুরু হয় সুনীল তন্বার কাছে।
তাঁর ক্রীড়াজীবনের মূল অধ্যায় শুরু হয় ২০০২ সালের ফেসপিক গেমসে (FESPIC) স্বর্ণপদক জয়ের মধ্য দিয়ে। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত সেই প্রতিযোগিতার পরে ২০০৪ সালের এথেন্স গ্রীষ্মকালীন প্যারালিম্পিকে ভারতের হয়ে অংশগ্রহণ করেন দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়া আর প্রথম খেলাতেই স্বর্ণপদক জিতে নেন তিনি। ৬২.১৫ মিটার দূরত্বে জ্যাভেলিন নিক্ষেপ করে দেবেন্দ্র প্যারালিম্পিকে ভারতের দ্বিতীয় স্বর্ণপদকজয়ীর সম্মান লাভ করেন। প্যারালিম্পিকে ভারতের হয়ে প্রথম পদকটি পেয়েছিলেন মুরলীকান্ত পেটকার। তারপর ২০১৩ সালে ফ্রান্সের লিওনে আয়োজিত হয় ‘আইপিসি অ্যাথলেটিক্স ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ’ যেখানে পুরুষদের এফ-৪৬ বিভাগে জ্যাভলিন নিক্ষেপণে অংশ গ্রহণ করেন দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়া এবং এবারেও স্বর্ণপদকের শিরোপা নতুন পালক এনে দেয় তাঁর মুকুটে। থেমে থাকেননি দেবেন্দ্র, থেমে থাকেনি তাঁর ক্রমান্বয়ী পদকজয়। ঠিক এর পরের বছরই ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ইঙ্কিয়নে ২০১৪ এশিয়ান প্যারা গেমসে জ্যাভলিন নিক্ষেপণে রৌপ্য পদক লাভ করেন তিনি। ২০১৫তে দোহায় অনুষ্ঠিত আইপিসি অ্যাথলেটিক্স ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্য পদক লাভ করেন তিনি। সেই প্রতিযোগিতায় ৫৯.০৬ মিটার দূরত্বে জ্যাভেলিন ছুঁড়েও চিনের প্রতিযোগী গুয়ো চুনলিয়াং-এর কাছে তিনি পরাজিত হন দেবেন্দ্র। ২০১৬ সালে দুবাইতে আয়োজিত ২০১৬ আইপিসি অ্যাথলেটিক্স এশিয়া-ওশিয়ানিয়া চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করে স্বর্ণপদক লাভ করেন দেবেন্দ্র। ঐ বছরই গ্রীষ্মকালীন প্যারালিম্পিক আয়োজিত হয় রিও-ডি-জেনিরোতে। সেই প্রতিযোগিতাতে ৬৩.৯৭ মিটার দূরত্বে জ্যাভেলিন নিক্ষেপ নিজের করা আগের রেকর্ডটি ভেঙে স্বর্ণপদক জয় করেন তিনি। ২০১৬ সালের রিও-ডি-জেনিরোর অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় কুস্তিতে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিলেন সাক্ষী মালিক এবং ব্যাডমিন্টনে পিভি সিন্ধু পেয়েছিলেন রৌপ্য পদক। স্বর্ণপদক জয় করতে না পারার গ্লানিই দূর করে ভারতকে আরেকবার বিশ্বের দরবারে চিনিয়ে দিয়েছিলেন দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়া। প্রথম ভারতীয় হিসেবে প্যারালিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতে রেকর্ড গড়েন তিনি। নিজের মেয়ে জিয়ার সঙ্গে তাঁর চুক্তি হয়েছিল যে যদি জিয়া তাঁর কিণ্ডারগার্টেন স্কুলে প্রথম হয়, তাহলে অলিম্পিকে দেবেন্দ্রকেও সোনা জিততে হবে। সেই চুক্তির প্রতিশ্রুতি রেখেছেন দেবেন্দ্র।
কুম্ভমেলার মতো প্রায় বারো বছর অপেক্ষার পর আবার আরেকটি স্বর্ণপদক জুটলো তাঁর ভাগ্যে। এতদিন পরিবারের থেকে দূরে থেকে কঠোর অনুশীলনে আর পরিশ্রমে নিজেকে তৈরি করছিলেন তিনি। দুই বছরের ছোটো ছেলে তাঁকে কখনো দেখেইনি, বাবা কে তা ছবি দেখে চেনাতে হয়েছে তাঁকে। উপায়ও ছিল না। যখন প্রথম আন্তর্জাতিক স্তরে খেলতে আসেন তিনি, দেবেন্দ্র লক্ষ করেছিলেন অন্য অ্যাথলিটদের পায়ে পনেরো-বিশ হাজার টাকা দামের স্পাইক জুতোর তুলনায় তাঁর পায়ের আড়াইশো টাকা দামের স্পাইক অনেকটাই মলিন, কিন্তু এই মালিন্য শুধুমাত্র দক্ষতার সাহায্যে দূর করতে বদ্ধপরিকর হন তিনি।
জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত ২০২০ প্যারালিম্পিকে জ্যাভেলিন নিক্ষেপণে দেবেন্দ্র রুপো জিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেন।
ভারতীয় রেলওয়ে বিভাগে একদা কাজ করেছেন দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়া। বর্তমানে তিনি রাজস্থানের বন বিভাগে কর্মরত আছেন।
২০০৪ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে অর্জুন পুরস্কারে ভূষিত হন দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়া। তারপরে ২০১২ সালে তিনি পান ভারতের চতুর্থ শ্রেষ্ঠ নাগরিকের সম্মান – ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার। তিনিই প্রথম প্যারালিম্পিয়ান যিনি পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৪ সালে এফআইসিসিআই-এর মনোনয়নে তিনিই বছরের সেরা প্যারা-স্পোর্টসম্যান নির্বাচিত হন। সবশেষে ২০১৭ সালে ভারত সরকার মেজর ধ্যানচাঁদ খেলরত্ন পুরস্কারে সম্মানিত করে দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়াকে।
ভারত সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রকের অধীনে বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত আছেন দেবেন্দ্র।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান