সববাংলায়

হলদিঘাটির যুদ্ধ

ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল মোগল শাসন পর্ব। মোগল রাজশক্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট আকবরের সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ নীতি ইতিহাসবিদিত। উত্তর ভারত, বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ইত্যাদি জয় করতে পারলেও আকবর জানতেন রাজপুতানাকে মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত করা সহজ কাজ নয়, তবে মোগল সাম্রাজ্যকে দৃঢভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে রাজপুতদের মতো যোদ্ধা জাতির সহযোগিতা যে প্রয়োজন, আকবর তাও অনুভব করতে পেরেছিলেন৷ কিন্তু মেবারের মহারাণা প্রতাপ আকবরের এই নীতিকে উপেক্ষা করে মোগল শাসনের বশ্যতা স্বীকারে রাজি হয়নি। ফলত, মানসিংহের নেতৃত্বাধীন মোগল বাহিনী এবং  মহারাণা প্রতাপের মেবার বাহিনীর মধ্যে ভয়ঙ্কর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ১৫৭৬ সালের ১৮ জুন রাজস্থানের রাজসমন্দ জেলার হলদিঘাটিতে দুই পক্ষের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল বলে, ইতিহাসে এটি হলদিঘাটির যুদ্ধ বা হলদিঘাটের যুদ্ধ (Battle of Hadighati) নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে দুই পক্ষেরই যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তবে আবুল ফজলের লেখা অনুসারে রাজপুতদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনায় অনেক বেশি ছিল। আবুল ফজলের আকবরনামায় এই যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা উল্লিখিত রয়েছে।

আকবরের সাম্রাজ্যবিস্তার নীতি ইতিহাসের বহুচর্চিত এক অধ্যায়। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে একের পর এক বিভিন্ন রাজ্য জয় করে তিনি এক বিরাট ও শক্তিশালী মোগল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। কেউ বলেন আকবরের ছিল রাজ্য জয়ের নেশা, তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদী, কেউ আবার সেই মতকে খন্ডন করে দিয়ে বলেছেন আসলে ভারতে রাজনৈতিক ঐক্য ও সংহতি স্থাপনের জন্য এবং পৈতৃক রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি রাজ্যজয়ে অবতীর্ণ হন। আবার আবুল ফজল এই সাম্রাজ্যবিস্তার নীতির পিছনে যে একটি সৎ উদ্দেশ্য ছিল সেকথা লিখেছেন। আবুল ফজলের মতে, রাজাদের স্বৈরাচারে জর্জরিত জনসাধারণকে শান্তি দেওয়ার জন্যই নাকি আকবর রাজ্যজয়ে নেমেছিলেন।

কারণ যাই হোক, তিনি তাঁর অসাধারণ দক্ষ রণনীতি ও কৌশলের সাহায্যে সাম্রাজ্যের দ্রুত বিস্তারে সাফল্য লাভ করছিলেন। প্রথমে উত্তর ভারতের আজমীর, গোয়ালিয়র ও জৌনপুর মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল। পরবর্তীকালে গুজরাট, বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ইত্যাদি অংশগুলিও সফলভাবে অধিকার করেছিলেন। তবে আকবরের মতো দক্ষ প্রশাসকও জানতেন যে রাজপুতানাকে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা খুব সহজ কাজ নয়৷ সেইজন্য কৌশলে বৈবাহিক সম্পর্ক পাতিয়ে তাঁদেরকে নিজের অধীনস্থ করার চেষ্টা করেন, কোনো ক্ষেত্রে সফলও হন। অম্বরের রাজা বিহারীমল নিজের কন্যার সঙ্গে আকবরের বিবাহ দিয়ে মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু রাজপুতানার সকলেই এত সহজে নির্বিবাদে আকবরের বশ্যতা মেনে নেননি। মেবার বাদে বেশিরভাগ রাজপুত রাজ্যকেই আয়ত্তে আনতে পেরেছিলেন আকবর। মেবারকে শায়েস্তা করবার জন্য আকবর ১৫৬৭ সালে মেবারের রাজধানী চিতোরগড় অবরোধ করেন। উদয় সিংহ দুর্গরক্ষা করতে পারেননি এবং চিতোর ত্যাগে বাধ্য হন। উদয় সিংহ নাকি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আরাবল্লীর জঙ্গলে ছিলেন। চিতোরের পতনের পর জয়সালমীর, বিকানীর, মাড়োয়ার-সহ অনেক রাজপুত রাজ্য আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। তবে রাজধানী চিতোরের পতন হলেও মেবার অত সহজে আকবরের আয়ত্তে আসেনি। উদয় সিংহের পুত্র মহারাণা প্রতাপ অনেক দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যেও মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন।

আকবর মেবারের রাণা প্রতাপের কাছে একের পর এক কূটনৈতিক দূত পাঠিয়ে তাঁকে বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন। আকবরের প্রথম দূত ছিলেন জালাল খান কুর্চি, কিন্তু তিনি রাণা প্রতাপকে রাজি করাতে ব্যর্থ হন। দ্বিতীয় দূত হিসেবে পাঠানো হয়েছিল কচ্ছোয়া বংশের একজন রাজপুত অম্বরের মানসিংহকে। তিনিও প্রতাপকে বোঝাতে ব্যর্থ হন এবং তৃতীয় দূত রাজা ভগবন্ত দাসও প্রতাপের দরবার থেকে খালি হাতে ফিরে আসেন। শেষে চূড়ান্ত দূত টোডরমলও যখন ব্যর্থ হন তখন এই হলদিঘাটির যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

ঐতিহাসিকদের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, মেবারের রাণার তুলনায় আকবরের সৈন্যসংখ্যা অনেক বেশি ছিল। আকবর মেবারের এই সিসোদিয়াদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য কচ্ছোয়ার মানসিংহকে নিযুক্ত করেছিলেন। রাণা প্রতাপ উদয়পুরের কাছে গোগুন্ডা শহরে তাঁর ঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন। অন্যদিকে মানসিংহ মন্ডলগড়ে ঘাঁটি ফেলেন, সৈন্যদের একত্র করেন এবং গোগুন্ডার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। মানসিংহের গতিবিধি সম্পর্কে রাণা প্রতাপ খোঁজখবর রাখছিলেন। হলদিঘাটি গিরিপথের প্রবেশদ্বারে রাণা প্রতাপ সেনাবাহিনী নিয়ে পথরোধ করে অপেক্ষা করছিলেন মানসিংহের জন্য। ঐতিহাসিকদের অনুমান মানসিংহের বাহিনীতে প্রায় ১০,০০০ সৈন্য ছিল এবং অন্যদিকে রাণা প্রতাপের ঘোড়সওয়ারের সংখ্যা ছিল ৩০০০ ও প্রায় ৪০০ ভীল তীরন্দাজও তাঁর পক্ষে ছিল। মহারাণা প্রতাপের সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা হলেন, হাকিম খান সুর, ভীম সিং, রামদাস রাঠোর, রামশাহ তোমার প্রমুখ ব্যক্তি। প্রতাপ নিজে ঘোড়ায় চড়ে প্রায় ১৩০০ সৈন্যের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

মোগলদের পক্ষে আবার বন্দুকধারী বাহিনীও ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন সঈদ হাশিম। এছাড়াও মোগল সেনাবাহিনীর অন্যান্য পরিচালকদের মধ্যে ছিলেন, বখশী আলী আসফ খান, মাধো সিং, মোল্লা কাজী খান, মিহতার খান প্রমুখ। কেন্দ্রে ছিলেন স্বয়ং মানসিংহ।

হলদিঘাটের প্রান্তরে দুই পক্ষের মধ্যে আনুমানিক প্রায় চার ঘন্টাব্যাপী হলদিঘাটির যুদ্ধ হয়েছিল। মহারাণা প্রতাপের প্রাথমিক আক্রমণের ফলে প্রথমে মোগলবাহিনী পিছু হটলেও, আবুল ফজলের লেখা থেকে জানা যায়, পরে তারা খামনোরের কাছাকাছি রতি-তালাই নামক স্থানে সমাবিষ্ট হয়। বদায়ুনীর মত অনুসারে চুড়ান্ত যুদ্ধ হয়েছিল গোগুন্দায়।

মেবারের সেনাদের ক্রমাগত আক্রমণে মোগলবাহিনীর ডান ও বামশাখা বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মানসিংহ ব্যক্তিগতভাবে ইম্পেরিয়াল রেয়ার বাহিনীকে নেতৃত্ব দিতে থাকেন। মিহতার খান ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে রটিয়ে দেন যে, সম্রাটের সেনাবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি হয়েছে। এই খবর মোগল সেনাদের মনোবল জোগাতে যেমন সহায়তা করে তেমনই মেবারের সেনাদেরকে হতাশ করে দেয়। মেবারের অনেক সেনা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যায়। সেসময় মানসিং নামে এক ঝালা সর্দার রাণা প্রতাপের স্থান গ্রহণ করেন এবং রাণার কিছু রাজকীয় প্রতীক তুলে ধরেন। তা দেখে মোগলবাহিনীর মনে হয় তিনিই রাণা প্রতাপ, ফলে সেই ঝালা সর্দারকে বাহিনী হত্যা করে এবং সেই ঝালা সর্দারের বীরত্ব ও আত্মবলিদান মহারাণা প্রতাপকে পিছু হটবার যথেষ্ট সুযোগ করে দেয়।

হলদিঘাটির এই যুদ্ধে মেবারের প্রায় ৫০০ সেনা নিহত হয়েছিল বলে জানা যায়, অন্যদিকে মোগলদের প্রায় ৩৫০ সেনা আহত এবং আনুমানিক ১৫০জন নিহত হয়েছিল। এই সংখ্যা যদিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না৷ আবুল ফজল ও নিজামুদ্দিন আহমেদের লেখা থেকে এই সংখ্যা পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে আবার রাজস্থানী ইতিহাসবিদেরা যুদ্ধের ভয়াবহতাকে বোঝাতে হতাহতের সংখ্যা ২০,০০০-এ উন্নীত করেছিল।

ঐতিহাসিকের মতে, পিছু হটতে থাকা মেবারের সৈন্য এবং রাণা প্রতাপকে মানসিংহের সেনা তাড়া করেনি, কারণ ব্যক্তিগতভাবে মানসিংহ মহারাণা প্রতাপকে শ্রদ্ধা করতেন। যাইহোক, প্রতাপকে বন্দী না করার জন্য আকবর মানসিংহকে তিরস্কার করেছিলেন এবং মোগল দরবার থেকে কিছু সময়ের জন্য বরখাস্ত করেছিলেন তাঁকে। প্রতাপ যখন সফলভাবে পশ্চাদপসরণ করতে সক্ষম হন, মোগল সৈন্যরা অল্প সময়ের জন্য হলেও তাঁর অস্থায়ী রাজধানী গোগুন্ডা দখল করে। পরবর্তীকালে, আকবর রাণার বিরুদ্ধে নিরন্তর অভিযান পরিচালনা করেন এবং শীঘ্রই মেবারের বেশিরভাগ অংশ তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

ইতিহাস বলে, হলদিঘাটির যুদ্ধে মানসিংহ জয়লাভ করেছিলেন। এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিক রিমা হুজার মতে, যুদ্ধশেষে উভয়পক্ষই জয় দাবি করে। মেবার বিজয় দাবি করে, কারণ তারা আত্মসমর্পণ করেনি এবং মোগলরা বিজয় দাবি করেছিল কারণ তারা রণক্ষেত্র ছেড়ে যায়নি। সাম্প্রতিক গবেষণা এমনও দাবি করেছে যে, যুদ্ধে আসলে রাণা প্রতাপই জয়ী হয়েছিলেন। এই মন্তব্যের সমর্থনে গবেষণা করে যে প্রমাণ দেখানো হয়েছে, সেটি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। গবেষক অধ্যাপক চন্দ্রশেখর শর্মা ষোড়শ শতকের জমির রেকর্ডের ভিত্তিতে দেখান যে, হলদিঘাটির যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার এক বছর পর পর্যন্তও মহারাণা প্রতাপ হলদিঘাটির নিকটবর্তী গ্রামে জমির অধিকার তামার প্লেটে খোদাই করে জমি বন্টন করেছিলেন, যাতে দেওয়ানের স্বাক্ষরও রয়েছে। প্রতাপ যুদ্ধে না জিতলে তাঁর এমন প্রশাসনিক অধিকার থাকত না, ফলে যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করেছিলেন বলেই মনে করেন চন্দ্রশেখর শর্মা। তবে নিশ্চিতভাবে এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করা দুরূহ ব্যাপার।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’ (পুনর্মুদ্রণ), জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিশার্স, কলকাতা, জানুয়ারি, ২০২১
  2. https://en.m.wikipedia.org/
  3. https://www.geeksforgeeks.org/
  4. https://theprint.in/
  5. https://www.ksgindia.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading