সববাংলায়

আলো এবং পেন্টের ক্ষেত্রে মৌলিক রং আলাদা কেন?

বিভাগঃ ,

জল রং দিয়ে ছবি আঁকার সময় আমরা শুধু লাল, নীল, হলুদ এই তিন রং বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে অন্যান্য অনেক রং তৈরি করে নিতে পারি। ছবি আঁকার সময় লাল, নীল, হলুদকে মৌলিক রং হিসেবে জেনেছি সবাই। অল্প বয়সে এই রকম এই রকম রং মিশিয়ে বিভিন্ন রং তৈরি করতে বেশ মজাও লাগে। তারপর একটু বড় হয়ে যখন পদার্থবিদ্যায় আলো নিয়ে পড়াশোনা শুরু হয় তখন সেই ছবি আঁকায় শেখা রং এর ধারণা পাল্টে যায়। আলোর ক্ষেত্রে মৌলিক রং বলা হয় লাল, সবুজ ও নীলকে। কারণ এই তিন বর্ণের আলো দিয়ে অন্যান্য বর্ণের আলো তৈরি সম্ভব। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, আলো এবং পেন্টের ক্ষেত্রে মৌলিক রং আলাদা কেন? অর্থাৎ, আলোর ক্ষেত্রে মৌলিক রং লাল, সবুজ, নীল হলেও পেন্টের ক্ষেত্রে মৌলিক রং ম্যাজেন্টা, সায়ান, হলুদ কেন?

আলোর ক্ষেত্রে মৌলিক রং এবং পেন্টের ক্ষেত্রে মৌলিক রং আলাদা হওয়ার পিছনে মূলত আলোর মিশ্রণ পদ্ধতি এবং পেন্টের রঙের মিশ্রণ পদ্ধতির পার্থক্য রয়েছে। দুটি পদ্ধতির মধ্যে তাত্ত্বিক এবং বাস্তবিকভাবে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এই পদ্ধতিগুলিকে অ্যাডিটিভ কালার মিক্সিং (Additive Color Mixing) এবং সাবট্র্যাকটিভ কালার মিক্সিং (Subtractive Color Mixing) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখানে দুটি পদ্ধতি নিএ বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

১. আলোর ক্ষেত্রে মৌলিক রং

আলোর ক্ষেত্রে অ্যাডিটিভ কালার মিক্সিং পদ্ধতি কাজ করে। এক্ষেত্রে, আলো যোগ করার মাধ্যমে নতুন রঙ তৈরি হয়। এখানে, লাল, সবুজ, এবং নীল রঙের (RGB) আলো একত্রিত হয়ে সাদা আলো তৈরি করে। এই পদ্ধতিতে, বিভিন্ন রঙের আলোর তরঙ্গ একে অপরের সাথে যোগ হয়। যত বেশি আলোর তরঙ্গ একত্রিত হয়, ততই উজ্জ্বল এবং পূর্ণ (সাদা) আলো পাওয়া যায়।

কীভাবে কাজ করে:

  • যখন লাল, সবুজ, এবং নীল আলো একত্রিত হয়, তখন তারা একটি পূর্ণ তরঙ্গদৈর্ঘ্য তৈরি করে, যা সাদা আলো।
  • এই তিনটি বর্ণের আলোর বিভিন্ন অনুপাতে মিশ্রণের ফলে সব ধরণের আলোকবর্ণালী তৈরি হয়।

এখানে আলোর বিভিন্ন রঙের মিশ্রণে কী রং তৈরি হয় তার কিছু উদাহরণ দেওয়া হল:

লাল + সবুজ = হলুদ
লাল + নীল = ম্যাজেন্টা (Magenta)
সবুজ + নীল = সায়ান (Cyan)
লাল + সবুজ + নীল = সাদা

এই পদ্ধতির প্রয়োগ করে বিভিন্ন আলোক উৎস যেমন ডিজিট্যাল স্ক্রিন, প্রোজেক্টর, স্টেজ লাইটিং করা হয়।

২. পেন্টের ক্ষেত্রে মৌলিক রং

পেন্ট বা জল রঙের ক্ষেত্রে সাবট্র্যাকটিভ কালার মিক্সিং পদ্ধতিতে রং নির্ধারিত হয়। এক্ষেত্রে, কোন কিছুর রং কী হবে তা নির্ধারিত হয় আলোর তরঙ্গ শোষণ করার মাধ্যমে। এখানে, বিভিন্ন রঙের পিগমেন্ট (যেমন পেইন্ট) আলো শোষণ করে এবং শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রতিফলিত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হলুদ রঙের পদার্থ তার উপর আপতিত সাদা আলো থেকে আলো বর্ণালীর নীল রং শোষণ করে নেয় এবং লাল ও সবুজ রং প্রতিফলিত করে যা একত্রে হলুদ রং দেখায়। কালো রঙের বস্তু সব রঙের আলোক তরঙ্গ শোষণ করে নেয় তাই কালো দেখায় অপর দিকে সাদা রঙ্গের বস্তু আলোকবর্ণালীর কোন রং শোষণ করে না পুরোটাই প্রতিফলিত করে। এইভাবেই পেন্টের বিভিন্ন রং আমরা দেখি।

এবার, যখন বিভিন্ন রঙের পিগমেন্ট একত্রিত হয়, তারা একে অপরের আলোর তরঙ্গ শোষণ করে এবং একটি নতুন রঙ তৈরি হয়।

এই মডেলটি সাধারণত পেইন্টিং, প্রিন্টিং বা রঙের অন্যান্য পদার্থগত ব্যবহারে ব্যবহার হয়। এখানে, সায়ান, ম্যাজেন্টা এবং হলুদ মৌলিক রং হিসাবে ব্যবহৃত হয় (CMY)- সাধারণভাবে আমরা লাল, নীল ও হলুদকে মৌলিক রং বলি।

কেন ম্যাজেন্টা, সায়ান, এবং হলুদ মৌলিক রং?

এই তিনটি রং একে অপরের সাথে মিশিয়ে বিভিন্ন রঙ তৈরি করা হয়, কারণ এগুলো আলো শোষণ করে এবং প্রতিফলিত আলোর তরঙ্গ একে অপরের কাছ থেকে ভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাজেন্টা রঙ সবুজ তরঙ্গ শোষণ করে এবং লাল ও নীল প্রতিফলিত করে, সায়ান রঙ লাল তরঙ্গ শোষণ করে এবং নীল ও সবুজ প্রতিফলিত করে; হলুদ রঙ নীল তরঙ্গ শোষণ করে এবং লাল ও সবুজ প্রতিফলন করে।

এই তিনটি মৌলিক রং মিশিয়ে বাকি সমস্ত রং তৈরি করা সম্ভব। এর কিছু উদাহরণ এখানে দেওয়া হল, পরিমাণের রকমফেরে এই রংগুলির সামান্য তারতম্য ঘটতে পারে।

ম্যাজেন্টা + সায়ান = বেগুনি
ম্যাজেন্টা + হলুদ = কমলা
সায়ান + হলুদ = সবুজ
ম্যাজেন্টা + সায়ান + হলুদ = কালো

সহজভাবে বললে, আলোর ক্ষেত্রে মৌলিক রং লাল, সবুজ, নীল (Additive Model), যেখানে আলোর তরঙ্গ যোগ করার মাধ্যমে রং তৈরি হয়।
পেন্টের ক্ষেত্রে মৌলিক রং ম্যাজেন্টা, সায়ান, হলুদ (Subtractive Model), যেখানে আলোর তরঙ্গ শোষণ এবং প্রতিফলন ঘটে।

এই কারণে, আলোর রঙ এবং পেন্টের রঙের মডেল দুটি আলাদা, এবং সেগুলোর মৌলিক রংও আলাদা।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।