সববাংলায়

দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: প্রলয় কাণ্ড, চরম হট্টগোল, তুমুল গোলমাল। এই প্রবাদটির সঙ্গে হিন্দু পুরাণের মহাদেব, সতী ও দক্ষের যজ্ঞের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। এখানে আমরা জেনে নেব “দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার” প্রবাদটি এলো কীভাবে।

এই প্রবাদ এসেছে দক্ষ প্রজাপতির দম্ভের কারণে তৈরি হওয়া এক বিশৃঙ্খলার থেকে। প্রজাপতিরা হলেন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার মানসপুত্র, যাদের মাধ্যমে জীবসমূহের সৃষ্টি। এসব প্রজাপতি্রা হলেন মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, বশিষ্ঠ, দক্ষ, ভৃগু ও নারদমুনি। মূল প্রজাপতি হলেন ব্রহ্মা।

দক্ষের জন্ম হয়েছিল ব্রহ্মার বুড়ো আঙ্গুল থেকে। মনুর কন্যা প্রসূতির গর্ভে তার ষোলজন কন্যার জন্ম হয়। তাদের মধ্যে সতীর বিয়ে হয় শিবের সঙ্গে এবং সেই সূত্রে ভগবান শিবের শ্বশুর হলেন দক্ষ। কিন্তু শিবের বৈরাগ্য, সমাজবহির্ভূত জীবনযাপন ও প্রথাবিরোধী স্বভাব দক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। শিবকে তিনি একজন অযোগ্য, নিয়মভঙ্গকারী তপস্বী হিসেবেই দেখতেন। এই অন্তর্নিহিত অহংকার ও অবজ্ঞাই পরবর্তীকালে এক ভয়াবহ ঘটনার সূত্রপাত করে।

একসময় দক্ষ প্রজাপতি এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেন — যার উদ্দেশ্য ছিল নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা। তিনি প্রায় সব দেবতা, ঋষি ও প্রজাপতিদের আমন্ত্রণ জানান, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে শিবকে নিমন্ত্রণ করেন না। সতী পিতৃগৃহের যজ্ঞের সংবাদ পান এবং তিনি বিনা আমন্ত্রণেই সেখানে উপস্থিত হনন। সতী আশা করেছিলেন যে পিতা কন্যার মর্যাদা রক্ষা করবেন। কিন্তু যজ্ঞস্থলে পৌঁছে সতী দেখতে পান, তাঁর স্বামী শিবকে প্রকাশ্যে অপমান করা হচ্ছে। দক্ষ যজ্ঞসভায় শিবের নিন্দা করেন এবং তাঁকে অযোগ্য বলে আখ্যা দেন।

এই অপমান সতীর কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। তিনি যুক্তি দেন যে শিব সকল দেবতার ঊর্ধ্বে, কিন্তু দক্ষ তাঁর কথা গ্রহণ করেন না। গভীর দুঃখ ও ক্রোধে সতী ঘোষণা করেন, যিনি শিবকে অপমান করেন, তাঁর গৃহে জন্ম নেওয়া দেহ আর তিনি ধারণ করবেন না। এরপর যজ্ঞকুণ্ডের আগুনেই তিনি যোগাগ্নিতে আত্মত্যাগ করেন।

সতীর মৃত্যুসংবাদ শিবের কাছে পৌঁছালে তিনি ভয়ংকর রুদ্ররূপ ধারণ করেন। তাঁর জটা থেকে তৈরি করেন বীরভদ্র ও ভদ্রকালীকে এবং তাঁদের নির্দেশ দেন দক্ষের যজ্ঞ ধ্বংস করতে। বীরভদ্র যজ্ঞস্থলে পৌঁছে দেবতাদের পরাভূত করেন, যজ্ঞ লণ্ডভণ্ড করেন এবং শেষে দক্ষের মুণ্ডচ্ছেদ করেন। ফলে সেই মহাযজ্ঞ সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়।

পরবর্তীকালে দেবতারা উপলব্ধি করেন যে অহংকার ও অবমাননার ফলে মহাবিপর্যয় ঘটেছে। তাঁদের প্রার্থনায় শিবের ক্রোধ প্রশমিত হয়। শিব দক্ষকে পুনর্জীবিত করেন — কিছু পুরাণ মতে ছাগলের মস্তক স্থাপন করে — এবং যজ্ঞ সম্পূর্ণ করার অনুমতি দেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দক্ষের অহংকার ভঙ্গ হয় এবং যজ্ঞ লাভ করে নতুন অর্থ।

এইভাবেই পুরাণে “দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার” কেবল একটি কাহিনী নয়, বরং অহংকার, আচারসর্বস্ব ধর্মবোধ এবং চেতনার দ্বন্দ্বের এক গভীর প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রুদ্ররোষে লণ্ডভণ্ডকারী প্রলয়কাণ্ডকে তাই “দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার” বলে থাকি আমরা। দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার মানেই লণ্ডভণ্ড কর্মকাণ্ডে বিপর্যস্ত অবস্থা।

‘দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:

১। বিয়ে বাড়িতে পাত্রপক্ষের লোকেরা সামান্য বিষয় নিয়ে এমন ঝামেলা পাকালো যে বিয়ে প্রায় পণ্ড হওয়ার অবস্থা হয়ে দাঁড়ালো – যেন একেবারে ‘দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার’ ঘটে গেল।
২। মেসি কলকাতায় এলেও দর্শকদের সামনে না আসায় স্টেডিয়ামে ‘দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার’ ঘটে গেল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ৮১ পৃঃ

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading