ধর্ম

বেলুড় মঠের পুজো

উনিশশতকের আধ্যাত্মিক সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ যেমন ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস এবং তাঁর সুযোগ্য শিষ্য বিবেকানন্দ, তেমনি এই আধ্যাত্মিক চেতনা বিস্তারের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল স্বামীজি প্রতিষ্ঠিত বেলুড় মঠ। শুধু তাই নয়, মানবসেবার ব্রতে এই বেলুড় মঠই ভারতের দিকে দিকে আর্তের সেবায় নিয়োজিত থেকেছে যুগ যুগ ধরে। সেই বেলুড় মঠের দুর্গাপুজো যে অন্যান্য পুজোর তুলনায় একটু ভিন্নমাত্রার হবে তাতে আর আশ্চর্য কী! শ্রীরামকৃষ্ণের মতবাদ, দর্শনকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্যই ১৮৯৮ সালে স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মিশন এবং ১৮৯৯ সালে হুগলি জেলার বেলুড়ে স্থাপন করেন বেলুড় মঠ। মানুষের সেবা করাই ছিল এই মঠ ও মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য। ১৯০২ সালে স্বামীজি তাঁর মৃত্যুর ঠিক এক বছর আগে ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে পুজো চালু করেন তিনি।

কেন দুর্গাপুজো শুরু করেন স্বামীজি তার উত্তরে জানা যায় স্বামীজি এবং তাঁর অনুগামীদের আদর্শরূপ অদ্বৈতবাদকে গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীরা ভালোভাবে মেনে নেননি। এমনকি তারা অনেকেই মনে করতেন এই অদ্বৈতবাদ হিন্দুধর্মের অংশ নয়, ফলে স্বামীজিরা হিন্দুধর্ম থেকে বিচ্যুত হওয়ার রাস্তা দেখাচ্ছেন মানুষকে এমন অপপ্রচার শুরু হয়েছিল। সেই অপপ্রচার রুখতে এবং একইসঙ্গে তাঁরা যে হিন্দুধর্মেরই অন্তর্গত তা প্রমাণ করার জন্যেই সম্ভবত নিজ উদ্যোগে বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপুজো প্রচলন করেন স্বামী বিবেকানন্দ। স্বামীজির ইচ্ছায় গুরুভাই ব্রহ্মানন্দ এবং তাঁর শিষ্যরা সকলে মিলে পুজোর আয়োজন করেন। কিন্তু সমস্যা ছিল সন্ন্যাসীরা কেউই তো ‘সঙ্কল্প’ করতে পারতেন না পুজোয়। স্বামীজি এ ব্যাপারে মা সারদার কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি তাঁকে অনুমতি দেন এবং জানান এতে কোনো অন্যায় নেই। মা সারদার অনুমতি পেয়ে তাঁর নামেই দুর্গাপুজোয় সঙ্কল্প করেন স্বামীজি। পুজোর আগের দিন মা সারদাকেও তাঁর বাগবাজারের বাড়ি থেকে বেলুড় মঠে নিয়ে আসা হয়। কুমোরটুলি থেকে মূর্তি এনে ১৯০১ সাল প্রথম দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয় বেলুড় মঠে। পূজা করলেন ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল মহারাজ আর তন্ত্রধারক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র ভট্টাচার্য মহাশয়। ঈশ্বরচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের পূর্বাশ্রমের পিতা। এই পুজোর আগে মূর্তি আনা নিয়ে একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। জানা যায় যে, স্বামীজি দুর্গাপুজো করার সিদ্ধান্ত নেবার পরে আর মাত্র এক-দেড় সপ্তাহ বাকি ছিল পুজোর। তখন কুমোরটুলিতে গিয়ে দেখা যায় প্রথমে প্রায় সব প্রতিমারই বায়না হয়ে গিয়েছে। একজন মৃৎশিল্পীর কাছেই জানা যায় একটি মাত্র প্রতিমা রয়েছে যেটি একান্ত বায়না বাতিল হলেই পাওয়া সম্ভব। তা সেই প্রতিমার বায়না বাতিল হয়েছিল অবশেষে এবং ঐ প্রতিমাটিই নিয়ে এসে পুজো করা হয়। বেলুড় মঠের পুরনো মন্দির আর স্বামীজির ঘরের মাঝের জায়গায় একটা ছাউনি দিয়ে পুজো করা হয়েছিল। ১৯৪২ সাল থেকে এই স্থান বদলে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরের ভিতরেই পুজোর আয়োজন করা হয় টানা ২০০০ সাল পর্যন্ত। পরের ২০০১ সালে আবার পুজোর স্থান বদলায়। মন্দির সংলগ্ন মাঠে প্যাণ্ডেল বেঁধে সেখানেই পুজোর আয়োজন করা হতে থাকে। এই স্থান পরিবর্তনের কারণ মূলত প্রচুর ভক্তদের আগমণে মন্দিরের ভিতরে স্থান সংকুলান না হওয়া। প্রথম বছর থেকে শুরু করে পরেও শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহী ভক্তরা ছাড়াও বেলুড়, বালী ও উত্তরপাড়ার বহু মানুষ সেই পুজোয় নিমন্ত্রিত ছিলেন। প্রথম বছরের পুজোয় স্বামীজিকে সাহায্য করেছিলেন সুকুল, গোবিন্দ, কালীকৃষ্ণ, সুধীর ও সুশীল। পুজোর প্রাচীন রীতি অনুসারে আজও সারদা মায়ের নামেই দেবীর কাছে সঙ্কল্প করা হয়। তবে সারদা দেবীর নির্দেশে পুজোয় কোনো পশুবলি করা হয়নি। সেই মতো আজও দুর্গাপুজোয় কোনো পশুবলি হয় না। শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর লেখা ‘স্বামী-শিষ্য সংবাদ’ থেকে জানা যায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তুঙ্গ পরিস্থিতিতে স্বামীজি দেশীয় মানুষের সুপ্ত স্বাজাত্যবোধ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দুর্গাপুজোয় পশুবলি করতে চেয়েছিলেন। স্বামীজির চরিত্রের এই রকম অদ্ভুত বৈপরীত্য জেনে আশ্চর্য হতে হয়।

এই বেলুড় মঠের পুজোর সবথেকে আকর্ষণীয় অংশ হল কুমারী পূজা। অষ্টমীর দিন স্বামীজি প্রথম রামলালদাদার কন্যাকে কুমারী উমা হিসেবে পূজা করেন বেলুড় মঠে। বেলুড় মঠে কুমারী পূজায় প্রথম নয়জন কুমারীকে পূজা করেছিলেন স্বামীজি। যদিও বর্তমানে একজন কুমারীকেই পূজা করা হয়ে থাকে অষ্টমীর দিনে। স্বামীজির এই কুমারী পূজার ইতিহাস যদিও অনেক প্রাচীন। প্রথম কাশ্মীর ভ্রমণকালে ১৮৯৮ সালে এক মুসলমান কন্যাকে তিনি কুমারী দেবী হিসেবে পূজা করেন বলে জানা যায়। এই কুমারীপুজোর দীর্ঘ এক ইতিহাস এবং পৌরাণিক তাৎপর্য আছে হিন্দু ধর্মে। এর পাশাপাশি জানা যায় স্বামীজি মা সারদাকেও একইভাবে জ্যান্ত দুর্গা হিসেবে একশো আটটি পদ্ম সহযোগে অষ্টমীর দিন পুজো করেছিলেন। একদিকে কুমারী পুজো আর একদিকে জ্যান্ত দুর্গার কারণে বেলুড়ের দুর্গাপুজো একটি ভিন্নমাত্রার হয়ে উঠেছে। বেলুড়ের সন্ধি পুজো দেখতে আজও ভক্তদের ভিড় হয়। এই সন্ধিপূজায় কালীঘাটে বলি দেওয়া মহাপ্রসাদ অর্পণ করা হয় দেবীকে। বেলুড়ের গঙ্গার ঘাটে সপ্তমীর দিন স্বামীজি নিজে হাতে নবপত্রিকা স্নান করিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। এই ঘাটেই দেবী দুর্গার বিসর্জন হয়। অষ্টমীর দিন প্রাচীন রীতি মেনে বহু মানুষকে ভোগ খাওয়ানো হয় আর একে কেন্দ্র করে আজও অঢেল মানুষের জমায়েত লক্ষ করা যায়। ১১৯ বছরের পুরনো এই পূজায় প্রথম ২০২০ সালে কোভিড-সংক্রমণ ঠেকাতে মানুষের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, এমনকি মঠের সন্ন্যাসীদেরও সকলের উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ব্রত নিয়ে শুনুন



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন