সববাংলায়

বিকর্ণ

মহাভারতের সভাপর্বে ষটষষ্টিতম অধ্যায় অর্থাৎ ৬৬তম অধ্যায়ে ধৃতরাষ্ট্র নন্দন বিকর্ণের (Bikarna) উল্লেখ পাওয়া যায়। গান্ধারীর গর্ভজাত ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের মধ্যে একমাত্র বিকর্ণ ই ধার্মিক ছিলেন। নিজের সহোদরগণের কৃত অশালীন কর্মের সমালোচনা করতে পিছপা হননি তিনি।

খাণ্ডবপ্রস্থে ময় দানবের নির্মাণ করা মহারাজ যুধিষ্ঠিরের সভাগৃহের সৌন্দর্য্য দেখে হিংসায় জ্বলতে থাকেন ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্যোধন। চক্রান্ত করতে থাকেন কীভাবে পাণ্ডবদের রাজ্য থেকে বিতাড়িত করে সকল ঐশ্বর্য্য একা ভোগ করা যায়। তাঁর এই দুষ্কর্মে সামিল হন মামা শকুনিও। দুজনের পরিকল্পনায় ঠিক হয় মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে হস্তিনাপুরে আমন্ত্রণ জানানো হবে এবং শকুনি কপট পাশাখেলার মাধ্যমে যুধিষ্ঠিরের রাজ্যপাট বাজিতে জিতে নেবেন।

সেইমত, দূতের গিয়ে মহারাজকে নিমন্ত্রণ করে আসে। পাণ্ডবরা পাঁচ ভাই দেবী দ্রৌপদীকে সঙ্গে নিয়ে হস্তিনাপুরে আসেন। দুর্যোধন ও শকুনির ছলের কথা বুঝতে না পেরে যুধিষ্ঠির সম্মত হন পাশা খেলতে। বাজি রেখে খেলতে গিয়ে আস্তে আস্তে পাণ্ডবদের অতুল ধনসম্পত্তি সমস্তই শকুনির হস্তগত হয়ে যায়।

তারপরেও দুর্যোধন খেলা চালিয়ে যেতে বললে বিভ্রান্ত মহারাজ যুধিষ্ঠির পণ রাখেন দ্রৌপদীকে। পাশা ফেলে তাঁকেও জিতে নেন কপট শকুনি। তখন দুর্যোধন আদেশ করেন দ্রৌপদীকে রাজসভায় সর্বসমক্ষে নিয়ে আসার জন্য। দুঃশাসন বলপ্রয়োগ করে দ্রৌপদীকে চুল ধরে টানতে টানতে সভায় নিয়ে আসেন। সভায় উপস্থিত ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কেউই এই নীচ কাজের প্রতিবাদ করেন না। একবস্ত্রা রজঃস্বলা দ্রৌপদী গুরুজনদের কাছে তাঁর এই অপমানের বিচার প্রার্থনা করলে দুর্যোধনের ভয়ে সবাই চুপ করে থাকেন। তখন একমাত্র দুর্যোধনের ভ্রাতা বিকর্ণ প্রতিবাদ করেন। ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্য কুলবধূকে প্রকাশ্য জনসভায় অপমান করা যে অত্যন্ত অনৈতিক কাজ, তা শুধু তিনিই স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন। যেখানে দ্রৌপদীর উপর পঞ্চপাণ্ডবের সমান অধিকার আছে, সেখানে একা যুধিষ্ঠির অন্য চারজনের অমতে কীভাবে দ্রৌপদীকে পণ রাখতে পারেন সেই প্রশ্নও করেন বিকর্ণ। তাঁর এই প্রতিবাদের পর সমস্ত সভাসদেরা তাঁর জয়গান ও কৌরবদের নিন্দা করতে থাকে।

কিন্তু দুর্যোধন এই সমস্ত কথায় কান দেন না। বিকর্ণের প্রতিবাদকে ‘বালকোচিত’ আখ্যা দেন। উপরন্তু কর্ণ বিকর্ণকে অত্যন্ত অপমান করেন। ব্যথিত বিকর্ণ ধর্মকে ত্যাগ না করে সেই সভাকে ত্যাগ করে চলে যান। এরপর ওই সভায় কী ঘটেছিল তা আজ আমরা সবাই জানি!

পুনরায় বিকর্ণকে দেখা যায় কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের ময়দানে। যুদ্ধের ১৩তম দিনে কুরুবংশ যখন প্রায় বিনাশের মুখে, সেই সময় ভীমের সামনাসামনি হন বিকর্ণ। ভীম বলেন যেহেতু বিকর্ণ আজীবন ধর্মের সাথে ছিলেন, তাই ভীম তাঁকে বধ করবেন না। জবাবে বিকর্ণ বলেন তিনি যদি প্রাণভয়ে রণাঙ্গণ পরিত্যাগ করেন তবে তা অধর্ম হবে। যুদ্ধে পাণ্ডবদের বিজয় নিশ্চিত জেনেও তিনি যুদ্ধ করবেন, কারণ তিনি বিভীষণের মতো নিজের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে পরিত্যাগ করতে পারবেন না। অতএব ভীম যেন তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁকে বধ করেন, তাতে বিকর্ণের স্বর্গলাভ হবে। এই কথা শোনার পর ভীম ও বিকর্ণের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয় ও বিকর্ণ বীরের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে প্রানত্যাগ করেন।

একশত কৌরবের মধ্যে দাসীপুত্র যুযুৎসু ও বিকর্ণ ছাড়া কেউই ধর্ম ও ন্যায়ের পথে চলেননি। দুর্যোধনের তৃতীয় ভাই হওয়া সত্ত্বেও সিংহাসন প্রাপ্তির লোভ বাসা বাঁধেনি বিকর্ণের মধ্যে। আজীবন তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ, ন্যায়ের পুজারী। কিন্তু ধর্মের জন্যও তিনি কর্তব্য থেকে সরে আসেননি। যুদ্ধ করেছেন অধর্মী দুর্যোধনের হয়েই। যেখানে যুদ্ধের সূচনায় যুযুৎসু ত্যাগ করেছিলেন কৌরবপক্ষ, সেখানে বিকর্ণ পালন করেছিলেন ভ্রাতৃধর্ম।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1.  ‘মহাভারত’,কালীপ্রসন্ন সিংহ, সভাপর্ব, অধ্যায় ৬৬, পৃষ্ঠা ৭১-৭২
  2. ছেলেদের মহাভারত, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি, পৃষ্ঠা ৫৩-৫৪
  3. https://www.ebanglalibrary.com/
  4. https://en.wikipedia.org/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading