সববাংলায়

ইচ্ছেমৃত্যুর গল্প ।। অপ্রকাশিত বিজ্ঞান গবেষণাপত্র

বিভাগঃ ,

অপ্রকাশিত বিজ্ঞান গবেষণাপত্র

ইচ্ছেমৃত্যু


আপেলটা ঠিক মাথার উপর পড়ল। চিন্‌চিন্‌ করে উঠল মাথাটা। আপেলটাকে অবশ্য দোষ দিয়েও কোনও লাভ নেই। আমিও যে আপেল পড়ার অপেক্ষায় দিনের পর দিন বিভিন্ন আপেল গাছের তলায় গিয়ে বসে থেকেছি। আজ সেই অপেক্ষা সাঙ্গ হল। নিউটনকে কতদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল জানি না, নিশ্চয় এরকমই অনেকদিন হবে। ও হ্যাঁ, আমি হলাম একজন ক্ষুদ্র বাঙালি বিজ্ঞানী , বিনয় করে নিজেকে ক্ষুদ্র বললেও আমি জানি আমার সমমানের জীবিত বিজ্ঞানী খুব কমই আছে আর আমার মাথায় যেটা পড়েছিল সেটা অবশ্য সত্যিকারের কোনো আপেল ছিল না, ওটা ছিল পেয়ারা। বাংলার এই গ্রামে আপেল গাছ পাই কোথায় বলুন, তাই আমি আমের সিজিনে আমগাছের তলায়, পেয়ারার সিজিনে পেয়ারা গাছের তলায় বসে অপেক্ষা করেছি কখন আম বা পেয়ারা পড়বে। আর আমি আম বা পেয়ারাকেই আপেল ধরে নিয়ে, যাকে বলে অ্যাসাম্পশন করে নিয়ে আমার সূত্র তৈরি করব। এই পরীক্ষার পিছনে দৌড়ে প্রথমেই যেটা মনে হয়েছে – নিউটন মানুষটি খুবই অলস ছিলেন। দিনের পর দিন আপেল গাছের তলায় বসে থাকতেন কখন আপেল পড়বে! ভেবে দেখুন, সময়ের কত অপচয় – কবে অপেল পড়বে সেই অপেক্ষায় বসে থাকা! শুধু আপেল পড়াই নয়, অন্যান্য ঘটনাও ওনার এই আলসেমির পক্ষেই সওয়াল করে – উনি নিজেই বলেছেন, বিশাল জ্ঞানসমুদ্রের কুলে বসে কিছু নুড়ি পাথরই কুড়িয়েছেন। আরে বাবা, শুধু নুড়ি কুড়ালে হবে! ঝিনুক, পাথর অনেক কিছু কুড়ানোর আছে। আর সব থেকে বড় কথা নুড়ি কুড়িয়ে কুড়িয়ে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয়! তাই আমি প্রথমে আপেল পড়ার অপেক্ষায় বসে থাকিনি। আমার এত সময় নষ্ট করার সময়ই নেই। এই আপেল ছাড়াও আমার অনেক কাজ করা বাকি – সিঙ্গুলারিটি কনসেপ্ট নিয়ে এখনও কোনও কাজই করে উঠতে পারলাম না। এর আগে অবশ্য অনেক কিছু করেছি। আসলে আমার আসল ইন্টারেস্ট ছিল আইনস্টাইন। অনেক ছোট থেকেই তাঁর সূত্রের ঠিক ভুল নিয়ে আমি অনেক কিছু প্রমাণ করেছি। কিন্তু আইনস্টাইন ব্যাপারটা একটু বেশিই ব্যয় সাপেক্ষ, গাঁটের কড়ি থেকে এক ডজন কলার দাম দিতে হয়েছে আইনস্টাইনের জন্যে। নিউটনের বেলায় সেই সব ব্যয়ের ব্যাপার নেই, বরং উপরি হিসেবে আমটা, পেয়ারাটা মিলেছে কপালগুণে। তখন আইনস্টাইনের আলোর বেগ নিয়ে হাতে কলমে পরীক্ষা করব বলে আমাদের ক্লাসের সব থেকে জোরে দৌড়ানো আলোকে চারটে কলার বিনিময়ে আলোর সঙ্গে রেসে নামতে রাজি করেছিলাম। আইনস্টাইনের মতে লাইটই সব থেকে বেশি বেগে দৌড়ায় আর তার বেগও নাকি কনস্ট্যান্ট। আমাদের ক্লাসের আলোও সব থেকে জোরে দৌড়ায় – এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না, আমার তো মনে হত ওর বাবা মা ওর নাম এই কারণেই আলো রেখেছিলেন যে বড় হয়ে ও খুব জোরে দৌড়াবে, একেবারে আলোর মত। সে যাই হোক, একদিন দুপুরে ক্লাস পালিয়ে আমি আর আলো চলে গেলাম পাবলিক গ্রাউন্ডে। আলো পড়াশোনায় ভাল না হলেও আমার গবেষণায় বেশ উৎসাহী ছিল। তবে চারটে কলা দিতে হল ওর এনার্জির জন্যে। আমার হাতে টর্চ। ঠিক হল, দৌড় শুরুর জায়গায় আমি টর্চ জ্বালাবো আর আলো দৌড়ে যাবে একশ মিটার। কে আগে পৌঁছায়। যদি আমার বন্ধু আলো আগে পৌঁছায় তাহলে সে বলবে কত পরে আলো মানে লাইট পৌঁছাল আর লাইট যদি আলোকে ক্রশ করে তাহলে আলো বলে দেবে কোথায় ক্রশ করল। আর আলোর কাছেই থাকবে স্কুলের ল্যাবরেটরি থেকে ঝেড়ে দেওয়া স্টপ ক্লকটা। এটা নেহাতই প্রাথমিক পরীক্ষানিরিক্ষা তাই মাপজোকের ভুলভ্রান্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিইনি। একটা সাধারণ ধারণায় পৌঁছালে তবেই সঠিক মাপজোকে গুরুত্ব দেওয়া যাবে। তো কথা অনুযায়ী শুরু হল আমাদের পরীক্ষা, কিন্তু বিপদ বাধল টর্চ জ্বালালেও সে লাইট গেলই না বেশিদূর। আলোই বলল, দিনের বেলা বলে বোধ হয় টর্চের লাইটটা বোঝা যাচ্ছে না! ও হ্যাঁ, ব্যাপারটা খুবই সাধারণ, এরকম সাধারণ ভুল বড় বড় বিজ্ঞানীরা করেই থাকেন। এই যেমন নিউটন ঘড়ি সেদ্ধ করতে বসিয়ে ডিমে সময় দেখতেন। আমিও একবার এরকম করেছিলাম, অবশ্য সেটা ইচ্ছে করেই যাতে সবাই মনে করে আমি নিউটনের মত বড় বিজ্ঞানী। তবে আমি নিজের ঘড়ি সেদ্ধ করতে বসাইনি, বাবারটা বসিয়েছিলাম, হাতে ডিম নিয়ে। মা তো খুব রেগে গেছিল, বাবাই মাকে শান্ত করে বলেছিল, ‘আরে মুর্খ, তুমি জানো না! ও আসলে খুব বড় বিজ্ঞানী হবে। নিউটনও এরকম করেছিলেন’। তবে আমি ঐ ঘড়ি সেদ্ধর ঘটনার অনুসিদ্ধান্ত নতুন ঘড়ি কেনার প্রথম সুত্র হিসেবে বের করেছিলাম কারণ বাবা একটা নতুন ঘড়ি পেয়েছিল। আমার সূত্র শুনে ক্লাসের কয়েকজন প্রয়োগ করেছিল এবং দু’একজন ছাড়া বাকিরা নতুন ঘড়ি পেয়েছিল। ঐ দুয়েকজনের কপালে উত্তম মধ্যম জুটেছিল, তাই বলে আমার সুত্র ভুল হয়ে যায় না বরং ‘এক্সেপশন প্রুভ্‌স্‌ দ্য ল্য’। যাই হোক, লাইটের গতিবেগ পরীক্ষার জন্য আলোকে রাতের বেলায় আসতে বললাম – এবারে সে চারের জায়গায় আটটা কলা চাইল। উপায় নেই, আমাকে পরীক্ষাটা করতেই হবে। সেই একই পদ্ধতিতে রাতের বেলা শুরু করলাম মাপজোক। কিন্তু রাতের বেলাও টর্চের ছটা কয়েক মিটারের বেশি গেলই না। তখন আলোর আইডিয়া মত আমি ওর পিঠে টর্চের আলো ফেলে পরীক্ষাটা করার কথা ভাবলাম। লাইট যদি জোরে দৌড়ায় তাহলে আলোকে ক্রশ করে ফেলবে, নাহলে আলোর পিঠে পিঠেই যাবে। এই ভাবে তিনবার পরীক্ষা করলাম। লাইট আলোর পিঠে পিঠেই দৌড়ালো – এগনোর কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। পরীক্ষা শেষ হলে আমি, খাতা কলম নিয়ে গতিবেগ নির্ণয়ে বসলাম। দেখলাম তিনবার তিনরকম বেগ এসেছে। আলো এবং লাইটের দুজনেরই। আমি আইনস্টাইনের সূত্রের সংশোধনী আনার কথা ভাবলাম – লাইটের বেগ সব থেকে বেশি নয় এবং তা কন্‌স্‌ট্যান্টও নয়। পরের দিন ফিজিক্সের স্যরকে একথা বলায় তিনি এত রেগে গেলেন যে আমি আর বিশদে কিছু বলতেই পারলাম না। এতদিন পরে, এত কিছু করে কি নিউট্রিনো না ভুতুড়ে কণা আবিস্কার করে বলছে লাইটের থেকেও বেশি গতির কিছু থাকতে পারে আর লাইটের বেগ কন্‌স্‌ট্যান্ট নাও হতে পারে। আরে এ কথাই তো আমি কতদিন আগে, পাব্লিক গ্রাউন্ডে পরীক্ষা করে বলেছি। বাঙ্গালী বিজ্ঞানীরা কোনদিনই নাম পেল না, জগদীশের হকের নোবেলটা মার্কনি নিয়ে চলে গেল, আর আমাকে তো পাত্তাই দিল না আমাদের স্যর।

সেই আমি কিন্তু রণে ভঙ্গ দিইনি। কলার খরচ কমানোর জন্যে আলবার্ট ছেড়ে আইজ্যাক ধরলাম। কয়েকদিন আমতলায় অপেক্ষা করেছিলাম, আম আর পড়ে না। আমি আবার প্রথমেই বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করে আম মাটিতে ফেলতে চাইনি। বাইরে থেকে বল প্রয়োগে ফল ভাল হয় না। পড়াশোনা না করলে মা মাঝে মাঝেই খুন্তি বা ছড়ি নিয়ে বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করে আমাকে পড়তে বাধ্য করত কিন্তু তাতে ফল কিছু হত না, মাথায় কিছুই ঢুকত না।  কিন্তু বেশ কয়েকদিন বসে থেকেও কোনও কাজ হল না, এদিকে আমের সিজিনও শেষের মুখে। ঠিক করলাম ঢিল ছুঁড়েই আম ফেলব মাটিতে। ভাবা মত কাজ – কিন্তু সে ঢিল গিয়ে পড়ল জেঠিমাদের টালিতে – দুপুরে টালি আর সন্ধ্যেতে বাবা বাড়ি ফেরার পর আমার পিঠ দুইই ফাটল।  কিছুদিন রণে ভঙ্গ দিতেই হল – আর আমের সিজিনও গেল পেরিয়ে। অগত্যা পেয়ারাই ভরসা। এবারে আর ঢিল নয়। পেয়ারা তলায় বসে গাছের গুঁড়ি ধরে দিলাম নাড়া। আর তারপরের ঘটনা তো প্রথম লাইনেই বলেছি।

পরীক্ষা তো হল। এবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। আইজ্যাকের কথা অনুযায়ী অভিকর্ষের টানে পেয়ারা বা আপেল মাটির দিকে নেমে আসে – এটা মোটামুটি ঠিক। কিন্তু আমার খটকা লাগল, পেয়ারাটা এত জায়গা থাকতে আমার মাথাতেই পড়ল কেন, আর আইজ্যাকের মাথায় পড়েনিই বা কেন? সাড়ে তিনরাত অনেক লগারিদম, ক্যালকুলাস, পাটিগণিত, ত্রিকোণমিতি কষে বের করলাম আসল কারণ। বুঝলাম আমার মাথাই এই জন্যে দায়ী। যে বস্তুর আকর্ষণ বল বেশি সেই দিকেই ধেয়ে যায় আপেল। পৃথিবীর আকর্ষণ বেশি বলে পৃথিবীর দিকে ছুটে যায় আপেল, পৃথিবী আপেলের দিকে যায় না। এক্ষেত্রেও পেয়ারার উপর আমার মাথার আকর্ষণ বল বেশি ছিল, তাই মাটির দিকে না গিয়ে পেয়ারাটি আমার মাথায় এসে পরেছে। আইজ্যাকের মাথা ফাঁপা ছিল, তাই আপেল মাথার আকর্ষণ অনুভব না করে পৃথিবীর দিকেই গেছিল। আমার মাথা নিরেট প্রমাণের জন্যে আরও একটি তথ্য হল, পেয়ারাটা মাথায় পড়ে টুকরো হয়ে গেছিল, অবশ্য আইজ্যাকের আপেলের কি দশা হয়েছিল জানা নেই।

আমি আমার এই সমস্ত গবেষণা আমার মৌলিক গবেষণাপত্রে লিখে দেশ বিদেশের বিভিন্ন বিজ্ঞান পত্রিকায় পাঠিয়েছি কিন্তু বাঙালি বিজ্ঞানীদের প্রতি শতাব্দী প্রাচীন বিরূপতাবশত কেউ লেখাগুলি প্রকাশ করেনি। তাই সাধারণ মানুষের বোঝার মত ভাষায় আমার গবেষণাপত্র লিখে সাহিত্য পত্রিকায় পাঠালাম। যাঁরা আরও বিশদে জানতে আগ্রহী বা মৌলিক গবেষণাপত্রটি পাঠ করতে আগ্রহী তাঁরা আমার সঙ্গে ইমেলে যোগাযোগ করতে পারেন, ইমেল – bigganeshwar_prodhan@bangali_biggani.thek।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading