সববাংলায়

ঢাকেশ্বরী মন্দির

বিভাগঃ ,

বাংলাদেশের জাতীয় হিন্দু মন্দির হল ঢাকেশ্বরী মন্দির (Dhakeshwari Temple)। ঢাকেশ্বরী রোডের লালবাগ দুর্গের কাছে অবস্থিত ঢাকেশ্বরী মন্দিরটি বাংলাদেশের অন্যান্য মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান মন্দির। সনাতন ধর্মের মানুষেরা বিশ্বাস করে যে, ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকেই ওই অঞ্চলের নাম হয়েছে ঢাকা। ঢাকেশ্বরী নামের প্রকৃত অর্থ হল ঢাকার দেবী বা ঢাকার ঈশ্বরী। ঢাকার অধিষ্ঠাত্রী এই দেবী প্রায় ৯০০ বছর ধরে আদি শক্তি মা দুর্গার রূপ হিসাবে এই মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন। প্রতি বছর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার পুণ্যার্থী দেবী দুর্গার আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্য এই মন্দিরে আসে।

ঢাকেশ্বরী মন্দির ভারতীয় উপমহাদেশের একটি পবিত্রতম শক্তিপীঠ বলে মনে করা হয়। জনশ্রুতি আছে যে, দক্ষযজ্ঞের পর শিব যখন সতীর দেহ নিয়ে তাণ্ডব শুরু করেছিলেন তখন বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে দেবীর দেহ ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত করে দেন। প্রত্যেকটি খণ্ড যেখানে পড়েছিল সেখানেই একটি করে সতীপীঠ গড়ে ওঠে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ঢাকা অঞ্চলে সতীর মুকুটের অংশ বা রত্ন পড়েছিল এবং এরপর থেকে ওই স্থানে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু হয়। তবে বর্তমানে এই মন্দিরে সতীর মুকুটের রত্নটি আর নেই, তা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।

এই মন্দির প্রতিষ্ঠার বিষয়ের প্রচলিত কাহিনি হল যে, একদিন সেন রাজবংশের রাজা বিজয় সেনের গর্ভবতী স্ত্রী স্নানের জন্য লাঙ্গলবন্দে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে তিনি ওই স্থানে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন, যিনি পরবর্তীকালে বল্লাল সেন নামে পরিচিত হয়েছিলেন। এই বল্লাল সেন সিংহাসনে আরোহণের পর নিজের জন্মস্থানকে মহিমান্বিত করার জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। আবার অন্য কিংবদন্তি অনুসারে, বল্লাল সেন একবার জঙ্গলে আচ্ছাদিত এক দেবীর স্বপ্ন দেখে দুর্গার মূর্তি লাভ করেছিলেন বলে দেবীর নাম হয় ঢাকেশ্বরী অর্থাৎ ‘ঢাকা + ঈশ্বরী’। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, জঙ্গলের যাবতীয় বিপদ থেকে তাঁকে রক্ষার পেছনে রয়েছে এই দেবী আর এই কারণে তিনি ওই অঞ্চলে বারশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ঢাকেশ্বরী মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গে মন্দিরের উপর আক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার পর সম্ভাব্য আক্রমণ ও লুন্ঠন থেকে দেবীর মূর্তি রক্ষা করার জন্য গোপনে এই মন্দিরের প্রাচীন বিগ্রহটি কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীকালে ওই মূর্তিটি ১৯৫০ সালে কলকাতার কুমোরটুলিতে ব্যবসায়ী দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরীর উদ্যোগে তৈরি একটি নতুন মন্দিরে স্থাপন করা হয়। এরপরেও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রমনা কালী মন্দির ধ্বংসের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক এই মন্দিরও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশকে ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণার পর থেকে বাংলাদেশী হিন্দু গোষ্ঠীগুলি প্রধান হিন্দু উপাসনালয়ের সরকারি স্বীকৃতির দাবি জানাতে শুরু করে। তাদের সেই দাবিকে সমর্থন করে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে জাতীয় মন্দিরের মর্যাদা দিয়ে তার নতুন নাম দেন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির। বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ যেখানে জাতীয় হিন্দু মন্দির রয়েছে।

ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বরে কয়েকটি মন্দির ও বিভিন্ন সৌধ লক্ষ করা যায়। এই মন্দিরের অঙ্গনে প্রবেশের জন্য একটি সিংহদ্বার বা সিংহ তোরণ বা নহবতখানা তোরণ রয়েছে আর তার উপরে রয়েছে একটি ঝুলন্ত ঘণ্টা। লোককথা অনুসারে একসময় বড় বড় হাতি চলাচলের জন্য এই তোরণটি ব্যবহার করা হত। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সমগ্র মন্দির প্রাঙ্গণটি দুটি অংশে বিভক্ত – অন্তর্বাটি বা অভ্যন্তরীণ অংশ ও বহির্বাটি বা বাইরের অংশ। পূর্বদিকে অবস্থিত এই মন্দিরের অভ্যন্তরীণ অংশের মধ্যে রয়েছে মূল মন্দির, নাটমন্দির ও অন্য ইমারত। এই অংশে প্রবেশের জন্য আবার একটি পৃথক তোরণদ্বার রয়েছে। এছাড়া মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণটি রয়েছে পশ্চিম দিকে, যেখানে কয়েকটি মন্দির, একটি পান্থশালা, বেশ কয়েকটি ঘর ও একটি গ্রন্থাগার আছে। এই গ্রন্থাগারে সনাতন ধর্মের প্রায় ৫০০ টি বই রয়েছে, তবে এই গ্রন্থাগারটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়।

দক্ষিণমুখী এই মন্দিরের প্রবেশ করার পর প্রথমে দেখা যায় একটি দুর্গামন্ডপ। মন্দিরের সামনে রয়েছে বিশাল বড় নাটমন্দির আর তার পাশেই রয়েছে একটি ভোজনালয়। মন্দিরের পূর্ব দিকে কিছু সাধুর সমাধি রয়েছে যাঁরা মন্দিরে প্রার্থনা বা ধ্যান করতেন। প্রধান মন্দিরের ভবনগুলি উজ্জল হলুদ ও লাল রঙের। মূল মন্দিরের কেন্দ্রীয় কক্ষের ডান ও বাম পার্শ্বের কক্ষদুটির প্রতিটিতে একটি করে কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গ রয়েছে। এছাড়া মন্দিরের বাইরের দিকে আরও চারটি শিব মন্দির দেখা যায়। বেশ উঁচু বেদির উপর অবস্থিত বলে মন্দিরগুলিতে প্রবেশের জন্য রয়েছে সিঁড়ি।

এছাড়া ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছে একটি প্রাচীন দীঘি ও একটি বটবৃক্ষ রয়েছে। ভক্তরা নিজেদের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য ওই দীঘিতে স্নান করেন। এছাড়া মন্দিরের পাশে রয়েছে একটি সুন্দর বাগান।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের স্থাপত্যে বাংলা চৌচালা এবং শিখর শৈলীর মিশ্রণ দেখা যায়। আবার অনেকের মতে চুন-বালি মিশ্রিত এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে মুসলিম আমলের স্থাপত্যশৈলীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়া কিছু ঐতিহাসিকের মতে মন্দিরের গঠন একটি বৌদ্ধ প্যাগোডার মতো। ঢাকার ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিদর্শন থাকলেও ধারাবাহিকভাবে সংস্কারের ফলে এই ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নানা রকম পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করা হয়। এছাড়া মন্দিরের রাষ্ট্রীয় মালিকানার কারণে রীতি অনুসারে মন্দির চত্বরে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রতিদিন সকালে উত্তোলন করা হয় এবং জাতীয় শোক পালনে তা অর্ধনমিত রাখা হয়।

ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রায় ৮০০ বছরের, আবার অনেকের মতে প্রায় ৯০০ বছরের পুরনো একটি দেবী দুর্গার মূর্তি ছিল। দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক বিভেদের রোষানল থেকে ওই মূর্তিটিকে রক্ষা করার জন্য গোপনে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার কুমারটুলিতে নিয়ে চলে আসা হয়। ১.৫ ফুট উঁচু দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী এই ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মূল মূর্তিটি হল সোনার। মূর্তিটিতে দেবীর ডান ও বাম পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক এবং গণেশের মূর্তি রয়েছে। দেবীর বাহন হিসেবে একটি পশুর প্রতিমাও দেখা যায়। তবে ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বর্তমানে যে মূর্তিটির পূজা করা হয়, তা ওই মূল মূর্তির প্রতিরূপ মাত্র।

প্রাচীনকালে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে চৈত্র মাসে উৎসবের আয়োজন করা হত। ওই সময় ধার্মিক ব্যক্তিরা ধর্মীয় পুণ্য অর্জনের জন্য মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করতেন। তবে বর্তমানে এই মন্দিরে মহাসমারোহে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। প্রতি বছর ঢাকার দুর্গাপুজার সব থেকে বড় আয়োজন হয় এখানে। গণ্যমান্য অনেক ব্যক্তি বাংলাদেশী হিন্দু সম্প্রদায়কে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানাতে এই মন্দিরে আসেন। ঐতিহ্যবাহী বাঙালি রীতিনীতি অনুসরণ না করে, এখানে দেবী দুর্গার পুজা করা হয় উত্তর ভারতীয় নবরাত্রির রীতি মেনে। এই সময় দেবীকে সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ প্রসাদ দেওয়া হয়। এই মন্দিরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে মঙ্গল ঘাটে বারোটি মাটির প্রদীপ জ্বালানোর রীতি আছে। এছাড়া এই দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার কয়েক দিন পরে পার্শ্ববর্তী মাঠে একটি বিজয়া সম্মেলন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ঢাকার বিখ্যাত সঙ্গীত এবং চলচ্চিত্র শিল্পীরা অনুষ্ঠান করেন। হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের মানুষরাও এই অনুষ্ঠানে আনন্দের সাথে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া এই মন্দিরে কৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমীতেও বিশেষ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হয় এবং তারপর পুরানো ঢাকার রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যায়।

ঢাকেশ্বরী মন্দির শান্ত ও ঐতিহ্যবাহী একটি মন্দির। প্রকৃতির মৃদু শব্দ মন্দিরের ঘণ্টার সুরের সাথে মিশে এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ভক্তদের একটি আধ্যাত্মিক তৃপ্তি প্রদান করে। এই মন্দিরের স্থাপত্য দেখলে মন্দিরটিকে কেবলমাত্র ধর্মীয় স্থান হিসেবে নয় বরং একটি সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক প্রকাশ হিসেবেও মনে হয়। আর মন্দিরে সাংস্কৃতিক রীতিনীতি এবং দুর্গাপুজোর মতো উৎসব উদযাপনের মধ্যে দিয়ে মন্দিরটি বিশ্বব্যাপী ভক্তের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।