প্রাচীনকাল থেকেই মানুষেরা বিশ্বাস করত অন্য পদার্থ থেকে সোনা তৈরি সম্ভব। অতীতে এক রহস্যময় বিদ্যার প্রচলন ছিল, যার নাম অ্যালকেমি (Alchemy)। অ্যালকেমিস্টরা বিশ্বাস করতেন যে সাধারণ ধাতুকে সোনায় রূপান্তর করা সম্ভব, যদি তাঁরা পরশ পাথর (Philosopher’s Stone) নামক এক জাদুকরী বস্তু খুঁজে পান। শত শত বছর ধরে বিজ্ঞানী ও সাধকরা এই রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন — কেউ গোপন গবেষণাগারে, কেউ বা রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতায়। এমনকি শিল্প-সাহিত্যেও বারবার এসেছে “পরশপাথর” এর কথা। রাজশেখর বসুর গল্প অবলম্বনে সত্যজিত রায়ের বিখ্যাত সিনেমা “পরশ পাথর” বা রবীন্দ্রনাথ এর “পরশ পাথর” কবিতা লোহা থেকে সোনা তৈরি করার কল্পনা থেকেই সৃষ্টি।
কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অন্য পদার্থ (মৌল) থেকে সোনা তৈরি সম্ভব নয়, সোনার কোন যৌগ থেকেই শুধু মাত্র সোনা নিষ্কাশন সম্ভব হতে পারে। তবে আধুনিক বিজ্ঞান এও আবিষ্কার করেছে যে পারমাণবিক পরিবর্তন বা নিউক্লিয়ার ট্রান্সমিউটেশন নামক এক বিশেষ পদ্ধতিতে সত্যিই অন্য পদার্থ থেকে সোনা তৈরি সম্ভব। তাহলে কি আজকের বিজ্ঞান সেই প্রাচীন স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে? চলুন, জেনে নেওয়া যাক আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে অন্য পদার্থ থেকে সোনা তৈরি সম্ভব কীভাবে?
অন্য পদার্থ থেকে সোনা তৈরি সম্ভব কীভাবে?
সোনার একটি পরমাণুতে ৭৯টি প্রোটন থাকে। তাই অন্য মৌল থেকে সোনা তৈরি করতে হলে সেই মৌলের পরমাণু সংখ্যাকে পরিবর্তন করে ৭৯ করতে হবে। অর্থাৎ খাতায় কলমে, পারদ বা মার্কারির (পারমানবিক সংখ্যা ৮০) থেকে একটি প্রোটন বের করে বা প্লাটিনামের (পারমানবিক সংখ্যা ৭৮) সঙ্গে একটি প্রোটন যোগ করে সোনায় রূপান্তরিত করা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি নিউক্লিয়ার ট্রান্সমিউটেশন (Nuclear Transmutation) নামে পরিচিত, যা সাধারণত পারমাণবিক বিক্রিয়া বা কৃত্রিম নিউক্লিয়ার রিয়্যাকশনের মাধ্যমে ঘটে।
এই পদ্ধতিতে পারদ বা প্লাটিনামের নিউক্লিয়াসে পার্টিকেল অ্যাক্সিলেটর (particle accelerators) যন্ত্রের সাহায্যে সজোরে নিউট্রন কণা ছুঁড়ে দেওয়া হয়। এর ফলে ওই দুই মৌলের নিউক্লিয়াসে একটা নিউট্রন যোগ হতে পারে কিংবা একটা নিউট্রন নিউক্লিয়াস থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতেও পারে। যোগ হওয়া নিউট্রনটা তেজস্ক্রিয় ক্ষয় (Radioactive Decay) এর ফলে একসময় প্রোটনে পরিণত হয়। এভাবে প্লাটিনামে একটি প্রোটন যুক্ত হয়ে প্রোটন সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৯ টি। অর্থাৎ প্লাটিনাম পরিণত হয় সোনায়। আবার পারদের নিউক্লিয়াস লক্ষ্য করে নিউট্রন ছুঁড়লে নিউক্লিয়াসটি অস্থিতিশীল ও তেজস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সেটাই একসময় তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের ফলে সোনায় পরিণত হয়। এছাড়াও অন্যান্য তেজস্ক্রিয় মৌল থেকেও পারমানবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সোনা তৈরি সম্ভব।
তবে এই পদ্ধতিগুলি এতটাই ব্যয়বহুল যে এই পদ্ধতিতে সোনা তৈরি করে লাভবান হওয়ার কোন সম্ভবনা নেই। এছাড়াও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতিতে প্রাপ্ত সোনা তেজস্ক্রিয় মৌল হিসেবে পাওয়া যায় দ্রুত ক্ষয়লাভ করে এবং মানুষের উপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে বলে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না
অবশেষে বলা যায়, পরশ পাথরের মত কোনকিছুর আবিষ্কার আজও সম্ভব হয়নি যা ছোঁয়ালেই অন্য পদার্থ সোনায় পরিণত হতে পারে! আর সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সোনা তৈরি করা সম্ভব নয় – সোনার কোন যৌগ থেকে সোনা তৈরি করা সম্ভব তবে তা হল সোনা নিষ্কাশনের পদ্ধতি, সম্পূর্ণ অন্য মৌল থেকে সোনা তৈরি নয় । আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে পারমাণবিক বিক্রিয়া ব্যবহার করে অন্য মৌল থেকে সোনা তৈরি করা সম্ভব, যদিও এটি অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ এবং বাস্তবে লাভজনক নয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান