শিল্প-সাহিত্য

জুজু

'জুজু' ছোটদের মনে এক অজানা আতঙ্ক। জুজুর ভয় দেখিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো ইত্যাদি নানা অসম্ভব কাজ বাবা-মা করে এসেছেন। অথচ সেই জুজু কি বা কে? রাক্ষস, ভুত, অতিকায় কোন জন্তু - সে উত্তর না জানে বাচ্চা না জানে তার বাবা মা। অথচ 'জুজু' প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভয়ের এক প্রবাদ হয়ে থেকে গিয়েছে। এখানে আমরা 'জুজু'র সব ভয় কাটিয়ে তার উৎস সম্বন্ধে জানব।

জুজু শব্দটি বা 'জুজুর ভয় দেখানো' প্রবাদ যাই বলি না তার উৎপত্তি যদি বলি সেই বুদ্ধদেবের জাতকের গল্পে তাহলে অবাক হবেন না - হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন, জুজুর ভয়ের প্রাচীনত্ব সেই জাতকের গল্পগুলির সময় থেকেই। 'বিশ্বন্তর জাতক' (Vessantara Jataka) এর গল্পে এক বুড়ো, রাগী ব্রাহ্মণের উল্লেখ আছে যাঁর নাম জুজক - সে জুজকই হল আজকের জুজু। কিন্তু এই জুজককে বাচ্চারা ভয় পেতই বা কেন আর জুজক এর নামে ভয় দেখানোর রীতি এল কি ভাবে তা জানতে এই জাতকের গল্পটির অংশবিশেষ তো জানতেই হবে। মূল গল্পটি অনেক বড় তাই এখানে শুধু প্রয়োজনীয় অংশটি তুলে ধরব।

রাজা বিশ্বন্তর মহাদানী ছিলেন - তাঁর কাছে কেউ কোনদিন কিছু চেয়ে আশাহত হয়নি। নির্বান লাভ করার জন্য তিনি নিজের সমস্ত জিনিস একে একে দান করে দেন। একসময় সব কিছু দান করে দিয়ে রাজা তাঁর স্ত্রী ও শিশু পুত্রকন্যাসহ জঙ্গলের আশ্রমে বাস করতে থাকেন। এদিকে জুজক নামক এক গরীব বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের কম বয়সী সুন্দরী স্ত্রী ছিল যে তার সকল কাজ করে দেওয়ার জন্য ব্রাহ্মণকে লোক জোগাড় করে দেওয়ার দাবী জানাতে থাকে। জুজক বিশ্বন্তরের দান করার কথা জানতে পারে ও একদিন রাজার কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়। রাজার কাছে জুজক তাঁর শিশু পুত্রকন্যাকে তার স্ত্রীর পরিচর্যা ও কাজ করে দেওয়ার জন্য চাইল। রাজা উদাত্ত চিত্তে দান করলেন।কিন্তু রাজকুমার ও রাজকুমারী জুজকের নিষ্ঠুর স্বর ও দান চাইবার কারণ শুনে প্রথমে গিয়ে কুটিরের পিছনে গিয়ে লুকায়, তারপর বনের নিবিড় গুল্মের মধ্যে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। তবুও তাদের মধ্যে ভয় যায় না - 'এই বুঝি জুজক এসে ধরল'। তাই কাঁদতে কাঁদতে নানা দিকে ছোটাছুটি করতে করতে শেষে পুকুরে জলে নেমে পদ্মপাতা দিয়ে নিজেদের ঢেকে আড়াল করল। এদিকে জুজক রেগে গিয়ে রাজাকেই গালমন্দ করতে লাগল, যে রাজাই কোনভাবে তাদের ইশারা করে লুকিয়ে পড়তে বলেছে। রাজা ব্রাহ্মণকে আশ্বাস দিয়ে নিজে পুত্র জালীকুমার ও কন্যা কৃষ্ণাজিনকে পুকুর থেকে খুঁজে নিয়ে আসেন ও তাদেরকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ব্রাহ্মণের হাতে অর্পণ করেন। বলাবাহুল্য, পথের মধ্যেও ব্রাহ্মণ বাচ্চাগুলির উপর প্রভূত অত্যাচার করে। আর এই কারণেই 'জুজুক' যা অপভ্রংশে 'জুজু'কে বাচ্চারা ভয় পায়। সময়ের সাথে সাথে জুজক বা বিশ্বন্তরের কাহিনী আমরা ভুলে গেছি কিন্তু 'জুজু'র ভয় থেকেই গেছে - 'এই বুঝি জুজক এসে ধরল'।

উদাহরণঃ আপনারা লেখাটি শেয়ার করুন নইলে কিন্তু জুজু এসে ধরবে।

তথ্যসূত্র


  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Vessantara
  2. জাতক - শ্রী ঈশানচন্দ্র ঘোষ অনুদিত (মূল পালি গ্রন্থ থেকে), ষষ্ঠ খন্ড,  ৩৩৪ পৃষ্ঠা

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!