উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে সংবাদপত্রগুলির সক্রিয়তা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেই সময়তেই ষাটের দশকে দুই বাঙালি সহোদর মিলে অমৃতবাজার পত্রিকা (Amrita Bazar Patrika) নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন বাংলা ভাষায়। পরবর্তীতে তা বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই প্রকাশ পেয়েছিল। ইংরেজ শাসনের অনাচারের বিরুদ্ধে অমৃতবাজার অকপটে প্রতিবাদ করেছে তাদের পত্রিকায়। মূলত অমৃতবাজার পত্রিকার মতো ব্রিটিশবিরোধী পত্রিকাকগুলিকে স্তব্ধ করতেই ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট (Vernacular Press Act, 1878) প্রবর্তন করেছিলেন ব্রিটিশ বড়লাট। নীলচাষীদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরা থেকে শুরু করে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা, গান্ধীজীর আন্দোলনকে সমর্থন এমনকি দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রভাবশালী সব প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করে গেছে অমৃতবাজার পত্রিকা। এই পত্রিকার সুখ্যাতি ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ইংল্যান্ডের সাংবাদিকরাও এই কাগজটি দেখতেন এবং কথিত আছে রাশিয়ার জননেতা ভ্লাদিমির লেনিনও অমৃতবাজার পত্রিকাকে ভারতের সেরা জাতীয়তাবাদী পত্রিকার তকমা দিয়েছিলেন।
১৭৮০ সালে প্রকাশিত জেমস অগাস্টাস হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’ ছিল ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্র। সেই কাগজ ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হত। তবে বাংলা ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশ হতে আরও বেশ কিছুটা সময় লেগে গিয়েছিল। ১৮১৮ সালে একজন সাহেব জন ক্লার্ক মার্শম্যানের হাত ধরে ‘সমাচার দর্পণ’ নামে প্রথম বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। যদিও খাতায়-কলমে মার্শম্যানের নাম সম্পাদক হিসেবে থাকলেও বাঙালি পণ্ডিতেরাই নাকি সেই সংবাদপত্রটি পরিচালনা করতেন। এর পরপরই ‘সংবাদকৌমুদী’ (১৮২১), ‘সমাচারচন্দ্রিকা’ (১৮২২) ইত্যাদির মতো প্রভাবশালী সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে।
ভারতে সংবাদপত্রের সূচনা হওয়ার পর থেকেই মানুষের উপরে তা প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। সংবাদপত্রকে হাতিয়ার করেই বহু শিক্ষিত, চিন্তাশীল মানুষ কালে কালে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন, সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলেছেন। বিশেষত ব্রিটিশদের লাগামছাড়া অবিচার, অত্যাচার যখন নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তখন বেশ কিছু নির্ভীক মানুষ এগিয়ে আসেন সংবাদপত্রকে অবলম্বন করে এবং তাঁদের অগ্নিবর্ষী কলম দুর্বিনীত ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে অকপটে আওয়াজ তুলতে একটুও দ্বিধা বোধ করেনি। উল্টেটাও অবশ্য দেখা গেছে। ব্রিটিশ শাসনের অকুন্ঠ প্রশংসাও বহু সংবাদপত্র ছেপেছে নির্দ্বিধায়। কেবলমাত্র রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ব্যাপারই নয় কেবল, স্ত্রীশিক্ষা, বিধবা বিবাহ, বহুবিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সব বিষয় নিয়েও বিভিন্ন সংবাদপত্র বিবিধ মতামত রেখেছে। একটির সঙ্গে আরেকটির মতবিরোধ হয়েছে এমনকি কখনও কখনও সরাসরি বিবাদও বেধেছে। সাধারণ মানুষের হাতে হাতে ঘুরেছে সেইসব কাগজ, তাদের প্রভাবিতও করেছে। সংবাদপত্রের এই ধারাবাহিকতায় অমৃতবাজার পত্রিকা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিটিশ শাসনাধীন বঙ্গ প্রদেশে যশোর জেলার (অধুনা বাংলাদেশ) অন্তর্গত মাগুরার ধনী বণিক হরিনারায়ণ ঘোষের পুত্র শিশিরকুমার ঘোষ এবং মতিলাল ঘোষ একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র করবেন বলে নিজেদের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের আরেক ভাই হেমন্তকুমার ঘোষও এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উল্লেখ্য যে মতিলাল ঘোষ নিজে সেই অর্থে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। তাঁদের পরিবার মাগুরাতে একটি বাজার নির্মাণ করেছিল এবং হরিনারায়ণ ঘোষের স্ত্রী অমৃতময়ীর নামে বাজারটির নামকরণ করা হয়েছিল অমৃত বাজার। সেখান থেকে দুই ভাই সংবাদপত্রটি প্রকাশ করেছিলেন বলে জায়গার নামেই পত্রিকার নাম অমৃতবাজার পত্রিকা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৮৬৮ সালের মার্চ মাসে প্রথম এই সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল। ৩২ টাকা দিয়ে কেনা পেটানো কাঠের মুদ্রণযন্ত্রে পত্রিকাটি ছাপা হত। প্রথমদিকে কেবল বাংলা ভাষাতেই প্রকাশিত হত কাগজটি।
মূলত নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে শোষিত কৃষকদের অধিকার আদায়ের কাজে তাদের পাশে দাঁড়ানোর এবং সেকাজে সাহায্য করবার অভিপ্রায় নিয়েই শিশির এবং মতিলাল এই সংবাদপত্র প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে কেবল সেইটুকু পরিসরেই তা সীমাবদ্ধ থাকেনি, ধীরে ধীরে অমৃতবাজারে ইংরেজ সরকারের নানারকম দুরাচারের বিরুদ্ধে লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। কেবল তাইই নয়, বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন জাতিভেদ, বাল্যবিবাহ, লিঙ্গবৈষম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছিল অমৃতবাজার। পত্রিকা প্রকাশ হওয়ার ঠিক চারমাস পরেই ১৮৬৮ সালের জুলাই মাসে একজন ইংরেজ সাবডিভিশনাল অফিসার মিস্টার রাইট-এর তীব্র সমালোচনা করে ফলে সাহেব তাতে অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন। রাইট সম্পাদকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মানহানির মামলা করেছিলেন কিন্তু আদালত সম্পাদককে দোষী সাব্যস্ত করেনি।
প্রকাশের পর সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৮৭১ সালে সেই গ্রামে ভয়ানক প্লেগের (মতান্তরে ম্যালেরিয়া) উৎপাত শুরু হয়েছিল। সেবছর অক্টোবর মাসে ঘোষ ভাইয়েরা গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন এবং বৌবাজার অঞ্চলে পত্রিকার নতুন অফিস খোলা হয়। তাঁরা বার্ষিক গ্রাহক হওয়ার জন্য পাঁচটাকা ধার্য করেন, বিনিময়ে ক্রেতারা পেতেন ফুলস্কেপ কাগজের মোট আটপৃষ্ঠার সংবাদপত্র। কলকাতাতে আসার পরই পত্রিকাটি একটি দ্বিভাষিক সাপ্তাহিক পত্রিকাতে রূপান্তরিত হয় অর্থাৎ বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই তাতে সংবাদ প্রকাশিত হত। পত্রিকাটি এসময় থেকে ধীরে ধীরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা তো পেয়েছিলই এমনকি ব্রিটেনের সাংবাদিকরাও এই ধরনের সাংবাদিকতার জন্যই অমৃতবাজারের প্রতি নজর রাখতেন। লণ্ডনের সংবাদপত্রগুলিতে ভারতীয় প্রশাসন সম্পর্কিত উদ্ধৃতিগুলি অধিকাংশই অমৃতবাজার থেকে গ্রহণ করা হত। ১৮৭২ সালে বেঙ্গল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রিপোর্টে অমৃতবাজার সম্পর্কে লেখা হয়েছিল কেউ কেউ মনে করেন অন্যান্য পত্রিকার তুলনায় অমৃতবাজারই বেশি পঠিত সংবাদপত্র। ১৮৭৪ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বৌবাজার অঞ্চলে থাকবার পর সংবাদপত্রের অফিস স্থানান্তরিত হয়ে বাগবাজারে চলে যায়।
অমৃতবাজারের জনপ্রিয়তা এবং সাধারণ মানুষের উপর তার প্রভাব দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। একটা সময় পর থেকে তা ইংরেজ সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে। স্যার অ্যাশলে ইডেন যখন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর হয়েছিলেন তখন তিনি ভীষণই কঠোর হাতে বাংলাকে শাসন করতে চেয়েছিলেন। সেসময় সরকারের তীব্র সমালোচক অমৃতবাজার পত্রিকাকে তিনি শত্রুর চোখে দেখতে শুরু করেন। তবে প্রথমেই কোনও কঠিন পদক্ষেপ না নিয়ে স্যার অ্যাশলে সম্পাদক শিশির ঘোষকে একটি প্রস্তাব দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তিনি শিশির ঘোষকে তাঁর সঙ্গে প্রদেশ পরিচালনার কাজে যোগ দেবার আহ্বান জানান এবং সেই সঙ্গে বলেন যে সংবাদপত্রে সরকারের সমালোচনা করে যখনই কোনও প্রবন্ধ শিশির ঘোষ লিখবেন ছাপার আগে তা অ্যাশলেকে দেখাতে হবে। শিশির ঘোষ বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন এবং অকপটে বলেন যে দেশে একজন অন্তত সৎ সাংবাদিক থাকা উচিত। তাঁর প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে অ্যাশলে ভারতের ভাইসরয় লিটনের সঙ্গে দেখা করেন এবং অমৃতবাজারের কন্ঠরোধ করবার জন্য কোনও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবার জন্য রাজি করান। এরপরেই ১৮৭৮ সালের ১৪ মার্চ সংবাদপত্রগুলির লেখার বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ এবং সরকার বিরোধী লেখা থেকে তাদের বিরত রাখবার জন্য প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি বিল পাঠ করা হয়, এটি ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট ১৮৭৮ নামে পরিচিত। এই সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন প্রবর্তনের কেন্দ্রীয় কারণই ছিল অমৃতবাজার পত্রিকার স্বাধীনতা হরণ করে তাদের কন্ঠরোধ করা। ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট সম্পর্কে লিটন বলেছিলেন স্বদেশী ভাষায় লেখা পত্রিকাগুলি মূলত অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মানুষদের জন্য। এমনকি তিনি পাঠকদের ইংরেজি বুঝতে অসুবিধাকে বুদ্ধিমত্তার অভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন ফলে তাঁর মতে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে সহজেই সেই মানুষগুলি সায় দিতে শুরু করে এবং প্রতিবাদ জাগিয়ে তোলে। এই আইন কেবল তাই ভার্নাকুলার পত্রিকাগুলিকে নিয়ন্ত্রণের জন্যই প্রবর্তন করা হয়েছে। এই বিল ঘোষণার পর অমৃতবাজার পিছিয়ে তো যায়নি বরং পরদিন থেকেই পুরো কাগজটিই কেবল ইংরেজি ভাষায় ছাপতে শুরু করে। ১৮৭৮ সালের ২১ মার্চ থেকে অমৃতবাজার ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশ পেতে থাকে। কলকাতা ছাড়াও কটক, রাঁচি, এলাহাবাদ থেকেও ইংরেজি অমৃতবাজার প্রকাশ পেত।
এরপরেও বিভিন্ন সময়ে অনেক এমন সংবাদ প্রকাশ করেছে এই পত্রিকা যার ফলে ইংরেজ সরকার স্থির থাকতে পারেনি। লর্ড ডাফরিন যখন ভারতের ভাইসরয় ছিলেন সেসময় অমৃতবাজার স্যার লেপেল গ্রিন এবং ভোপাল প্রশাসনের কুকীর্তিগুলি উন্মোচিত করে দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ভাইসরয় সেসময় অমৃতবাজারের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেননি কারণ তিনি জানতেন যে তা উল্টে কুখ্যাতি বয়ে আনবে।
আবার লর্ড ল্যান্সডাউন যখন ভারতের ভাইসরয় ছিলেন সেসময় সংবাদপত্রটি তার প্রথম পৃষ্ঠায় কাশ্মীর সম্পর্কিত গোপনীয় এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করেছিল। কথিত আছে, অমৃতবাজারের কোনও এক সাংবাদিক ডাস্টবিন থেকে কয়েকটি ছেঁড়া কাগজের টুকরো উদ্ধার করেছিল এবং তা ছাপিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল যে ভাইসরয় মহারাজা প্রতাপ সিংহের কাছ থেকে কাশ্মীর আত্মসাৎ করে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। মহারাজ এই খবর পাওয়ার পর লণ্ডনের কর্তৃপক্ষের কাছে এর তীব্র বিরোধিতা করেন এবং কাশ্মীরের স্বাধীন মর্যাদা বজায় রাখতে সক্ষম হন। এই ঘটনার জেরে ১৮৮৯ সালে সরকারি নথি ও তথ্য প্রকাশ রোধ করবার জন্য একটি আইন পাস হয়, যেটি ভারতীয় সরকারি গোপনীয়তা আইন ১৮৮৯ নামেও পরিচিত। অমৃতবাজার বিভিন্ন সরকারি গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কংগ্রেসপন্থী এক জোরালো কন্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল।
১৮৯১ সালে অমৃতবাজার একটি দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশ পেতে শুরু করে।
পত্রিকাটি নির্ভীক সাংবাদিকতার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছিল। ১৮৯৭ সালে যখন বাল গঙ্গাধর তিলককে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয় তখনও অমৃতবাজার পত্রিকা তিলককে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছিল। এমনকি তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য অমৃতবাজার তহবিলও সংগ্রহ করেছিল। যে বিচারক তিলককে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেছিল অমৃতবাজার। পরবর্তীতে ১৯০৫ সালে যখন সারা বাংলায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল তখন এই বিভাজনের তীব্র বিরোধিতা করে অমৃতবাজার। পত্রিকার অফিসটি অনেক নেতার কাজের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছিল। বঙ্গভঙ্গের সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সম্পাদকীয়গুলির কারণে ১৯১০ সালে প্রেস অ্যাক্ট পাসের পর পত্রিকার কাছ থেকে ৫০০০ টাকা দাবি করা হয়েছিল। মতিলাল ঘোষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হলেও তিনি তাঁর অসামান্য বাক-পটুতার সাহায্যে আদালত থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের সাফল্যের নিমিত্ত এই পত্রিকা তাদের শেয়ার দান করেছিল। ১৯৪৬ সালে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর সময় পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভটি তিনদিন ধরে ফাঁকা রাখা হয়েছিল। ১৯৪৭-এর দেশভাগের আবহে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে দাঁড়িয়েছিল অমৃতবাজার।
এসব বৃহত্তর রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ছাড়াও ব্রিটিশদের অত্যাচারের যে কোনোরকম খবরাখবরেই গর্জে উঠত অমৃতবাজার। সুভাষচন্দ্র বসু এবং তাঁর কয়েকজন সহপাঠীকে ইংরেজের বিরুদ্ধে সাহসী আচরণের জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে যখন বহিষ্কার করে দেওয়া হয়েছিল তখন এই ঘটনার খুব নিন্দা করেছিল অমৃতবাজার এবং এমনভাবেই প্রতিবাদ করেছিল যে পুনরায় সুভাষচন্দ্রদের প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি করে নেওয়া হয়েছিল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বেঙ্গলি’ পত্রিকার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল অমৃতবাজার পত্রিকা।
১৯২২ সালে মতিতাল ঘোষের মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তীতে শিশির ঘোষের অবসরের পর তাঁর পুত্র তুষারকান্তি ঘোষ ১৯৩১ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছিলেন। অমৃতবাজার পত্রিকার সহযোগী সংবাদপত্র ছিল ‘যুগান্তর’। ১৯৯১ সালে অমৃতবাজার পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৬ সাল থেকেই এর পতন শুরু হয়েছিল। ততদিনে অফিসও বাগবাজার থেকে চলে গিয়েছিল মধ্য কলকাতার আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু রোডে। এসময় পত্রিকার বিজ্ঞাপন থেকে আয় ১ কোটি থেকে ২০ লক্ষতে নেমে আসে। অনেক কর্মচারী বেতন পাবার আশায় অফিসে যেতেন নিয়মিত। প্রুফ রিডার চণ্ডী ঘোষ পত্রিকার অফিসেই সুইসাইড করেন। ১৯৯১ সালে নাকি পত্রিকাটির ঋণ ছিল প্রায় ২১ কোটি টাকা। ঋণ শোধ করতে না পেরে, বেতন দিতে অক্ষম হয়ে মালিকপক্ষ হাল ছেড়ে দেন, ফলে অমৃতবাজার পত্রিকা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৬৮ থেকে ১৯৯১ সাল—মোট এই ১২৩ বছর অমৃতবাজার পত্রিকা সৎ সাংবাদিকতার অন্যতম একটি মুখ হিসেবে বিরাজমান ছিল। রাশিয়ার বিশ্বখ্যাত জননেতা ভ্লাদিমির লেনিন অমৃতবাজারকে ভারতের সেরা জাতীয়তাবাদী পত্রিকা বলে উল্লেখ করেছিলেন। অমৃতবাজার পত্রিকার ইতিহাস বাঙালির ব্যবসায়িক সফলতার পাশাপাশি নির্ভীকতা এবং ভয় না পাওয়া লড়াকু মানসিকতার ইতিহাসও বটে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান