ভূগোল

ঢাকা জেলা

বাংলাদেশ ৬৪টি জেলাতে বিভক্ত। বেশিরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল ঢাকা (Dhaka) জেলা। 

ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী এবং ঢাকা বিভাগের প্রধান শহর। দিল্লির পরেই দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় জনবহুল শহর ঢাকা। ঢাকা একইসঙ্গে একটি মেগাসিটি এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান শহর। এই জেলাকে ‘মসজিদের শহর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। ইসলামী স্থাপত্য ও বুড়িগঙ্গার নদীপ্রবাহের কারণে একে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ও বলা হয়৷ এই জেলা ‘বিশ্বের রিকশা রাজধানী’ নামেও পরিচিত কারণ এই শহরের রাস্তায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লক্ষ রিকশা চলাচল করে। 

এই জেলার উত্তরে গাজীপুর জেলা ও টাঙ্গাইল জেলা, দক্ষিণে মুন্সিগঞ্জ জেলা, পূর্বে নারায়ণগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে মানিকগঞ্জ জেলা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ফরিদপুর জেলা অবস্থিত। এই জেলার গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলি হল ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, বংশী, তুরাগ, বালুনদী। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরেই ঢাকা জেলা অবস্থিত। চারশো বছর আগে এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল ঢাকা শহর। প্রায় ৩০ কিমি দীর্ঘ এবং ৪০০ মিটার প্রশস্ত বুড়িগঙ্গা নদীর গভীরতা প্রায় ৪০ মিটার। ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যা নদীর জল  মিলিত হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর সৃষ্টি হয়েছিল। তবে বর্তমানে এই নদী ধলেশ্বরী নদীর শাখাবিশেষ।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


আয়তনের বিচারে এই জেলা সমগ্র বাংলাদেশে ষষ্ঠ বৃহত্তম জেলা। এর আয়তন প্রায় ১৪৬৩.৬০ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা জেলা সমগ্র বাংলাদেশে সর্বাধিক জনবহুল জেলা। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকা জেলার জনসংখ্যা ১,২৫,১৭,৩৬১ জন।

এই জেলার নামকরণ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতান্তর রয়েছে। একটি মত অনুসারে, একসময় এই অঞ্চলে প্রচুর ঢাক গাছের প্রাচুর্য ছিল বলে সেই গাছের নাম থেকে এই জনপদের নাম ‘ঢাকা’ হয়েছে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, ইসলাম খান তাঁর রাজধানী উদ্বোধনের দিনে পরিবেশকে উৎসব মুখরিত করতে ঢাক বাজানোর নির্দেশ দেন – একসঙ্গে বেজে ওঠা ঢাকের শব্দই অঞ্চলটির এরূপ নামকরণের আরেকটি কারণ। আবার এখানে প্রচলিত প্রাকৃত ‘ঢাকাভাষা’ থেকেও নামটির উৎপত্তি হতে পারে বলে ধরে নেওয়া হয়। কলহন রচিত ‘রাজতরঙ্গিণী’ গ্রন্থে ‘ঢাক্কা’ শব্দটি ‘পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার এলাহাবাদ শিলালিপিতে উল্লিখিত সমুদ্রগুপ্তের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ‘ডবাক’কে অনেক ক্ষেত্রেই ঢাকার পূর্বনাম বলে ধরা নেওয়া হয়। কথিত আছে যে, সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভ্রমণ করার সময়ে নিকটবর্তী জঙ্গলে হিন্দু দেবী দুর্গার একটি মূর্তি খুঁজে পেয়ে ঐ এলাকায় একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর বিগ্রহ ঢাকা বা গুপ্ত অবস্থায় যেহেতু খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, তাই রাজা মন্দিরের নাম রাখেন ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির’। মন্দিরের নাম থেকেই ক্রমে ক্রমে স্থানটির নাম হয় ‘ঢাকা’৷  

এই অঞ্চলের পুরাতাত্ত্বিক ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, মোগল-পূর্ব যুগে ঢাকা শহরে দুটি এবং মিরপুরে একটি মসজিদ ছিল যার মধ্যে প্রাচীনতমটির নির্মাণকাল ১৪৫৬ সাল। জোয়াও দ্য ব্যারোস ১৫৫০ সালে তাঁর আঁকা মানচিত্রে ঢাকা জেলার অবস্থান নির্দেশ করেছেন। ‘আকবরনামা’ গ্রন্থে ঢাকা একটি থানা হিসেবে এবং ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে পরগনা হিসেবে ঢাকাকে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম খান চিশতি সুবে বাংলার রাজধানী রাজমহল অঞ্চল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং স্বভাবতই মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে এখানকার নতুন নাম হয় জাহাঙ্গীরনগর। প্রশাসনিকভাবে স্থানটির নাম পরিবর্তন হয়ে জাহাঙ্গীরনগর হলেও সাধারণ মানুষের মুখে ঢাকা নামটিই প্রচলিত থেকে যায়। ফলত সকল বিদেশি পর্যটক এবং বিদেশি কোম্পানির কর্মকর্তারাও তাদের বিবরণ এবং সরকারি চিঠিপত্রে ঢাকা নামটিই ব্যবহার করতে থাকেন। ঢাকা ১৬১০ সালে প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তারপর প্রায় একশো বছর ঢাকার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ ছিল। এই শহরে ছিল প্রশাসনিক সদর দফতর এবং সুবাদার ও অন্যান্য কর্মচারীদের বাসস্থান। তবে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কারণে মাহজাদা সুজা রাজধানী স্থানান্তর করলে ঢাকা তার গুরুত্ব হারিয়ে একটি স্থানীয় প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নদীপথের পাশে অবস্থানের কারণে ঢাকা প্রাক্‌-মোগল যুগ থেকেই স্থানীয় বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। এখানে উৎপাদিত মসলিন সুতিবস্ত্র ছিল উচ্চমানসম্পন্ন এবং বহির্বিশ্বে এর প্রচুর চাহিদা ছিল। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি এখান থেকেই মসলিন আমদানি করতো। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের দিকে যখন ঢাকাকে পূর্ব বাংলা ও আসাম নামে নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয়, ঢাকার প্রশাসনিক গুরুত্ব নাটকীয়ভাবে আরও বৃদ্ধি পায়। আবার ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পর ‘পূর্ব বাংলা’ নামে নতুন প্রদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকা প্রতিষ্ঠা পায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঢাকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নৃশংস গণহত্যার কারণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহরুল হক এবং জগন্নাথ হলের ছাত্রদের নির্বিচারে হত্যা করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এছাড়া ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের রক্তে ভেসেছিল ঢাকার রাজপথ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে সম্মিলিত হয়েছিল বাংলা ভাষাভাষী অগণিত ছাত্র-ছাত্রী আর তাঁদের মধ্যেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ দেয় রফিক, সালাম, বরকত সহ আরো অনেক তরুণ ভাষাশহীদ।

এই অঞ্চলের ভাষা মূলত অর্ধতৎসম, তদ্ভব আর দেশি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে।ইউরোপীয় বা আরবি-পারসি শব্দের ব্যবহার এই ভাষায় নেই বললেই চলে। উচ্চারণে নাসিক্য ধ্বনি, বিশেষ করে চন্দ্রবিন্দু বর্জিত সরল বাংলা ভাষার ব্যবহারই সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। ঢাকা জেলার ভাষাকে সাধারণত ‘পূর্ববঙ্গীয় ভাষা’ নামে অভিহিত করা হয়। উল্লেখ্য যে, মহানগরী ঢাকার এক শ্রেণির জনগোষ্ঠী বাংলা, উর্দু, হিন্দি, ফার্সি মিশ্রিত এক প্রকার ভাষার ব্যবহার করে থাকে যা ‘ঢাকাইয়া ভাষা’ নামে পরিচিত। 

এই জেলার অধিবাসীদের মধ্যে বেশিরভাগই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তবে কয়েকঘর হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষও এখানে বসবাস করেন।

এই জেলায় প্রশাসনিক সুবিধের জন্য ৫টি উপজেলা রয়েছে। যথা – দোহার, নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও ধামরাই উপজেলা। এছাড়া এই জেলায় দুটি নগর-কর্পোরেশন রয়েছে। ৩টি পৌরসভা, ৭৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই জেলায় সংসদীয় আসন রয়েছে কুড়িটি যার অধিকাংশই বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের অধীনে।

বুড়িগঙ্গা নদী-বিধৌত এই জেলার উর্বর সমভূমিতে ধান, পাট, বিভিন্ন শাক-সব্জি সহ অন্যান্য ফসল ভালো ফলে।  

ঢাকা জেলার উল্লেখযোগ্য  ভ্রমণস্থানের তালিকা অপূর্ণই থেকে যাবে যদি তালিকার শুরুতেই আহসান মঞ্জিলের নাম না থাকে। আহসান মঞ্জিল ছাড়াও বিখ্যাত ভ্রমণস্থানের মধ্যে পড়ে লালবাগ কেল্লা, ছোট কাটরা, শাহী মসজিদ, তারা মসজিদ, সাত মসজিদ, বড় কাটারা, আহসান মঞ্জিল ও ঢাকা গেট ইত্যাদি। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ায় এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলির বেশিরভাগই মোগল আমলে নির্মিত হয়েছিল। প্রায় সময়ই স্থানগুলিতে পর্যটকদের ভিড় দেখা যায়। এই ভ্রমণস্থানগুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া যেতে পারে৷ ঢাকা শহরের প্রথম ইঁট-পাথরের তৈরি স্থাপত্য নিদর্শন আহসান মঞ্জিলেই নবাবদের হাতে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে উঠেছিল। লর্ড কার্জন ঢাকায় এলে এই ভবনেই থাকতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। লালবাগ কেল্লা এখানকার উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থান। রাজধানী ঢাকার টিকাটুলিতে অবস্থিত রোজ গার্ডেন প্যালেস যা হৃষীকেশ দাস নামের এক হিন্দু জমিদার বিনোদনের জন্য নির্মাণ করেছিলেন৷ রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত গাছের ছায়াঘেরা অঞ্চল সঙ্গে নদী তীরের মুক্ত বাতাস ও কোলাহলহীন পরিবেশে অবসর সময় কাটানোর জন্য নেভারল্যান্ড একটি সেরা বিনোদন কেন্দ্রের নাম। ঢাকার কেরানীগঞ্জের সাউথ টাউন আবাসিক প্রকল্পে নজরকারা স্থাপত্যশৈলী ও বৈচিত্র্যময় নির্মাণ কৌশলে সমৃদ্ধ ‘সাউথ টাউন জামে মসজিদ’ অবস্থিত। ‘ছোট কাটরা’ শায়েস্তা খানের আমলে তৈরি হয়েছিল সরাইখানা বা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য। ১৮৭২ সালে নির্মিত হয়েছিল যে ‘নর্থব্রুক হল’ তার লালরঙের কারণেই পরবর্তীকালে একে লালকুঠি নামে ডাকা হতো।এই লালকুঠিতে বহু পুরোনো একটি গ্রন্থাগার আছে।

ঢাকা জেলা বেশ কিছু বিখ্যাত মানুষের জন্মস্থান যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নবাব আবদুল গনি, নবাব খাজা আহসান উল্লাহ, খাজা সলিমুল্লাহ বা নবাব সলিমুল্লাহ, কবি শামসুর রাহমান, আজম খান, গায়িকা উৎপলা সেন, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন প্রমুখ। 

ঢাকা জেলার সংস্কৃতি বাংলাদেশের সংস্কৃতিরই একটি অংশ হলেও এই জেলার কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই জেলার ঢাকাই জামদানী শাড়ি আজ সারা বিশ্ব জুড়ে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছে। খাদ্যাভাসে, পোশাকে, শিল্পকর্মে, খেলাধূলা, সঙ্গীতে, লোকগীতিতে, স্থাপত্যে, হস্তলিপি এবং অন্যান্য সৃষ্টিশীল কর্মক্ষেত্রে নিজস্বতার ছাপ রেখেছে ঢাকা জেলা।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও