সববাংলায়

স্টিভেন স্পিলবার্গ

বিভাগঃ , ,

বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্য রচয়িতা এবং প্রযোজক স্টিভেন স্পিলবার্গ (Steven Spielberg)। বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যসফল পরিচালকদের মধ্যে তিনি অগ্রগণ্য। নতুন যুগের হলিউডের বাঁক বদল করতে প্রভূত সহায়তা করেছেন স্পিলবার্গ। তাঁর পরিচালিত কল্পবিজ্ঞান নির্ভর ছবি ‘জুরাসিক পার্ক’ আপামর মানুষের কাছে প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল একসময়। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘শিণ্ডলার্স লিস্ট’ স্পিলবার্গের সবথেকে বিখ্যাত ও কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে একটি। ১৯৫৭ সালে সামুদ্রিক এক হিংস্র হাঙরের কাহিনি অবলম্বনে তাঁর পরিচালিত ছবি ‘জ’স’ বহুল জনপ্রিয় চলচ্চিত্র যা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষ স্থান অর্জন করেছে। স্পিলবার্গের বেশ কিছু কল্পবিজ্ঞান নির্ভর ছবির মধ্যে ‘ই.টি – দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’ ছবিটিও স্বতন্ত্র মাত্রা এনে দেয় দর্শকমনে। আজীবন চলচ্চিত্র নির্মাণের কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। তার পাশাপাশি এএফআই লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, কেনেডি সেন্টার সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। অ্যাম্বলিন এন্টারটেইনমেন্ট ও ড্রিম ওয়ার্ক্স নামের প্রযোজনা সংস্থা দুটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্পিলবার্গ।

১৯৪৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর ওহিওর সিনসিনাত্তিতে এক রক্ষণশীল ইহুদি পরিবারে স্টিভেন স্পিলবার্গের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম স্টিভেন অ্যালান স্পিলবার্গ। তাঁর বাবা আর্নল্ড স্পিলবার্গ একজন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এবং তাঁর মা লে অ্যাডলার ছিলেন একটি রেস্তোরাঁর মালকিন এবং একজন দক্ষ কনসার্ট পিয়ানোবাদক। স্পিলবার্গের তিন বোন রয়েছে যথা- অ্যান, স্যু এবং ন্যান্সি। ১৯৫২ সালে রেডিও কর্পোরেশন অফ আমেরিকায় চাকরি পাওয়ার কারণে স্পিলবার্গের পরিবার নিউ জার্সির হ্যাডন টাউনশিপে চলে আসে। ১৯৫৭ সালে পুনরায় স্থান বদলে অ্যারিজোনার ফিনিক্সে চলে আসেন তাঁরা। বিশ্বযুদ্ধকালীন হিটলারের ইহুদি নিধনকালে তাঁদের পরিবারের বহু আত্মীয় মারা গিয়েছিলেন। ইহুদি হওয়ার কারণে হাই স্কুলে পড়াকালীন স্পিলবার্গকে মারও খেতে হয়েছিল। ফলে ইহুদি ধর্মবিশ্বাসের প্রতি তাঁর অনাস্থা চলে আসে এবং এই ধর্মীয় ঐতিহ্য তিনি আর বহন করতে চাইছিলেন না। বয়ঃসন্ধিকালে তিনি এই ধর্মীয় পরিবেশ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। ১২ বছর বয়সেই স্পিলবার্গ ঘরে বসেই একটি ছবি বানিয়েছিলেন তাঁর খেলনা লিওনেল ট্রেনটি দিয়ে। ১৯৫৮ সালে তিনি একজন বয় স্কাউট হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ছবি তোলার অদম্য নেশায় এই সময় তিনি একটি নয় মিনিটের ছবি তৈরি করেন ‘লাস্ট গানফাইট’ নামে। তাঁর বাবার মুভি ক্যামেরা নিয়ে শখের ছবি তুলতেন স্পিলবার্গ। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই সেই মুভি ক্যামেরা দিয়ে ‘এসকেপ টু নোহোয়্যার’ নামে একটি ৪০ মিনিটের ছবি বানিয়ে ফেলেন তিনি যা আসলে একটি যুদ্ধের ছবি ছিল। এই ছবিতে তাঁর সব স্কুলের বন্ধুরাই অভিনয় করেছিলেন।   

১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত হিব্রু স্কুলেই পড়াশোনা করেছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ। কিশোর বয়সে হাই স্কুলে পড়াকালীন তিনি ১৪-১৫টির মতো ছোট ছোট অ্যাডভেঞ্চার ফিল্ম বানিয়েছিলেন। ফিনিক্সে থাকাকালীন প্রতি শনিবারে স্থানীয় থিয়েটারে সিনেমা দেখতেন স্পিলবার্গ, এই ছবিগুলিই তাঁকে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হয়ে ওঠার রসদ জুগিয়েছিল। ১৯৬১ সালে মাত্র তিন বছরের জন্য স্পিলবার্গ ভর্তি হন আর্কেডিয়া হাই স্কুলে। ১৯৬৩ সালে তিনি প্রথম ‘ফায়ারলাইট’ নামে ১৪০ মিনিট দৈর্ঘ্যের একটি স্বতন্ত্র ছবি বানান। তাঁর বাবাই এই ছবি তৈরি জন্য ৬০০ ডলার দিয়েছিলেন স্পিলবার্গকে এবং স্থানীয় থিয়েটারে সে ছবি দেখানোও হয়েছিল এক সন্ধ্যায়। ইতিমধ্যে ১৯৬৪ সালে ইউনিভার্সাল স্টুডিওর সম্পাদনা বিভাগে একজন অবৈতনিক সহকারী হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। এরপরে ক্যালিফোর্ণিয়ার সারাটোগা হাই স্কুলে ভর্তি হন স্পিলবার্গ এবং এখান থেকেই ১৯৬৫ সালে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। এর পরের বছরই তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে স্পিলবার্গ তাঁর বাবার সঙ্গে চলে আসেন লস অ্যাঞ্জেলসে, তাঁর মা ও অন্য বোনেরা রয়ে যায় সারাটোগাতে। দক্ষিণ ক্যালিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্কুলে ভর্তির আবেদন করলেও একেবারে কম নম্বরের জন্য সুযোগ পাননি স্পিলবার্গ। ফলে ক্যালিফোর্ণিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন তিনি।

১৯৬৮ সালে ইউনিভার্সাল স্টুডিওর সৌজন্যে ‘অ্যাম্বলিন’ নামে ২৬ মিনিট দৈর্ঘ্যের একটি ছবির চিত্রনাট্য লিখে ও পরিচালনা করার সুযোগ পান স্পিলবার্গ। এর এক বছর পরেই ইউনিভার্সাল স্টুডিওর হয়ে টেলিভিশন ধারাবাহিক পরিচালনার জন্য কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। সেই সময় তিনিই ছিলেন হলিউড স্টুডিওর সবথেকে কমবয়সী পরিচালক। ২০০২ সালে পুনরায় তিনি লস অ্যাঞ্জেলসে ফিরে এসেছিলেন ফিল্ম ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার উপর বি.এ কোর্স সম্পূর্ণ করার জন্য। ১৯৬৯ সালে নাইট গ্যালারির একটি পাইলট পর্ব পরিচালনার জন্য আহ্বান জানানো হয় স্পিলবার্গকে। কিন্তু এই কাজটি তত সাফল্য পায় না। নিজের একটি কম-বাজেটের ছবি বানানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন তিনি। ইউনিভার্সাল স্টুডিওর সঙ্গে চারটি টেলিভিশন ছবি করার চুক্তিতে আবদ্ধ হন স্পিলবার্গ। একেবারে প্রথম ছবি ‘ডুয়েল’ (১৯৭১)-এর পরে যথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করেন তিনি, ফলে একে একে ‘সামথিং এভিল’ (১৯৭২), ‘স্যাভেজ’ (১৯৭৩) ইত্যাদি ছবিগুলি মুক্তি পায়। ১৯৭৪ সালে তাঁর পরিচালিত ‘দ্য সুগারল্যাণ্ড এক্সপ্রেস’ ছবিটি চারশোটিরও বেশি থিয়েটারে মুক্তি পায় এবং যথেষ্ট প্রশংসিত হয়। ঐ বছরই কান চলচ্চিত্র উৎসবে এই ছবিটি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের পুরস্কার পায়। ঠিক এর পরের বছর স্পিলবার্গ পরিচালিত বিখ্যাত ছবি ‘জস্‌’ মুক্তি পায় যেখানে একটি মানুষখেকো হাঙরই কাহিনীর মূল কেন্দ্রে। এই ছবিটি তিনটি অ্যাকাডেমি পুরস্কার অর্জন করে এবং সমগ্র বিশ্বে প্রায় ৪৭০ কোটি ডলার অর্থ উপার্জন করে। এর পরেই সমগ্র বিশ্বে স্টিভেন স্পিলবার্গ একটি জনপ্রিয় ও ঘরোয়া নাম হয়ে ওঠে। এরপরে ইউএফও নিয়ে একটি ছবি বানান তিনি যা তাঁকে শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মান এনে দেয়। ১৯৮২ সালে তাঁর পরিচালিত ‘ই.টি – দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’ ছবিটি মুক্তি পায় যা সমগ্র বিশ্বে ৭০০ কোটি ডলার অর্থ উপার্জন করে এবং শ্রেষ্ঠ সাউণ্ড এফেক্ট, শ্রেষ্ঠ স্পেশাল এফেক্ট এবং শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত বিভাগে অ্যাকাডেমি পুরস্কারে মনোনীত হয় এই ছবিটি। ১৯৮৪ সালে তাঁর পরিচালনায় ইণ্ডিয়ানা জোনস ধারাবাহিকের প্রথম পর্বটি মুক্তি পায় ‘ইণ্ডিয়ানা জোনস অ্যাণ্ড দ্য টেম্পল অফ ডুম’ নামে। প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে এই ছবিটিও। এই বছরই স্পিলবার্গ, ফ্রাঙ্ক মার্শাল এবং ক্যাথলিন কেনেডি একত্রে ‘অ্যাম্বলিন এন্টারটেইনমেন্ট’ নামে একটি প্রযোজনা সংস্থা তৈরি করেন। এরপর ১৯৯০ সালের মধ্যে মোট উনিশটি ছবিতে প্রযোজক হিসেবে কাজ করেন স্টিভেন স্পিলবার্গ। মূলত শিশু-কিশোরদের উপযোগী ছবি এবং কার্টুন তৈরি করার দিকে মনোনিবেশ করেন তিনি। ইণ্ডিয়ানা জোন্স ধারার বেশ কিছু ছবি একের পর এক মুক্তি পায় স্পিলবার্গের পরিচালনায়। ১৯৯৩ সালে তাঁর পরিচালনায় ও প্রযোজনায় ‘জুরাসিক পার্ক’ নামের ছবিটি মুক্তি পায় যা তাঁর অন্যতম সেরা কাজ এবং এই ছবিটিও বক্স অফিসে বিপুল সাফল্যের পাশাপাশি বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তিনটি অ্যাকাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হয় এই ছবিটি যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কম্পিউটার নির্মিত ছবি ও এফেক্ট ব্যবহৃত হয়েছে। এই বছরই অস্ট্রেলিয়ান ঔপন্যাসিক ‘শিণ্ডলার্স আর্ক’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘শিণ্ডলার্স লিস্ট’ নামে একটি ছবি করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে। হলোকস্ট থেকে এগারোশো ইহুদিকে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে রক্ষা করেছিলেন অস্কার শিণ্ডলার্স, এই সত্য ঘটনাই স্পিলবার্গের ছবিতে প্রতিভাত হয়েছে। সাতটি বাফটা পুরস্কার এবং তিনটি গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার অর্জন করে এই ছবিটি এবং মার্কিন চলচ্চিত্র জগতের ১০০টি সেরা ছবির মধ্যে এটিকে অন্যতম বলে ধরে নেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালে ‘জুরাসিক পার্ক : দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড’ ছবিটি মুক্তি পায় তাঁর পরিচালনায়।

চলচ্চিত্র জগতে কৃতিত্বের জন্য বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ। ১৯৯৫ সালে এএফআই লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, ১৯৯৮ সালে অর্ডার অফ দ্য মেরিট ফেডেরাল রিপাবলিক অফ জার্মানি, ২০০৩ সালে হলিউড ওয়াক অফ ফেম পুরস্কার পান স্টিভেন স্পিলবার্গ।

সর্বশেষ ২০১৯ সালে স্পিলবার্গ ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’ নামে একটি ছবি তৈরি করেছিলেন, কিন্তু তা এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পায়নি।       


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading