ইতিহাস

ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা

ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা অবিভক্ত ভারতবর্ষের পূর্ববঙ্গের ভাওয়াল এস্টেটের অধিকার নিয়ে একটি বিখ্যাত মামলা। এই মামলায়  একজন সন্ন্যাসী নিজেকে তৎকালীন ভাওয়াল এস্টেটের রাজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায় হিসাবে দাবী করেন, যার মৃত্যু এক দশক আগেই হয়েছিল বলে ধারণা। বিবাদী পক্ষে ছিলেন রাজকুমারের বিধবা পত্নী বিভাবতী দেবী, যিনি সেই সন্ন্যাসীকে নিজের স্বামী হিসাবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। সেই ঘটনার বিস্তারিত এখানে দেওয়া হল।

ভাওয়াল এস্টেট ছিল অবিভক্ত ভারতবর্ষের পূর্ববঙ্গের ঢাকা নবাব এস্টেটের পরেই সেখানের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারি। ১৮৭৮ সালে কালীচরণ রায় চৌধুরী ব্রিটিশ সরকার থেকে 'রাজা' উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর পুত্র রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী জমিদারি আরও বাড়িয়ে তোলেন। তাঁর সময়ে ভাওয়াল এস্টেটে ছিল ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও বাকেরগঞ্জ এইসব অঞ্চলগুলো ছিল। তিনি এই ভাওয়াল এস্টেটের কেন্দ্র জয়দেবপুরে থাকতেন। ১৯০১ সালের ২৬শে এপ্রিল তিনি মারা যান। রাজার মৃত্যুর সময়ে তাঁর স্ত্রী রানী বিলাসমণি ছাড়াও তাঁর ছয়টি সন্তান ছিলেন যারা হলেন ইন্দুময়ী, রণেন্দ্রনারায়ণ রায়,রমেন্দ্রনারায়ণ রায়, রবীন্দ্রনারায়ণ রায়, জ্যোতির্ময়ী এবং তরিন্ময়ী। রাজার উইল অনুসারে তাঁর মৃত্যুর পরে রাণীমাই সম্পত্তির দেখাশোনা করেন। ১৯০৭ সালের ২১শে জানুয়ারী রানী মারা গেলে তাঁর তিন পুত্র সম্পত্তির সমানাধিকার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।

১৯০৫ সালে রমেন্দ্রনারায়ণ সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হন। ১৯০৯ সালে তিনি তাঁর স্ত্রী বিভাবতী দেবী, শ্যালক সত্যেন ব্যানার্জী এবং বেশ কিছু অনুচরদের নিয়ে জয়দেবপুর থেকে দার্জিলিং-এ যান। সেখানেই ৭ই মে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কারণ হিসাবে বলা হয় বিলিয়ারি কলিক বা গলব্লাডারে পাথর। ৮ই মে তাঁর শবদেহ দাহ করা হয়। কোনো কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, দাহ করার সময়ে হঠাৎ শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। ফলে শ্মশানে চিতা জ্বালার মুহুর্তে দাহকার্য্য স্থগিত হয়ে যায়। শেষকৃত্যে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা শিলাবৃষ্টি থেকে বাঁচতে কাছে আশ্রয় নেয় এবং অনেকের দাবী তখন মৃতদেহ গায়েব হয়ে যায়। এর পর রমেন্দ্রনারায়ণের বিধবা  স্ত্রী বিভাবতী দেবী তাঁর ভাই এর সাথে ঢাকায় চলে যান। পরের দশ বছরে ভাওয়াল এস্টেটের মালিক অন্য দুই ভাইয়েরও মৃত্যু ঘটে। তখন তৎকালীন ঔপনিবেশিক শাসক ব্রিটিশদের কোর্ট অফ ওয়ার্ড্‌স কুমারদের বিধবা স্ত্রীদের হয়ে এই জমিদারীর ভার গ্রহণ করে।

১৯২০-২১ সালের দিকে ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধের কাছে সর্বাঙ্গে ছাই মাখা এক সন্ন্যাসীর আগমন ঘটে। চারদিকে গুজব রটে যায় যে, রমেন্দ্রনারায়ণের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সন্ন্যাসীকে ১৯২১ সালের ১২ ই এপ্রিল হাতিতে করে জয়দেবপুরে পাঠিয়ে দেন । সন্ন্যাসী ২৫শে এপ্রিল ঢাকায় ফিরে যান। তারপর কুমারের আত্মীয়দের আহবানে তিনি আবার এপ্রিলের ৩০ তারিখে জয়দেবপুরে আসেন। তখন তাঁকে আত্মীয় ও প্রজা সবাই দেখতে আসে। উপস্থিত জনতার জিজ্ঞাসাবাদে সন্ন্যাসী কুমার নিজেকে নরেন্দ্রনারায়ণ বলে দাবী করেন। সন্ন্যাসী জানান তাঁর দার্জিলিং-এ অসুস্থ হয়ে পড়ার আগের কথা মনে নেই। জঙ্গলে নাগা সন্ন্যাসীরা তাঁকে বৃষ্টিভেজা অবস্থায় খুঁজে পায় এবং সেবা করে বাঁচিয়ে তুলে। সেই থেকে তিনিও নাগা সন্ন্যাসীর দলে যোগ দিয়েছেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বছর দশেক ঘোরার পর তাঁর স্মৃতি ফেরত আসতে শুরু করে। তখন গুরুর আদেশে তিনি ভাওয়ালে ফিরে আসেন।

১৯৩০ সালের এপ্রিল ২৪ তারিখে ভাওয়াল সন্ন্যাসীর আইনজীবীরা বিভাবতী দেবী ও অন্যান্য মালিকদের বিরুদ্ধে ভাওয়াল এস্টেটের সম্পত্তির অধিকার চেয়ে মামলা করেন। ভাওয়াল সন্ন্যাসীর প্রধান উকিল ছিলেন বিজয় চন্দ্র চক্রবর্তী। বিবাদীপক্ষের উকিল ছিলেন অমিয় নাথ চৌধুরী। জেলা জজ অ্যালান হেন্ডারসন বিচারপতি পান্নাবল বসুকে এই মামলার বিচারে নিয়োগ করেন। বিচার শুরু হয় ১৯৩৩ সালের নভেম্বর ৩০ তারিখে।উভয় পক্ষ থেকে প্রচুর সাক্ষী হাজির করা হয়। তাদের অনেকের সাক্ষ্য ছিলো পরস্পরবিরোধী। বিবাদী পক্ষ কুমারের বোন জ্যোতির্ময়ী দেবীকে জেরা করে। তিনি সন্ন্যাসীর পক্ষে ছিলেন, এবং দাবী করেন, সন্ন্যাসীই তাঁর ভাই। তিনি আরো দাবী করেন, সন্ন্যাসীর চেহারায় তাঁদের বংশের ছাপ রয়েছে, এবং সন্ন্যাসী বাংলা বলতে পারেন। বাদীপক্ষ কুমারের স্ত্রী বিভাবতী দেবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বিভাবতী দেবী কুমারের চেহারার সাথে সন্ন্যাসীর চেহারার কোনো মিল নেই বলে দাবী করেন। অবশেষে বিচারক পান্নাবল বসু সন্ন্যাসীর পক্ষে রায় দেন।  বিভাবতী দেবী হাইকোর্টে আবেদন করেন, কিন্তু হাইকোর্টেও সন্ন্যাসীর পক্ষেই রায় যায়।

কিন্তু বিভাবতী দেবী হাল ছাড়তে রাজি হননি। বিভাবতী দেবীর আইনজীবীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে আবেদন করে। জার্মান বিমান হামলায় কাউন্সিলের কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রিভি কাউন্সিলের অধিবেশন ঘটে হাউজ অফ লর্ডসে, ১৯৪৫ সালে। প্রিভি কাউন্সিল আপিল শুনতে রাজি হয়। ২৮ দিন ধরে শুনানি চলে। ১৯৪৬ সালের জুলাই ৩০ তারিখে বিচারকেরা সন্ন্যাসীর পক্ষে রায় দেন, এবং আপিল নাকচ করে দেন। পরের দিন কলকাতায় টেলিগ্রাফ মারফত মামলার রায় জানানো হয়। রায় জানার পর যখন সন্ন্যাসী মন্দিরে প্রার্থনায় জাম্ন, সেখানে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং দুদিন পর মারা যান।

এই ঘটনা তৎকালীন বাংলায় বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল। এই ঘটনা নিয়ে অনেক গান, নাটক এবং সিনেমাও লেখা হয়েছে।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!