ইতিহাস

বাংলায় বর্গী আক্রমণের ফলাফল

বাংলায় বর্গী আক্রমণ বাংলার ইতিহাসে একটি কালান্তক অধ্যায়।বাংলায় বর্গী আক্রমণের ফলাফল  দেখতে বসলে তাই আজও শিউরে উঠতে হয়। ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত দশ বছর ধরে বাংলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে নিয়মিতভাবে বর্গীহানা বাংলার প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে দিয়েছিল।বর্গী তথা মারাঠি ধনগর জাতের এই লুঠেরাদের নেতা ছিলেন নাগপুর রাজ্যের মহারাজা প্রথম রঘুজী ভোঁসলের প্রধানমন্ত্রী তথা ভাস্কর পণ্ডিত। ১৭৪১ সালে উড়িষ্যা আক্রমণের মাধ্যমে যে আক্রমণের সূচনা হয়, তা আনুষ্ঠানিক ভাবে শেষ হয় ১৭৫১ সালের মে মাসে বাংলার নবাব আলীবর্দী খানের সাথে মারাঠা রাজ রঘুজীর সন্ধি স্বাক্ষরের মাধ্যমে।

১৭৫১ সালে যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বাংলায় মারাঠা আক্রমণের অবসান ঘটে তাতে  উড়িষ্যা কার্যত মারাঠাদের অধীনস্থ হয় এবং আলীবর্দী মারাঠাদের বার্ষিক হারে চৌথ প্রদান করতে রাজি হন।

শান্তিচুক্তির শর্তগুলি ছিল এরকম:

১) বাংলার নবাবের অধীনে উড়িষ্যার শাসনকর্তা নিযুক্ত হবেন মীর হাবিব।

২) নবাব বাংলা ও বিহারের জন্য মারাঠাদেরকে বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা হারে চৌথ দেবেন।

৩) বাংলার নবাব যত দিন এই কর দেবেন ততদিন মারাঠারা বাংলায় আক্রমণ চালাবে না।

৪) সুবর্ণরেখা নদী বাংলা ও উড়িষ্যার সীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে (এর ফলে দক্ষিণ মেদিনীপুর উড়িষ্যার সঙ্গে যুক্ত হয়)।

এই চুক্তি অনুযায়ী উড়িষ্যার ওপর বাংলার নবাবের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব বজায় থাকলেও প্রকৃতপক্ষে মীর হাবিব স্বাধীনভাবেই উড়িষ্যার শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। কিন্তু এই অবস্থা বাংলার ভাগ্যাকাশে বেশীদিন স্থায়ী থাকল না।১৭৫২ সালের ২৪ আগস্ট জানুজীর মারাঠা সৈন্যরা মীর হাবিবকে হত্যা করে। রঘুজী, মুসলেহউদ্দিন মুহম্মদ খান নামক তাঁর একজন মুসলিম সভাসদকে এরপর উড়িষ্যার শাসনকর্তা নিযুক্ত করলে উড়িষ্যার ওপর থেকে বাংলার নবাবের যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ কার্যত লোপ পায়। প্রকৃতপক্ষে উড়িষ্যা মারাঠা সাম্রাজ্যের নাগপুর রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়।

বাংলায় মারাঠা আক্রমণকালে মারাঠা সৈন্যরা বাংলার জনসাধারণের ওপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার-নির্যাতন চালায় তার কোন নজির ইতিহাসে মেলা ভার। মারাঠা বর্গীরা নির্বিচারে সমগ্র বাংলা জুড়ে লুঠতরাজ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ভয়ংকর এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ১৭৪২ সালের মে মাসে মুর্শিদাবাদ লুঠ করে ফেরার পথে মারাঠা হানাদারেরা পথিমধ্যে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে শ্মশান করে দেয়। ১৭৪২ সালের জুনে মারাঠারা হুগলী অধিকার করলে তাদের অত্যাচারে হুগলীবাসীর দুর্দশা চরমে পৌঁছয়। মারাঠারা অগণিত সাধারণ মানুষকে হত্যা করে বাংলাকে প্রায় নরমেধ যজ্ঞের বধ্যভূমিতে পরিণত করে। ধারণা করা হয়, বাংলার প্রায় চার লক্ষ অধিবাসী মারাঠা আক্রমণকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিল। বিপুলসংখ্যক নারী মারাঠাদের হাতে ধর্ষিত হয়। ফলে বহু মানুষ তাঁদের পরিবারের নারীদের সম্মান রক্ষার জন্য তাঁদের বাড়িঘর ত্যাগ করে গঙ্গানদীর পূর্বতীরে চলে গিয়ে গোদাগারী-তে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।

অনিয়মিত মারাঠা আক্রমণ গঙ্গানদীর পূর্ব তীরের নবাবের শাসনের প্রতিও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। যেসব অঞ্চলের ওপর নবাব কর্তৃত্ব হারিয়েছিলেন সেসব অঞ্চলে মারাঠা দলগুলো উদ্দেশ্যহীনভাবে ধ্বংস লীলা এবং অকথ্য অত্যাচার চালায়। মারাঠা লুণ্ঠনের ভয়ে বণিক এবং তাঁতিরা বীরভূম থেকে পালিয়ে যান। মারাঠা ধ্বংসযজ্ঞের প্রবল আতঙ্কে রেশম বস্তুসামগ্রী প্রস্তুতকারীরাও এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। রেশম এবং কাপড়ের কারখানা ও বিক্রয়কেন্দ্রগুলো পরিত্যক্ত হয়, খাদ্যশস্য দুর্লভ হয়ে পড়ে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সব ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়। ১৭৪২ সালের সেপ্টেম্বরে কাটোয়ার যুদ্ধে পরাজয়ের পর পলাতক মারাঠা সৈন্যরা মেদিনীপুরে যায়, সেখানকার একটি বিখ্যাত রেশম-পালন কেন্দ্র রাধানগর লুঠ করে এবং জ্বালিয়ে দেয়। ঝাড়গ্রামের কুলটিকরি থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি যাওয়ার পথে পড়ে কিয়ারচাঁদ। এই কিয়ারচাঁদের বিরাট এলাকায় শয়ে শয়ে লম্বা, চৌকো বিভিন্ন আকৃতির নানা রকম পাথর পোঁতা আছে যা এই এলাকায় বর্গীদের ত্রাসের সাক্ষ্যই বহন করছে। বর্গিদের অত্যাচারে ত্রস্ত স্থানীয় জমিদার সারি সারি পাথর পুঁতেছিলেন এবং সন্ধ্যার সময় ওই সব পাথরের গায়ে জ্বলন্ত মশাল বেঁধে দেওয়া হত যা দূর থেকে দেখলে মনে হত, মশালধারী সৈন্যরা গড় পাহারা দিচ্ছে।

এই একটি উদাহরণই যথেষ্ট মেদিনীপুরে বর্গিরা কতটা আতঙ্ক তৈরি করেছিল তার সাক্ষ্য প্রমাণ হিসেবে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই উড়িষ্যা সংলগ্ন মেদিনীপুর বারবার বর্গি হানার শিকার হয়েছে। সম্পদহানির সঙ্গে সঙ্গে প্রাণহানির হিসেব নেই কোন।মানুষ মারতে দ্বিধা না করলেও ঠাকুর-দেবতায় বর্গিদের ছিল শ্রদ্ধা অটল। তারা সব লুঠ করলেও কোনও দেব-মন্দির লুঠ করেনি। একথা শোনা যায় বর্গভীমা মন্দিরের কোনও অংশে তারা হাত পর্যন্ত দেয়নি। আবার সাঁকরাইল থানার পিতলকাঠি (পাথরাকাটি) গ্রামের জয়চণ্ডী মন্দিরকে তারা নতুন ভাবে তৈরি করে দিয়েছিল বলেও শোনা যায়। মন্দিরের পাশে ছিল ভুঁইয়া রাজার গড়। এই ভুঁইয়ারা প্রচুর ধন-সম্পদশালী ছিল। বর্গি হামলায় তিনি নিঃস্ব হয়ে যান। এবং তাঁর বংশধারাও লোপ পায়। এখনও এই এলাকায় রাজার ভাঙা-গড়ের চিহ্ন দেখা যায়। ১৭৬৯ সালে বিশাল মারাঠা বাহিনী সুবর্ণরেখা পার হয়ে বাংলার প্রান্ত সীমায় উপস্থিত হয়ে সমগ্র মেদিনীপুরকে শ্মশানে পরিণত করে বর্ধমানের দিকে এগিয়ে যায়। শস্যের অভাবে, খিদের জ্বালায় মানুষ কলাগাছের তেউড় ও পশুরা খড় ও পোয়ালের অভাবে গাছের পাতা খেয়ে খিদে মেটাতে বাধ্য হয়েছিল। খাবারের প্রবল অভাবে বিশেষ করে সদর রাস্তার ধারের গ্রামগুলো প্রায় মানুষ শূন্য হয়ে গিয়েছিল।এরকমভাবে দীর্ঘ দশ বছর ধরে মারাঠা হানাদারেরা বাংলার জনগণের মধ্যে যে অভাবনীয় ত্রাস ও আতঙ্কের সঞ্চার করেছিল তা ছিল এককথায় নজিরবিহীন।

তথ্যসূত্র


  1. Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib by Nitish K. Sengupta.
  2. Advance Study in the History of Modern India, Volume-1 by G.S.Chhabra.
  3. Advanced Study in the History of Modern India by Jaswant Lal Mehta.
  4. "Forgotten Indian history: The brutal Maratha invasions of Bengal".
  5. https://www.ebanglalibrary.com/
  6. https://www.anandabazar.com/editorial/bargis-had-spread-terror-in-west-bengal-1.934645

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।