বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন আতাউর রহমান খান (Ataur Rahman Khan)। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর স্বতন্ত্র বাংলাদেশ গঠনের দীর্ঘ যাত্রাপথে নানা রাজনৈতিক উত্থানপতনের সঙ্গে আতাউর রহমান খানের নাম জড়িয়ে আছে। পেশায় তিনি আইনজীবী ছিলেন। পরবর্তীকালে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ এবং তারপর প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় একাধিকবার অপসারিত হয়েও ক্ষমতায় ফিরে এসেছিলেন। মুজিবর রহমানের সঙ্গে মতপার্থক্যের ফলে নিজে জাতীয় লীগ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দলও গঠন করেন তিনি। পরে আতাউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯০৭ সালের ১ জুলাই ব্রিটিশ শাসনাধীন ঢাকা জেলার ধামরাই থানার অন্তর্ভুক্ত বালিয়া গ্রামে আতাউর রহমান খানের জন্ম হয়। আতাউর রহমানের প্রাথমিক শিক্ষা মূলত ঢাকাতেই। ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে তাঁর বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা শুরু হয়েছিল। ১৯২৪ সালে এই পোগোজ স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সফলতা অর্জন করেন। এরপর জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। ১৯২৭ সালে সেই কলেজ থেকে এফএ পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আতাউর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চস্তরের পড়াশোনার জন্য প্রবেশ করেন। ১৯৩০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক-সহ স্নাতক (বি.এ) ডিগ্রি অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। স্নাতকের পরে তাঁর আইন বিষয়ক পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তার একটা কারণ হয়ত এই যে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকের পরেই কৃষক প্রজা সমিতির কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পদার্পণ করেছিলেন এবং ১৯৩৪-৩৫ সাল নাগাদ ঢাকা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকও নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। রাজনীতিতে দক্ষ হতে গেলে আইনের জ্ঞান থাকা যে প্রয়োজন, আতাউর তা বুঝেছিলেন। বি.এ ডিগ্রি লাভের কিছু পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন তিনি এবং ১৯৩৬ সালে সেখান থেকে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশ করবার পরই আইনের চর্চা করবার জন্য ১৯৩৭ সালে ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট বারে যোগদান করেন। অবশ্য ১৯৪২ সালে একজন মুন্সেফ হিসেবে বিচার বিভাগের চাকরিতে যোগ দিলেও দুই বছর পর, অর্থাৎ ১৯৪৪ সালে আবার বারে ফিরে আসেন তিনি।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, কৃষক প্রজা সমিতির একজন কর্মী হিসেবে আতাউর রহমান নিজের রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন এবং সেই সমিতির ঢাকা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকও নিযুক্ত হন। তবে এরপর আতাউর ১৯৪৪ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগে যোগদান করে আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পদার্পণ করেছিলেন। ঢাকা জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি এবং পার্টির মানিকগঞ্জ মহকুমা ইউনিট কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
১৯৪৯ সালে যখন ঐতিহাসিক আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়, আতাউর প্রথম থেকেই খুব সক্রিয়ভাবে সেই নবগঠিত দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কেবল জড়িত ছিলেন বললে কম বলা হবে, ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এই আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন তিনি। এর মাঝে আবার ১৯৫২ সালের সেই রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। আতাউর রহমান ভাষা আন্দোলনে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার লড়াইতে সামনে থেকে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম-পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি ভাষা আন্দোলনকে চালনা করবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন।
এরপর ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে জয়ী যুক্তফ্রন্টের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। আতাউর রহমান নিজে ইস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং এ কে ফজলুল হকের অধীনে যুক্তফ্রন্ট সরকারে বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালে আতাউর রহমান পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের বিরোধী দলের নেতা ছিলেন।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর আবু হোসেন সরকারকে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেন যাতে আতাউর রহমান খান সেই স্থানে বহাল হতে পারেন। আতাউর রহমান ১৯৫৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে সরকার গঠন করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৫৮ সালের ৩১ মার্চ গভর্নর এ কে ফজলুল হক আতাউর রহমানকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে আবু হোসেন সরকারকে নিয়োগ করেন। রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জা ফজলুল হককে গভর্নরের পদ থেকে অপসারণ করেন এবং আতাউর ১২ ঘন্টার মধ্যে পুনরায় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী পদে বহাল হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হওয়ার আগে পর্যন্ত এই মুখমন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন তিনি। ১৯৬২ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)-এর অন্যতম নেতা হিসেবে আতাউর দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭০ সালে বার কাউন্সিলেরও সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
এর মধ্যে অবশ্য মুজিবর রহমানের সঙ্গে আতাউরের সম্পর্কের কিছুটা অবনতি ঘটেছিল। মতপার্থক্য তাঁদের মধ্যে এক দূরত্ব তৈরি করেছিল। সেই মতপার্থক্য থেকেই ১৯৬৯ সালে আতাউর রহমান জাতীয় লীগ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং এর সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে আতাউর জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে যোগদান করলেও পরাজিত হয়েছিলেন।
এই সময় চতুর্দিকে মুক্তিযুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই তাতে আতাউর রহমানেরও সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছিলেন এবং ছয়মাস তাঁদের হাতে আটক থেকে সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তি পেয়েছিলেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে আতাউর বাংলাদেশের সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন৷ এরপর ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগে (বাকশাল) যোগদান করেন তিনি এবং এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। ক্রমে এই বাকশালের পতনের পর আতাউর তাঁর জাতীয় লীগকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলেন।
১৯৭৯ সালে পুনরায় বাংলাদেশের সংসদে নির্বাচিত হন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় লীগ সাত দলীয় জোটের সদস্য হিসেবে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। পরে অবশ্য তিনি জেনারেল এরশাদের মন্ত্রীসভাতেই যোগদান করেছিলেন। এর ফলে তাঁকে কেন্দ্র করে বিতর্কও দানা বেঁধে উঠেছিল। ১৯৮৪ সালে এরশাদের শাসনকালেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য তিনি নির্বাচিত হন এবং ৩০ মার্চ শপথ গ্রহণ করেন। তবে এরশাদের প্রশাসনিক পদ্ধতির সঙ্গে সহমত হতে না পারার কথা জানিয়ে ১৯৮৫ সালের ১ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন তিনি।
আতাউর রহমান একজন দক্ষ আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদ হওয়ার পাশাপাশি একজন সুলেখকও ছিলে৷ প্রাঞ্জল ভাষায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায়কে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন তিনি, যা থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক ধারাবাহিক চিত্র উঠে আসে। আতাউর রহমানের লেখা গ্রন্থগুলি হল: ‘ওজারতির দুই বছর’ (১৯৬৩), ‘স্বৈরাচারের দশ বছর’ (১৯৬৯), ‘প্রধানমন্ত্রীত্বের নয় মাস’ (১৯৮৭) এবং ‘অবরূদ্ধ নয় মাস’ (১৯৯০)।
১৯৯১ সালের ৭ ডিসেম্বর ৮৪ বছর বয়সে ঢাকায় আতাউর রহমান খানের মৃত্যু হয়৷
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান